
১
২০২৬ সালের এপ্রিলে বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ এক অভাবনীয় বাঁক নিয়েছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা নিরসনে পাকিস্তানের ভূমিকা এখন কিংবদন্তিতুল্য। তেহরান ও ওয়াশিংটন যখন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে, তখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন পাকিস্তানের বর্তমান সামরিক প্রধান এবং দেশটির দ্বিতীয় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ২০২৫ সালের অক্টোবরে মিসরের শারম আল-শেখে অনুষ্ঠিত ‘গাজা শান্তি সম্মেলনে’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে ট্রাম্প বলেন:
“আসিম মুনির আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল।” (“Asim Munir is my favorite field marshal.”)
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এভাবে জনসমক্ষে তাকে “মাই ফেভারিট ফিল্ড মার্শাল” বলে অভিহিত করার পর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মুনিরের প্রভাব নতুন মাত্রা পায়। গত কয়েক সপ্তাহে তার পরিচালিত শাটল ডিপ্লোম্যাসি কেবল পাকিস্তানকেই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে বৈশ্বিক কূটনীতির চালকের আসনে বসিয়ে দিয়েছে। প্রথাগত প্রটোকল ভেঙে ট্রাম্পের সাথে তার ব্যক্তিগত সখ্যতা এবং ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর তার গভীর প্রভাব—এই দুইয়ের মেলবন্ধনই আজ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। হোয়াইট হাউস থেকে তেহরানের আইআরজিসি সদর দপ্তর পর্যন্ত মুনিরের যে অবাধ যাতায়াত, তা তাকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ‘সৈনিক-কূটনীতিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার এই কৌশলী মধ্যস্থতার ফলেই মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য মহাপ্রলয় থমকে দাঁড়িয়েছে এবং বিশ্ব এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের হাত থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়েছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উত্থান প্রমাণ করে যে, কৌশলগত অবস্থানে থাকলে একটি দেশ কীভাবে বিশ্বশান্তির ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠতে পারে।
২
ট্রাম্পের আস্থা এবং ‘ফেভারিট ফিল্ড মার্শাল’।
২০২৫ সালের জুন মাসে হোয়াইট হাউসের ক্যাবিনেট রুমে এক মধ্যাহ্নভোজের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন:
“তাকে (মুনির) আজ আমন্ত্রণ জানাতে পেরে আমি সম্মানিত। একটি (পরমাণু) যুদ্ধ বন্ধ করতে সাহায্য করার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই আমি এই আমন্ত্রণ জানিয়েছি।” ট্রাম্প দাবি করেন যে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চরম উত্তেজনার সময় আসিম মুনির অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত রুখে দিয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের সাথে রাওয়ালপিন্ডির সম্পর্ক প্রথাগত প্রটোকল ছাপিয়ে এক অভূতপূর্ব ব্যক্তিগত সখ্যতায় রূপ নিয়েছে। এই সম্পর্কের মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০২৫ সালে, যখন ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনে ট্রাম্পের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। ট্রাম্প প্রায়ই মুনিরকে একজন দক্ষ সামরিক নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। ওভাল অফিসে এক বৈঠকের পর তিনি একবার তাকে উদ্দেশ্য করে সাংবাদিকদের বলেন:
“তিনি একজন অসাধারণ যোদ্ধা এবং একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।” (“An exceptional man and a greater fighter.”)
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে নিভৃত মধ্যাহ্নভোজ থেকে শুরু করে সরাসরি টেলিফোনে নিয়মিত আলাপ- ট্রাম্প ও মুনিরের এই রসায়নই ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতির মূল ভিত্তি তৈরি করেছে। ট্রাম্প বরাবরই প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক কূটনীতির চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নকে বেশি গুরুত্ব দেন, আর সেখানেই মুনির সফল হয়েছেন। ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সরাসরি কথা বলার ধরণ এবং জটিল ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচকে সহজভাবে উপস্থাপনের ক্ষমতা ট্রাম্পকে মুগ্ধ করেছে। কৌশলগতভাবে ট্রাম্পকে তুষ্ট করতে মুনির পাকিস্তানে বড় ধরনের মার্কিন বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোর সহযোগিতার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। এর বিনিময়ে ট্রাম্পও তাকে “মাই ফেভারিট ফিল্ড মার্শাল” বলে স্বীকৃতি দিয়ে রাওয়ালপিন্ডির গুরুত্ব ওয়াশিংটনের দরবারে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের এই সখ্যতা কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকেনি, বরং এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থানকে পুনরায় শক্তিশালী করেছে।
৩
