
১
ডেভিড কোরেশ একজন স্বঘোষিত মার্কিন কাল্ট লিডার। তিনি ডুমস-ডে নিয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন এবং ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানস নামে ধর্মীয় গোষ্ঠীর একজন নেতা, তিনি নিজেকে ঐ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সর্বশেষ নবী বলে বিশ্বাস করতেন। তিনি কারো কাছে যেমন জেসাস ক্রাইস্ট, আবার কারো কাছে তিনি খ্রিষ্টীয় ধারণার বিকৃত প্রতিচ্ছবি। তিনি পাপীদের ক্ষমা করতেন না এবং রক্তাক্ত না হওয়া পর্যন্ত তার অনুসারীদের নির্যাতন করতেন, যাদের মধ্যে নারী-শিশু এমনকি ৮ মাসের শিশুও ছিল। তিনি সবসময় তার সাথে নাইন এমএম পিস্তল এবং ভয়ঙ্কর দাহ্য পদার্থ রাখতেন বলে জানা যায়। এতসব সত্ত্বেও তার কয়েকশ আবেগপ্রবণ ভক্ত ছিল, যারা বিশ্বাস করতো স্বর্গে যাওয়ার পথ হলো নরকের ভিতর দিয়ে। তাই হয়তো ডেভিড কোরেশ অগ্নিকান্ডে নিজের এবং তার সম্প্রদায়ের জন্য ধ্বংস ডেকে এনেছিলেন।
২
১৯৪২ সালে সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চ ভেঙে ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান কাল্ট গড়ে ওঠে। যার নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ তার নাম ভিক্তর হুউটেফ। তিনি বিশ্বাস করতেন যিশুর প্রত্যাবর্তন কেবল তখনই ঘটবে যখন খ্রিস্টানদের একটা ক্ষুদ্র দল পরিশুদ্ধতা লাভ করবে। নিউ টেস্টামেন্টের শেষ অধ্যায় ‘The Book of Revelation’ এর Chapters 5, 6, 8-এ ‘The Seven Seals’ এর কথা বলা হয়েছে, যা বাইবেল পন্ডিতদের ধাঁধায় ফেলেছে। খ্রিষ্টীয় পরলোকতত্ত্বে (১) White Horse, Bow & Crown (২) Red Horse, a Great Sword, (৩) Black Horse, Pair of Balances, (৪) Pale Horse, Death and Hades, (৫) Souls Crying Out, Given White Robes, (৬) Earthquake, Sun, Moon, Stars, (৭) Silence in Heaven, for half an hour খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভিক্তর হুউটেফ মনে করতেন তার প্রথম কাজ হলো এসব গুপ্ত রহস্য ভেদ করা। অনেকের মতে, এসব যিশুর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন এবং মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত। ভিক্তর হুউটেফ মনেকরতেন তার দ্বিতীয় কাজ হলো একটা ছোট খ্রিস্টান গোষ্ঠীকে বিশুদ্ধ করা। এরফলে যীশুর জেরুজালেমে প্রত্যাবর্তন সুগম হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাপ্রলয়ে ব্যবিলনের পতন হলে ‘কিংডম অব ডেভিড’ এর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। এই উদ্দেশ্যেই ভিক্তর হুউটেফ ১১ জন অনুসারী নিয়ে টেক্সাসের ওয়াকো থেকে নয় মাইল উত্তর-পূর্বে এলক শহরের মাউন্ট কারমেলে ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান কাল্ট (the General Association of Branch Davidian Seventh-day Adventists) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার দলটিকে বলতেন Shepherd's Rod।
