
১
গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি প্রতিবাদের এক অত্যন্ত শক্তিশালী অস্ত্রও বটে। ইতিহাস জুড়ে শিল্পী ও সুরকাররা সচেতনভাবে তাদের সৃষ্টিকে ব্যবহার করেছেন সামাজিক অন্যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জোরালো আওয়াজ তোলার জন্য। যখন প্রচলিত যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণ বা ভয়ের কারণে নীরব বা অবরুদ্ধ থাকে, ঠিক তখনই গান তার সার্বজনীন আবেদন নিয়ে গণমানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে। এই সঙ্গীত সেখানে প্রতিবাদের এক নতুন স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে তোলে এবং মানুষের চেতনাকে উদ্দীপ্ত করে। আমরা সম্প্রতি জুলাই ২৪-এর আন্দোলনেও এর প্রমাণ দেখেছি, যেখানে র্যাপগান কীভাবে দ্রুত প্রতিবাদের প্রধান ভাষা হয়ে উঠেছিল। গানের একটি বিশেষ ও অনন্য ক্ষমতা হলো এটি যুক্তির চেয়েও আগে মানুষের গভীর আবেগ এবং অনুভূতিকে সরাসরি স্পর্শ করতে পারে। একটি মর্মস্পর্শী সুর অথবা একটি শক্তিশালী, সুচিন্তিত লিরিক্স মুহূর্তেই হাজার হাজার ভিন্ন মতের মানুষকে একই লক্ষ্যের জন্য একত্রিত করতে পারে। এটি কেবল তাদের মধ্যে সমবেদনা জাগিয়ে তোলে না, বরং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য সেই প্রতিবাদের চেতনাকেও শাণিত করে। এরফলে সঙ্গীত সবসময়ই একটি মুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের জন্য অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
২
ইতিহাসের পাতায় সঙ্গীতের প্রতিবাদী সুর।
প্রতিবাদী সঙ্গীত কেবল নির্দিষ্ট সময়ে আবির্ভূত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং সামাজিক বৈষম্যের মুখে যখন অন্যান্য মাধ্যম মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন সঙ্গীতই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের শেষ আশ্রয়। এটি শোষিত মানুষের বেদনা এবং বিদ্রোহের আকাঙ্ক্ষাকে এমন সুরে বাঁধতে পারে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণা সঞ্চার করে। গানের মূলশক্তি এর সহজবোধ্যতা এবং সার্বজনীনতা। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়:
ক। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং ফোক সঙ্গীত।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ফোক সঙ্গীত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই সময়ে শিল্পী বব ডিলান এবং জোন বায়েজ তাদের গানের মাধ্যমে বর্ণবৈষম্য এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাদের সঙ্গীত কেবল বিনোদন ছিল না, বরং তা ছিল প্রতিবাদের সরাসরি হাতিয়ার। বিশেষত 'We Shall Overcome' গানটি আন্দোলনের ঐক্য এবং অদম্য ইচ্ছার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে ডিলানের 'Blowin' in the Wind' গানটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওঠা মৌলিক প্রশ্নগুলোকে তুলে ধরে, যা ছিল প্রতিবাদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। এই শিল্পীরা তাদের গানের সুর ও কথায় নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরকে ধারণ করে আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন।
খ। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন: শান্তির বার্তা।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে সঙ্গীত ছিল সেসময়ের তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার। যুদ্ধ যখন আমেরিকান সমাজে গভীর বিভেদ সৃষ্টি করেছিল, তখন সঙ্গীত শিল্পীরা শান্তির সপক্ষে এবং সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে কণ্ঠস্বর তুলে ধরেন। জন লেননের কালজয়ী গান ‘Give Peace a Chance’ দ্রুত আন্দোলনের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়। এই সহজ কিন্তু শক্তিশালী বার্তাটি যুদ্ধের বিভীষিকার বিরুদ্ধে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিল। এছাড়া বব ডিলান এবং কান্ট্রি জো অ্যান্ড দ্য ফিশ-এর মতো শিল্পীদের গানগুলো সামরিক নীতির তীব্র সমালোচনা করে যা হাজার হাজার তরুণকে বিক্ষোভে নামতে উৎসাহিত করেছিল। সঙ্গীত এভাবে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের আবেগ ও নৈতিকতা ধারণ করে তাকে শক্তিশালী করেছিল।
গ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন: মুক্তির সঙ্গীত।
দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ ও কঠোর বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সঙ্গীত এক অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করেছিল। বর্ণবাদী সরকারের দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে এই গানগুলো জনগণের মধ্যে সাহস, সংহতি এবং প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল। বিশেষত নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তি এবং সকল নাগরিকের জন্য সমতার দাবিতে এই গানগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পী মিরিয়াম মাকেবা তার শক্তিশালী কণ্ঠস্বর নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবির্ভূত হন এবং তার গানগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে বর্ণবাদের ভয়াবহতা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেন। এই আন্দোলন প্রমাণ করে, কীভাবে সঙ্গীত একটি জাতির মুক্তির লড়াইকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
ঘ। চিলির স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন: ভিক্টর জারা।
১৯৭০-এর দশকে চিলিতে সামরিক স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোচেটের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অবিস্মরণীয় নাম হলেন শিল্পী ভিক্টর জারা। তিনি গানকে জনগণের দুঃখ-দুর্দশা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রতিরোধের কথা বলার জন্য শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। জারার ফোক সঙ্গীত দ্রুত গণমানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয় এবং আন্দোলনের প্রেরণা জোগায়। সামরিক বাহিনী তাকে নির্মমভাবে আটক ও হত্যা করে তার কণ্ঠস্বর চিরতরে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। অথচ তার শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও, ভিক্টর জারার সঙ্গীত আজও চিলির জনগণের মুক্তি এবং প্রতিবাদের এক অমর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঙ। বাংলায় গণজাগরণ ও বিদ্রোহ: গণসঙ্গীতের শক্তি।
বাংলায় গণজাগরণ ও বিদ্রোহের ইতিহাসে গণসঙ্গীতের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও এই ধারার সঙ্গীত ছিল গণমানুষের চেতনার প্রধান উৎস। হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং সলিল চৌধুরীর মতো দিকপাল শিল্পীরা তাদের গানের মাধ্যমে শ্রেণি-সংগ্রাম ও শোষণের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তীকালে কবি সিকান্দার আবু জাফরের মতো গীতিকাররা তাদের লেখনী দিয়ে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেন। এই গানগুলো কেবল মনোরঞ্জনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা সাধারণ মানুষের মনে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাত। ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ বা ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই গণসঙ্গীত প্রমাণ করে, কীভাবে একটি জাতি তার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার সময় সুরের শক্তিকে ব্যবহার করে।
ছ। পুয়ের্তো রিকোর প্রতিবাদ: কায়ে ১৩।
আধুনিক প্রতিবাদী সঙ্গীতের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো পুয়ের্তো রিকোর প্রভাবশালী ব্যান্ড কায়ে ১৩। ব্যান্ডের দুই ভাই, রেসিডেন্তে এবং ভিজিটান্তে তাদের সঙ্গীতের মাধ্যমে ল্যাটিন আমেরিকার তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলেন। তাদের গানের মূল বিষয়বস্তু ছিল রাজনৈতিক দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং নব্য-উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা। কায়ে ১৩ তাদের রেগেটন ও হিপ-হপের মিশ্রণে তৈরি সুরে ধারালো, বুদ্ধিদীপ্ত এবং আবেগপূর্ণ লিরিক্স ব্যবহার করেন। তাদের গান 'লাতিনো আমেরিকা' মহাদেশের মানুষের আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে। ব্যান্ডটি শুধু সঙ্গীত পরিবেশন করেনি, তারা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনেও সরাসরি অংশ নিয়ে প্রতিবাদকে মূলধারায় নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।
৩
একবিংশ শতাব্দীর প্রতিবাদ: ডিজিটাল যুগে গানের বিস্ফোরণ।
