
১
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশক ধরে যে আটলান্টিক নিরাপত্তা বলয় বিশ্বরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, ২০২৬ সালে এসে তা এক নজিরবিহীন বিচ্ছেদের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট ২০.০’ নীতি এখন আর কেবল বাণিজ্যিক শুল্ক বা অর্থনৈতিক দরকষাকষিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ন্যাটোর অস্তিত্বের মূলে আঘাত করছে। ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের এই দূরত্ব ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা স্থাপত্যকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে পুরনো মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার চেয়ে মার্কিন স্বার্থই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান ইউরোপীয় রাজধানীগুলোতে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, কারণ আমেরিকার পারমাণবিক ও সামরিক ছত্রছায়া ছাড়া মহাদেশটি কৌশলগতভাবে কার্যত এতিম হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্রাসেলস এখন বাধ্য হয়েই ওয়াশিংটনের বিকল্প খুঁজছে, যা পশ্চিমা বিশ্বের এককেন্দ্রিক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এক বহু-মেরু কেন্দ্রিক অস্থির বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে। গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে আঙ্কারার সাথে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা—সবই এই মহাপরিবর্তনের অংশ। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের এই ফাটল কেবল একটি জোটের ভাঙন নয়, বরং এটি সমসাময়িক ভূ-রাজনীতির মানচিত্র পুনর্লিখন করার এক বৈশ্বিক মহড়া।
২
ইউরোপীয় ফ্রন্টে ফাটল: রাজধানীগুলোর বিদ্রোহ।
ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের এই বিচ্ছেদ এখন আর কেবল কূটনৈতিক নথিপত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইউরোপীয় রাজধানীগুলোর প্রভাবশালী নেতাদের সাথে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সংঘাত ও নীতিগত বৈরিতা একে একটি প্রকাশ্য বিদ্রোহে রূপ দিয়েছে। প্যারিস থেকে লন্ডন—সবখানেই আমেরিকার একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যা দশকের পর দশক ধরে চলে আসা আটলান্টিক সংহতিকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। মূলত, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে ট্রাম্পের আপসহীন 'আমেরিকা ফার্স্ট' অবস্থান ইউরোপীয় নেতাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা স্বায়ত্তশাসন বা 'ইউরোপীয় সেনাবাহিনী'র মতো বিকল্প পথে হাঁটতে বাধ্য করছে।
ক। লন্ডন ও প্যারিস বনাম ওয়াশিংটন।
লন্ডন ও প্যারিসের সাথে ওয়াশিংটনের এই দ্বৈরথ মূলত ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ফাটলকে এক চূড়ান্ত সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইউক্রেন সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং ভারত মহাসাগরে কৌশলগত 'দিয়েগো গার্সিয়া' দ্বীপটি মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের বাগবিতণ্ডা এখন কূটনৈতিক শিষ্টাচার ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত তিক্ততায় রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট যখন ‘ইউরোপীয় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর ডাক দিচ্ছেন, তখন ট্রাম্প প্রতিরক্ষা বাজেটে ইউরোপের ‘ফ্রি-রাইডিং’ বা মার্কিন অর্থের ওপর নির্ভরশীলতার কঠোর সমালোচনা করে জোট ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন। এই পারস্পরিক অনাস্থা কেবল সামরিক জোটের শক্তিমত্তাকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে পশ্চিমাদের একক আধিপত্যের ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে। আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের এই আদর্শিক সংঘাত ব্রাসেলসকে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা ছত্রছায়া থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন পথে চলার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।
খ। রোমের সাথে মতবিরোধ।
ইতালির প্রধানমন্ত্রীর রক্ষণশীল রাজনৈতিক অবস্থান সত্ত্বেও, ভূ-মধ্যসাগরীয় নিরাপত্তা এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্পের একতরফা ও আগ্রাসী সিদ্ধান্তের কারণে রোমের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে গাজা সংকটের প্রেক্ষাপটে ইতালি ইসরায়েলের সাথে তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিত করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিলে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্প সরাসরি ইতালীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করে একে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অদূরদর্শী’ সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা রোমকে ব্রাসেলসের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এই দূরত্বের ফলে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ইতালি এখন ওয়াশিংটনের বিকল্প হিসেবে নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় গড়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। রোম ও ওয়াশিংটনের এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব ন্যাটোর দক্ষিণ ব্লকের সামরিক ঐক্যকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গ। মাদ্রিদ ফ্যাক্টর।
