
১
কবি জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কবিতায় লিখেছেন, ‘বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে’, বিম্বিসারের সময়টা কি আসলেই ধূসর বা অনুজ্জ্বল ছিল? ইতিহাসের সুদূর ও প্রাচীন সময়কালকে কাব্যিক রূপকে তুলে ধরতেই সম্ভবত এভাবে বলা হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় রাজা বিম্বিসারের সেই যুগটি বৈচিত্র্যহীন বা ‘ধূসর’ ছিল না। বরং খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে পঞ্চম শতকের (খ্রিস্টপূর্ব ৫৪০-৪৬৮ অব্দ) এই সময়কালটি ছিল প্রাচীন ভারতের জ্ঞান, দর্শন এবং সামাজিক উত্থানের এক অত্যন্ত আলোকিত এবং যুগান্তকারী অধ্যায়। এই সময়ে মগধের হর্যঙ্ক বংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা বিম্বিসার (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪৩-৪৯২ অব্দ) প্রায় ৫২ বছর মগধ শাসন করেছিলেন, যা ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যুগ। তার রাজধানী রাজগৃহ (বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের স্থানটি 'রাজগির' নামে পরিচিত) বিপুলাচল, রত্নগিরি, উদয়গিরি, স্বর্ণগিরি ও বৈভারগিরি নামে পাঁচটি পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। বিম্বিসারের রাজত্বকাল ছিল বহুত্ববাদ, দার্শনিক বিতর্ক এবং এক মহা-ধর্মসংস্কার আন্দোলনে দেদীপ্যমান এক চরম আলোকিত জগৎ। তার সময়েই প্রাচীন ভারতের চিন্তাজগতে এক অভূতপূর্ব বৌদ্ধিক ও ধর্মীয় বিপ্লব ঘটেছিল। প্রচলিত বৈদিক যাগযজ্ঞ এবং কঠোর সামাজিক শ্রেণিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই যুগেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ (খ্রিস্টপূর্ব ৫৬৩-৪৮৩ অব্দ) এবং জৈনধর্মের চব্বিশতম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর। বুদ্ধ ও মহাবীরের পরম পৃষ্ঠপোষক রাজা বিম্বিসার নিজে এই মুক্তচিন্তা ও ধর্মীয় সহনশীলতার পরিবেশকে ত্বরান্বিত করেছিলেন, যা প্রাচীন ভারতের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই বৈপ্লবিক যুগেই বৈদিক ধারার বাইরে সমান্তরালভাবে বহু নতুন নাস্তিক ও শ্রমণ সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। এসব নতুন ধর্ম ও দর্শন কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তিই দেয়নি, বরং সমাজের নিম্নশ্রেণি, কারুশিল্পী এবং বণিকদের এক বিশাল অংশকে সামাজিক মর্যাদার নতুন আলো দেখিয়েছিল। মহাবীর ও বুদ্ধের সমসাময়িক এই সময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী, জনপ্রিয় অথচ কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ধর্মের নাম ‘আজীবক সম্প্রদায়’।
২
প্রবর্তক মক্ষলি গোশাল: চিত্রকর থেকে সন্ন্যাসী।
আজীবক সম্প্রদায়ের প্রধান প্রবর্তক ও আচার্য ছিলেন মখলিপুত্ত গোসাল বা মক্ষলি গোশাল (মৃত্যু: আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৪ অব্দ) । মক্ষলি গোশালের অতীত জীবন ছিল বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। পাণিনি ও পতঞ্জলির গ্রন্থ এবং বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যে ‘মংখ’ নামক একশ্রেণীর যাযাবর চিত্রকরদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যারা