একবিংশ শতাব্দীতেও গান প্রতিবাদের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তার গুরুত্ব বজায় রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আয়োজিত আন্দোলনে র্যাপ, হিপ-হপ, রক মিউজিক তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদের নতুন ভাষা হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে এখন মুহূর্তের মধ্যে একটি প্রতিবাদের গান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ক। ‘বুম বুম তেল আবিব’ এবং এর শিল্পী লুকাস গেজ।
১৩ জুন ২০২৫ তারিখে ইরানে ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন গায়ক ও প্রযোজক লুকাস গেজ-এর ‘বুম বুম তেল আবিব’ গানটি মুক্তি পায়। গানটি ২০ জুন ২০২৫ তারিখে মুক্তি পায় এবং প্রকাশের পর থেকে রিল, স্টোরি, টিকটক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ সকল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে গানটির ৫৭৭ মিলিয়ন ভিউ হয়েছে। এই গানের জনপ্রিয়তার কারণ হলো ইসরায়েলের প্রতারণা, নিরীহ মানুষের ওপর হামলা এবং গাজায় চালানো বেসামরিক হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা গানের কথা ও বিষয়বস্তুতে তুলে ধরা হয়েছে, যা শ্রোতা-দর্শকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।
লুকাস গেজ একজন আমেরিকান-ইতালীয় নাগরিক, যিনি পূর্বে মার্কিন মেরিন কর্পসে কাজ করেছেন। তিনি ইসরায়েলের কার্যকলাপের তীব্র সমালোচক এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন আমেরিকানরা চায় না তাদের সরকার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নামুক। তিনি তার গানের কথায় লিখেছেন, ‘ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যেন তোমার আকাশে আলো ছড়ায়, আর তুমি বলছ তুমি যুদ্ধ শুরু করোনি, কিন্তু পুরো বিশ্ব জানে তুমি মিথ্যা বলছো।’ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। অনেক সমালোচক গেজকে একজন উগ্র ও চরমপন্থি এবং কেউ কেউ ‘নব্য-নাৎসি’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। লুকাস গেজ গানের কথায় ইসরায়েলের কার্যকলাপের ফলস্বরূপ তাদের উপর হামলার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ‘তুমি যখন ফিলিস্তিনের মৃত শিশুদের নিয়ে উপহাস করছিলে, তখন ভাবোনি একদিন এর ফলভোগ করতে হবে। এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে তোমার আকাশ আলোকিত, আর তুমি কাঁপছো আতঙ্কে, যেমনটা ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন অনুভব করে।’ লুকাস গেজ বলেছেন, ‘ইহুদিবাদীরা এই গানটি প্রায় পুরো ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলেছে।’ এই পদক্ষেপগুলো ইসরায়েলি সরকারের বর্ণবাদী ও অমানবিক নীতির বিরুদ্ধে নির্মিত সাংস্কৃতিক কাজ অপসারণের চলমান প্রচেষ্টার অংশ।
খ। আরব বসন্তের হিপ-হপ: এল জেনারেল।
২০১১ সালের আরব বসন্তের মতো গণজাগরণের সময় সঙ্গীত কীভাবে প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তিউনিশিয়ার র্যাপার এল জেনারেল। মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি তার তীক্ষ্ণ এবং সরাসরি গানের মাধ্যমে তৎকালীন স্বৈরশাসক জাইন এল আবিদিন বেন আলীর দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তুলে ধরেন। তার জনপ্রিয় গান ‘রাইস লেবেল্ড ফ্যামিলি’-এ তিনি শাসকগোষ্ঠীর বিলাসিতা এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেকার বৈষম্য তুলে ধরেন। গানটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটি দ্রুত সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তিউনিসিয়ার তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক বিক্ষোভে স্ফুলিঙ্গ জোগায়। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে গানটি এক বিশাল ভূমিকা পালন করে। এই প্রতিবাদের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও জনগণের অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার দ্রুত তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এল জেনারেলের সঙ্গীত প্রমাণ করে হিপ-হপ আধুনিক যুগে নিপীড়িত মানুষের আশা ও প্রতিরোধের ভাষা হতে পারে।
