
১
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে পর্দার আড়ালের সামরিক চালগুলো অনেক সময়ই প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণার চেয়েও বেশি রণকৌশলগত বার্তা বহন করে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অগ্রবর্তী ঘাঁটি ও ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্টের সম্মুখভাগ থেকে প্রায় দুই ডজন সি-১৭ গ্লোবমাস্টার-এর মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ‘হেভি-লিফট’ কৌশলগত পরিবহন বিমান জার্মানি ও পোল্যান্ডের নিরাপদ ন্যাটো জোনে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের তীব্র নজর কেড়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এই বিমান স্থানান্তরকে মার্কিন পিছুটান বা একটি সাধারণ লজিস্টিক মহড়া মনে হলেও, এর গভীরতা কেবল আকাশপথের পুনর্বিন্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক পরিভাষায় এই চতুর ও সুদূরপ্রসারী চালের নেপথ্যে মূলত দুটি সমীকরণ সমান তালে কাজ করছে—প্রথমত, কোটি কোটি ডলারের মূল্যবান সামরিক সম্পদকে শত্রুর নিখুঁত ড্রোন বা মিসাইল হামলা থেকে বাঁচানোর ‘ফোর্স প্রটেকশন’ কৌশল; এবং দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করে নতুন কোনো কোড নামে সুনির্দিষ্ট বিমান হামলার পটভূমি তৈরি করার ‘ব্যাটলস্পেস প্রিপারেশন’। আর তাই বিমানের এই কৌশলগত প্রস্থান মূলত একপ্রকার ‘স্প্রিং-এর মতো সংকুচিত হওয়া’—যা যেকোনো মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের স্তূপে আরও বড় ও বিধ্বংসী শক্তিতে আঘাত হানার এক স্পষ্ট পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
২
ফোর্স প্রটেকশন: বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রক্ষার হিসাব।
ফোর্স প্রটেকশন কৌশল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। এই কৌশলের মাধ্যমে তারা তাদের বিপুল সামরিক সম্পদ রক্ষা করে। সি-১৭ গ্লোবমাস্টারের মতো ব্যয়বহুল বিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যে হুমকির মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ইরান বা এর মিত্রদের ড্রোন বা মিসাইল হামলা থেকে বাঁচতে এই বিমানগুলোকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এটি একটি বিচক্ষণ কৌশল, যা শুধু আর্থিক ক্ষতিই কমায় না, বরং মার্কিন বিমানবাহিনীর লজিস্টিক চেইনকে আরও শক্তিশালী করে।
ক। ঝুঁকি হ্রাস (Risk Mitigation)।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান এবং এর সমর্থিত প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোর (হুথি, হিজবুল্লাহ, ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠী) সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং আত্মঘাতী ড্রোন প্রযুক্তি এখন অত্যন্ত নিখুঁত এবং কার্যকর। এই উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করে তারা যেকোনো সময় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে পারে। সি-১৭ গ্লোবমাস্টারের মতো বিশাল আকৃতির পরিবহন বিমানগুলো কোনো বিমানঘাঁটিতে পার্ক করে রাখা হলে তা শত্রুর ড্রোন বা মিসাইলের জন্য একটি অত্যন্ত সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায়। একে সামরিক পরিভাষায় "সিটিং ডাক" বলা হয়। একটি ড্রোন বা মিসাইল হামলা হলে বিমানগুলো ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই বিমানগুলোর একেকটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। তাই একটি বিমান ধ্বংস হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা বিশাল আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে। পাশাপাশি এই বিমানগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর লজিস্টিক চেইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এদের ক্ষতি হলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা কমে যাবে।
এসব ঝুঁকি বিবেচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সি-১৭ গ্লোবমাস্টার বিমানগুলোকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা তাদের বিপুল সামরিক সম্পদ রক্ষা করছে এবং মার্কিন বিমানবাহিনীর লজিস্টিক চেইনকে আরও শক্তিশালী করছে। এটি একটি বিচক্ষণ কৌশল, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে।
খ। আর্থিক ও কৌশলগত ক্ষতি এড়ানোর মনস্তত্ত্ব।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর কাছে একেকটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার কেবল একটি পরিবহন যান নয়, বরং বৈশ্বিক লজিস্টিক চেইনের মূল চালিকাশক্তি। শত্রুভাবাপন্ন অঞ্চলে একটিমাত্র বিমান ধ্বংস হওয়া মানে শুধু শত মিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ আর্থিক লোকসানই নয়, বরং এরফলে ওয়াশিংটনের বিশ্বব্যাপী দ্রুত সেনা ও রসদ সরবরাহের চেইনটি বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ঘটনার আগেও ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্ট থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি ভারী বিমানগুলোর আকস্মিক উধাও হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে কাজ করেছিল এই একই মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত হিসাব। মধ্যপ্রাচ্যের চরম ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রন্টলাইন থেকে বিমানগুলোকে সরিয়ে জার্মানির রামস্টেইন বা পোল্যান্ডের নিরাপদ ন্যাটো ঘাঁটিতে নোঙর করা তাই কেবল কোনো পলায়নপর নীতি নয়, বরং দূরদর্শী 'ফোর্স প্রটেকশন' কৌশলের এক অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী বাস্তবায়ন।
৩
ব্যাটলস্পেস প্রিপারেশন: নতুন কোনো কোড নামে আক্রমণের ছক?