১৯৫৫ সালে হাউটেফের মৃত্যুর পর, তার স্ত্রী ফ্লোরেন্স ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান-এর নিয়ন্ত্রণ নেন। একই বছর, রডেন (হাউটেফের একজন অনুসারী), তিনি নিজেকে ঈশ্বরের কাছ থেকে একটি নতুন বার্তা বলে বিশ্বাস করে ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানদের অনুসারীদের কাছে বেশ কিছু চিঠি লিখেন। যারা তার উপরে আস্থা আনেন তারা পরবর্তীতে ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানস সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট হিসাবে পরিচিত হয়েছিলেন। ফ্লোরেন্স ১৯৬২ সালে ডেভিডিয়ান এসোসিয়েশন ভেঙ্গে দেন এবং ব্রাঞ্চ এর প্রায় সব সম্পত্তি রডেন-এর কাছে বিক্রি করে দেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ নাগাদ অবশিষ্ট সম্পত্তি বেঞ্জামিন রডেন, লইস রডেন এবং তাদের ছেলে জর্জ রডেনের কাছে বিক্রি করা হয়। ১৯৭৮ সালে রডেনের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী লইস রডেন পরবর্তীতে নেতৃত্বে আসেন। এর কয়েক বছর পর ডেভিড কোরেশ নামে এক যুবকের মাউণ্ট কারমেলে আগমন ঘটে।
৩
ডেভিড কোরেশ ১৯৫৯ সালের ১৭ই আগস্ট তারিখে আমেরিকার টেক্সাসের হিউস্টনে বোনি স্যু ক্লার্ক নামে ১৫ বছরের এক নারীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ২০ বছর বয়সের এক যুবক ববি হাউএল। কোরেশের পারিবারিক নাম ছিল ভারনন ওয়াইনে হাউএল, ১৯৯০ সালে তিনি পারিবারিক নাম বদলে নিজের নাম রাখলেন ডেভিড কোরেশ। কোরেশের জন্মের পূর্বেই তার বাবা অন্য একটি কিশোরী মেয়ের সাথে পরিচিত হলে তার মা বোনি স্যুকে রেখে চলে যান। একারণে কোরেশের সাথে কখনোই তার বাবা’র সাক্ষাৎ হয়নি। তার মা এক সময় মাদক নিতে শুরু করেন এবং ১৯৬৩ সালে কোরেশের বয়স যখন ৪ বছর, তখন তার মা ছেলেকে ফেলে তার এক প্রেমিকের সাথে চলে যান। এরপর কোরেশ তার নানীর কাছে বেড়ে উঠেন। কোরেশে’র বয়স যখন ৭ বছর তখন তার মা রয় হাডম্যানকে বিয়ে করেন এবং তার কাছে ফিরে আসেন। ১৯৬৬ সালে ‘হাডম্যান ও ক্লার্ক’ দম্পতির ঘরে রজার নামে একটি সন্তানের জন্ম হয়। কোরেশ তার শৈশব সম্পর্কে বলেন, তিনি শৈশবে সবসময় একা থাকতেন এবং ৮ বছর বয়সে তার চেয়ে বয়সে বড় ছেলেদের একটা গ্যাং দ্বারা ধর্ষিত হন। তাছাড়া ডিসলেক্সিয়া (Dyslexia) বা রিডিং ডিজঅর্ডার (Reading disorder) এর কারণে তার লেখাপড়ায় সমস্যা ছিল বলে তাকে বিশেষ শিক্ষা ক্লাসে ভর্তি করে দেয়া হয়, সেখানে বন্ধুরা তাকে মিস্টার রিটার্ডো বলে ডাকতো। তবে স্কুলে তেমন সুবিধা করতে না পারলেও তার মিউজিক ভালো লাগতো এবং বাইবেল প্রায় মুখস্থ ছিল।
২২ বছর বয়সে কোরেশ, ১৫ বছরের এক মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ও পরবর্তীকালে মেয়েটি গর্ভবতী হয়। এরপর কোরেশ ধর্মীয় ধারায় বিশ্বাসী হয়ে ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভেনটিস্ট চার্চে’-তে যোগদান করেন। সেখানে তিনি গির্জার যাজকের মেয়ের প্রেমে পড়েন এবং যাজককে তার সাথে তার মেয়েকে বিয়ে দিতে বলেন। তিনি আরো বলেন যে, ঈশ্বর চান যাজকের মেয়ে যেন তার স্ত্রী হন, এতে যাজক ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে গির্জা থেকে বের করে দেন। এরপরও তিনি বারবার যাজককে বিরক্ত করতে থাকলে যাজক কোরেশকে গির্জার মিশন থেকে বহিষ্কার করেন।
৪