গ। রাশিয়ার প্রতিবাদ: পুসি রায়ট।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরোধী কণ্ঠস্বর হিসেবে পুসি রায়ট নামের ফেমিনিস্ট পাঙ্ক-রক গোষ্ঠীর নাম আন্তর্জাতিক মহলে সুপরিচিত। এই গোষ্ঠী তাদের তীব্র, সরাসরি এবং প্রকাশ্য প্রতিবাদের জন্য উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালে মস্কোর খ্রিস্ট দ্য সেভিয়ার ক্যাথেড্রালে তাদের বিতর্কিত 'পাঙ্ক প্রেয়ার' শিরোনামের পারফরম্যান্সটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে। তারা সরকারের দমনমূলক নীতি এবং অর্থোডক্স চার্চের সঙ্গে ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিরুদ্ধে গান গেয়েছিলেন। তাদের এই প্রতিবাদী পারফরম্যান্স এবং গানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়। এর ফলস্বরূপ গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে সমালোচনার জন্ম দেয়। পুসি রায়ট প্রমাণ করে শিল্পের মাধ্যমেও ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়া সম্ভব।
ঘ। ২০২৪ সালের আন্দোলনে বাংলা র্যাপ গানের বিস্ফোরণ।
২০২৪ সালের কোটা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে বাংলা র্যাপ গান ছিল প্রতিবাদের সবচেয়ে উদ্দীপক কণ্ঠস্বর। ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ার শঙ্কা উপেক্ষা করে নারায়ণগঞ্জের তরুণ র্যাপার সেজান ১৬ জুলাই প্রকাশ করেন ‘কথা ক’ গানটি। গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সেজান প্রশ্ন তোলেন “আমার ভাই–বইন মরে রাস্তায়, তর চেষ্টা কইরে? কথা ক।” সেজানের ভাই হান্নান হোসাইনও ১৭ জুলাই লেখেন ‘আওয়াজ উডা’ গানটি, যা দ্রুত স্লোগানে পরিণত হয়। এই র্যাপারদের গান প্রকাশের দায়ে ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়তে হয়, এমনকি হান্নানকে গ্রেপ্তার হয়ে ১২ দিন কারাগারে থাকতে হয়। আন্দোলনের সময় অন্তত ৪০টি বাংলা র্যাপ গান প্রকাশিত হয়, যা অন্য যেকোনো ঘরানার চেয়ে অনেক বেশি। ‘বাংলা মা’, ‘বায়ান্ন’, ‘দেশ কার’, ‘রক্ত’-এর মতো গানগুলো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তীব্র উদ্দীপনা জুগিয়েছে এবং র্যাপ গানের শ্রোতাগোষ্ঠীর গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
৪
সঙ্গীতের প্রতিবাদী শক্তি কালজয়ী এবং অনস্বীকার্য। গান তার গভীর আবেগ এবং স্পষ্ট বার্তার মাধ্যমে সমাজের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের মনের কথা তুলে ধরার এক অসাধারণ ক্ষমতা রাখে, যা কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা প্রচারমাধ্যম সহজে অর্জন করতে পারে না। এটি এমন এক সর্বজনীন ভাষা, যা ভৌগোলিক ও ভাষাগত সীমানা অতিক্রম করে মুহূর্তেই হাজারো মানুষকে একই চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বা রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে সঙ্গীত অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে, তা সে আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলন হোক, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী লড়াই হোক, অথবা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বব ডিলান, ভিক্টর জারা, মিরিয়াম মাকেবা কিংবা আপেল মাহমুদ, প্রত্যেকেই সুরকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি অপ্রতিরোধ্য হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই ধারা অব্যাহত আছে যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো র্যাপ বা হিপ-হপের মতো নতুন ধারাকে বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে, যেমনটি আমরা দেখলাম ‘বুম বুম তেল আবিব’ গানের ক্ষেত্রে। এটি প্রমাণ করে যে ক্ষমতাসীনদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও একটি প্রতিবাদের সুরকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। এই সঙ্গীত কেবল ক্ষোভ বা হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয় বরং এটি প্রতিরোধের চেতনা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতি মানুষের অদম্য আশাকে বাঁচিয়ে রাখে। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ, বৈষম্য এবং অবিচার বিদ্যমান থাকবে ততদিন সঙ্গীত তার দৃঢ় কণ্ঠস্বর নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে যাবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা জোগাবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৪ ডিসেম্বর ২০২৫