
১
উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত নিরাপত্তা সমীকরণে ১৭ মে ২০২৬ তারিখে আরব বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পারমাণবিক স্থাপনা—সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০ বিলিয়ন ডলারের ‘বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’-এ আকস্মিক ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। আবুধাবির আল ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত এই প্ল্যান্টের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি ড্রোনের দুটিকে সফলভাবে প্রতিহত করতে পারলেও, তৃতীয় আত্মঘাতী ড্রোনটি অভ্যন্তরীণ সীমানার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে আঘাত হানলে সেখানে তীব্র অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। তবে দেশটির মিডিয়া ও ফেডারেল পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে—এতে কোনো হতাহত বা মূল রিয়্যাক্টরের তেজস্ক্রিয় নিরাপত্তা স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং প্ল্যান্টের সবকটি ইউনিট বর্তমানে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে সচল রয়েছে। এই ঘটনা সাময়িক বিপর্যয় এড়াতে পারলেও, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতি এবং আধুনিক ড্রোন যুদ্ধকৌশলের ক্ষেত্রে এমন কিছু গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণ তৈরি করেছে, যা পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে এক নতুন ও জটিল মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে চলমান ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাতের এই উত্তপ্ত আবহে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনায় এমন আঘাত আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে যেমন বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, তেমনি তা আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধের চূড়ান্ত সীমা বা 'রেডলাইন' অতিক্রমের এক বিপজ্জনক বার্তা বহন করছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী পারস্য উপসাগরের বুকে এই নজিরবিহীন আঘাত আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে নতুন মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি করাসহ সামগ্রিক সামুদ্রিক পরিবহন ও বীমা খরচ বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গভীর উদ্বেগ প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই হামলা বিশ্বকে একবিংশ শতাব্দীর এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে, যা ভবিষ্যৎ পারমাণবিক নিরাপত্তা প্রোটোকল ও ডিফেন্স ডকট্রিন সম্পূর্ণ পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য করবে। একই সাথে, ইউএই-এর বহুলাকাঙ্ক্ষিত নিরাপদ ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি ও তেল-পরবর্তী যুগের গ্রিন এনার্জি লক্ষ্যমাত্রায় এই আঘাত দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নাড়িয়ে দিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ এবং টেকসই শিল্পায়নের গতিকেও মন্থর করে দিতে পারে।
২
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ‘প্রক্সি ওয়ার’-এর নতুন সমীকরণ।
১৭ মে ২০২৬ (রোববার) তারিখে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি আকস্মিক ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে তিনটি ড্রোন অনুপ্রবেশ করেছিল, যার মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুটি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। তবে তৃতীয় আত্মঘাতী ড্রোনটি আল ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত এই প্ল্যান্টের অভ্যন্তরীণ সীমানার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরে সরাসরি আঘাত হানে এবং সেখানে তীব্র অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে। এই হামলার সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক নিরাপত্তার জায়গায়, কারণ বারাকাহ প্ল্যান্টটি আমিরাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। এমন একটি সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত কৌশলগত অবকাঠামোতে শত্রুপক্ষের ড্রোন অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া আমিরাতের বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এরফলে মার্কিন প্যাট্রিয়ট বা থাড (THAAD) সিস্টেমের মতো অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়নের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে এই আকস্মিক হামলা।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাতের পর থেকে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে, এই হামলাকে তারই একটি বিপজ্জনক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত আমিরাত কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করেনি এবং কোনো পক্ষই এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবুও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আঙুল উঠছে আঞ্চলিক 'প্রক্সি' শক্তিগুলোর দিকেই। তদন্তে যদি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী বা ইরাক-সিরিয়া ভিত্তিক কোনো ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আমিরাত এর আগে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার মুখে পড়লেও পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাতের ঘটনা এটিই প্রথম, যা তাদের রেডলাইন বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে এই ঘটনার প্রতিশোধমূলক পাল্টা জবাব হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি সরাসরি ও বিধ্বংসী বহুপাক্ষিক সামরিক সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