২০২৬ সালের ২রা মার্চ স্পেন সরকারের নেওয়া নজিরবিহীন সিদ্ধান্তটি ওয়াশিংটন-ব্রাসেলস বিচ্ছেদের ইতিহাসে এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সোশ্যালিস্ট সরকার গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ এবং ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রতিবাদে স্প্যানিশ আকাশসীমা ও কৌশলগত ‘রতা’ ও ‘মোরোন’ ঘাঁটি ব্যবহারে মার্কিন বিমানবাহিনীর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই পদক্ষেপের ফলে অন্তত ১৫টি মার্কিন যুদ্ধবিমান স্পেন ছেড়ে জার্মানিতে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে, যা ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার দীর্ঘদিনের লজিস্টিক চেইনকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে। মাদ্রিদ কেবল সামরিক বাধাই দেয়নি, বরং গাজায় মানবিক সহায়তা পাঠাতে নিজস্ব জাহাজ পাঠিয়ে ওয়াশিংটনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন একে ‘মিত্রতার চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে স্পেনের ওপর পূর্ণ বাণিজ্যিক অবরোধ বা ‘অল ট্রেড কাট অফ’-এর হুমকি দিলেও স্পেন তার সার্বভৌম সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। এরফলে ওয়াশিংটন-মাদ্রিদ সম্পর্ক গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং ইউরোপের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনপন্থী নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে স্পেন। এই ‘মাদ্রিদ ফ্যাক্টর’ ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ অনৈক্যকে এতটাই উসকে দিয়েছে যে, ইউরোপের একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র এখন সরাসরি আমেরিকার বৈশ্বিক রণকৌশলকে প্রত্যাখ্যান করছে।
ঘ। বুদাপেস্টের মোড় পরিবর্তন।
২০২৬ সালের ১২ই এপ্রিল হাঙ্গেরির নির্বাচনে ১৬ বছরের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভিক্টর অরবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় ইউরোপে ইসরায়েল-আমেরিকা অক্ষের সর্বশেষ মজবুত দুর্গটি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগয়ার এবং তার নেতৃত্বাধীন 'তিসজা' দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসায় বুদাপেস্ট এখন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বলয় থেকে বেরিয়ে ব্রাসেলসের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে মনোযোগী। ইতিপূর্বে অরবানের সরকার যেভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে নাম প্রত্যাহার এবং নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সত্ত্বেও লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, মাগয়ারের জয়ে সেই 'অরবানতন্ত্র' এখন বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূলধারার নেতাদের মধ্যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ছাড়া ইসরায়েলের নীতিকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার মতো কোনো শক্তিশালী মিত্র অবশিষ্ট নেই, যা ওয়াশিংটনকে ইউরোপে সম্পূর্ণ বন্ধুহীন করে তুলেছে।
ঙ। অস্ত্র অবরোধ ও আটলান্টিক ফাটল: এন্টওয়ার্প বন্দরের নজিরবিহীন সংঘাত।
২০২৬ সালের ১০ মার্চ, বেলজিয়ামের এন্টওয়ার্প বন্দরে জার্মানি থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে পাঠানো ‘রাইনমেটাল’ ও ‘ডিহেল ডিফেন্স’-এর তৈরি অত্যাধুনিক ট্যাংক বিধ্বংসী শেল ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বিশাল চালান আটকে দেয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। বেলজিয়াম সরকার মানবিক কারণ ও আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে এই সামরিক ‘ট্রানজিট’ সুবিধা বাতিল করায় বার্লিনের সাথে ব্রাসেলসের চরম কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পদক্ষেপ কেবল একটি লজিস্টিক বাধা নয়, বরং এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ ফাটল এখন ইসরায়েল-আমেরিকা অক্ষের প্রতিরক্ষা সরবরাহের শিকলকে সরাসরি ভেঙে দিচ্ছে। ন্যাটোর দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের মধ্যে এই আস্থার সংকট মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ইউরোপের দ্বিধাবিভক্ত রূপকেই বিশ্বমঞ্চে চরমভাবে উন্মোচিত করেছে। ওয়াশিংটন এই ঘটনাকে "মিত্রদের পিঠে ছুরিকাঘাত" হিসেবে অভিহিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
৩
আর্কটিক ডিপ্লোম্যাসি: গ্রিনল্যান্ড কি পরবর্তী দাবার ছক?
