
১
ফ্রান্সিস বেকন ১৬ শতকের শেষার্ধে প্রথমবারের মত ইংরেজি সাহিত্যে ‘কালচার’ শব্দটি ব্যবহার করেন। শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ হলো সংস্কৃতি। আমার জানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, ভাষা, চিন্তাভাবনা, আচরণ, পোশাক, খাদ্য, ধর্ম, সংগীত, অঞ্চল বা ভূগোল ইত্যাদির সমষ্টিকে একত্রে সংস্কৃতি বলে। এই সংস্কৃতি সচেতন এবং অবচেতন উভয়ভাবেই আমাদের জীবনের প্রতিটি দিক প্রভাবিত করে। কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনসাধারণ কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে তারা কাজ করে, তাদের আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, পোশাক, তাদের কথা বা ভাষা, ধর্মীয় পরিচয়, সংগীত, সাহিত্য ইত্যাদি সম্মিলিতভাবে একটা সাংস্কৃতিক ধারা সৃষ্টি করে। সংস্কৃতির এই ধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সংক্রামিত হয় এবং সময়ের পরিক্রমায় নতুন নতুন চিন্তাভাবনা সংযোজিত হয়ে এর উন্নতি সাধিত হয়। সংগীত, ফিল্ম, টেলিভিশন, সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা দ্রুত অন্যান্য সংস্কৃতি দ্বারাও প্রভাবিত হতে পারি। এভাবে এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতির মাঝে প্রসার বা সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তি ঘটে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, এখন যে কেউ চাইলেই অন্যান্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং নিজেকে ঐ সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্বায়নের এই যুগে তরুণদের মধ্যে কে-কালচার ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখানে কে-কালচার বলতে কোরিয়ান কালচার বোঝানো হচ্ছে, যদি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চাই তাহলে দক্ষিণ কোরিয়ান সংস্কৃতিকে বোঝানো হচ্ছে। কে-পপ, কে-ফ্যাশন, কে-মুভি, কে-ড্রামা ইত্যাদি সবকিছু মিলেই কে-কালচার। কে-কালচার এতটাই জনপ্রিয় যে দক্ষিণ কোরিয়ান সরকার ২০২৩ সালেই কে-কালচার ভিসা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এই বিশেষ শ্রেণীর ভিসা মূলত কে-পপ এবং কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী বিদেশি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই ভিসায় তারা দেশটিতে নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করে কোরিয়ান সংস্কৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি প্রশিক্ষণও নিতে পারবেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো কে-কালচার বা কোরিয়ান সংস্কৃতি বাংলাদেশেও বেশ দ্রুত প্রভাব বিস্তার করছে। আমাদের দেশের তরুণদের একটা অংশ কে-পপের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে কে-ড্রামা উপভোগ করে থাকেন। সুতরাং কে-কালচার ভিসা চালু হলে বাংলাদেশে যে তা দ্রুতই জনপ্রিয় হবে, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে।
২
দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে উদ্ভূত সঙ্গীতের একটি ধারা হলো কে-পপ। সংগীত জগতে বিশ্বায়নের যে ঢেউ তার ফলে পপ, এক্সপেরিমেন্টাল, রক, জ্যাজ, গসপেল, হিপ-হপ, আরএন্ডবি, র্যাগে, ট্রন ডান্স ইত্যাদির সাথে কোরিয়ান লোকজ, দেশজ, ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের সংমিশ্রণে এই ধারাটির উদ্ভব ঘটে এবং ২০০০-এর দশকে ‘কে-পপ’ শব্দটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত ১৯৯২ সালের দিকে কোরিয়ান ছেলেদের একটা হিপ-হপ ব্যান্ড, Seo Taiji and Boys পশ্চিমা সঙ্গীতের বিভিন্ন জনপ্রিয় ঘরানার সাথে বিদেশী