মধ্যপ্রাচ্যের অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলো থেকে ভারী বিমান সরিয়ে নেওয়া মার্কিন পিছুটান নয়, বরং এক সুদূরপ্রসারী ‘ব্যাটলস্পেস প্রিপারেশন’ বা যুদ্ধক্ষেত্রের সুনিপুণ প্রস্তুতি। সমান্তরালভাবে এই অঞ্চলে প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন ফ্রন্টলাইনকে সুরক্ষিত করছে। লজিস্টিকসের এই চতুর পুনর্বিন্যাস একদিকে যেমন শত্রুপক্ষকে চরম সতর্কবার্তা (Deterrence) দিচ্ছে, অন্যদিকে যেকোনো মুহূর্তে নতুন কোড নামে বড় ধরনের সুনির্দিষ্ট বিমান হামলার (Surgical Airstrikes) জন্য রণমঞ্চ প্রস্তুত করছে। বিমানগুলোর এই সাময়িক প্রস্থান মূলত 'স্প্রিং-এর মতো সংকুচিত হওয়া', যা যেকোনো মুহূর্তে আরও তীব্র শক্তিতে প্রতিপক্ষের ওপর আছড়ে পড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ক। লজিস্টিকসের পুনর্বিন্যাস ও বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্টের কৌশল।
ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের সম্মুখ ঘাঁটিগুলোর ওপর সম্ভাব্য ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লজিস্টিকসের এই চতুর পুনর্বিন্যাস ঘটিয়েছে। এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই অত্যন্ত মূল্যবান সি-১৭ গ্লোবমাস্টার বিমানগুলোকে ফ্রন্টলাইন থেকে সরিয়ে জার্মানি বা পোল্যান্ডের মতো নিরাপদ ন্যাটো ঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে দূরবর্তী ঘাঁটিতে সরালেও এই বিমানগুলোর কার্যকারিতা বিন্দুমাত্র কমেনি, কারণ এগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে সক্ষম। নিরাপদ দূরত্বে থেকেই এই বিমানগুলো যেকোনো জরুরি মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে বিপুল পরিমাণ রসদ, ভারী যুদ্ধাস্ত্র এবং অতিরিক্ত সৈন্য সরবরাহ সচল রাখতে পারে। বিমানগুলোকে শত্রুর সরাসরি আক্রমণের সীমানার বাইরে রেখেও মার্কিন সামরিক বাহিনী তার বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ও যুদ্ধ প্রস্তুতি নিখুঁতভাবে বজায় রাখছে।
খ। আক্রমণাত্মক কৌশল ও ডেটারেন্স।
মার্কিন সামরিক শক্তির এই সুনিপুণ পুনর্বিন্যাস মূলত মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিপক্ষ বিশেষ করে ইরানের উদ্দেশ্যে একটি দ্বিমুখী ও জোরালো বার্তা প্রেরণ করে। প্রথমত, এটি শত্রুপক্ষকে একটি চরম মনস্তাত্ত্বিক সতর্কবার্তা বা 'ডেটারেন্স' দেয় যে, ওয়াশিংটন যেকোনো আকস্মিক পরিস্থিতি বা পাল্টা আঘাত মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। দ্বিতীয়ত, এটি ফ্রন্টলাইন থেকে সম্পদ সরিয়ে ডিফেন্সিভ পজিশন নেওয়ার আড়ালে নতুন কোনো কোড নামে সুনির্দিষ্ট, তীব্র বিমান হামলা (Surgical Airstrikes) বা বড় আকারের সামরিক অভিযানের জন্য নিখুঁতভাবে মঞ্চ প্রস্তুত করার স্পষ্ট ইঙ্গিত। আপাতদৃষ্টিতে বিমানগুলোর এই কৌশলগত প্রস্থানকে পিছুহটা মনে হলেও সামরিক পরিভাষায় এটি আসলে একপ্রকার 'স্প্রিং-এর মতো সংকুচিত হওয়া'। নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিয়ে শক্তি সঞ্চয়ের এই চতুর চালটি প্রমাণ করে যে, আমেরিকা যেকোনো মুহূর্তে আরও বড় এবং বিধ্বংসী শক্তিতে শত্রুর ওপর আছড়ে পড়ার জন্য চূড়ান্ত পূর্বলক্ষণ প্রকাশ করছে।
৪
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ও স্থিতিশীলতার রোডম্যাপ: কোন পথে সমাধান?
