
১
‘She has balls!’
কথাটা পলকা হাওয়ার মতো মনে রেখাপাত করে মিশে গেলেও সম্ভবত হাসির আভা মুখে ফুটে উঠেছিল! শব্দের ডেসিবেল কমিয়ে তিনি বাক্যটা তাই আবারও উচ্চারণ করলেন,
: আপনাকে দেখে নিব।
: আচ্ছা।
শীতল দৃষ্টিতে হুমকি ফিরিয়ে দিয়ে কথাটা বললাম বটে, কিন্তু আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। যাহোক ………
ঘটনাস্থল: উপ-অধিনায়কের অফিস। ধলপুর, যাত্রাবাড়ি, র্যাব-১০।
তারিখ: মার্চ/এপ্রিল ২০০৭।
জরুরি অবস্থার কঠিন দিনগুলোয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দু’জন নারীর সাথে ঝামেলা হয়। নাফিসা কামালের গল্প আগেই করেছি আজ লিখতে যাচ্ছি অন্যজনের কথা, তিনি যুব মহিলালীগ নেত্রী ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী।
ঘটনার সূত্রপাত এরকম।
জনৈক ব্যক্তি তার অভিযোগ জানিয়ে সমাধানের জন্য র্যাব-১০ এর অভিযোগ বাক্সে দরখাস্তটা ফেলেন। কমান্ডিং অফিসার সেটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঠিকঠাক অনুসন্ধান করে প্রতিকার করতে বললেন। অভিযোগটা ছিল ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী’র বিরুদ্ধে। আগেই লিখেছি তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। তার দল তখন ক্ষমতায় যাবার জন্য একটা নির্বাচনের অপেক্ষায়।
ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী কলাবাগান কিংবা এলিফেন্ট রোডের দিকে একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। ফ্ল্যাটের মূল মালিক আমেরিকা প্রবাসী, তার পক্ষে তার মামা প্রতিমাসের ভাড়া সংগ্রহ করতেন। মূল মালিকের দেশে অনুপস্থিত থাকার সুযোগে ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী ভাড়া দেয়া বন্ধ করে ফ্ল্যাটটা বেদখল করার চেষ্টা করছেন। অভিযোগ এতটুকুই। এফএস পাঠিয়ে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা খুঁজে পেলাম। আমার এফএস টিমের ইনচার্জ ছেলেটা পুলিশের একজন এএসআই। ঠিক ডিপজলের মতো দেখতে, তবে দুর্দান্ত দক্ষ এবং কর্মঠ। এইমুহুর্তে নামটা ঠিক মনেপড়ছে না, আলমগীর কিংবা রবিউল ধরণের হবে। তার মাধ্যমে ভদ্রমহিলার স্বামী জনাব শেখ রফিককে একদিন অফিসে ডেকে পাঠালাম, সাথে তিনিও এসেছিলেন। ভদ্রলোককে বেশ নিরীহ মনেহলো কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী যেন একটু অন্য ধাঁচের। ঐযে বললাম, She has balls.
উভয়পক্ষকে মুখোমুখি করে শেখ রফিক সাহেবকে ফ্ল্যাট খালি করার জন্য টাইমফ্রেম বেঁধে দিলাম। তিনি সেটা মেনে নিলেও তার স্ত্রী অনড়। তিনি বরং আমার উপরে ভীষণ ক্ষেপে গিয়েছিলেন। আমাকে দেখে নিবেন বললেন, তবে ঐই তার সাথে শেষ দেখা।
২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর সকল দলের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
আওয়ামীলীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করলো। একদিন শুনলাম তিনি সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হন। এ পর্যন্তই, আমি ভুলে গিয়েছিলাম তার কথা। কিন্তু তিনি ভুলেন নাই, ঐ যে বলেছিলেন, দেখে নিবেন।
২
ঘটনাস্থল: উপ-অধিনায়কের অফিস। পাইকপাড়া, মিরপুর, র্যাব-৪।
তারিখ: এপ্রিল/মে ২০১০।
সিপিসি-১ এর কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লীডার তাহিদ আমার অফিসে ঢুকে বললো,
: স্যার, ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পীকে চিনেন? ওনার সাথে আপনি কি করেছেন?