তেহরানের ভরসা: এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে তৈরি হওয়া তিক্ততা কাটিয়ে ইরানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন এক ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই অভাবনীয় পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ব্যক্তিগত প্রভাব এবং ইরানের প্রভাবশালী 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস'-এর সাথে তার দীর্ঘদিনের গভীর পেশাদার যোগাযোগ। যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ ও নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছিল, তখন মুনির তেহরান সফর করে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সাথে সরাসরি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। ইরানের নেতৃত্ব মুনিরকে কেবল একজন প্রতিবেশী সেনাপ্রধান হিসেবে নয়, বরং এমন এক নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করেছে যিনি ওয়াশিংটনের কড়া বার্তা যেমন নির্ভুলভাবে বয়ে আনেন, তেমনি তেহরানের নিরাপত্তার গভীর উদ্বেগগুলোকে ট্রাম্পের ডেস্কে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম। গাজা সংকট ও ইসরায়েল ইস্যুতে পাকিস্তানের স্পষ্ট এবং কঠোর অবস্থান ইরানের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে, যা তাকে তেহরানের কাছে একজন 'সৎ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের মতো একজন আনপ্রেডিক্টেবল প্রেসিডেন্টের সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় ইরান মুনিরের মাধ্যমে নিজেদের রেড-লাইনগুলো স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনকে জানাতে পারছে। তেহরানের গোয়েন্দা ও সামরিক বলয়ের সাথে মুনিরের এই অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী সেতুবন্ধনই তাকে মধ্যপ্রাচ্যের বারুদ সামলানোর মূল চাবিকাঠিতে পরিণত করেছে। এই আস্থার ফলে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার কয়েক দশকের পুরনো শত্রুতা সরিয়ে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ প্রশস্ত হয়েছে। আসিম মুনিরের মাধ্যমেই ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে একটি সম্মানজনক সমঝোতার দিকে এগোতে পারছে।
৪
ইসলামাবাদ: শাটল ডিপ্লোম্যাসির নতুন কেন্দ্র।
২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়া আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনাটি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২১ ঘণ্টার সেই রুদ্ধদ্বার ম্যারাথন বৈঠক থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত চুক্তি না এলেও, ফিল্ড মার্শাল মুনিরের অনন্য মধ্যস্থতায় একটি বৈপ্লবিক ‘অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি’ সম্ভব হয়েছে। এই শাটল ডিপ্লোম্যাসির মূল কারিগর হিসেবে তিনি একাধারে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় এবং সংবেদনশীল বার্তার আদান-প্রদান করছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা পাকিস্তানের এই নতুন ভূমিকাকে ‘সৈনিক-কূটনীতি’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যেখানে প্রথাগত সিভিলিয়ান প্রটোকলের চেয়ে সামরিক নেতৃত্বের ব্যক্তিগত রসায়ন ও প্রভাব বেশি কার্যকর হচ্ছে। ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক বিজয় প্রমাণ করে যে, সংকটকালীন সময়ে সামরিক শক্তি যখন আস্থার সেতুবন্ধনে রূপান্তরিত হয়, তখন যুদ্ধের দামামা থামিয়ে দেওয়াও সম্ভব। মুনিরের এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ কেবল যুদ্ধই থামায়নি, বরং ইসলামাবাদকে আধুনিক ভূ-রাজনীতির এক নতুন স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কয়েক দশকের অচলায়তন ভাঙতে এই শাটল ডিপ্লোম্যাসি এখন একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পেছনে মুনিরের অবদানের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প সম্প্রতি বলেন:
“ফিল্ড মার্শাল মুনিরই এই প্রক্রিয়ার চালিকাশক্তি—তিনি না থাকলে এটি (যুদ্ধবিরতি) কাজ করত না।” তিনি আরও যোগ করেন যে, ইরানের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে মুনিরের ওপর তার পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং মুনির একজন “নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারী”।
৫
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আজ কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার অক্ষশক্তি নন, বরং তিনি বিশ্ব রাজনীতির এক অপরিহার্য ‘ডিপ্লোম্যাটিক ব্রোকার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ট্রাম্পের প্রথাগত প্রোটোকলহীন ব্যক্তিগত পছন্দ আর ইরানের অনড় ও স্পর্শকাতর অবস্থানের মাঝে তিনি এক নির্ভরযোগ্য ‘অফ-র্যাম্প’ বা সংকট উত্তরণের পথ তৈরি করেছেন। তার এই ‘সৈনিক-কূটনীতি’ প্রমাণ করেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায় যখন সিভিলিয়ান কূটনীতি থমকে দাঁড়ায়, তখন ব্যক্তিগত সামরিক সংযোগ ও দূরদর্শী নেতৃত্বই মহাপ্রলয় রুখে দিতে পারে। মুনিরের সাথে সুসম্পর্কের জেরে ট্রাম্পকে তাই বেশ কয়েকবার বলতে শোনা গেছে:
“আমি পাকিস্তানকে ভালোবাসি।” (“I love Pakistan.”)
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান নিজেকে কেবল একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার এক অপরিহার্য অভিভাবক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আস্থা এবং তেহরানের নিরাপত্তা বলয়ের ওপর মুনিরের প্রভাব তাকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আস্থার একমাত্র সেতুবন্ধনে পরিণত করেছে। শাটল ডিপ্লোম্যাসির এই নতুন অধ্যায় সফল হওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব কেবল আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইতিহাসের পাতায় আসিম মুনিরের নাম কেবল একজন সমরনায়ক হিসেবে নয়, বরং পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিরসনকারী এবং এক সফল বৈশ্বিক শান্তিস্থাপক হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক বিজয় দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকেও এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। মুনিরের দূরদর্শী পদক্ষেপে পাকিস্তান আজ ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের অপবাদ ঘুচিয়ে বিশ্বশান্তির প্রকৃত অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই রূপান্তর কেবল বর্তমান সময়ের জন্য নয়, বরং আগামী দশকের ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের প্রভাবকে প্রশ্নাতীত করে তুলবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ এপ্রিল ২০২৬