
১
শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে ফাল্গুনের রাতের আধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাদ
মরিবার হল তার সাধ।
বধু শুয়ে ছিল পাশে-শিশুটিও ছিল;
প্রেম ছিল, আশা ছিল জোছনায় তবু সে দেখিল
কোন্ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?
অথবা হয় নি ঘুম বহুকাল- লাশকাটা ঘরে মুয়ে ঘুমায় এবার।
এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!
বহুল পরিচিত কবিতাটির নাম- আট বছর আগে একদিন, লিখেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। মরিবার হল তার সাধ, এই সাধটা তবে কি স্বেচ্ছামৃত্যু বা ইউথেনেশিয়া? ‘ইউথেনেশিয়া’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘ইউ' (eu) এবং ‘থানাতোস' (thanatos) থেকে এসেছে। ‘ইউ' অর্থ ভালো বা সহজ এবং ‘থানাতোস' মানে মৃত্যু। অর্থাৎ ‘ইউথেনেশিয়া’ এর মানে সহজ মৃত্যু। কোনো ব্যক্তি অত্যন্ত অসুস্থ কিংবা কঠিন কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তাকে অসহনীয় কষ্ট ও ব্যথা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রাণনাশে সহায়তা করাকেই ইউথেনেশিয়া বা সহজ মৃত্যু বলে। এই মৃত্যু আসলে কতোটা সহজ সে প্রসঙ্গে যাবার আগে জানা দরকার একজন মানুষ কখন বা কেন এরকম একটি সিদ্ধান্তের দিকে যায়। কারণ মানুষ তো মরতে চায়না, যুগযুগ ধরে মানুষ জ্বরা-মৃত্যুকে পরাজিত করার চেষ্টা করে এসেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘প্রাণ’ কবিতায় লিখেছেন,
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই।
আমাদের দেশে ২০১৭ সালে এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়, যখন এক পিতা তার দুই ছেলে ও এক নাতির জন্য ইউথেনেশিয়ার আবেদন করেন। মেহেরপুরের এই ফল বিক্রেতা তোফাজ্জল হোসেন অনেক বছর পরিবারের এই তিন সদস্যের ভরণপোষণের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। তার ২৪ এবং ১৩ বছর বয়সী দুই ছেলে ও ৮ বছর বয়সী নাতি ডাচেন মাস্কুলার ডিস্ট্রফিতে আক্রান্ত। এটা মূলত জিনগত সমস্যা, যার কারণে দেহের মাংসপেশী বয়সের সাথে না বেড়ে উল্টো কমতে থাকে এবং এই রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচতে পারে। জনাব হোসেন তাদের চিকিৎসা করানোর জন্য নিজের শেষ সম্বল দোকান বিক্রি করে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান; তবে কোনো কিছুই ফলপ্রসূ হয় না। অবশেষে আর কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে তাকে ইউথেনেশিয়ার মতো একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তিনি বলেন, “সরকারকে ভাবতে দেন তারা আমার নাতি ও সন্তানদের সাথে কী করবে। তারা অনেক কষ্টে ভুগছে এবং এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নাই। আমার পক্ষেও তাদের এই ভোগান্তি দেখার আর ধৈর্য নেই”। তার ভাষ্যমতে, ছেলেদেরকে তিনি যখন তার দরখাস্ত (ইউথেনেশিয়া জন্য) সম্পর্কে বলেন ,তখন তাদের তা নিয়ে বেশি একটা আপত্তি বা রাগও ছিল না। অবশ্য শেষপর্যন্ত তাদেরকে ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
আমরা যদি পশিচবঙ্গের দিকে তাকাই, গত বছরের নভেম্বর মাসের কথা।