ন্যাটো থেকে আমেরিকার সম্ভাব্য প্রস্থান ডেনমার্ক এবং নর্ডিক দেশগুলোর জন্য কেবল একটি কূটনৈতিক বিচ্ছেদ নয়, বরং এটি উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলে এক ভয়াবহ সামরিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার অশনি সংকেত। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড এখন ট্রাম্পের বৈশ্বিক দাবার ছকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্রুত বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের ভূ-গর্ভে থাকা বিশাল ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট’ বা বিরল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার এবং আর্টিক মহাসাগরের নতুন জাহাজ চলাচল পথগুলো ওয়াশিংটনের কাছে অত্যন্ত লোভনীয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের দৃষ্টিতে গ্রিনল্যান্ড কেবল একটি দ্বীপ নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি এবং প্রযুক্তি যুদ্ধের প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে তিনি ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’ (যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি)-কে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন; অর্থাৎ ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলে ডেনমার্ক তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমেরিকার কোনো আইনি বা সামরিক প্রতিশ্রুতি পাবে না। ট্রাম্পের ‘হার্ড ওয়ে’ বা কঠিন পথে হাঁটার সরাসরি হুমকি মূলত ডেনমার্ককে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো ডেনিশ সরকারকে দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরে বাধ্য করা। এই কৌশলগত ব্ল্যাকমেইল নর্ডিক দেশগুলোর মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে, কারণ তারা এখন দেখছে যে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রই এখন তাদের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত, আর্কটিক ডিপ্লোম্যাসি এখন আর আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি সামরিক পেশিশক্তি প্রদর্শনের এক নতুন ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে। ন্যাটোর সুরক্ষা কবজহীন এই অঞ্চলে আমেরিকার আগ্রাসী নজর মূলত ২০২৬ সালের এক অস্থির বিশ্বব্যবস্থারই প্রতিফলন।
৪
আঙ্কারার উত্থান এবং ‘নতুন ইরান’ তকমা।
মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে, যেখানে ইসরায়েল ও তুরস্ক সরাসরি সামরিক সংঘাতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালে ইসরায়েলি নেতারা তুরস্ককে 'নতুন ইরান' হিসেবে অভিহিত করে অভিযোগ তুলেছেন যে, আঙ্কারা ইরানকে আকাশপথ ব্যবহারের সুবিধা দিচ্ছে এবং নিজেদের সীমান্তে কুর্দি নিধনে লিপ্ত রয়েছে। এর বিপরীতে তুরস্কের আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের রায় প্রদান করেছে এবং এরদোগান তাকে সরাসরি 'হিটলার'-এর সাথে তুলনা করায় দুই দেশের সম্পর্ক এখন খাদের কিনারে। এই উত্তজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আঙ্কারা 'আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরাম'-কে কেন্দ্র করে মিশর, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের সাথে মিলে ন্যাটোর আদলে একটি স্বতন্ত্র 'মুসলিম সামরিক জোট' গড়ার চেষ্টা করছে, যা ইসরায়েল ও আমেরিকার আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি। এদিকে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার মূলত তুরস্ককে রাশিয়ার প্রভাব বলয়ে ঠেলে দেওয়া অথবা তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার একটি কৌশলগত ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ট্রাম্প যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে সরিয়ে নেন তবে তুরস্ক তার দীর্ঘদিনের সুরক্ষা কবজ হারাবে, যা ইসরায়েল বা আমেরিকার জন্য তুরস্কের ওপর সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালানোকে অনেক সহজ করে তুলবে। মূলত ইরানকে কোণঠাসা করার পর ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধান লক্ষ্যবস্তু যে তুরস্ক, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের ন্যাটো ত্যাগের হুমকি আঙ্কারার জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, কারণ ন্যাটোর বাইরে তুরস্ক হবে আমেরিকার জন্য একটি উন্মুক্ত লক্ষ্য। ২০২৬ সালের এই নতুন সমীকরণ মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। আঙ্কারার এই উত্থান ও সামরিক জোট তৈরির প্রচেষ্টাই এখন ওয়াশিংটন-ইসরায়েল অক্ষের মাথাব্যথার প্রধান কারণ।
