
১
গতকাল, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে হোয়াইট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘যদি শান্তি চুক্তিটি ইসলামাবাদে সই হয়, তবে আমি হয়তো সেখানে যাব।’ কিন্তু কেন? প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে তার দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনকালে চরম ও নজিরবিহীন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে আটলান্টিকের এপারে নিজ দেশে ‘নো কিংস’ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আর অভিশংসনের তীক্ষ্ণ খড়গ তার গদিকে টালমাটাল করে তুলেছে, অন্যদিকে এশিয়ায় ইরানের সাথে একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির হাতছানি দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। ওয়াশিংটনের রাজপথে যখন তার পদত্যাগের দাবিতে কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ বাজি হয়ে দাঁড়িয়েছে কূটনৈতিক সাফল্য। এই সংকটময় মুহূর্তে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এখন সুদূর দক্ষিণ এশিয়ার দিকে, যেখানে শান্তির বার্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে পাকিস্তান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হারানো জনসমর্থন পুনরুদ্ধার এবং ইমপিচমেন্টের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার চাবিকাঠি এখন অনেকটাই ইসলামাবাদের হাতে। যদি একটি সফল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা হবে ট্রাম্পের জন্য এক অভাবনীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। নতুবা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বহিঃশত্রুর দ্বিমুখী চাপে তার প্রেসিডেন্সি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হবে। তাই বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডে ট্রাম্পের ভাগ্য নির্ধারণে এখন ইসলামাবাদই হয়ে উঠেছে প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের পাকিস্তান সফর কেবল একটি কূটনৈতিক মিশন নয়, বরং এটি তার রাজনৈতিক জীবন রক্ষার এক মরণপণ লড়াই।
২
‘নো কিংস’ বিক্ষোভ: আমেরিকার রাজপথে গণবিস্ফোরণ।
মার্কিন ইতিহাসের বৃহত্তম এই গণআন্দোলন বর্তমানে হোয়াইট হাউসের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে, যেখানে কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার এই লড়াই ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে টেক্সাস পর্যন্ত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। রাজপথের এই নজিরবিহীন জনজোয়ার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে এক চরম রাজনৈতিক ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ক। বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট ও জনজোয়ারের বিস্তার।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক নজিরবিহীন জনবিস্ফোরণের সাক্ষী হয়ে আছে, যা আধুনিক ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। 'নো কিংস' নামক এই গণআন্দোলনে ৫০ থেকে ৯০ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হয়েছেন, যার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা। বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ হলো—ইরানের সাথে যে সম্ভাব্য যুদ্ধের দিকে দেশ এগোচ্ছে, তা সম্পূর্ণ 'অপ্রয়োজনীয়' এবং এটি কেবল সাধারণ মানুষের জীবন ও জাতীয় অর্থনীতিকে বিপন্ন করবে। এই আন্দোলনের স্লোগানগুলো সরাসরি প্রেসিডেন্টের ‘একনায়কতান্ত্রিক’ আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার, যেখানে দাবি তোলা হচ্ছে যে গণতন্ত্রে কোনো ‘রাজা’র স্থান নেই। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং যুদ্ধবিরোধী সংগঠনগুলো এই মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা রাজধানী ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মার্কিনিদের মতে, যুদ্ধের উন্মাদনা বাদ দিয়ে এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনকল্যাণে মনোযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। এই আন্দোলন কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এটি আমেরিকান জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার এক সম্মিলিত যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
খ। রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্ভেদ্য দুর্গে ফাটল।