মৃত্যুকে ভিক্ষা না করে অর্জন করবেন, সুস্মিতা দেবীর এই ইচ্ছেটা কি স্বেচ্ছামৃত্যু নাকি আত্মহত্যা তা রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছিল কলকাতায়। জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এলে মানুষ পালাতে চায়, কিন্তু ষাট বছর বয়সের সুস্মিতা রায় চৌধুরী পালালেন না, বেছে নিলেন 'স্বেচ্ছামৃত্যু'। নিজের কাছের মানুষদের তাই আগাম নিমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন মৃত্যুবাসরে উপস্থিত থাকার। শুধু বুঝতে দেননি 'এ দেখাই শেষ দেখা'। সুস্মিতা দেবীর অবসাদ বা মানসিক কোনও সমস্যা ছিলনা। শুধু জরাজীর্ণ শরীরে মৃত্যুকে ভিক্ষা করবেন না, বরং অর্জন করবেন, তাই জীবন থেকে ছুটি নিলেন। যাওয়ার আগে স্বামী মুকুলের জন্য লিখে গেলেন ‘মুকুল, আমি চললাম। বিদুরের মতো তুমি দেখে রেখো। নিজে ভাল থেকো'।
পশ্চিমবঙ্গের আরেকটা ঘটনা, এটা ২০২১ সালের জুলাই মাসে।
‘আমাকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হোক’, চীৎকার রাখাল বেরার। বিভিন্ন মানুষকে চাকরি দেয়ার নাম করে বিপুল পরিমাণ টাকা প্রতারণা করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ। সেচ দফতরে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন, আর সেই প্রতারণার অভিযোগে তিনি শ্রীঘরে। যিনি এখন স্বেচ্ছামৃত্যু চান। রাখাল বেরাকে কাঁথি আদালতে তোলা হলে বিচারককে দেখে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আমাকে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেওয়া হোক।’ যদিও তাতে কর্ণপাত করেননি বিচারক। এই বিষয়ে তার আইনজীবী অনির্বাণ চক্রবর্তী বলেন, ‘এই ধরনের আবেদন আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে রাখালকে যেভাবে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে তাতে সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি এমন কথা বলেছেন।’ ঘটনা যাই হোক তবে রাখালের এমন দাবিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায় আদালতে।
২
সাধারণত তিন ধরনের ইউথেনেশিয়া রয়েছে। যেমন- ভলান্টারি বা স্বেচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়া, যেখানে রোগী নিজ ইচ্ছায় মৃত্যুগ্রহণ করতে চায়। নন-ভলান্টারি বা অস্বেচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়ায় রোগী কোমায় বা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় থাকে, যার দরুন এটি সম্পাদনে রোগীর অনুমতি বা মতামত নেওয়া সম্ভব হয় না। আর ইনভলান্টারি বা অনিচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়া রোগীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পাদন করা হয়।
ইউথেনেশিয়া কি বৈধ হওয়া উচিত?
এই প্রসঙ্গে চারটি দেশে ইউথেনেশিয়ার বৈধতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-
# নেদারল্যান্ড।
২০০২ সালের এপ্রিলে নেদারল্যান্ড পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে ইউথেনেশিয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। তবে এক্ষেত্রে যথাযথ শর্ত পূরণ করলেই তা বাস্তবায়িত হবে, যেমন- রোগী যদি অসহনীয় ব্যথায় ভুগতে থাকে, অসুখটির চিকিৎসা সম্ভবপর না হলে এবং রোগী যদি সজ্ঞানে থাকা অবস্থায় এই ইউথেনেশিয়া দাবি করে, শুধুমাত্র তখনই এটি কার্যকর করা যাবে। ২০১০ সালে ৩,১৩৬ জন অধিবাসীকে চিকিৎসকদের রক্ষণাবেক্ষণে প্রাণনাশক ঔষধ পান করানোর মাধ্যমে আত্মহত্যায় সহায়তা করা হয়। ‘নিউ ইংল্যান্ড অফ জার্নাল'-এ নেদারল্যান্ডসের ২৫ বছরে ইউথেনেশিয়ার অবস্থা পর্যালোচনা করা হলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে ইউথেনেশিয়া বৈধ হওয়ার আগে শতকরা ১.৭ ভাগ এ ধরনের মৃত্যু গ্রহণ করত, যা ২০১৫ সালে শতকরা ৪.৫ ভাগ হয়। এর মধ্যে মাত্র ৯২ ভাগ মানুষ আসলেই মারাত্মকভাবে অসুস্থ ছিল, আর বাকিরা বৃদ্ধাবস্থার বিভিন্ন অসুস্থতা এবং মানসিক সমস্যায় ভুগছিল।