৫
কৌশলগত শূন্যতা ও ইউরোপীয় সেনাবাহিনী।
আমেরিকা যখন নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, তখন ইউরোপের সামনে মাত্র দুটি কঠোর পথ খোলা রয়েছে: হয় রাশিয়ার প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করা, নতুবা একটি স্বতন্ত্র 'ইউরোপীয় সেনাবাহিনী' গড়ে তুলে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ব্রাসেলস এখন দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিচ্ছে, যা ন্যাটোর কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে কাজ করতে পারে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দীর্ঘকাল ধরে এই 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন' বা ইউরোপীয় সামরিক সক্ষমতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন এবং ২০২৬ সালের এই সংকটে তার সেই দৃষ্টিভঙ্গিই এখন সমগ্র ইউরোপের প্রধান এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইইউ-এর পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলও বারবার ইউরোপকে নিজস্ব সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আমেরিকার প্রস্থান মূলত ইউরোপকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা ইউনিয়ন গঠনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তাকে চিরতরে শেষ করে দিতে পারে। এই ঐতিহাসিক সামরিক রূপান্তর কেবল ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং ওয়াশিংটনকে ইউরোপের কৌশলগত মানচিত্র থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেবে।
৬
২০২৬ সালের এই ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রটি বিশ্লেষণ করলে একটি রূঢ় সত্য বেরিয়ে আসে: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে ‘স্থিতিশীল’ বিশ্বব্যবস্থা আমরা চিনে এসেছি, তার মৃত্যু ঘণ্টা বেজে গেছে। ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের এই বিচ্ছেদ কেবল একটি সামরিক জোটের ভাঙন নয়, বরং এটি পশ্চিমা ঐক্যের এক চূড়ান্ত আদর্শিক পতন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি যখন ন্যাটোর সুরক্ষা কবজকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন ইউরোপ বাধ্য হচ্ছে তার কয়েক দশকের নিরাপত্তা পরনির্ভরশীলতা ঝেড়ে ফেলে একটি স্বতন্ত্র ‘ইউরোপীয় সেনাবাহিনী’ গড়ার পথে হাঁটতে।
এই শূন্যতা ও অস্থিরতার সুযোগেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে নতুন নতুন সংঘাতের ফ্রন্ট। একদিকে আর্কটিক অঞ্চলে গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ দখলের মার্কিন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-তুরস্ক সরাসরি সংঘাতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বিশ্ব এক বহুমেরু কেন্দ্রিক নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আঙ্কারার ‘চতুর্মুখী জোট’ গঠন এবং মাদ্রিদ-রোম-বুদাপেস্টের মতো রাজধানীগুলোতে ওয়াশিংটন বিরোধী যে বিদ্রোহ আমরা দেখছি, তা প্রমাণ করে যে আমেরিকার একক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত ন্যাটোর এই ভগ্নদশা কেবল ইউরোপের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর ঢেউ আছড়ে পড়বে এশিয়া থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত। যখন পুরনো মিত্ররা একে অপরের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় বা অস্ত্রের চালান আটকে দেয়, তখন বুঝতে হবে যে আমরা এক বড় ধরণের বৈশ্বিক যুদ্ধের পদধ্বনি শুনছি। ২০২৬ সালের এই অস্থির বিশ্বব্যবস্থায় একটি বিষয় নিশ্চিত—শান্তির পুরনো সমীকরণগুলো আর কাজ করবে না। গ্রিনল্যান্ড থেকে আঙ্কারা পর্যন্ত বিস্তৃত এই নতুন মানচিত্রটি তাই কোনো স্থিতিশীলতার সংকেত নয়, বরং এটি এক দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী রূপান্তরের নীল নকশা। আমরা কি তবে এক নতুন বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, নাকি এটি কেবল এক নতুন শক্তির ভারসাম্যের প্রসব বেদনা? সময় এবং আগামীর রণকৌশলই তার উত্তর দেবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৮ এপ্রিল ২০২৬