বিক্ষোভের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে, গত ২৮ মার্চ ২০২৬-এর একদিনেই ওয়াশিংটন ডি.সি.-সহ আমেরিকার প্রায় ৩,৩০০টি স্থানে মানুষ রাজপথে নেমে এসে স্থবির করে দেয় স্বাভাবিক জনজীবন। এই আন্দোলনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি; ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র বা ‘কট্টর ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা এবং টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতেও এখন বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে। রিপাবলিকান সমর্থিত এসব অঞ্চলে বিক্ষোভের আঁচ পৌঁছানোয় ট্রাম্প প্রশাসনের ভিত নড়ে উঠেছে এবং তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। জনরোষের চাপে স্থানীয় প্রশাসনগুলোও এখন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে শুরু করেছে, যা ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর এক বড় ধরণের লাগাম টেনে ধরেছে। বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যতক্ষণ না ইরান নিয়ে যুদ্ধংদেহী মনোভাব ত্যাগ করা হচ্ছে এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আসছে, ততক্ষণ এই রাজপথ তারা ছাড়বেন না। এই গণবিস্ফোরণ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এমন এক মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে, যা প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও ট্রাম্প এখন নিজ দেশের জনগণের কাছে এক বিশাল নৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
৩
জনসমর্থনের ধস ও অভিশংসনের হুমকি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জনপ্রিয়তা বর্তমানে এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন, যেখানে জনমত জরিপে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা মাত্র ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের অভ্যন্তরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর বিরুদ্ধে ১৩টি অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করে ক্ষমতাচ্যুতির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এমনকি তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের দাবি এখন ওয়াশিংটনের অলিন্দে প্রবলভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ক। জনসমর্থনের ঐতিহাসিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক সংকট।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জনপ্রিয়তা বর্তমানে এক গভীর অতলে তলিয়ে গেছে, যা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাম্প্রতিক UMass Amherst Poll (মার্চ ২০২৬) এর চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, তার অ্যাপ্রুভাল রেটিং বা জনসমর্থন কমে এখন মাত্র ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল তার ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন পর্যায়ই নয়, বরং আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জন্য এক লজ্জাজনক রেকর্ড। এমনকি তার কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিকাল ও গ্রামীণ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেও এখন স্পষ্ট অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং যুদ্ধের দামামা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলায় তারা প্রেসিডেন্টের নীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এই গণবিস্মৃতি ট্রাম্পের জন্য এক অশনি সংকেত, কারণ জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা এখন তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হোয়াইট হাউসের অন্দরমহলে এখন ত্রাসের রাজত্ব চলছে, কারণ এই ৩৩ শতাংশ সমর্থন নিয়ে ২০২৬-এর মধ্যবর্তী নির্বাচনে টিকে থাকা হবে এক দুরুহ চ্যালেঞ্জ। জনমতের এই বিশাল ধস ট্রাম্পের প্রশাসনিক শক্তিকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে।
খ। আইনি সংঘাত এবং ২৫তম সংশোধনীর খড়গ।
জনসমর্থন হারানোর পাশাপাশি ট্রাম্প এখন আইনি ও সাংবিধানিক যুদ্ধের এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছেন। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জন লারসন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদে ১৩টি অভিশংসন নিবন্ধ (Articles of Impeachment) জমা দিয়েছেন, যা তার গদি চ্যুতির পথ প্রশস্ত করছে। এই অভিশংসন প্রস্তাবগুলোতে নির্বাহী ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অদূরদর্শিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে তার সাম্প্রতিক কিছু হঠকারী ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের কারণে; বিশেষ করে ‘একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’—এমন হুঙ্কার ডেমোক্র্যাট ও কিছু মধ্যপন্থী রিপাবলিকানদেরও শঙ্কিত করে তুলেছে। এই প্রেক্ষিতে অনেক সিনিয়র রাজনীতিবিদ তাকে ‘মানসিকভাবে আনফিট’ বা রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম বলে অভিহিত করছেন। তারা এখন মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীর প্রয়োগ ঘটিয়ে তাকে অবিলম্বে ক্ষমতা থেকে সরানোর জোরালো দাবি তুলছেন। আইনি লড়াই এবং এই মানসিক সক্ষমতার প্রশ্নটি এখন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির ওপর এক ঝুলন্ত তলোয়ারের মতো বিঁধে আছে। অভিশংসনের এই তীব্র চাপ এবং সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিনি কতদিন টিকে থাকতে পারবেন, তা নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনেই এখন সংশয় তুঙ্গে।
৪
ইসলামাবাদ সফর: ট্রাম্পের শেষ বাজি?