ভেন ডের হেইডি বলেন, ‘যখন ইউথেনেশিয়া জীবননাশের একটি সাধারণ পথ হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই পথ সহজেই বেছে নেওয়ার মানুষও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’ বায়োএথিসিস্ট (Bioethicist) স্কট কিম বলেন, ‘বয়সগত রোগের কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে চায়, তবে তাদের মধ্যে কেউ মারাত্মক কোনো রোগে আক্রান্ত নয়। তারা বৃদ্ধ, তাদের বন্ধুরা মারা গেছে, সন্তানেরা সময় দেয় না, একাকিত্ব ভালো লাগে না- এসকল কারণে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে চান।’
# বেলজিয়াম।
বেলজিয়ামে ২০০২ সালে ইউথেনেশিয়াকে বৈধ করার জন্য একটি আইন পাশ করা হয়। নেদারল্যান্ডসের পর বেলজিয়াম দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এই কার্যক্রমকে আইনগত সম্মতি প্রদান করে। তবে এই আইনে উক্ত ইউথেনেশিয়া ভলান্টারি, নন-ভলান্টারি নাকি ইনভলান্টারি, তা সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু বলা নেই, যার কারণে কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা বোঝা যায় না। ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি'-এর প্রেসিডেন্ট জ্যাকুলিন হেরেমেনস বলেন, “আমরা ইউথেনেশিয়ার ক্ষেত্রে শাব্দিক কোনো পার্থক্য করি না।” তবে তা বাস্তবায়নের সময় অবশ্যই একজন চিকিৎসককে উপস্থিত থাকতে হবে। বেলজিয়ামে ২০০৩ সালে ২৩৫টি, ২০০৮ এ ৭০৮টি ২০১২ তে ১৪৩২টি এবং ২০১৩ সালে ১৮০৭টি ইউথেনেশিয়ার ঘটনা ঘটে। দরখাস্তকারীদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ ডাচভাষী। ২০১৪ সালে শিশুদের জন্য ইউথেনেশিয়া বৈধ ঘোষণা করে। প্রাণনাশী ঔষধ কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে যেকোনো বয়সের মানুষ স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে পারেন।
# আমেরিকা।
আমেরিকার শুধুমাত্র ছয়টি প্রদেশে এটা আইনসম্মত; বাকি প্রদেশে অবৈধ। তবে কলম্বিয়া প্রদেশে শুধু ওয়াশিংটন ডিসি, অর্থাৎ আমেরিকার রাজধানীতে এটি বৈধ। অরিগন প্রদেশে সর্বপ্রথম ভলান্টারি বা স্বেচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু শুধুমাত্র সেইসব রোগীরাই এজন্য দরখাস্ত করতে পারবে, যারা মারাত্মক অসুস্থ এবং ছয় মাসের চেয়েও কম সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে। এর প্রায় এক যুগ পরে ওয়াশিংটন অরিগনের মতোই একটি আইন পাশ করে। ২০১৩ সালে ভারমন্টেও এটা বৈধ করা হয়। পরবর্তীতে মন্টানার কোর্ট ইউথেনেশিয়াকে বৈধতা প্রদান করে। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, হাওয়াইতেও এটা স্বীকৃতি পায়। আমেরিকায় ২০১৩ সালে প্রায় ৩০০ জন ইউথেনেশিয়ার জন্য সম্মতি পায়। এর মধ্যে ২৩০ জন প্রাণনাশক ঔষধ গ্রহণে মারা যায়, বাকিরা অনুমোদনের পরে এই সিদ্ধান্ত বাদ দেন।
