
১
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়, বরং ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন ভোটারের জন্য এটি এক বিশাল ‘ডিজিটাল অগ্নিপরীক্ষা’। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী সাইলেন্ট পিরিয়ড হলো ভোটের ঠিক আগে নির্ধারিত একটি বিশেষ সময়সীমা, যা সাধারণত ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে শুরু হয়ে ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকে। আসন্ন নির্বাচনে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে এই ৩৮ ঘণ্টার সাইলেন্ট পিরিয়ড শুরু হবে, যখন সব ধরনের প্রকাশ্য সভা-সমাবেশ, মিছিল ও প্রচারণা আইনত নিষিদ্ধ। এই সময়ের মূল উদ্দেশ্য হলো দীর্ঘ প্রচারণার পর ভোটারদের একটি শান্ত পরিবেশ দেয়া, যাতে তারা কোনো প্ররোচনা ছাড়াই ঠাণ্ডা মাথায় তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এই সময়টিই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ প্রার্থীরা প্রচারণা বন্ধ রাখলেও কুচক্রী মহল এআই-জেনারেটেড ‘ডিপ ফেক’ ভিডিও বা ভুয়া অডিওর মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর মোক্ষম সুযোগ পায়। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোটারের কাছে প্রযুক্তির এই নিখুঁত কারসাজি যখন বাস্তব বলে মনেহয়, তখন তা সরাসরি ব্যালটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। নির্বাচনী বিধি নিষেধের কারণে প্রার্থীরা এই মিথ্যা তথ্যের বিপরীতে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা বা জনসভা করার সুযোগ পান না, যা পুরো ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে কোটি মানুষের স্মার্টফোনে পৌঁছে যাওয়া এই ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা সামাজিক অস্থিরতা ও আস্থার সংকট তৈরি করতে সক্ষম। তাই তথ্যের এই ‘অন্ধকার সময়ে’ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও ব্যক্তিগত সচেতনতা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির এই অদৃশ্য যুদ্ধ মোকাবিলায় প্রতিটি ভোটারের বিচারবুদ্ধিই হতে পারে স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার।
২
‘সাইলেন্ট পিরিয়ড’: প্রচার বন্ধ, কিন্তু গুজব কি থেমে থাকবে?
আগেই যেটা বলেছি, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ভোটের আগে প্রচার বন্ধ থাকার এই স্থিতিশীল সময়টিই এখন প্রযুক্তির অপব্যবহারে ‘ডিজিটাল আক্রমণের’ মোক্ষম সুযোগে পরিণত হয়েছে। যখন প্রার্থীরা আইন মেনে নীরব থাকেন, তখন এআই-নির্ভর প্রোপাগান্ডা যন্ত্র সচল হয়ে ভোটারদের অবচেতন মনে বিভ্রান্তি ও আতঙ্কের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ‘সাইলেন্ট পিরিয়ড’ এখন আর কেবল শান্তির সময় নয়, বরং তথ্যের স্বচ্ছতা রক্ষার এক অসম ডিজিটাল লড়াইয়ের ময়দান।
ক। তৎক্ষণিক প্রতিকারের অভাব।
সাইলেন্ট পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর প্রার্থীরা নির্বাচনী বিধিনিষেধের কারণে জনসভা বা গণমাধ্যম ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা দেয়ার আইনি সুযোগ হারান। এই সুযোগটিই নিতে পারে অপপ্রচারকারীরা, যারা এআই-জেনারেটেড ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে প্রার্থীদের অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। প্রথাগত প্রচারযন্ত্র বন্ধ থাকায় একটি মিথ্যা ভিডিও বা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়ে, তার সত্যতা নিশ্চিত করার আগেই ভোটের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। ফলে তথ্যের এই 'অন্ধকার সময়ে' প্রার্থীরা কোনো কার্যকর ঢাল ছাড়াই ডিজিটাল আক্রমণের শিকার হতে পারেন।
খ। ডিপ ফেক-এর থাবা।
এআই-চালিত 'ডিপ ফেক' প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো শীর্ষ নেতার কণ্ঠ ও অবয়ব হুবহু নকল করে আপত্তিকর বক্তব্য বা ভোট বর্জনের মিথ্যা ঘোষণা প্রচার করা এখন অত্যন্ত সহজ। ১০ তারিখ রাতে এমন কোনো সংবেদনশীল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে, ১২ তারিখ সকালে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে সাধারণ ভোটারের মনে চরম বিভ্রান্তি ও আস্থার সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য। যেহেতু এই সময়ে আইনগতভাবে কোনো পালটা প্রচার সম্ভব নয়, তাই প্রযুক্তির এই সূক্ষ্ম কারসাজি মুহূর্তেই নির্বাচনী মাঠের সমীকরণ বদলে দেয়ার সক্ষমতা রাখে। মূলত ডিজিটাল এই 'অদৃশ্য থাবা'র কাছে সাইলেন্ট পিরিয়ডে ভোটারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
৩
কেন এই ঝুঁকি এবার বেশি?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের ৫৬ শতাংশের বেশি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ায় ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার ঝুঁকি এবার কয়েক গুণ বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তথ্যের জন্য প্রথাগত মাধ্যমের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যা যাচাইহীন সংবাদকে দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয়। ফলে এআই-জেনারেটেড অপতথ্য এই বিপুল সংখ্যক অনলাইন ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্বকে সহজেই প্রভাবিত করে নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে।