৩
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
পারস্য উপসাগরকে বলা হয় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী, যার সামান্যতম স্থবিরতাও পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। বারাকাহ পারমাণবিক প্ল্যান্টের জেনারেটরে লাগা আগুন দ্রুত নেভানো সম্ভব হলেও, আন্তর্জাতিক বাজারে এর মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে মোটেও সময় লাগবে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো একটি সর্বোচ্চ সুরক্ষিত ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় এই ড্রোন হামলা বৈশ্বিক বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এই একটিমাত্র ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে যাচ্ছে, তা নিচের দুটি প্রধান ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ক। তেলের বাজারে অস্থিরতা।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো সংবেদনশীল জ্বালানি বা কৌশলগত অবকাঠামোতে আঘাত আসার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম এক লাফে বেড়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, আর বারাকাহ প্ল্যান্টের এই ড্রোন ঘটনাও তার ব্যতিক্রম হবে না। যদিও এই হামলায় কোনো তেল শোধনাগার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তবুও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার খবর ছড়ামাত্রই বৈশ্বিক তেল বাজারে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ওপেক (OPEC) প্লাস জোটের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুকে এমন হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের চেইন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী ও ফাটকা কারবারিরা (Speculators) ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকটের কথা মাথায় রেখে এখনই তেল মজুত বা অগ্রিম ক্রয়ের দিকে ঝুঁকছেন, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্যকে দ্রুত উর্ধ্বমুখী করে তুলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল সংকটের কারণে তেলের বাজার এমনিতেই নড়বড়ে ছিল, তার ওপর এই নতুন ধাক্কা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতকে এক দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
খ। বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি।
পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো সর্বোচ্চ স্পর্শকাতর স্থাপনায় এই ড্রোন হামলার পর পারস্য উপসাগর ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল ট্যাংকারগুলোর ‘মেরিন ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বীমা খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক বীমা সংস্থাগুলো এই নৌপথকে এখন 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল' হিসেবে বিবেচনা করায় জাহাজ মালিকদের অতিরিক্ত প্রিমিয়াম গুনতে হবে, যা সামগ্রিক নৌ-পরিবহন ব্যয়কে রাতারাতি বাড়িয়ে দেবে। এই বাড়তি পরিবহন খরচের কারণে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। এরফলে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) পারদ চড়তে শুরু করবে।
৪
নতুন যুদ্ধকৌশল এবং পারমাণবিক নিরাপত্তার বৈশ্বিক ঝুঁকি।
বারাকাহ-র এই ড্রোন হামলার ঘটনাটি চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো তাৎক্ষণিক কোনো বড় পারমাণবিক বিপর্যয় ডেকে আনেনি সত্য, কিন্তু এটি বিশ্বকে একবিংশ শতাব্দীর এক নির্মম ও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে, যা হলো ‘ড্রোন ওয়ারফেয়ার’ (Drone Warfare)। প্রথাগত যুদ্ধবিমানের চেয়ে অত্যন্ত সস্তা, সহজে বহনযোগ্য এবং রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এই আত্মঘাতী ড্রোনগুলো এখন পারমাণবিক প্ল্যান্টের মতো সর্বোচ্চ সুরক্ষিত স্থাপনার জন্যও সবচেয়ে বড় কৌশলগত হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অতীতে পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা প্রধানত বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিমান হামলা বা ভূগর্ভস্থ নাশকতার কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হতো, কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে আসা ছোট ড্রোনের নিখুঁত আঘাত প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা যে বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নেই, তা এই ঘটনাটি প্রমাণ করে দিল। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একটি সস্তা ড্রোনের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের স্পর্শকাতর পারমাণবিক অবকাঠামোকে সহজেই অচল করে দেওয়া সম্ভব।
এই নজিরবিহীন হামলার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, কারণ এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শত শত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা দুর্বলতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। এই একটিমাত্র ঘটনা বিশ্বের সমস্ত পারমাণবিক শক্তিধর দেশের নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং ডিফেন্স ডকট্রিন বা প্রতিরক্ষা নীতি সম্পূর্ণ পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য করবে। এখন থেকে যুদ্ধকৌশলে কেবল মূল রিয়্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্ল্যান্টের বাইরে থাকা বিদ্যুৎ গ্রিড, কুলিং সিস্টেম এবং জেনারেটর ব্যবস্থার সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে। এর কারণ, মূল রিয়্যাক্টরে সরাসরি আঘাত না করেও যদি ড্রোনের সাহায্যে বাইরের জেনারেটর বা কুলিং সিস্টেম ধ্বংস করে দেওয়া যায়, তবে তা পরোক্ষভাবে পুরো প্ল্যান্টকে অকেজো করে এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
