
১
ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এবং তাদের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ নীতিকে মোকাবিলা করতে ভারত যে পাল্টা কৌশল গ্রহণ করেছে, তাকে ভূ-রাজনীতিতে ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশল বলা হয়। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত চীনের কৌশলগত বেষ্টনীকে ছিন্ন করা। এর আওতায় ভারত বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশে নৌঘাঁটি স্থাপন ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে চীনকে পাল্টা ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে। ওমান থেকে সিঙ্গাপুর এবং সেশেলস থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সাথে সামরিক লজিস্টিক চুক্তি এই কৌশলগত হারকে আরও শক্তিশালী ও পূর্ণতা দান করেছে। কেবল সামরিক উপস্থিতি নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মিত্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এশীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখাই এই কৌশলের প্রধান উদ্দেশ্য। এভাবেই 'নেকলেস অফ ডায়মন্ডস' ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং উন্মুক্ত সমুদ্রপথ নিশ্চিত করতে একটি অপরিহার্য ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
২
‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলের সারকথা।
‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলটি মূলত চীনকে ঘিরে ফেলার একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত বেষ্টনী। চীন যেমন পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের বন্দরে ঘাঁটি গেড়ে ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’-এর মাধ্যমে ভারতকে অবরুদ্ধ করতে চায়, ভারতও তেমনি পাল্টা জবাব হিসেবে চীনের চারপাশের দেশগুলোতে নিজেদের সামরিক ও লজিস্টিক উপস্থিতি জোরালো করছে। এই কৌশলের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোতে ভারতের আধিপত্য ও নজরদারি নিশ্চিত করা হয়। ২০১১ সালে ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব ললিত মানসিং প্রথম এই দূরদর্শী ধারণাটি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। বর্তমানে এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার এক অপরিহার্য প্রতিরক্ষা নীতি হিসেবে স্বীকৃত।
৩
কৌশলগত অবস্থান: ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ -এর প্রধান স্তম্ভসমূহ।
ভারত মহাসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত চীনের প্রভাব রুখতে ভারত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে সামরিক ও লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করেছে, যা এই 'হীরক হার'-এর প্রধান স্তম্ভ। এই কৌশলের আওতায় ওমানের দুয়াকম থেকে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি পর্যন্ত প্রতিটি ঘাঁটি ভারতের জন্য একেকটি উজ্জ্বল 'হীরা' হিসেবে কাজ করে। এই ভূ-কৌশলগত অবস্থানগুলো ব্যবহার করে ভারতীয় নৌবাহিনী সংকটের সময়ে চীনের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ বা ‘সি লাইন অফ কমিউনিকেশন’ (SLOC) সহজেই নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ক। চাঙ্গি নৌঘাঁটি (সিঙ্গাপুর)।
২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরের সাথে স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে ভারত এই ঘাঁটিতে সরাসরি লজিস্টিক সাপোর্ট এবং রিফুয়েলিং সুবিধা লাভ করে। কৌশলগতভাবে এটি মালাক্কা প্রণালীর অত্যন্ত সন্নিকটে অবস্থিত, যা দক্ষিণ চীন সাগরের প্রবেশপথে ভারতীয় নৌবাহিনীর অবস্থানকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে। এই সুবিধার ফলে ভারত এখন পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অপারেশন পরিচালনা এবং চীনের গতিবিধির ওপর কার্যকর নজরদারি রাখতে সক্ষম। মূলত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নৌ-ক্ষমতা বিস্তারে চাঙ্গি নৌঘাঁটি একটি গুরুত্বপূর্ণ 'হীরা' হিসেবে কাজ করছে।
খ। সাবাং বন্দর (ইন্দোনেশিয়া)।