বাদ্যযন্ত্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সমসাময়িক সঙ্গীতের সংমিশ্রণে একটি নতুন ধারা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালান। তাদের সেই প্রচেষ্টার ফলাফল হচ্ছে কে-পপ। এই দলটা ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। ছেলেদের এই ব্যান্ডের তিনজন সদস্য হলেন Seo Taiji, Yang Hyun-suk এবং Lee Juno। কে-পপ ইন্ডাস্ট্রিতে ছেলেদের দলগুলোর জয়জয়কার থাকলেও মেয়ে দলগুলোও কিন্তু পিছিয়ে নেই, এর উদাহরণ হলো ‘ব্ল্যাকপিংক’। এছাড়া ২০১৫ সালে মেয়েদের আরেকটা দল ‘টোয়াইস’ জেওয়াইপি এন্টারটেইনমেন্টের অধীনে ‘সিক্সটিন’ নামে একটা প্রোগ্রামের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে। ছেলেদের অন্যান্য দলের মধ্যে সিউলে অবস্থিত একটি কোরিয়ান-চাইনিজ দল হলো ‘এক্সো’, যা নয়জন ছেলে সদস্য নিয়ে গঠিত। এছাড়া এনসিটি (নিও কালচার টেকনোলজির সংক্ষিপ্ত রূপ) একটি দক্ষিণ কোরিয়ান দল, যা এসএম এন্টারটেইনমেন্ট দ্বারা গঠিত এবং জানুয়ারি ২০১৬ সালে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এটি বিশ্বের বৃহত্তম কে-পপ দলগুলোর একটি। তবে কে-পপ এর সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হলো বিটিএস, যার সব সদস্যই ছেলে। কোরিয়ান ভাষায় ‘ব্যাংতান সোনিওদান' এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো বিটিএস, যার বাংলা অর্থ ‘বুলেটপ্রুফ বয় স্কাউটস’। তবে বিশ্বব্যাপী ভক্তদের কাছে তারা বিটিএস নামেই পরিচিত, যার অর্থ ‘বিয়ন্ড দ্য সিন’।
২০১৩ সালের ১২ জুন মাত্র ৭ জন সদস্য নিয়ে বিটিএস আত্মপ্রকাশ করে বিগ হিট এন্টারটেইনমেন্টের মাধ্যমে, তাদের হিট একক অ্যালবাম ‘2 Cool 4 Skool’ দিয়ে। গত কয়েক বছর ধরে কে-পপের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলেও কারো কাজ বিটিএসের জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তারা দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত শিল্পী। বিটলসের পর তারাই দ্রুততম ব্যান্ড হয়ে ওঠে যাদের অ্যালবাম যুক্তরাষ্ট্রে চার্টে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে। ২ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তারা এটি করেছে। এই দলটি ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি ভোট নিয়ে বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডে টানা ২ বছরের জন্য শীর্ষ সামাজিক শিল্পীর খেতাব ছিনিয়ে এনেছে। বিটিএস ২০২০ সালের আগস্টে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বাধিক ইউটিউব ভিউয়ের রেকর্ড ভাঙে। তাদের প্রথম ইংরেজি গান 'ডায়নামাইট' এর ভিডিও মাত্র একদিনে ১০১.১ মিলিয়ন ভিউতে পৌঁছায়। ২০২২ সালের ২১ মে তারা আবার নিজেদের রেকর্ড ভেঙেছে। এসময় তাদের দ্বিতীয় ইংরেজি গান 'বাটার' এর ভিউ ছিল ১০৮.২ মিলিয়ন।
তিনজন র্যাপার (আরএম, সুগা এবং জে-হোপ) এবং চারজন কণ্ঠশিল্পী (জিন, জিমিন, ভি এবং জাংকুক) নিয়ে গঠিত এই দলটি হিপ-হপ, পপ, কিছু ইডিএম এবং র্যাপ ঘরানার গান করে, পাশাপাশি তাদের গানের মাধ্যমে প্রেম ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলোকেও তুলে ধরে। তারাই প্রথম কে-পপ দল যারা বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ড জিতেছে এবং প্রথম কে-পপ দল যারা গ্র্যামিতে মনোনয়ন পেয়েছে। আরএম বিটিএস ব্যান্ডের নেতা, একসময়ের র্যাপ মনস্টার এখন শুধু আরএম নামেই পরিচিত। ব্যান্ডের ২৮ বছর বয়সী জিন দলের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য, তিনি এই ব্যান্ডের একজন গায়ক। এছাড়া সুগা একজন র্যাপার। জে-হোপ একজন র্যাপার এবং এর পাশাপাশি তিনি এই ব্যান্ডের সৃজনশীল সদস্যদের একজন। তিনি বিটিএস-এর জন্য বেশ কয়েকটি হিট গান লিখেছেন। গায়ক ভি একজন অভিনেতা, তবে নেভার নামে একটা নেতৃস্থানীয় কোরিয়ান ওয়েবসাইটের জরিপে একসময় দলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২৩ বছর বয়সী জাংকুক বিটিএসের অন্যতম সদস্য। তিনি একজন অলরাউন্ডার। তিনি যখন এই ব্যান্ডে যোগ দিয়েছিলেন তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১৫ বছর। তবে বিটিএস-এ সবার শেষে যোগ দেয়া সদস্য জিমিন বর্তমানে এই দলের প্রধান গায়ক এবং সেরা নৃত্যশিল্পী।