গান গাইতে গাইতে ছবি দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করত এবং জীবিকা নির্বাহ করত। মক্ষলি গোশাল ছিলেন এমনই এক চিত্রকরের সন্তান এবং সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণের আগে তিনি নিজে বাবার মতো ছবি দেখিয়ে বেড়াতেন। অল্প বয়সেই তিনি সংসার ত্যাগ করে ভিক্ষু হন। সাধক জীবনের শুরুতে জৈন তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীরের সাথে তাঁর পরিচয় হয় এবং দীর্ঘ ছয় বছর তাঁরা একসাথে কাটান। কিন্তু পরবর্তীকালে স্বভাব, চরিত্র ও আদর্শগত চরম পার্থক্যের কারণে মহাবীরের সাথে তাঁর বিবাদ হয় এবং তিনি পৃথক পথ বেছে নেন, যা পরে ‘আজীবক সম্প্রদায়’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তিনি প্রাচীন ভারতের ‘শ্রাবস্তী’ নগরীকে তাঁর মতাদর্শের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। আজীবক সন্ন্যাসীরা নগ্ন থাকতেন, কঠোর নিয়ম-সংযম মেনে চলতেন। গোশাল অদৃষ্টবাদী দর্শন প্রচার করেন, উত্তর ও বিশেষভাবে দক্ষিণ-ভারতে দীর্ঘদিন তার প্রভাব টিকে ছিল। তার প্রভাব প্রাচীন বাংলাতেও ছিল।
প্রাচীন বাংলায় বৈদিক যাগযজ্ঞ ও কঠোর শ্রেণিভেদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা শ্রমণ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল আজীবক সম্প্রদায়। মৌর্য সম্রাট বিন্দুসারের রাজত্বকালে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে মখলিপুত্ত গোসালের এই চরম অদৃষ্টবাদী দর্শন প্রাচীন বাংলাতেও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সে যুগে উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার তাম্রলিপ্ত বন্দর এবং পূর্ব বাংলার সমতট বা কুমিল্লা অঞ্চলই ছিল তাদের প্রধান আবাস্থল। পুণ্ড্রনগরে আজীবকদের সুসংগঠিত বসতি গড়ে উঠেছিল এবং চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণ বৃত্তান্তে তাম্রলিপ্ত এলাকায় প্রচুর আজীবক সন্ন্যাসীর বসবাসের উল্লেখ মেলে। তবে তাদের বসবাসের সবচেয়ে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন সমতট বা কুমিল্লা অঞ্চলে আবিষ্কৃত খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের একটি ঐতিহাসিক তাম্রশাসনে। এই লিপি থেকে জানা যায় যে, সমতটে আজীবিকদের নিজস্ব সংঘ, আশ্রম এবং তাঁদের প্রধান উপাস্য যক্ষ 'মণিভদ্র'-এর একটি বিশাল মন্দির ছিল। ফলে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ, কারুশিল্পী ও বণিকদের আকর্ষিত করে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের পাশাপাশি আজীবকেরাও নিজস্ব বলয় তৈরি করেছিল। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধদের পাশাপাশি আজীবক সন্ন্যাসীরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতায় অত্যন্ত মর্যাদার সাথে এই বাংলায় একত্রে বসবাস করতেন।
৩
আজীবক দর্শনের মূল ভিত্তি: চরম নিয়তিবাদ বা অদৃষ্টবাদ।