৫
আমিরাতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও ‘গ্রিন ইমেজ’-এ ধাক্কা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে নিরাপদ, স্থিতিশীল ও আকর্ষণীয় ব্যবসা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে বারাকাহ পারমাণবিক প্ল্যান্টের মতো সর্বোচ্চ সুরক্ষিত একটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় এই ড্রোন হামলা দেশটির সেই বহুলাকাঙ্ক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত নিরাপদ ভাবমূর্তিকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। যদি এই ধরনের সংবেদনশীল জাতীয় অবকাঠামো ও কৌশলগত অঞ্চলগুলো বারবার বহিরাগত ড্রোন কিংবা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত ঝুঁকিতে পড়ে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে বহির্বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের আস্থা (Investor Confidence) মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। যেকোনো বিদেশি পুঁজি বা বহুজাতিক কোম্পানি বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, যা এই হামলার পর কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক থেকে বারাকাহ প্ল্যান্টটি ছিল আমিরাতের কার্বন নিঃসরণ কমানোর এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় 'গ্রিন এনার্জি' বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান স্তম্ভ। দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ একা সরবরাহকারী এই কেন্দ্রটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া মানে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ নিরাপত্তার ওপর এক বিরাট হুমকি তৈরি হওয়া। এই ধরনের ধারাবাহিক হুমকি কেবল পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে আমিরাতের অগ্রযাত্রাকেই ব্যাহত করবে না, বরং তেল-পরবর্তী যুগের জন্য তাদের পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ (Economic Diversification) এবং আধুনিক শিল্পায়নের গতিকেও অনেকটাই মন্থর করে দিতে পারে। একটি দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের মূল চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, যা এখন যুদ্ধকালীন ড্রোন প্রযুক্তির নতুন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
৬
বারাকাহ পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভঙ্গুর ও বিস্ফোরক নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি বড় ধরনের 'অ্যালার্ম বেল' বা চূড়ান্ত সতর্কতা সংকেত। এই হামলা প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এখন কোনো পক্ষই ছায়াযুদ্ধের প্রথাগত সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না, বরং সর্বোচ্চ সুরক্ষিত স্ট্র্যাটেজিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতেও দ্বিধা করছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য প্রথম এবং প্রধান দিকনির্দেশনা হলো—ওয়াশিংটন থেকে তেহরান, কিংবা আবুধাবি থেকে রিয়াদ—সব পক্ষকে প্রক্সি পলিসি থেকে সরে এসে একটি যৌথ ও টেকসই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো (Regional Security Framework) তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দী দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত আস্থার অভাব দূর না হলে এই ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে, যা যেকোনো মুহূর্তে একটি অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ ডেকে আনবে। বিশেষ করে, জলসীমা এবং জ্বালানি করিডোরগুলোর সুরক্ষায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর হটলাইন ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সংলাপের পথ উন্মুক্ত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করলে, এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে এক বড় ধরনের রূপান্তর বা প্যারাডাইম শিফ্ট লক্ষ্য করা যেতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্ভবত এখন আর কেবল পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর এককভাবে নির্ভর না করে, তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং 'অ্যান্টি-ড্রোন ইলেকট্রনিক শিল্ড' প্রযুক্তির আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকবে। একই সাথে, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে সুরক্ষিত রাখতে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর অঞ্চলে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সমন্বয়ে নতুন কোনো মেরিটাইম টাস্কফোর্স গঠনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই ধাক্কা মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলোকে তাদের ভবিষ্যৎ মেগা-প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা প্রোটোকল আরও কঠোরভাবে ঢেলে সাজাতে এবং জাতীয় জ্বালানি গ্রিডের বিকেন্দ্রীকরণ করতে বাধ্য করবে। এই সংকটের মধ্য দিয়ে যেমন একটি ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, ঠিক তেমনি এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিজেদের মধ্যকার বৈরিতা ভুলে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য তৈরির এক অভূতপূর্ব সুযোগও এনে দিয়েছে। এই সুযোগকে আমিরাত ও তার প্রতিবেশীরা কীভাবে কাজে লাগায়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৮ মে ২০২৬