
১
তারিখ: ১২/১৩ জানুয়ারি ২০০৭
সময়: মধ্যরাত
স্থান: ঢাকা
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তারিখে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দেন এবং কারফিউ জারি করে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। এরপর শুরু হয় রাজনৈতিক নেতাদের ধরপাকড়। দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই সেসময়ে গ্রেপ্তার হন। আমার গল্পটা সেসময়ের। কিছুকিছু গল্পের জন্য দেড়দশক অপেক্ষা করতে হয়, এটা আসলে সেরকম একটা গল্প।
জানুয়ারির শীতের রাতে ডীপ সী ব্লু কালারের নিশান পেট্রোল গাড়ি এবং একটা সাদা মাইক্রোবাসে সি টাইপ পেট্রল নিয়ে যাচ্ছি গুলশানের দিকে। কারফিউ চলছে বলে চারদিকে সুনসান নীরবতা। নিস্তব্ধতা খুন করে মাঝে মাঝে নাইটগার্ডের হুইসেল কিংবা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে। আবার কখনো গলির মুখে ভবঘুরে ফকিরের মুখ হেডলাইটের আলোয় হঠাৎ ভেসে উঠে সরে যায়। আমি তখন র্যাব দশে কর্মরত, খিলগাঁও ফ্লাইওভার ধরে যাত্রাবাড়ি থেকে মালিবাগের দিকে যাচ্ছি, সেখান থেকে বনানী। মনের ভিতরে তোলপাড় চলছে, কেননা এইপ্রথম সাবজেক্ট সম্পর্কে ডিটেইলস না জেনেই অপারেশনে পা বাড়িয়েছি। শুধু জানি জনৈক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে টিএফআই-এর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আমাকে একটা পাসওয়ার্ড, আরভি লোকেশন এবং সাবজেক্ট-এর ক্রমিক নম্বর দেয়া হয়েছে। আরভিতে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতরে পৌঁছাতে হবে, সেখানে প্রথম কন্টাক্ট অপেক্ষা করবেন। তিনিই টার্গেট সম্পর্কে ব্রিফ করবেন। সেদিন রাতে আমার মত আরও বেশ কয়েকজন অফিসার অপারেশনে বের হয়েছেন এবং সবারই একই অবস্থা। আমার কমান্ডিং অফিসার সতর্ক করে বলে দিয়েছেন, কোনভাবেই ব্যর্থ হওয়া চলবে না। মাস দুয়েক আগে একটা অপারেশনে অস্ত্র ব্যবসায়ীসহ ১৩টা পিস্তল উদ্ধার করেছিলাম বলে আমার উপরে তার আস্থা ছিল।
বনানী মাঠের আশেপাশের একটা গলিতে ফাইনাল আরভি। কাছাকাছি পৌঁছে গাড়ি পার্ক করে হেড লাইট অফ করতেই অন্ধকারের চাদর ভেদ করে মধ্যবয়স্ক একজন জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। সম্ভবত সিগারেট হাতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন। সাইড ডোর গ্লাস নামাতেই তামাকপোড়া গন্ধের ঝাপটা নাকে এসে বিঁধলো। পাসওয়ার্ড বিনিময় করে আমরা একে অপর সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। ইতিমধ্যে মাইক্রোবাস গতি কমিয়ে পিছনে এসে থামলো। আমি গাড়ি থেকে নেমে সামান্য দূরে কন্টাক্ট-এর সাথে কথা বলে সাবজেক্ট সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিলাম। আবু হেনা মোহাম্মাদ মুস্তফা কামাল, যিনি লোটাস কামাল নামে বেশি পরিচিত তিনিই আমার সাবজেক্ট। তিনি পরবর্তীতে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য, অর্থমন্ত্রী এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি আইসিসি’র সহ-সভাপতি এবং সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কন্টাক্ট জানালেন সাবজেক্টের বাসার কাছেই দ্বিতীয় কন্টাক্ট অপেক্ষা করবে, একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে হবে।
২
গোয়েন্দা সংস্থা থেকে নিয়োজিত প্রথম কন্টাক্ট এর ব্রিফিং থেকে বুঝলাম গুলশান-২ নম্বর সেকশনে, পিংক সিটির পাশ দিয়ে ১০৩ নম্বর সড়ক ধরে কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যে মোবাইল ফোনে জানতে পেলাম সেদিন রাতে ঢাকা শহর চষে বেড়ানো আমাদের ইউনিটের একটাসহ বেশ কয়েকটা গ্রুপ তাদের টার্গেট মিস করেছে। যেকোন ভাবেই হোক, কেউ বা কারা যেন ইনফরমেশন লিক করেছে। সেদিন রাতে যে তালিকা ধরে কাজ করেছিলাম তাতে ৬৫/৬৭ জনের ছদ্মনাম ও ক্রমিক নম্বর ছিল। ইনফরমেশন লিক হওয়ার কথা শুনে কিছুটা মানসিক চাপে পড়লাম। কামাল আতাতুর্ক এভেনিউ ধরে গুলশান-২ সার্কেল থেকে হাতের ডানে এগোলে পিংকসিটি, শপিং কমপ্লেক্সটা