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে যুদ্ধ বা একতরফা সামরিক আক্রমণ কখনো কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না; অতীতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল সুনির্দিষ্ট হামলাও এই অঞ্চলের অস্থিরতা কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত স্থিতিশীলতা কেবল তখনই সম্ভব, যখন বৈরী পক্ষগুলো বুলেটের ভাষা ছেড়ে আলোচনার টেবিলে বসবে। বর্তমানে এই সংকট নিরসনে এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা করতে পাকিস্তান যে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তা আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে। টেকসই শান্তির জন্য সামরিক আধিপত্যের নীতি পরিহার করে একটি দীর্ঘমেয়াদী, বহুমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক রোডম্যাপ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
ক। ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য সমাধান।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মূল উৎস হলো ফিলিস্তিন ইস্যু, যা সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত করছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের প্রাক-যুদ্ধ সীমানাভিত্তিতে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা এই সংকটের একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান। যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণের এই ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অঞ্চলের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, গণ-অসন্তোষ এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো চিরতরে বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর উচিত পক্ষপাতমূলক নীতি পরিহার করে একটি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের (Two-State Solution) রূপরেখা বাস্তবায়নে অবিলম্বে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা।
খ। আঞ্চলিক পরাশক্তিদের সরাসরি সংলাপ।
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতগুলোর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক পরাশক্তির মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্রক্সি যুদ্ধ (Proxy War), যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এই কৃত্রিম যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে রিয়াদ-তেহরান কূটনৈতিক সম্পর্ককে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও গভীর ও কৌশলগত স্তরে নিয়ে যেতে হবে। একইসাথে বর্তমান ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক সমীকরণ—ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি নিরপেক্ষ ও জোরালো মধ্যস্থতা অত্যন্ত প্রয়োজন। কেবল মাত্র এই প্রধান আঞ্চলিক পক্ষগুলো যখন নিজেদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কমিয়ে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসবে, তখনই ইয়েমেন, সিরিয়া কিংবা লেবাননের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত ফ্রন্টলাইনগুলোতে স্থায়ীভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
গ। বহিরাগত হস্তক্ষেপ হ্রাস ও আঞ্চলিক জোট।
মধ্যপ্রাচ্যকে দীর্ঘকাল ধরে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন) ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের চারণভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের নিজস্ব স্থিতিশীলতাকে চিরতরে বিনষ্ট করেছে। এই পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পেতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উচিত বহিরাগত হস্তক্ষেপের পথ বন্ধ করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটের সমাধান নিজেরাই করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সফল মডেল অনুসরণ করে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যদি একটি শক্তিশালী এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্লক বা সাধারণ বাজার গড়ে তোলা যায়, তবে তা আঞ্চলিক সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। যখন দেশগুলোর নিজস্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন একে অপরের স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাবে, তখন যেকোনো বিরোধে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই সবার জন্য অনেক বেশি লাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হবে।
৫
পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকার সাম্প্রতিক এই চতুর সামরিক চালটি একাধারে 'ফোর্স প্রটেকশন' এবং 'ব্যাটলস্পেস প্রিপারেশন'—উভয় সমীকরণকেই নিখুঁতভাবে সিদ্ধ করে। কৌশলগত এই পুনর্বিন্যাস একদিকে যেমন বিলিয়ন ডলারের মূল্যবান আকাশযানগুলোকে সম্ভাব্য ড্রোন বা মিসাইল হামলার নাগাল থেকে নিরাপদ রাখছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলোতে আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক রসদ জোরদার করে যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। তবে ভূ-রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বারুদের স্তূপে বসে সামরিক আধিপত্য বিস্তার বা একতরফা সুনির্দিষ্ট আক্রমণ সাময়িক রণকৌশলগত সুবিধা দিলেও তা কখনো দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে না। অতীতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল হামলা যেমন কোনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি, তেমনি ফ্রন্টলাইনের এই শক্তিমত্তা প্রদর্শনও কেবল সংকটের আবর্তকে দীর্ঘায়িতই করবে। মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই ও প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হলো ফিলিস্তিন সংকটের ন্যায্য সমাধান, বহিরাগত হস্তক্ষেপের অবসান এবং সমঅধিকারের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরাশক্তিদের সরাসরি সংলাপের মুখোমুখি হওয়া। পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান কূটনৈতিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাগুলো যদি সফল হয়, তবেই বুলেটের ভাষা ছাপিয়ে আলোচনার টেবিলে মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ মে ২০২৬