মক্ষলি গোশালের প্রবর্তিত আজীবক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো চরম নিয়তিবাদ বা অদৃষ্টবাদ, যা মানুষের চিরন্তন কর্মবাদ ও স্বাধীন ইচ্ছাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে এক অভিনব চিন্তার জন্ম দিয়েছিল। এই দর্শনের প্রধান স্তম্ভ হলো মানুষের ‘পুরুষার্থের অস্বীকৃতি’, যার অর্থ মানুষের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা, ইচ্ছা, বীর্য বা কর্মের কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই এবং এগুলো মানবভাগ্যের গতিপথকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারে না। আজীবকদের মতে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা এবং প্রতিটি জীবের জীবনধারা এক অমোঘ, অপরিবর্তনীয় ও পূর্বনির্ধারিত নিয়মের অধীনে পরিচালিত হয়, যেখানে মানুষের কোনো হাত নেই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘কার্যকারণহীনতা’ বা অহেতুকবাদ, যা দাবি করে যে জাগতিক কোনো রূপান্তর বা বিকারের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট লৌকিক কারণ বা হেতু কাজ করে না। মানুষের ইহলৌকিক ভালো কাজ কিংবা মন্দ কাজ—কোনোটির মাধ্যমেই তার জন্মান্তর, আত্মিক মলিনতা বা আধ্যাত্মিক শুদ্ধি প্রভাবিত হয় না; সবকিছুই প্রাক-নির্দিষ্ট নিয়তির অমোঘ নিয়মে আপন গতিতে ঘটে চলে। নৈতিকতা বা অনৈতিকতা কোনোটিই মানুষের ভাগ্যলিপির ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না, তাই মানুষের পুরুষার্থ অপেক্ষা নিয়তিই এখানে পরম শক্তিশালী।
পালি ত্রিপিটকের অন্তর্গত ‘দীঘনিকায়’-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে মক্ষলি গোশালের এই দর্শনের গভীরতা ও ‘সুখ-দুঃখের নির্দিষ্ট পরিমাপ’ নিয়ে এক চমৎকার ও প্রতীকী আলোচনা পাওয়া যায়। গোশালের মতে, প্রতিটি জীবের সংসারে সুখ ও দুঃখের ভোগ একদম নির্দিষ্ট এবং পরিমিত, যা চাইলেই কোনো ধর্মীয় আচার বা জপ-তপ দিয়ে কমানো কিংবা বাড়ানো সম্ভব নয়। তিনি এটিকে বোঝাতে সুতোর গোলার এক অনন্য রূপক ব্যবহার করেছেন—একটি সুতোর গোলাকে ওপর থেকে ছেড়ে দিলে তা যেমন তার ভেতরের সমস্ত সুতো শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘুরতে ঘুরতে নিজে থেকেই খুলতে থাকে, ঠিক তেমনই মূর্খ কিংবা পণ্ডিত নির্বিশেষে প্রতিটি জীবকে তার নির্ধারিত বিপুল সংখ্যক যোনি, মার্গ ও কল্পের চক্র অতিক্রম করতেই হয়। এই সুদীর্ঘ নির্ধারিত পথ বা আশি লক্ষ ক্ষুদ্র-বৃহৎ কল্পের যাত্রা শেষ করেই কেবল দুঃখের চূড়ান্ত অবসান ঘটে, তার আগে কোনো সাধনা বা কঠোর তপস্যা দিয়ে অপক্ব কর্মকে পাকানো যায় না। এই দর্শনের মূল কথাই হলো—সংসারে নতুন কোনো ঘটনার উৎকর্ষ বা রূপান্তর হয় না, বরং এক অদৃশ্য তুলাদণ্ডের মতো জীবনের রাস্তা আগে থেকেই মাপা থাকে, যেখানে মানবজাতি কেবল নিয়তির হাতের পুতুল হিসেবে সুখ ও দুঃখের নির্দিষ্ট পরিমাপটুকু ভোগ করে সমাপ্তির দিকে ধাবিত হয়।
৪
জীবনযাত্রা ও আচার-আচরণ: কঠোরতা ও সরলতার মিশ্রণ।
আজীবক সম্প্রদায়ের প্রাত্যহিক জীবনধারা এবং আচার-আচরণ ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা, যেখানে বাহ্যিক কঠোরতার সমান্তরালে এক ধরণের নিরুদ্বিগ্ন সরলতা বিদ্যমান ছিল। তারা তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীরের মতো শরীরের ওপর চরম অত্যাচার বা ঘোর আত্মনিগ্রহের কৃচ্ছ্রসাধন পছন্দ করতেন না; বরং আরামদায়ক ও সহজ উপায়ে জীবনযাপনে কিছুটা পক্ষপাতী ছিলেন। আজীবকদের এই জীবনদর্শনের কারণে গৌতম বুদ্ধ এক জায়গায় তাদের ব্রহ্মচর্যের