পার হয়ে বামে মোড় নিয়ে কিছুটা এগোতেই দ্বিতীয় কন্টাক্টের সাথে দেখা হলো। তিনি জানালেন সাবজেক্ট কিছুক্ষণ আগে সপরিবারে একটা পার্টি থেকে ফিরেছেন। খবরটা শুনে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করলাম। ওয়ান্ডার ল্যান্ড পার্কের দেয়াল ঘেঁষে গাছের সারির দিকে, খানিকটা অন্ধকারে গাড়ি পার্ক করে মাইক্রোবাসের ভিতরেই টিমের সবাইকে ব্রিফ করলাম। আমাদের একটা গ্রুপ এক্সিট রুট কভার করে ডুপ্লেক্স বাড়ীটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো, আমি ৩/৪জনকে নিয়ে দো’তলায় উঠলাম। আমার হাতে পিস্তল। বারান্দায় পৌঁছাতেই কেউ একজন কাঠের ভারী দরজা লাগাতে উদ্যত হলে ফ্লাইং-কিক করে দরজার হুড়কো ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকলাম। কলেজ জীবনে নেয়া কারাতে প্রশিক্ষণ সেদিন রাতে বেশ কাজে লেগেছিল।
প্রচন্ড বিরক্তি আর ক্রোধ নিয়ে নাফিসা কামাল সামনে এগিয়ে এলেন, ২৩/২৪ বছর বয়সের একজন তরুণী। বেশ স্মার্ট এবং সুন্দরী। তার পরনে ব্লু জিন্স আর টপস, রঙটা মনে নেই। পার্টি থেকে ফিরে পোশাক বদলাবার ফুরসৎ পাননি। তার বুনো আচরণটা কেন জানিনা ভালো লাগলো। পিস্তল হোলস্টারে ঢুকাতেই রাগত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কে? ঢাবির ছাত্রদলের ক্যাডার?’, তারা আসলে তখনো জানতেন না শীতের রাতের আঁধারে ঢাকা শহরে তখন কি তাণ্ডব চলছে! মাথায় বড় চুল, পরনের জিন্সের সাথে কালো লেদার জ্যাকেট এবং কোমরের হোলস্টারে ঝুলানো ৭.৬২ মিমি চায়নিজ পিস্তল দেখে আমাকে হয়তো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বলেই ঠাহর করেছেন। প্রশ্নের উত্তরটা না দিয়ে কয়েক সেকেন্ড ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে থাকলাম। তিনি উত্তরটা দৃষ্টি থেকেই বুঝে নিলেন, এখানে সুবিধে হবে না। তবে সেদিন রাতে আমি যেটা উপলব্ধি করলাম, সুন্দরী মেয়েরা যখন গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে তখন তাদের রূপের দ্যুতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই রূপ মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ঝলসে দেয়া রূপ। ‘দোতলার সব রুম সার্চ করবো’, ঠাণ্ডা মাথায় তাকে জানালাম।
বারান্দায় কথাবার্তার আভাস পেয়ে টাইয়ের নট খুলতে খুলতে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন ভদ্রলোক। মার্জিত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ, তার পরনে গাঢ় ধূসর রঙের স্যুট, ভিতরের শার্টটা সম্ভবত অফ হোয়াইট। বুঝলাম, ইনিই আমার সাবজেক্ট জনাব মুস্তফা কামাল। আমাদের দিকে তাকিয়ে তিনি হয়তো বুঝলেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে এসেছি, তবে কারা সেটা না বুঝলেও পরিবারের সবাইকে আমাদের কাজে সহযোগিতা করতে বললেন। সবাইকে মাস্টার বেডরুমে একত্রিত করে মোবাইল ফোন একজায়গায় রাখতে বলা হলো। কিছুদিন আগে ছোটো মেয়ে, নাফিসার বিয়ে হয়েছে, তার স্বামী সৈয়দ আসিফ অবাক চোখে আমাদের কাজকর্ম দেখছেন। বড় মেয়ে কাশফি কামাল সেদিন বাসায় ছিলেন না। জনাব মুস্তফা কামালের স্ত্রী, কাশ্মীরি কামালকে বললাম, ‘ম্যাডাম, সার্চ করার সময় আপনাদের কেউ একজন যেন আমাদের সাথে থাকেন।’ আমার সাথে থাকা ভিডিও ক্যামেরাম্যানকে বললাম পুরো সময়টা ভিডিও করে রাখতে, আমিসহ টিমের কেউই যেন ক্যামেরার লেন্সের বাইরে না থাকি।
৩
নাফিসা কামাল রাগত স্বরে অনর্গল কথা বলছিলেন, আমি চুপচাপ শুনছিলাম। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তিনি আমাদের পরিচয় জানতে চেষ্টা করছিলেন। সুন্দরী মেয়েদের উপেক্ষা করার মাঝে একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে, সেদিন জেনেছিলাম। শংকর বা নিমাই ভট্টাচার্যের কোন উপন্যাসে সেরকমটা কখনো পড়িনি। এটা কিন্তু মেল শভিনিজম জাতীয় কিছুনা, তিনি আমাদের কাজে খুব বিরক্ত করছিলেন, সেজন্যই মূলত পাত্তা না দেয়া। তিনি অবশ্য পরবর্তীতে জেনেছিলেন, শীতের সেই মধ্যরাতে আমরা কয়েকজন আসলে কারা ছিলাম!