ইন্দোনেশিয়ার সাবাং বন্দরটি মালাক্কা প্রণালীর অত্যন্ত নিকটবর্তী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থানে অবস্থিত। এই বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতিকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক রুট দিয়ে চীনের সিংহভাগ জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, যার ওপর নজরদারি রাখা এখন ভারতের জন্য সহজতর হয়েছে। এই বন্দরে প্রবেশাধিকার লাভের ফলে ভারত মহাসাগরের প্রবেশপথে ভারতের সামরিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলে সাবাং বন্দরটি তাই চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ মোকাবিলায় একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘হীরা’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গ। দুয়াকম বন্দর (ওমান)।
আরব সাগরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই কৌশলগত বন্দরে ভারত পূর্ণাঙ্গ সামরিক ব্যবহারের সুবিধা লাভ করেছে। এটি ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর অত্যন্ত সন্নিকটে হওয়ায় ভারত এখান থেকে পশ্চিম ভারত মহাসাগরে নিবিড় নজরদারি চালাতে সক্ষম। ওমানের এই বন্দরে ভারতীয় নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রবেশের অধিকার চীনের জিবুতি ঘাঁটির এক শক্তিশালী পাল্টা জবাব হিসেবে কাজ করে। এই অবস্থানের ফলে এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরমুখী বাণিজ্যিক রুটে ভারতের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত, আরব সাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং চীনের প্রভাব বলয় ভাঙতে দুয়াকম বন্দর ভারতের জন্য এক অমূল্য ‘হীরা’।
ঘ। চাবাহার বন্দর (ইরান)।
পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে চীনের উপস্থিতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে ভারত ইরানের চাবাহার বন্দরকে তার ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৪ সালের মে মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ১০ বছর মেয়াদী চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। এটি কেবল চীনের প্রভাব রুখতেই নয়, বরং পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় ভারতের পণ্য পৌঁছানোর প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। লোহিত সাগরের অস্থিরতায় যখন প্রথাগত বাণিজ্যিক পথগুলো ঝুঁকির মুখে, তখন চাবাহার বন্দরকে ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোর’ (INSTC)-এর সাথে যুক্ত করে ভারত ইউরেশীয় অঞ্চলে একটি নিরাপদ বিকল্প রুট তৈরি করছে। আমেরিকার বিশেষ নিষেধাজ্ঞামুক্ত ছাড় এবং রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এই বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মূলত, আঞ্চলিক যুদ্ধাবস্থা চাবাহারের কার্যকারিতা কমানোর বদলে ভারতের জন্য একে আরও অপরিহার্য করে তুলেছে। এর মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজের বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে ভারত এক অত্যন্ত সফল ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে।
ঙ। অ্যাসাম্পশন আইল্যান্ড (সেশেলস)।
ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই কৌশলগত দ্বীপটিতে ভারত একটি উন্নত নৌঘাঁটি এবং অত্যাধুনিক নজরদারি কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সেশেলস সরকারের সাথে কাজ করছে। এই ঘাঁটিটি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পথের ওপর কড়া নজর রাখা সম্ভব। চীনের ক্রমবর্ধমান সমুদ্রযাত্রার বিপরীতে এটি ভারতের জন্য একটি শক্তিশালী লজিস্টিক হাব হিসেবে কাজ করবে, যা প্রতিকূল সময়ে দ্রুত সাড়াদানের ক্ষমতা যোগায়। স্থানীয় রাজনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে ভারত বর্তমানে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলসীমায় নিজের নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’-কে আরও নিখুঁত করে তুলছে। মূলত, গভীর সমুদ্রে ভারতের কৌশলগত নজরদারি এবং সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে অ্যাসাম্পশন আইল্যান্ড এক অপরিহার্য ‘হীরা’।
চ। রাশিয়ার সাথে কৌশলগত সহযোগিতা।
ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতা 'নেকলেস অফ ডায়মন্ডস' কৌশলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মস্কো সফরে চূড়ান্ত হওয়া ‘রেসিপ্রোকাল এক্সচেঞ্জ অফ লজিস্টিকস এগ্রিমেন্ট’ (RELOS)। এই চুক্তির ফলে দুই দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটি ও লজিস্টিক সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ায় ভারতে রাশিয়ার কৌশলগত উপস্থিতি যেমন বাড়ছে, তেমনি ভারতীয় নৌবাহিনীও রাশিয়ার আর্কটিক ও দূরপ্রাচ্যের বন্দরগুলোতে প্রবেশের অধিকার পেয়েছে। বিশেষ করে ভ্লাদিভোস্তক বন্দরে ভারতের উপস্থিতি চীনের উত্তরাঞ্চলীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রভাবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই অংশীদারিত্ব ভারতের ‘হীরক হার’ কৌশলকে কেবল ভারত মহাসাগরে সীমাবদ্ধ না রেখে ইউরেশীয় জলসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। এর মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা ও গভীর সমুদ্রে নজরদারির ক্ষেত্রে ভারত এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মূলত, রাশিয়ার সাথে এই সমীকরণ ভারতের এই কৌশলে সবচেয়ে শক্তিশালী ও নতুন ‘হীরা’ হিসেবে যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে দিয়েছে।