প্রতি এক ধরণের ‘উদাসীন’ সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে আরামের প্রতি পক্ষপাত থাকলেও আজীবক ভিক্ষুদের জীবন যাপন চিত্র ছিল অত্যন্ত আড়ম্বরহীন ও মৌলিক নিয়মে বাঁধা। যেমন, দীক্ষাপ্রাপ্ত আজীবক সন্ন্যাসীরা পুরোপুরি সামাজিক লোকলজ্জা ত্যাগ করে সম্পূর্ণ নগ্নাবস্থায় বিচরণ করতেন। তাদের খাওয়ার পদ্ধতিও ছিল বেশ সরল; কোন পাত্র ব্যবহার না করে দিনে মাত্র একবার মানুষের দুয়ার থেকে ভিক্ষা সংগ্রহ করতেন এবং সরাসরি নিজেদের হাতের তালুতে রেখে খেতেন (হস্তপ্রলেখী)। নিয়তিবাদের অমোঘ তত্ত্বে বিশ্বাসী হলেও তারা প্রাত্যহিক জীবনে নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করেননি; কঠোরভাবে মাছ, মাংস ভক্ষণ এবং মদ্যসেবন বর্জন করে চলতেন। জীবনের পরম লক্ষ্য কিংবা চরম তপস্যা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তারা অত্যন্ত সরল কিছু প্রাত্যহিক নিয়ম-সংযম ও আত্মিক শৃঙ্খলা মেনে চলতেন, যা তাদের সমসাময়িক অন্যান্য শ্রমণদের চেয়ে এক পৃথক ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছিল।
৫
সমসাময়িক প্রতিপাদ্য ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা।
তৎকালীন ভারতবর্ষে আজীবক ধর্ম বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করার মূল কারণ ছিল সমাজকাঠামোর আমূল সমালোচনা। ‘আজীবক সম্প্রদায় প্রথমদিকে বৌদ্ধদের প্রতিপক্ষরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। বৌদ্ধধর্মের অবিচল ও মৌলিক সমালোচনা দিয়ে খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে আজীবক ধর্মের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণরূপে ব্রাহ্মণধর্মের বিরোধকে উল্লেখ করা হয়। তবে সমাজে জাতিভেদের কাঠামো ও ব্রাহ্মণদের কর্মবাদের ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে গোসাল প্রচারিত সমালোচনা কেবল সমাজের নীচুস্তরের মানুষকে আকর্ষণ করেনি, ববং শুধু সাধারণ মানুষই নয়, কারুশিল্পী, কামার, কুমার, ধীবর (জেলে) এবং বড় বড় বণিকেরা এই ধর্মের অনুসারী ও গৃহী সদস্য হয়েছিলেন। এই কারণে আজীবক ধর্ম সন্ন্যাসী হতে গৃহী-পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। পালি বৌদ্ধগ্রন্থে গোসালকে একজন জেলের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তিনি নদীর মোহনায় জাল ফেলে অসংখ্য মাছ ধরতেন। এ থেকে বুঝা যায় সে সময়ে আজীবক ধর্মের জনপ্রিয়তা ব্যাপক ছিল।
৬
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বনাম ধর্মীয় নিপীড়নের ইতিহাস।
মৌর্য যুগে আজীবক সম্প্রদায়ের প্রভাব ও বিস্তৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং চরম ধর্মীয় নিপীড়নের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য ও আলো-ছায়ার চিত্র পরিলক্ষিত হয়। একদিকে যেমন বৌদ্ধধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও সম্রাট অশোক তাঁর শিলালেখে আজীবকদের পাহাড় কেটে গুহা বাসস্থান দান করার ঐতিহাসিক কথা উল্লেখ করে গেছেন। শুধু তাই নয়, সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও অবিরোধ বজায় রাখার জন্য তিনি 'ধর্মমহামাত্র' নামক বিশেষ রাজকর্মচারী নিযুক্ত করেছিলেন। অশোকের এই ধার্মিক