ক। তারুণ্যের নির্ভরশীলতা।
বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি তরুণ, যাদের তথ্যের প্রাথমিক উৎস এখন আর সংবাদপত্র বা টেলিভিশন নয়, বরং ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম। ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে তরুণ ভোটাররা চটজলদি এবং দৃশ্যমান তথ্যে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করায় তারা এআই-জেনারেটেড চটকদার কন্টেন্টের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। প্রথাগত মিডিয়ার ফিল্টার বা সম্পাদনা ছাড়া সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা ভিডিওগুলো এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মনে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে, যা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তরুণদের ডিজিটাল নির্ভরশীলতা সাইলেন্ট পিরিয়ডে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জকে জটিল করে তুলতে পারে।
খ। বিকল্প তথ্যের উৎস।
বিগত দেড় দশকে নিয়ন্ত্রিত তথ্যপ্রবাহের ফলে মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা মফস্বল ও গ্রামীণ জনপদের প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোটারকে বিকল্প তথ্য উৎসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পেশাদার সংবাদমাধ্যমের পরিবর্তে স্থানীয় চায়ের দোকান বা ব্যক্তিগত স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে আসা অনির্ভরযোগ্য ভিডিওগুলোই এখন তাদের কাছে ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে ডিজিটাল লিটারেসি বা তথ্য যাচাইয়ের কারিগরি জ্ঞান সীমিত থাকায় এআই-জেনারেটেড বা ‘এডিট করা’ কন্টেন্টগুলো কোনো ফিল্টার ছাড়াই দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পেতে পারে। ফলে সাইলেন্ট পিরিয়ডে তথ্যের এই অনিয়ন্ত্রিত বিকল্প উৎসগুলোই অপপ্রচারকারীদের জন্য সবচেয়ে উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়ে চূড়ান্ত মুহূর্তে জনমতকে আমূল বদলে দিতে পারে।
৪
এআই প্রোপাগান্ডার ভয়াবহতা: ডিপ ফেক ও চিপ ফেক।
বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, আধুনিক প্রযুক্তির অপপ্রয়োগে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে আসা কৃত্রিম ভিডিও কিভাবে দেশের স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের হাতিয়ার হতে পারে। এআই ব্যবহার করে তৈরি করা এই কন্টেন্টগুলো কেবল ভুল তথ্য দেয় না, বরং ভোটারের আবেগ ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলে এক কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করে। ফলে ব্যালট পেপারে ছাপ দেয়ার আগেই প্রযুক্তির এই অদৃশ্য কারসাজি জনমতের স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দিয়ে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
ক। ডিপ ফেক (Deep Fake) ।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চতর অ্যালগরিদম ব্যবহার করে তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, শফিকুর রহমান কিংবা নাহিদ ইসলামের মতো জননন্দিত নেতাদের শারীরিক ভাষা, চেহারা এবং গলার স্বর অবিকল নকল করে যেকোনো সংবেদনশীল বা বিভ্রান্তিকর বার্তা প্রচার করা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ‘ডিপ ফেক’ প্রযুক্তিতে ডিজিটাল কারসাজি এতই নিখুঁত হয় যে, সাধারণ মানুষের চোখে আসল-নকলের পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে সাইলেন্ট পিরিয়ডে হঠাৎ কোনো নেতার ভুয়া বার্তা ছড়িয়ে পড়লে তা মুহূর্তের মধ্যে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ বা বিভ্রান্তি তৈরি করে পুরো নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
খ। চিপ ফেক (Cheap Fake) ।
‘চিপ ফেক’ মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাড়াই সস্তা ও সাধারণ এডিটিং টুলস ব্যবহার করে তৈরি করা অপপ্রচার কৌশল। এসবে কোনো নেতার স্বাভাবিক বক্তৃতাকে সামান্য স্লো-মোশন বা কাটছাঁট করে তাকে ‘মাতাল’, ‘অসুস্থ’ বা ‘অসংলগ্ন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যা গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটারদের মাঝে দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। যেহেতু এটি বাস্তব ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তাই মানুষ সহজে একে ভুয়া মনে করে না এবং সাইলেন্ট পিরিয়ডে তথ্যের উৎস যাচাইয়ের সুযোগ না থাকায় এর মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো অনেক সহজ হয়ে পড়ে।
৫
সম্ভাব্য প্রতিকার: আমাদের করণীয় কী?