# কানাডা।
কানাডায় ২০১৬ সালে ‘বিল সি-১৪' এর মাধ্যমে ইউথেনেশিয়াকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আবেদনকারীকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে, অর্থাৎ ১৮ বছর বা এর উর্ধ্ববয়সী হতে হবে এবং ‘কানাডিয়ান হেলথকেয়ার কাভারেজ’ -এর অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। কোনো নাবালক যদি মারাত্মক কোনো রোগে আক্রান্তও হয় কিংবা বাঁচার সম্ভাবনাও খুব বেশি একটা না থাকে, তবুও তাকে ইউথেনেশিয়ার স্বীকৃতি দেওয়ার নিয়ম নেই। এক পরিসংখ্যান অনুসারে, যারা মৃত্যুর এই পন্থা বেছে নেয়, তারা মূলত বৃদ্ধ, উচ্চশিক্ষিত, স্বাধীন এবং অত্যন্ত অসুস্থ। ২০১৬ সালের ‘আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ জার্নালের এক জরিপ অনুসারে, কানাডায় ইউথেনেশিয়ার আবেদনকারীদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি।
৩
৯ মার্চ, ২০১৮ শুক্রবার ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বেঞ্চ ঘোষণা করেছিল এক ঐতিহাসিক রায়। যা পারেনি ভারত সরকার, যা পারেনি সমাজ, অবশেষে তাই করে দেখালো আদালত। আইনি স্বীকৃতি বা বৈধতা পেল ইউথেনেশিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার। জীবন যখন মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক তখনও যেভাবে হোক বেঁচে থাকতেই হবে, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে আর রোগীর জীবন্মৃত শরীরটাকে ‘বাঁচিয়ে রাখতে’ যেয়ে হাসপাতালের খরচ মেটাতে সর্বস্ব বেঁচে ক্রমশ নিঃস্ব হতে থাকবে একটি পরিবার। জীবনের নামে এই নরক যন্ত্রণা থেকে অবশেষে মুক্তির পথ দেখালেন ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রর নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ। বেঞ্চের শাশ্বত ঘোষণা, ‘সম্মানের সঙ্গে মৃত্যু, জীবনের অধিকার। এটা মানুষের মানবিক অধিকার।’
মুম্বাইয়ের কেইএম হাসপাতালে প্রাক্তন নার্স অরুণা শানবাগের মৃত্যুই কী ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারের রাস্তা প্রশস্ত করে দিল?
২০১৫ সালের ১৮ মে মৃত্যু হয় অরুণার। তার আগে ২০১১ সালে তার স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল আদালত। সেই ঘটনা থেকেই ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার নিয়ে বিতর্ক তীব্র হতে শুরু করে। এই অধিকারের কোনও রকম অপপ্রয়োগ যাতে না ঘটতে পারে সেজন্য বেঞ্চের নির্দেশ- মেডিকেল বোর্ডের অনুমতি স্বাপেক্ষেই মরণাপন্ন রোগীর শরীর থেকে খুলে নেয়া যাবে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। তবে আদালত স্বীকৃত এই স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারের প্রয়োগের পরিসর নিতান্তই সীমিত। কারণ, এক্ষেত্রে মুত্যৃ পথযাত্রী কোনও রোগীর জীবনদীপ নির্বাপনের জন্য ব্যবহার করা যাবে না কোনো ইঞ্জেকশন বা অন্য কোনো পদ্ধতি। সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশিত রায় অনুযায়ী কেবল মেডিকেল বোর্ডের অনুমতিপ্রাপ্ত রোগীর দেহ থেকে খুলে নেয়া যাবে লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। আইনি পরিভাষায় এই ধরনের স্বেচ্ছামৃত্যুকে সর্বোচ্চ আদালত ‘প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া’ নামে অভিহিত করেছে।
কী হয়েছিল অরুণার?