দেশী/বিদেশী টাকা, পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত পাসপোর্ট এবং ঈর্ষনীয় পরিমাণ মদের বোতল জব্দ করেছিলাম। আমি ভাবছিলাম তারা বাসায় H2O নাকি R-OH পান করে! তবে লাইব্রেরীতে ঢুকে আমার চোখে ধাঁধাঁ লেগে গেল! উডেন ফ্লোরের মেঝে থেকে ছাদ অবধি বইয়ের তাক, আর তাতে সুন্দরভাবে গোছানো বইয়ের সারি। নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করা হয় বোঝা যাচ্ছে। জনাব লোটাস কামালের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঈর্ষা এসে ভর করলো। ব্যক্তিগত লাইব্রেরীতে বইয়ের এরকম সংগ্রহের মালিককে হিংসা না করে পারা যায় না। টার্গেট মিস করিনি এবং সাবজেক্ট আমার সাথেই আছেন, কমান্ডিং অফিসারকে ফোন করে জানালাম। তিনি আমার টিমকে কংগ্রাচুলেট করে জব্দকৃত মালামাল আপাতত ইউনিটে নিয়ে যেতে বললেন, পরবর্তীতে যেভাবে সিদ্ধান্ত আসে সেভাবেই কাজ করা হবে। সিজার লিস্টের কাজ শেষে তাদের কেউ একজন, সম্ভবত লোটাস কামালের স্ত্রী, কাশ্মীরি কামাল কাগজে স্বাক্ষর করলেন। সবশেষে জনাব লোটাস কামালকে বললাম, ‘স্যার আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।’ হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে আবারও বললাম, ‘আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে। জব্দ করা আইটেমগুলোও আমাদের সাথে যাবে।’
বের হবার সময় তিনি লাইব্রেরী থেকে একটা বই সাথে নিতে চাইলেন। অনুমতি দিয়ে ব্যক্তিগত আগ্রহে তার সাথে গেলাম। একজন ভারতীয় লেখকের একটা বই হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলেন। বইয়ের ঝকঝকে তাক থেকে অন্য একটা বই নামিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘ঐ বইটা সাথে নিলে তো আমাকে ভারতের দালাল বলতেন।’ উত্তরে কিছু না বলে তাকে সহ বাসা থেকে বের হলাম। পিছনে নাফিসা কামালের অগ্নিদৃষ্টি আমাকে চিতাভস্ম করে দিচ্ছিল জানি।
৪
তারিখ: ১২/১৩ জানুয়ারি ২০০৭
সময়: ভোর রাত
স্থান: ঢাকা
জনাব মুস্তফা কামালকে ব্লাইন্ড ফোল্ড করে গাড়ির মাঝের সীটে বসানো হলো, বামে আমি আর ডানদিকে অন্য আরেকজন অফিসার। কুয়াশার চাদর ভেদ করে আমাদের গাড়ি ছুটে যাচ্ছে উত্তরা, র্যাব-১ এর অফিসের দিকে। টিএফআই-এর কাছে আওয়ামীলীগ নেতা আবু হেনা মোহাম্মাদ মুস্তফা কামালকে হস্তান্তর করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ। জনাব লোটাস কামাল ভয় কাটাতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। আমরা চুপচাপ শুনছি। তিনি ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পুরো পাকিস্তানে চার্টার্ড একাউন্টেন্সি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় সম্মিলিতভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেন, সে গল্প করলেন। জানলাম তাকে কেন লোটাস কামাল বলা হয় এবং আরও অনেককিছু। তিনি কথা বলছিলেন, তার কথা শুনছিলাম তবে আমার মনটা পড়েছিল তার ডুপ্লেক্স বাড়িতে। নাফিসা কামালে না, তার লাইব্রেরীতে। একটা চমৎকার লাইব্রেরীর মালিক তিনি, সেখানে ঝকঝকে বইয়ের র্যাকে সারিবদ্ধভাবে সাজানো বিভিন্ন বিষয়ের উপরে লেখা বই। কল্পনা করছি একদিন আমারও এরকম একটা লাইব্রেরী থাকবে! আমি জানিনা ৬৫/৬৭ জনের নামীয় তালিকা কারা কীভাবে তৈরি করেছেন! তবে আজ এতোটা বছর পর মনেহলো, কতোটা সঠিক ছিল সেই তালিকা! এরকম একটা সমৃদ্ধ লাইব্রেরী যাকে আলোকিত করতে পারে না সে আসলেই অভাগা!
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে হাসিনা সরকারের পতনের পর ঐদিন রাতেই বারোটার দিকে লোটাস কামাল তার মেয়ে নাফিসা কামালসহ সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন। যেটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বই যদি আত্মাকে আলোকিত না করে তবে তা বুকশপের র্যাকেই পড়ে থাক।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