সহনশীলতার ধারা বজায় রেখে তাঁর পৌত্র রাজা দশরথও (আনুমানিক ১৮৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) গয়ার নিকটবর্তী নাগার্জুন পাহাড়ের বেশ কিছু বিখ্যাত গুহা আজীবক সন্ন্যাসীদের ব্যবহারের জন্য দান করেছিলেন। কিন্তু এই উদারতার ঠিক বিপরীত পিঠে বৌদ্ধ গ্রন্থ 'অশোকাবদান'-এর ঐতিহাসিক বিবরণী অনুসারে, প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন (মহাস্থানগড়) অঞ্চলে এক আজীবক অনুসারী কর্তৃক বুদ্ধদেবকে জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর বা আজীবক গুরু মক্ষলি গোশালের চরণে অবনত দেখানোর একটি বিতর্কিত স্কেচ বা ছবি আঁকাকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি হয়। মৌর্য সম্রাট অশোক একে বুদ্ধের চরম অবমাননা গণ্য করে চরম ক্ষিপ্ত হন এবং পুণ্ড্রবর্ধনের সমস্ত আজীবককে সমূলে বিনাশের নৃশংস রাজকীয় ফরমান জারি করেন, যার ফলে প্রায় ১৮,০০০ আজীবক অনুসারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং করতোয়া নদীর জল রক্তে লাল হয়ে ওঠে।
এই ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজধানী পাটলিপুত্রেও অনুরূপ চিত্রাঙ্কনের পুনরাবৃত্তি ঘটলে সম্রাট অশোক ক্রোধে অন্ধ হয়ে সেই চিত্রকর ও তার পুরো পরিবারকে ঘরের ভেতর জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার মতো নিষ্ঠুর শাস্তি দেন। এরপরও ক্ষোভ প্রশমিত না হওয়ায় তিনি সমগ্র সাম্রাজ্যে ভিন্নধর্মী 'পাষণ্ডদের' উৎপাটনে এক ভয়ঙ্কর রাজকীয় পুরস্কার ঘোষণা করেন, যেখানে বলা হয় যে, যেকোনো ব্যক্তি যদি কোনো ভিন্নধর্মী সাধু বা সন্ন্যাসীর কাটা মাথা এনে রাজদরবারে জমা দিতে পারে, তবে তাকে পুরস্কার হিসেবে একটি করে মূল্যবান 'দিনার' বা রৌপ্য-স্বর্ণ মুদ্রা দেওয়া হবে। এই লোভনীয় ও নির্মম আদেশের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্নমতাবলম্বী সন্ন্যাসীদের নির্বিচারে হত্যা করে মাথা কাটার এক বীভৎস ও অন্ধ প্রতিযোগিতার জন্ম হয়। এই রক্তক্ষয়ী উন্মাদনার অবসান ঘটেছিল একটি মর্মান্তিক পারিবারিক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে, যখন এক রাখাল পুরস্কারের লোভে অন্ধ হয়ে অশোকের নিজেরই আপন ভাই বীতশোক বা বীতাশোককে ভিন্নধর্মী সাধু ভেবে ভুলবশত হত্যা করে তাঁর মাথা কেটে নিয়ে আসে। বীতশোক মূলত একজন সংসারত্যাগী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘকাল অরণ্যে সাধনার কারণে তাঁর চুল-দাড়ি অত্যন্ত বড় ও অবিন্যস্ত থাকায় দূর থেকে তাঁকে আজীবক বা জৈন সাধুর মতো দেখাচ্ছিল।
রাজদরবারে নিজের পরম প্রিয় ও সম্পূর্ণ নির্দোষ ভাইয়ের রক্তাক্ত কাটা মাথা দেখে সম্রাট অশোক বজ্রাহত ও শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন এবং বুঝতে পারেন যে তাঁর নিজস্ব সাময়িক ক্রোধ কীভাবে একটি আত্মঘাতী হিংস্রতার জন্ম দিয়েছে। ভাইয়ের এই করুণ মৃত্যুর পরই অশোকের চিরতরে মোহভঙ্গ হয় এবং তিনি অবিলম্বে এই ধরনের সমস্ত মৃত্যুদণ্ড, পুরষ্কারের ঘোষণা এবং ধর্মীয় নিপীড়নের আদেশ চিরকালের জন্য বাতিল করে অহিংসা ও পরধর্মসহিষ্ণুতার পথ বেছে নেন। তবে, আধুনিক ঐতিহাসিকরা (যেমন রোমিলা থাপার বা চার্লস ড্রেকেমেয়ার) 'অশোকাবদান' গ্রন্থে বর্ণিত এই পুণ্ড্রবর্ধন ও