: মানে! এই নামে কাউকে চিনি না।
বিরক্ত হয়ে উত্তরটা দিলাম বটে, পরক্ষণেই মনেপড়লো তিন বছর আগের ঘটনাটা। তাহিদের জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বললাম না। হেসে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু সে নাছোড়বান্দা,
: স্যার, উনি আপনার সাথে কথা বলতে চান।
বলেই সে মোবাইলে কল করে ফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দিল,
: সমস্যা কি? তোমার এতো আগ্রহ কেন?
মেজাজটা বিগড়ে গেলেও অপরপ্রান্তে হ্যালো…. হ্যালো শুনে সাড়া দিতে হলো,
: হ্যালো।
: কি খবর মেজর সাহেব? আমাকে চিনতে পেরেছেন?
: জী, না। দুঃখিত। আপনাকে চিনলাম না।
: এখন তো চিনবেন না। অফিসে আসেন, এক কাপ চা খেয়ে যাবেন।
তার গলায় প্রচ্ছন্ন হুমকি।
স্কোয়াড্রন লীডার তাহিদকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি তাকে কিভাবে চেনো?’ তারা একসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়েছে এবং ছাত্রলীগ করতো জানালো।
: স্যার, বাপ্পী আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছে। কবে যাবেন?
: এখন ব্যস্ত আছি। পরে জানাবো।
ঘটনার কিছুদিন পর আমাকে ইউএন মিশনের জন্য সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করতে হলো এবং সেবছরই জুনের দিকে কঙ্গো চলে গেলাম। ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী’র সাথে আর কথা হয়নি। তবে ইতিমধ্যেই তিনি আমার ক্ষতিটা সেরে ফেলেছিলেন। ঠিক করেছিলাম, চাকুরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর তার মুখোমুখি হবো। কিছুকিছু বোঝাপড়া ইউনিফর্মের বাইরে গিয়ে করাই ভালো।
৩
পেশায় আইনজীবী ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী ছাত্রাবস্থা থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ২০১১ সালে সংরক্ষিত নারী আসন-৪৭ থেকে এবং ২০১৪ সালে সংরক্ষিত নারী আসন-৩০ থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। উভয় সংসদ অধিবেশনে এবং টিভি’র টক শোগুলোতে তিনি খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়াকে নিয়ে প্রচুর বিষোদাগার করতেন। তার নমুনা ২৪ জুন ২০১৩ তারিখের দৈনিক পত্রিকা ঘাঁটলেও পাওয়া যায়,
‘খালেদা জিয়া ওমরা করতে সৌদি আরব যান। ওমরা করতে যান আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু উনি যখন সৌদিতে ওমরা করতে যান তখন তার পেছন থেকে হুইল চেয়ার ঠেলেন কে? যিনি চেয়ার ঠেলেন তিনি কি খালেদার পাহারাদার। এই ব্যক্তি সম্পর্কে ২০০৫ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে বের হয়েছিলো, উনার সঙ্গে খালেদার কাবিন নামা প্রকাশ করা হয়েছিলো।
তারেক রহমানের সমালোচনা করে বাপ্পী বলেন, তারেক একটি আতঙ্কের নাম। এদেশের মানুষ সেই আতঙ্ক থেকে মুক্তি চান। তারেক রহমান সিঙ্গাপুরের বাড়ীতে থাকেন সেই বাড়ির মালিক পাকিস্তানের এবং তারেকের গাড়ীর ড্রাইভারও পাকিস্তানী। তিনি জিয়াউর রহমানকে খুনী বলেও আখ্যায়িত করেন।
বাপ্পির বক্তব্য দেয়ার সময় ৭১ বিধি স্মরণ করিয়ে দিয়ে দুই বার মাইক বন্ধ করে দেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।’
৪
ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পী ০২ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মানুষ মরে গেলে হিসেব-নিকেষের আড়ালে চলে যায়।
তবে ঝরাপালকের মতো পড়ে থাকে কথার কিছু টুকরো, কিছু স্মৃতিচিহ্ন। তার জন্য শুভ কামনা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ অক্টোবর ২০২৪