
১
গত ০৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মাইকেল কুমির, অর্থাৎ প্রিয় মুশতাক ভাইকে নিয়ে আমার ওয়ালে লিখেছিলাম। মুশতাক আহমেদ ওরফে মাইকেল কুমির ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কারাবন্দী অবস্থায় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দী ছিলেন। মুশতাক ভাই ছিলেন একজন লেখক এবং দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির খামারের স্বপ্নদ্রষ্টা ও অন্যতম অংশীদার। তার এবং ভাবির সাথে পরিচয় সুন্দরবন বেড়াতে গিয়ে। সুন্দরবনের সবুজ নির্জনতায় গাইড ট্যুরস-এর লঞ্চের ছাদে বসে আমি মুশতাক ভাইয়ের কুমিরের খামার ঘিরে স্বপ্নের কথা শুনেছিলাম। মুশতাক ভাই 'মাইকেল কুমির ঠাকুর' নামে তার ফেসবুক পাতায় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুজে মন্তব্য করতেন। মুশতাক ভাই এবং লিপা ভাবির সাথে পরিচয় ছিল বলে হয়তো রাস্ট্রের হেফাজতে থাকাবস্থায় তার মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়। মুশতাক ভাইয়ের সাথে সেসময় জেলে বন্দি আরেকজন ব্যক্তিকে নিয়ে আজ লিখতে যাচ্ছি। তিনি আমার প্রিয় একজন কার্টুনিস্ট মানুষ কিশোর, যার আসল নাম আহমেদ কবির কিশোর।
দেশে বসেই হাসিনা সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে যারা কার্টুন এঁকেছেন কিংবা নিবন্ধ লিখেছেন কিংবা দেশে বা দেশের বাইরে এক্টিভিজম করে যারা ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শক্তি জুগিয়েছিলেন তাদের অনেকেই এখনও কিশোরের মতো বিদেশে অবস্থান করছেন। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা দেশে ফিরতে শঙ্কিত কিংবা দ্বিধাগ্রস্থ। ক্যালেন্ডারের পাতায় বছর গড়িয়ে গেছে ঠিকই, আন্দোলনের সাথে জড়িত অনেকের আর্থিক- সামাজিক- রাজনৈতিক উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনো অনেকে শারীরিক, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে ভুগছেন। যারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা আইন) অভিযুক্ত হয়েছেন, তাদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন বলে জানা যায়। আমার প্রশ্ন হলো ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পরও কার্টুনিস্ট কিশোরের বিরুদ্ধে দায়ের করা তথাকথিত ডিজিটাল মামলা তুলে নেয়া হলো না কেন এবং তাকে আরও কতদিন এভাবে অজ্ঞাতবাস থাকতে হবে? কেউ কি তার বিরুদ্ধে এখনও এক্টিভ নাকি স্রেফ প্রশাসনের নজরে আসেনি বলে এই উপেক্ষা! কার্টুনিস্ট কিশোরের বিষয়টা হয়তো প্রশাসনের নজরে আসেনি, তাই আমার এই প্রচেষ্টা।
২
কার্টুনিস্ট মানুষ কিশোরকে গত ০২ মে ২০২০ তারিখ রাতে কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্যাঁচে ফেলে র্যাব-৩ এর এএসপি বীণা রানিসহ অন্যরা সাদা পোশাকে শান্তিনগরের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে জানা যায়। এরপর গোপন বন্দিশালায় তার ওপরে চলে অমানুষিক নির্যাতন, একপর্যায়ে মাথায় আঘাত করা হলে তার কানের পর্দা ফেটে যায়। এই ভাইটা এখন ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত শুনেছি। সেসময় কার্টুনিস্ট কিশোরসহ লেখক মুশতাক আহমেদ, সামিউল ওরফে জুলকার নাইন সায়ের খান, নেত্র নিউজের তাসনীম খলিল, রাষ্ট্রচিন্তার ঢাকার সমন্বয়ক দিদারুল ভূঁইয়া, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান, আশিক ইমরান ও স্বপন ওয়াহিদ ইত্যাদি মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১/২৫ (১) (খ) ৩১/৩৫ ধারায় ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং করোনভাইরাস মহামারি সম্পর্কে গুজব ছড়ানো এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য অপবাদ, বিভ্রান্তি ও বিভেদ সৃষ্টির’ অভিযোগ আনা হয়।
মানুষ কিশোরের অপরাধ, তিনি ২০২০ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকারের কোভিড-১৯ মহামারি পরিচালনার সমালোচনা ও ব্যঙ্গ করে বেশ কয়েকটি কার্টুন আঁকেন এবং ‘করোনার সময় জীবন’ শিরোনামে এটিকে তার ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট করেন। এছাড়াও তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে নিয়ে ২০২০ সালে একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকেন, যিনি বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। কার্টুনিস্ট কিশোর ও মুশতাক ভাইকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটকের ১০ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের নিম্ন আদালত ৬ বার তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে। কারাগারে থাকা অবস্থায় মুশতাক আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ৫৩ বছর বয়সে, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে মারা যান। প্রায় ১০ মাস কারাভোগের পর তার অস্বাভাবিক মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা তীব্রতর করে তোলে। মুশতাক ভাইয়ের মৃত্যুর পর দেশের মানুষ ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঘটনার পরম্পরায় গত ০৩ মার্চ ২০২১ তারিখে হাইকোর্টের বিচারকদের একটি প্যানেল কার্টুনিস্ট কিশোরকে জামিনে মুক্তি দেয়। কিশোর ৫ মার্চ ২০২১ তারিখে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের জানান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন তাকে কীভাবে নির্যাতন করেছিল।