বিটিএসকে ২০২০ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং তারা একটি বক্তৃতা দিয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারিত হয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছেন বিটিএস-এর সদস্য জাংকুক, বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘ড্রিমারস’ও গেয়েছেন তিনি। ‘ব্যাংতান বয়েজ’দের ভক্তের সংখ্যা বিশাল, তারা আর্মি (এআরএমওয়াই) নামেই পরিচিত। বিশ্বের যে কোনো ব্যান্ড বা শিল্পীর চেয়ে আবেগপ্রবণ বিটিএস-এর ভক্তরা। আর্মির অর্থ 'অ্যাডোরেবল রিপ্রেজেন্টেটিভ এমসি ফর ইয়ুথ'। বিটিএস-এর সাফল্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাদের এই ভক্ত বা সমর্থক গোষ্ঠী। অনুমান করা হয় যে, বিটিএস আর্মির ৫০ মিলিয়ন রিক্রুট সদস্য আছে। ইনস্টাগ্রামে তাদর ৪৩ মিলিয়নের বেশি ফলোয়ার আছে। টুইটারে আছে ৩০ মিলিয়নের বেশি এবং ফেসবুকে ১৮ মিলিয়নের বেশি। এছাড়া, ইউটিউবে আছে ৫১ মিলিয়নের বেশি ও চ্যানেলে ১০ বিলিয়নেরও বেশি বেশি ভিউ হয়েছে।
৩
সারা বিশ্বের অসংখ্য কে-পপ ভক্তের মধ্যে বাংলাদেশের কাশফিয়া আরিফ-এর নামটা আলাদা করেই উচ্চারণ করতে হবে। কেননা তিনি শুধু ভক্ত নন, কে–পপ তার কাছে গবেষণার বিষয়। ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে কয়েক বছর শিক্ষকতা করে তিনি এখন কানাডার অন্টারিও কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন ইউনিভার্সিটিতে ‘আর্টস ইন ক্রিটিসিজম অ্যান্ড কিউরেটোরিয়াল প্র্যাকটিস’ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। মাস্টার্সে তার থিসিসের বিষয় ছিল ‘ফ্যান্ডমস ইন কে-পপ: আ ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিস অব দ্য ট্রান্সন্যাশনাল ফ্যান কালচার অব কে-পপ অ্যান্ড দ্য সোশ্যাল মিডিয়া’, ২০১৪ সালে। কাশফিয়া প্রথম আলোর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কে-পপের কনসার্টের সঙ্গে অন্য কনসার্টের পার্থক্য হলো, এখানে ‘মোটামুটি ভক্ত’ বলে কেউ নেই। সব ভক্তই ১০০-তে ১১০!’ কে কন, কে–পপ ফেস্টিভ্যাল নামে বাংলাদেশে বড় বড় আয়োজন হয়। ফেসবুকেও ভক্তদের একাধিক গ্রুপ আছে। দেশে কে–পপ ফেস্টিভ্যাল হলে অনেক ছোট ছোট বাচ্চা মা-বাবার হাত ধরে আসে। এটা যে শুধু টিনদের পছন্দ এমন নয় এবং কে-পপের ভক্তরা শুধুই ঢাকাকেন্দ্রিক তাও না, ঢাকার বাইরে বরং কে-পপের ভক্তের সংখ্যা বেশি। ‘কে-পপ’ উন্মাদনার কারণে কোরিয়ার পপ ঘরানার অনুরাগী গড়ে উঠেছে বিশ্বজুড়ে। কে-পপ শুধু সঙ্গীতের বিষয় নয় বলেই হয়তো এটি এত আকর্ষণীয়, তাদের টো-ট্যাপিং টেকনো বিট, ট্রেন্ড-ডিফাইনিং ফ্যাশন এবং নিখুঁতভাবে কোরিওগ্রাফ করা ভিডিওগুলোর জন্যই ‘কোরিয়ান ওয়েভ’ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ওয়েভ স্পর্স করেছে আমার ছোট পরিবারটাকেও। আমার মেয়ে ফিয়েস্তা, নিজেকে একজন ‘আর্মি’ বলে দাবী করে এবং ছেলেটাও তার বোনের পদচিহ্ন ধরে হাঁটছে। আম্মু এই লেখাটা তোমাদের জন্যই।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
হদিসঃ
১। প্রথম আলো ২৮ নভেম্বর ২০২১
২। দি ডেইলি স্টার ১ জানুয়ারি ২০২২
৩। মানবজমিন ২ জানুয়ারি ২০২৩
৪। ইন্টারনেট