দেশের ভেতরে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখন ট্রাম্পের জন্য 'লাইফলাইন' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান এবং দেশটির মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনা। ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হলে তা হবে ট্রাম্পের জন্য এক অভাবনীয় কূটনৈতিক বিজয়, যা তাঁর হারানো জনসমর্থন পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। এই ঐতিহাসিক সফরটিই এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এবং নিজেকে ‘শান্তিদূত’ হিসেবে প্রমাণের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ও ট্রাম্পের নতুন লাইফলাইন।
আমেরিকার অভ্যন্তরে যখন গণবিক্ষোভ আর অভিশংসনের চাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখন তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় ‘লাইফলাইন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। গত ১১-১২ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘ইসলামাবাদ টকস’ (Islamabad Talks) বিশ্বরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে এসেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের শত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি কার্যকরী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এই কূটনৈতিক সাফল্য ট্রাম্পের জন্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্সি চরম সংকটের মুখে। আর তাই গত ১৬ এপ্রিল হোয়াইট হাউসের লনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বলেন, ‘যদি শান্তি চুক্তিটি ইসলামাবাদে সই হয়, তবে আমি হয়তো সেখানে যাব। পাকিস্তান সত্যিই দুর্দান্ত কাজ করছে।’ তাঁর এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ট্রাম্প এখন ঘরোয়া রাজনীতিতে হারানো ভূমি ফিরে পেতে এই বৈদেশিক সাফল্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন। এই সম্ভাব্য সফরটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের নেতৃত্বের সক্ষমতা পুনরায় প্রমাণের এক মরণপণ চেষ্টা। ইসলামাবাদের এই শান্তি প্রক্রিয়ার সাফল্যই এখন নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে টিকে থাকার ভবিষ্যৎ।
খ। শান্তি চুক্তির রূপরেখা ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।
প্রস্তাবিত এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মূল শর্তগুলো মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। চুক্তির প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, ইরান তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে এবং আন্তর্জাতিক তদারকি মেনে নিতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো ধাপে ধাপে শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ইরানের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তি। এছাড়াও বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ সব ধরণের সামরিক হুমকি মুক্ত রেখে উন্মুক্ত রাখার বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। ট্রাম্পের জন্য এই শর্তগুলো মানিয়ে নেওয়া এক বড় ধরণের কূটনৈতিক বিজয়, কারণ এরফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা থামার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি ইসলামাবাদে গিয়ে এই চুক্তিতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করতে পারেন, তবে তিনি দেশে ফিরে নিজেকে ‘মহান শান্তিদূত’ হিসেবে দাবি করার সুযোগ পাবেন। এটি একইসাথে দেশের ভেতরের ‘নো কিংস’ আন্দোলনকে শান্ত করতে এবং ডেমোক্র্যাটদের অভিশংসন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে তাঁর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠবে। তাই এই মুহূর্তে ইসলামাবাদ সফরই ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় এবং শেষ বাজি।
৫
পাকিস্তানের ভূমিকা ও মধ্যস্থতা।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশ্বমঞ্চে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির এই শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছেন, যার ফলে 'ইসলামাবাদ টকস' এক সফল পরিণতি পাওয়ার পথে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও কোনো দ্বিধা ছাড়াই পাকিস্তানের এই কার্যকর মধ্যস্থতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নতুন উষ্ণতা এনেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি ইসলামাবাদে গিয়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন, তবে তিনি দেশে ফিরে নিজেকে একজন দক্ষ 'শান্তিদূত' হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পাবেন। এই কূটনৈতিক বিজয় কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ পুনরুদ্ধার করবে না, বরং ২০২৬ সালের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের পাল্লাও যথেষ্ট ভারী করতে পারে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ট্রাম্পকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও ইমপিচমেন্টের হুমকি থেকে রক্ষা পাওয়ার এক শক্তিশালী বর্ম এনে দিয়েছে। তাই ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক মিশনটি এখন ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৬
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য ইসলামাবাদ সফর কেবল একটি প্রথাগত কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরণপণ লড়াই। আমেরিকার রাজপথে উত্তাল ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ এবং ওয়াশিংটনের অলিন্দে অভিশংসনের যে খড়গ ঝুলছে, তা থেকে মুক্তি পেতে একটি সফল আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তিই হতে পারে তাঁর প্রধান রক্ষাকবচ। যদি ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে ট্রাম্প অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঘরোয়া রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবেন এবং ডেমোক্র্যাটদের আইনি আক্রমণকে নস্যাৎ করার নৈতিক শক্তি পাবেন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে—অনেকেই মনে করছেন, আমেরিকার অভ্যন্তরে যে গভীর সামাজিক বিভাজন এবং অসহনীয় অর্থনৈতিক সংকট দানা বেঁধেছে, তা কেবল একটি বৈদেশিক সাফল্যের মাধ্যমে সম্পূর্ণ উপশম করা সম্ভব নয়। পাকিস্তান সফর হয়তো ট্রাম্পকে সাময়িক রাজনৈতিক স্বস্তি দেবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের অভ্যন্তরীণ আস্থার সংকট কাটাতে তাঁকে আরও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। শেষ পর্যন্ত ইসলামাবাদের এই ‘শান্তি মিশন’ ট্রাম্পের ভাগ্যের চাকা কোন দিকে ঘোরায়, তা দেখার জন্য এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোটা বিশ্ব। এই সফরের সাফল্য বা ব্যর্থতাই নির্ধারণ করবে ২০২৬-এর মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের ভবিষ্যৎ এবং আমেরিকার ইতিহাসের পাতায় তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের চূড়ান্ত মূল্যায়ন।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৭ এপ্রিল ২০২৬