১৯৭৩ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ব্রেন-ডেড অবস্থায় ছিলেন অরুণা। সেই সময় তাঁর ওপর নৃশংস যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল ঐ হাসপাতালেরই এক ওয়ার্ড বয়। শারীরিক অত্যাচার করার সময় কুকুর বাঁধার শিকল দিয়ে অরুণার গলায় পেঁচিয়ে ধরেছিল সে। ঐ ঘটনায় অরুণা মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাথায় রক্ত সংবহনও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকী অন্ধও হয়ে যান অরুণা! এই অবস্থায় ৪২ বছর বেঁচে থাকতে হয়েছিল অরুণাকে। একদিকে কেইএম হাসপাতালের চিকিৎসকরা জীবন্মৃত অরুণাকে বাঁচিয়ে রাখার পবিত্র কর্তব্য সম্পাদনে আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছেন। অন্যদিকে সমাজের বিভিন্ন দিক থেকে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, কী লাভ এইভাবে বাঁচিয়ে রেখে? হাসপাতালের বাইরে বৃহত্তর সমাজে উঠে আসে একের পর এক প্রশ্ন। ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার নিয়ে বহুদিন আগে থেকেই আসলে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। অশীতিপর কমিউনিস্ট নেতা হীরেন মুখোপাধ্যায় একসময় নিজের দীর্ঘ জীবনের কথা মাথায় রেখে বলেছিলেন, সক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যুর বা ইচ্ছামৃত্যুর অধিকারকেও স্বীকৃতি জানানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ইউথেনেশিয়ার কি অবস্থা?
বাংলাদেশে ইউথেনেশিয়া অবৈধ। তবে ২০১৭ সালে ফল বিক্রেতা তোফাজ্জল হোসেনের ঘটনাটা সোস্যাল মিডিয়ায় বেশ সাড়া ফেলে, যার দরুন সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। ঘটনাটির প্রেক্ষিতে ইসলাম বিষয়ক গবেষক ফরিদুদ্দীন মাসুদ বলেন, “ইউথেনেশিয়া ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব সরকারের অবশ্যই নিতে হবে।" আইন ও শালিস কেন্দ্রের প্রধান নূর খান লিটন বলেন, “বাংলাদেশে অধিকাংশ জনগণ একে হত্যা মনে করে। এ বিষয়ে সরকার ও সমাজকেই রোগীদের দায়িত্ব নিতে হবে।" ইউথেনেশিয়া বা সহজ মৃত্যুর অনুমতি দেওয়া উচিত নাকি অনুচিত, তা নিয়ে সবার আলাদা আলাদা মত থাকতেই পারে। তবে কথা হলো, জীবন যখন মৃত্যুর চেয়েও বেশি কষ্টকর হয়ে পড়ে তখন তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং এজন্যই হয়তো 'ইউথেনেশিয়া'র মতো ধারণার উৎপত্তি। কেনোনা একজন বাহ্যজ্ঞানরহিত, শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত, মৃত্যুপথযাত্রী কোনো ব্যক্তিকে দিনের পর দিন কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা বাস্তবে কতখানি মানবিক কাজ! এই লেখা শুরু করেছিলাম জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা দিয়ে, শেষ করছি একইভাবে কারণ কবিরা ভবিষ্যৎ দেখতে পান। সেই দিন হয়তো আর বেশী দূরে নয় যেদিন কারো মরিবার সাধ খুব সহজেই পুর্ণ হবে। ইউথেনেশিয়া বা সম্মানের সাথে স্বেচ্ছামৃত্যু হোক মানুষের মানবিক অধিকার।
শোনো
তবু এ মৃতের গল্প;-কোনো
নারীর প্রণয়ের ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিতা জীবনের সাধ
কোথাও রাখে নি কোনো খাদ,
সময়ের উদবর্তনে উঠে এসে বধূ
মধু-আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের ‘পরে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হদিস: পত্র-পত্রিকা, রোর বাংলা এবং ইন্টারনেটের ভাঁজে ভাঁজে