ছ। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।
ভারতের এই নিজস্ব দ্বীপপুঞ্জটি মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত, যা চীনের প্রধান বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সরবরাহ পথের ওপর একটি প্রাকৃতিক বাধার মতো কাজ করে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একে ভারতের ‘অবিনাশী বিমানবাহী রণতরী’ (Unsinkable Aircraft Carrier) বলা হয়, যেখান থেকে ভারত মহাসাগরের বিশাল অংশে কড়া নজরদারি চালানো সম্ভব। এখানে অবস্থিত ত্রি-পরিষেবা কমান্ড (Tri-service Command) ভারতের নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীকে একযোগে দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতা প্রদান করে। চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ মোকাবিলায় এটি ভারতের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং কৌশলগত সুরক্ষা কবচ। মূলত, এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ভারতের ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
৪
কূটনৈতিক জোট ও অংশীদারিত্ব।
কেবল সামরিক ঘাঁটি স্থাপন নয়, ভারত সুদূরপ্রসারী বহুপাক্ষিক সম্পর্কের মাধ্যমে চীনকে কৌশলগতভাবে ভারসাম্যহীন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কৌশলের আওতায় ভারত বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তির সাথে এমন সব অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে যা চীনের একাধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। মূলত সামরিক কৌশলের পাশাপাশি কূটনৈতিক এই ‘হীরক হার’ এশীয় অঞ্চলে ভারতের প্রভাবকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ক। ভিয়েতনাম।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারত ভিয়েতনামকে একটি প্রধান কৌশলগত মিত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। ভারত এই দেশটিকে শক্তিশালী ব্রহ্মোস মিসাইল এবং সাবমেরিন বিধ্বংসী টর্পেডোসহ বিভিন্ন আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চীনের দক্ষিণ সীমান্তে ভারতের একটি শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে, যা বেইজিংয়ের ওপর বড় ধরনের কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করে। মূলত, ভিয়েতনামের সাথে এই নিবিড় অংশীদারিত্ব ভারতের ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক অনন্য শক্তি প্রদান করেছে।
খ। জাপান ও মঙ্গোলিয়া।
চীনের উত্তর ও পূর্ব দিকে অবস্থিত এই দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের সাথে ভারতের সুগভীর সম্পর্ক বেইজিংকে কৌশলগতভাবে চাপে রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও নৌ-সহযোগিতা এবং চীনের উত্তর সীমান্তে মঙ্গোলিয়ার সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব চীনের জন্য একটি দ্বিমুখী প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই দেশগুলোর সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা চীনের একাধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। মূলত, এই কূটনৈতিক মৈত্রী ভারতের ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলকে চীনের মূল ভূখণ্ডের চারপাশেই বিস্তৃত করেছে।
গ। কোয়াড (QUAD)।
ভারত, আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে গঠিত এই শক্তিশালী জোটটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে ‘মুক্ত ও অবাধ’ রাখার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। মূলত চীনের একাধিপত্যবাদী আচরণ এবং সামুদ্রিক আধিপত্য রুখতেই এই চার দেশি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ার মাধ্যমে কোয়াড চীনের নৌ-শক্তির বিপরীতে একটি দুর্ভেদ্য দেওয়াল তৈরি করেছে। ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলের ক্ষেত্রে এই জোটটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের প্রভাব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৫