জানা যায় যে কিশোরকে গ্রেফতার করে প্রথমে খিলগাঁও এবং এরপর রাজধানী সুপার মার্কেটের র্যাব ক্যাম্পে নেয়া হয়। সেখানে ০৩দিন নির্যাতনের পর ৫ মে ২০২০ তারিখে তাকে রমনা থানায় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাকে কোন জামিন না দিয়ে প্রায় ১০ মাস কারাগারে আটক রাখা হয়। তাকে এবং লেখক মুশতাককে কারাগারে একই জায়গায় রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়। ইতিমধ্যে ৬ বার তাদের জামিন আবেদন নাকচ করা হয়। ২০২১ সালের ৪ মার্চ তারিখে ১০ মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি এখনও চলমান এবং এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কবে হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। আমরা জানি, মামলার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং এটি আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ এক যৌথ বিবৃতিতে সেসময় কিশোরের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবী জানায়।
৩
কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলার বর্তমান অবস্থা বেশ জটিল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং সেসময় কিশোর যেহেতু আদালতে উপস্থিত ছিলেন না, তাই তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ২৫ এপ্রিল ২০২০ তারিখে এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছিল, তবে মিনহাজ মান্নান নামে একজন আসামি উচ্চ আদালতে অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করায় সাক্ষ্য গ্রহণ পিছিয়ে যায়। এই বিষয়ে নতুন তারিখের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এই মামলার অন্যতম আসামি লেখক মুশতাক আহমেদ ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে যেহেতু মারা যান, তাই তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে কার্টুনিস্ট কিশোরের মামলাটি এখনও বিচারাধীন, যদিও তিনি জামিনে মুক্ত আছেন। তবে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে কারণ অভিযোগ গঠনের সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পরও তিনি দেশে ফিরে এই মামলা ফেস করতে দ্বিধাগ্রস্থ। পূর্বে র্যাবের হেফাজতে অমানুষিক অত্যাচারজনিত ট্রমা তাকে হয়তো এখনও তাড়িয়ে ফেরে এবং তিনি নিরাপত্তাহীনতা ফিল করেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে হওয়ায় এটি যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
৪
দীর্ঘ ১০ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া কার্টুনিস্ট কিশোর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন ১০ মার্চ ২০২১ (বুধবার) তারিখ দুপুরে। তার অভিযোগ ছিল, ২ মে ২০২০ তারিখে তাকে কাকরাইলের বাসা থেকে সাদা পোশাকধারী ১৬-১৭ জন লোক জোর করে তুলে নিয়ে যায় এবং ৫ মে ২০২০ তারিখে র্যাব হেফাজতে নেয়ার আগে পর্যন্ত তাকে অজ্ঞাত স্থানে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। তার কান থেকে রক্ত পড়া এবং পায়ে লাঠি দিয়ে পেটানোর মতো গুরুতর অভিযোগ তিনি আদালতে উপস্থাপন করেন। বিজ্ঞ আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর এএসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে অভিযোগটি তদন্তের নির্দেশ দেন। একই সাথে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে তিন সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে কিশোরের শারীরিক পরীক্ষা এবং নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২১ সালের মার্চ মাসে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড কিশোরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, কিশোরের শরীরে নির্যাতনের কোনো সুস্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে অধিক নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। পিবিআই তাদের তদন্ত শেষে আদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে বলা হয় যে সাদা পোশাকে অজ্ঞাতনামা ১৬-১৭ জনের বিরুদ্ধে আনা কার্টুনিস্ট কিশোরকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কার্টুনিস্ট কিশোরের আইনজীবীরা আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। কার্টুনিস্ট কিশোরের নির্যাতনের অভিযোগ সংক্রান্ত মামলাটি এখনও বিচারাধীন। মেডিক্যাল বোর্ড এবং পিবিআইয়ের তদন্তে নির্যাতনের সুস্পষ্ট প্রমাণ না মেলার কারণে এটি বেশ জটিল রূপ নিয়েছে, তবে তার আইনজীবী কর্তৃক নারাজি আবেদনের মাধ্যমে মামলাটি সক্রিয় রয়েছে। এই নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তের উপর।
আদালত পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন, অথবা নারাজি আবেদন খারিজ করে দিতে পারেন।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩০ জুলাই ২০২৫