পাটলিপুত্রের গণহত্যার ঐতিহাসিক সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। কারণ, সম্রাট অশোকের সমসাময়িক নিজস্ব কোনো শিলালিপিতে এই ভয়াবহ রক্তপাতের বিন্দুমাত্র উল্লেখ বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং অশোকের শিলালিপিগুলোতে তিনি আজীবক ও জৈনদের গুহা বাসস্থান দান করা এবং সকল ধর্মের প্রতি পরম সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের কথাই বারবার প্রচার করে গেছেন। ঐতিহাসিকদের মতে, বৌদ্ধ গ্রন্থকাররা সম্ভবত বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর অশোকের অহিংস রূপকে আরও মহিমান্বিত করতে কিংবা তাঁর পূর্বের ক্রূর 'চণ্ডাশোক' রূপকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর উদ্দেশ্যেই এই ধরনের অতিশয়োক্তিপূর্ণ কাহিনীর অবতারণা করেছিলেন।
৭
প্রতিপক্ষের চোখে গোশাল: বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের বিবরণ।
আজীবক সম্প্রদায়ের নিজস্ব কোনো আদি ধর্মগ্রন্থ বা সাহিত্য আজ আর বেঁচে না থাকায়, তাঁদের সম্পর্কে যা কিছু জানা যায় তার পুরোটাই সমসাময়িক ও প্রতিপক্ষ বৌদ্ধ এবং জৈন সাহিত্য থেকে সংগৃহীত. মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, বুদ্ধদেবের সময়ে প্রচারিত প্রধান ছয়টি প্রাচীন ধর্মমতের মধ্যে মক্ষলি গোশালের ‘আজীবক’ এবং মহাবীরের ‘নিগ্রন্থ’ ছাড়াও পূর্ণ কাশ্যপ, অজিত কেশকম্বল, সঞ্জয় ও পোকুদ কত্ত্যায়নের মতবাদ অন্যতম ছিল. পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের বর্ণনা অনুযায়ী, জৈন পিটকে মক্ষলি গোশালকে এক ধর্মান্ধ, ঈর্ষাপরায়ণ ও মহাবীরের প্রতি আক্রমণাত্মক ব্যক্তি হিসেবে বেশ নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে. এর বিপরীতে বৌদ্ধ পিটকে (যেমন: মজ্ঝিমনিকায়) তাঁকে বুদ্ধ-যুগীয় প্রসিদ্ধ ছয়জন মহান আচার্যের একজন হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে গণ্য করা হয়েছে. এই বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুসারেই, ৫৩৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির সকালেও বুদ্ধগয়া থেকে গয়ার মধ্যবর্তী পথে 'উপক' নামক এক আজীবক সন্ন্যাসীর সাথে বুদ্ধের সাক্ষাৎ হয়েছিল. এছাড়া, মজ্ঝিমনিকায়-এ গোশালের পূর্বসূরি হিসেবে নন্দ বাৎস্য এবং কৃশ সাংকৃত্য নামের আরও দুজন আজীবক আচার্যের নাম পাওয়া যায়, যা এই ধর্মের প্রাচীনত্বকে প্রমাণ করে।
৮
অবলুপ্তি: একটি ঐতিহাসিক ধর্মের প্রস্থান।
প্রাচীন ভারতে আজীবক ধর্মের অবলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল তাদের নিজস্ব 'চরম নিয়তিবাদ' বা ভাগ্যের ওপর অন্ধ বিশ্বাস। মানুষের কর্ম ও পুরুষার্থকে অস্বীকার করার এই দর্শন দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের মনে চরম হতাশা, অকর্মণ্যতা ও নেতিবাচক মানসিকতার জন্ম দেয়। যখন মানুষ দেখল নৈতিক আচরণ বা চেষ্টার দ্বারা ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব নয়, তখন তারা ইহজাগতিক ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মতো কর্মমুখী এবং নৈতিক দর্শনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। এছাড়া, আজীবকদের কোনো স্থায়ী ও লিখিত নিজস্ব ধর্মগ্রন্থ না থাকায় কালক্রমে তাদের মূল শিক্ষাগুলো বিকৃত হয়ে পড়ে। শেষ দিকে টিকে থাকার লড়াইয়ে আজীবক সন্ন্যাসীরা জ্যোতিষচর্চা, ভাগ্যগণনা, তন্ত্র-মন্ত্র এবং কালো জাদুর (Black Magic) মতো নানা কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়ে, যা তাদের আধ্যাত্মিক পতনকে ত্বরান্বিত করে সচেতন সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