কৌশলগত অপরিহার্যতা: ভারতের অস্তিত্ব ও সুরক্ষা।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলটি এখন সময়ের দাবি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে চীনের তৈরি ‘মুক্তার মালা’ বেষ্টনী ছিন্ন করা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই কৌশল ভারতের জন্য একটি অপরিহার্য প্রতিরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে। মূলত এশীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে চীনের একাধিপত্য রুখতেই ভারত এই বহুমাত্রিক ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করেছে।
ক। জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা।
ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল আমদানি এবং সিংহভাগ সমুদ্র বাণিজ্য ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই সম্পন্ন হয়। এই প্রধান বাণিজ্যিক রুটে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য বা কোনো প্রকার অবরোধ ভারতের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই নিজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে সুরক্ষিত রাখতে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অপরিহার্য।
খ। চীনের বেষ্টনী নীতি ভাঙা।
পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে চীনের বিশাল পরিকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে সুদূরপ্রসারী সামরিক লক্ষ্য ও ভারতকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা লুকিয়ে রয়েছে। চীনের এই ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ বা বেষ্টনী নীতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলের মাধ্যমে ভারত বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোতে নিজস্ব ঘাঁটি ও লজিস্টিক সুবিধা তৈরি করে চীনের সেই বেষ্টনীকে কার্যকরভাবে ছিন্ন করার পথ তৈরি করেছে।
গ। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য।
এশীয় অঞ্চলে চীনের একমুখী আধিপত্য ও প্রভাব কমিয়ে একটি বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখাই ভারতের মূল লক্ষ্য। ভারত মহাসাগরে নিজের উপস্থিতি জোরালো করার মাধ্যমে ভারত কেবল নিজেকেই সুরক্ষিত করছে না, বরং ক্ষুদ্রতর রাষ্ট্রগুলোর ওপর চীনের অন্যায্য চাপ কমাতেও সাহায্য করছে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
৬
‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কৌশলটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং চীনের একাধিপত্য মোকাবিলায় একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দূরদর্শী প্রতিরক্ষা ঢাল। ওমানের দুয়াকম থেকে ইন্দোনেশিয়ার সাবাং এবং রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্তক পর্যন্ত বিস্তৃত এই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভারতকে গভীর সমুদ্রে এক অপ্রতিরোধ্য কৌশলগত অবস্থান প্রদান করেছে। কেবল সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং কোয়াড বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এই কৌশলকে বহুমাত্রিক পূর্ণতা দান করেছে। রাশিয়ার সাথে সাম্প্রতিক ‘রেলোস’ (RELOS) চুক্তি এবং চাবাহার বন্দরের দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ ভারতের এই ‘হীরক হার’-এ নতুন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী মাত্রা যোগ করেছে। এই কৌশলের সার্থকতা কেবল চীনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ বেষ্টনী ছিন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি এশীয় অঞ্চলে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করে। উন্মুক্ত সমুদ্রপথ এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই নেটওয়ার্কটি এখন ভারতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডের প্রধান রক্ষাকবচ। মূলত, সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার এই অনন্য সমন্বয় প্রমাণ করে যে, ভারত মহাসাগরে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে ভারত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরিশেষে বলা যায়, ‘নেকলেস অফ ডায়মন্ডস’ কেবল একটি প্রতিরক্ষা নীতি নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বমঞ্চে ভারতের উদীয়মান শক্তি ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৬ মে ২০২৬