প্রযুক্তির এই অদৃশ্য যুদ্ধ মোকাবিলায় কেবল আইনি বিধিনিষেধ দিয়ে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের এক সমন্বিত ডিজিটাল প্রতিরোধ। যখন প্রচারের সব বৈধ পথ বন্ধ থাকে, তখন প্রযুক্তিগত সুরক্ষা বলয় এবং তৃণমূল পর্যায়ের সচেতনতাই হতে পারে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আমাদের একমাত্র শক্তিশালী ঢাল। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই চ্যালেঞ্জ রুখতে যন্ত্রের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করাই হবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রধান রণকৌশল।
ক। জাতীয় ডিজিটাল ফরেনসিক সেল।
সাইলেন্ট পিরিয়ডে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন 'জাতীয় ডিজিটাল ফরেনসিক সেল' গঠন করা এখন সময়ের দাবি। এই সেলের মূল কাজ হতে পারে আধুনিক এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সত্যতা কয়েক মিনিটের মধ্যে যাচাই করা এবং তাৎক্ষণিক ফরেনসিক রিপোর্ট বা সরকারি বিবৃতি প্রদান করা। দ্রুততম সময়ে অপপ্রচারের স্বরূপ উন্মোচন করে এই সেলটি ডিজিটাল গুজবের সংক্রমণ থামিয়ে দিতে একটি শক্তিশালী 'প্রতিরক্ষা ব্যূহ' হিসেবে কাজ করতে পারে।
খ। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে সমন্বয়।
সাইলেন্ট পিরিয়ডে তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতে ফেসবুক (মেটা), ইউটিউব (গুগল) ও টিকটক কর্তৃপক্ষের সাথে নির্বাচন কমিশনের একটি বিশেষ ‘জরুরি সাড়াদান’ চুক্তি বা এসওপি (SOP) বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। এই সমন্বয়ের ফলে ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে যেকোনো উসকানিমূলক বা এআই-জেনারেটেড ভুয়া কন্টেন্ট রিপোর্ট করার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে ফেলা সম্ভব হতে পারে। মূলত বৈশ্বিক টেক জায়ান্টদের সাথে এই সরাসরি যোগাযোগই হতে পারে ডিজিটাল গুজবের দ্রুত বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর কারিগরি কৌশল।
গ। টেলকো অ্যালার্ট।
সাইলেন্ট পিরিয়ডে গুজব প্রতিরোধে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেশের ১০ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীকে সচেতনতামূলক 'পুশ মেসেজ' বা এসএমএস পাঠানো একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল হতে পারে। ‘তথ্য যাচাই না করে কোনো ভিডিও বিশ্বাস বা শেয়ার করবেন না’, এই একটি শক্তিশালী বার্তার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের মধ্যে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব। প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে সরাসরি ব্যবহারকারীর হাতে থাকা ডিভাইসে এই ডিজিটাল সতর্কতা পৌঁছানো হলে তা এআই-জেনারেটেড অপপ্রচারের প্রভাবকে অনেকাংশেই স্তিমিত করে দিতে পারে।
ঘ। কমিউনিটি বেজড ভেরিফিকেশন।
তৃণমূল পর্যায়ে গুজবের বিস্তার রুখতে পাড়া-মহল্লা ও গ্রামীণ চায়ের দোকানগুলোতে স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের নিয়ে ‘তথ্য যাচাইকারী দল’ বা ‘কমিউনিটি ফ্যাক্ট-চেকার’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই স্বেচ্ছাসেবীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা সন্দেহজনক কন্টেন্টগুলো দ্রুত যাচাই করে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সঠিক তথ্য জানাবে এবং ডিজিটাল কারসাজি সম্পর্কে সচেতন করবে। ডিজিটাল অপপ্রচারের বিপরীতে মানুষের ওপর মানুষের এই ব্যক্তিগত আস্থা ও সরাসরি যোগাযোগই হতে পারে সাইলেন্ট পিরিয়ডে গুজব প্রতিরোধের সবচেয়ে টেকসই সামাজিক রক্ষাকবচ।
৬
২০২৬ সালের নির্বাচন আমাদের সামনে এক নতুন ডিজিটাল বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপপ্রয়োগ সাইলেন্ট পিরিয়ডের মতো সংবেদনশীল সময়ে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে। ডিপ ফেক বা চিপ ফেক-এর মতো অদৃশ্য কারসাজি ভোটারদের বিবেক ও সিদ্ধান্তকে কলুষিত করার চেষ্টা করলেও, একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। জাতীয় ডিজিটাল ফরেনসিক সেলের সক্রিয়তা, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে কার্যকর সমন্বয় এবং তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি ভেরিফিকেশন, এই ত্রিভুজ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, ব্যালট পেপারে ছাপ দেয়ার আগে ১০ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সচেতনতাই হবে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা। প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে আমরা যদি সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে না শিখি তবে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার যন্ত্রের কারসাজির কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে। তাই ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয় কেবল কোনো প্রার্থীর হবে না, বরং তা হতে হবে সচেতনতা ও তথ্যের স্বচ্ছতার। যন্ত্রের জটিল অ্যালগরিদমকে পরাজিত করার একমাত্র পথ হলো মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি এবং তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের সংকল্প।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৮ জানুয়ারি ২০২৬