ডেভিড কোরেশ চার্চ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর রক স্টার হওয়ার জন্য হলিউড চলে যান। এরপর ১৯৮১ সালে টেক্সাসের ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান নামের অপ্রথাগত বিশ্বাসীদের দলে যোগ দেন। সে সময় ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন লইস রডেন নামে ৭৬ বছর বয়েসি এক নারী। লইস রডেন নিজেকে প্রোফেট দাবি করেছিলেন। কোরেশ ক্রমশ ব্রাঞ্চে নিজের জায়গা করে নেন এবং রডেন এর সাথে তার শারীরিক সর্ম্পক গড়ে ওঠে। কোরেশ দাবি করেন, গড হ্যাড চোজেন হিম টু ফাদার আ চাইল্ড উইথ হার, হু উড বি দ্য চোজেন ওয়ান। রডেন ১৯৮৩ সালে কোরেশকে ব্রাঞ্চে নিজের ধর্মমত প্রচার করার অনুমতি দেন। এতে দলে বির্তক সৃষ্টি হয়। কেননা অনেকেই কোরেশ’কে ভুঁইফোর বলে মনে করতো।
কোরেশ ব্রাঞ্চের যে কোনও নারী সদস্যের সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হতে পারতো কারণ কোরেশের মতে এটা ছিল ঈশ্বরের নির্দেশ। তার শয্যাসঙ্গীনির তালিকায় অপ্রাপ্তবয়সের বালিকা থেকে শুরু করে বিবাহিতা নারীরাও ছিল। কোরেশ তার ওপর বিশ্বাসের প্রমাণ হিসেবে পুরুষদের কৌমার্যব্রত পালন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ধর্মগুরুর আদেশ মেনে নিতে না পারায় অনেকেই তখন কাল্ট ছেড়ে দেয়। কোরেশ সবচেয়ে বিতর্কিত ছিলেন তার নতুন মতবাদের জন্য, তার মতে সকল নারী তার আত্মিক পত্নী, এমনকি অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু এবং বিবাহিতরাও। ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানের একজন সদস্য জানান, কোরেশের স্ত্রী ছিল ১৯ জন এবং ১২ বছরের নিচে প্রায় ১৩ জন শিশুর সাথেও তার শারীরিক সম্পর্ক ছিল।
৫
১৯৯৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে দি ইউনাইটেড স্টেটস ব্যুরো অভ অ্যালকোহল টোবাকো অ্যান্ড ফায়ারআমর্স (এটিএফ) এর সদস্যরা একদল মিডিয়াকর্মীদের সাথে সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে ব্রাঞ্চের র্যাঞ্চে যায়। ওই সময় র্যাঞ্চের ভিতর থেকে তাদের উদ্দেশ্যে গুলি বর্ষণ করা হয় এবং প্রায় ২ ঘন্টা গোলাগুলি অব্যাহত থাকে। এ সময় ৪ জন এজেন্ট এবং ৬ জন ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান নিহত হন। এরপর এফবিআই এসে র্যাঞ্চ অবরোধ করে। সহজে হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিলেন না কোরেশ, কোনো অবস্থাতে আত্মসমর্পণ করতে রাজি ছিলেন না তিনি। অভিযানে এফবিআই যুক্ত হয় কোরেশের ধ্বংসাত্মক ও আগ্রাসী আচরণের কারণে। সপ্তাহব্যাপী শান্তিপূর্ণভাবে চলে কোরেশকে আত্মসমর্পণ করানোর ব্যর্থ চেষ্টা। কিন্তু কোরেশ অনুসারীদের অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহীদ হওয়ার নির্দেশ দিয়ে একরকম যুদ্ধ শুরু করেন, মারাত্মক গোলাগুলি শুরু হয় কর্তৃপক্ষের সাথে।
এই অবরোধ একটানা ৫০ দিন চলে। এক পর্যায়ে ডেলটা ফোর্স ট্যাঙ্ক নিয়ে র্যাঞ্চে প্রবেশ করে। এই অভিযানের সময় র্যাঞ্চ আগুনে পুড়ে যায়। আগুন নেভার পর এফবিআই কোরেশসহ ৫৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক ও ২৮ জন শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করে। ওয়াকো অবরোধ শেষ হয় ৫১ দিন পর। পুরো ঘটনাটি এতটাই জটিল ও বিপদজনক ছিল যে, অভিযানে ১২টি ট্যাংক ও ৪টি ভারী যুদ্ধযান ব্যবহার করতে হয়েছিল। ডেভিড কোরেশকে টেক্সাসের টেইলার-এর মেরোরিয়ার পার্ক সেমিট্রিতে সমাহিত করা হয়।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ মে ২০২৩
হদিস:
১। দৈনিক মানবকন্ঠ, তারিখ ১১ মার্চ ২০২০
২। উইকিপিডিয়া
৩। অন্যান্য ইন্টারনেট সূত্র