বাংলা ও সমগ্র ভারতে আজীবকদের হারিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত অন্যান্য প্রধান ধর্মের সাথে তীব্র তাত্ত্বিক সংঘাত এবং রাজনৈতিক কোণঠাসা অবস্থা। প্রথম দিকে তারা সমান্তরালভাবে বসবাস করলেও, পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ও জৈনদের সাথে গভীর দার্শনিক বিতর্কে আজীবকদের ‘সর্বব্যাপী পূর্বনির্ধারণ’ তত্ত্বটি পুরোপুরি পিছিয়ে পড়ে। বাংলার গুপ্ত, পাল ও সেন বংশের আমলে যখন বৌদ্ধধর্ম ও সনাতন হিন্দুধর্ম প্রবল রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে বিকশিত হয়, তখন আজীবকরা চরমভাবে পরাজিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়ে। উত্তর ও পূর্ব ভারতে (বিশেষ করে বাংলায়) খ্রিষ্টীয় ১২ শতক থেকে ১৩ শতকের মধ্যে আজীবকরা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হারিয়ে মূলত জৈনদের 'দিগম্বর' সম্প্রদায় এবং হিন্দুদের শৈব ও তান্ত্রিক উপদলের সাথে মিশে যায়। ১২৯২ খ্রিষ্টাব্দের একটি জৈন গ্রন্থে এদের শেষবারের মতো একটি 'গোপন সংস্থা' হিসেবে টিকে থাকার উল্লেখ মিললেও, অবশেষে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে দক্ষিণ ভারত থেকেও তাদের শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাওয়ার মাধ্যমে এই সুপ্রাচীন ধর্মটি চিরতরে হারিয়ে যায়।
৯
চরম ভাগ্যবাদের প্রচারক হওয়া সত্ত্বেও আজীবক সম্প্রদায় প্রাচীন ভারতের সমাজ ও চিন্তাজগতে এক বৈপ্লবিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মানুষের স্বাধীন পুরুষকার ও কর্মকে অস্বীকার করার যে দুঃসাহসিক দর্শন মক্ষলি গোশাল প্রচার করেছিলেন, তা সমকালীন সমাজকে নিয়তির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এক নতুন দার্শনিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছিল। আজীবকদের নিজস্ব কোনো ধর্মগ্রন্থ আজ অবশিষ্ট না থাকলেও, মৌর্য যুগের পাহাড় কেটে তৈরি গুহা আর প্রতিপক্ষ বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের পাতায় তাঁদের ইতিহাস অক্ষয় হয়ে আছে। পরিশেষে বলা যায়, উত্থান-পতনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এই মতবাদটি কালক্রমে হারিয়ে গেলেও, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে মক্ষলি গোশাল ও তাঁর আজীবক ধর্ম চিরকাল এক গৌরবময়, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও রহস্যময় অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৫ জুন ২০২৬
তথ্যসূত্র:
১। বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব)- ড. নীহাররঞ্জন রায়
২। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস- রাহুল সাংকৃত্যায়ন
৩। History and Doctrines of the Ajivikas: A Vanished Indian Religion- A.L. Basham
৪। ইন্টারনেট