
১
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ওয়াশিংটনের সাজানো এক অলিখিত নিয়মের ওপর নির্ভরশীল—যাকে আমরা ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা বলে জানি। এই ব্যবস্থার মূল সমীকরণটি ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু ব্ল্যাকমেইলের সমতুল্য; যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি রাষ্ট্রকে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে হতো মার্কিন ডলারে, অন্যথায় অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে নেমে আসত সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ধ্বংস। ওয়াশিংটনের এই একচেটিয়া আর্থিক হাতুড়ি এবং সুইফট (SWIFT) ব্যাংকিং ব্যবস্থার রাজনৈতিক অপব্যবহারই ছিল গত ৮০ বছর ধরে পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের মাটিতে যা ঘটে গেল, তা কেবল সাধারণ কোনো দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক করমর্দন বা লাল গালিচার প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি মূলত মার্কিন একমেরু (Unipolar) বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অভ্যুত্থান এবং পশ্চিমা আর্থিক সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আর এই সক্রিয় কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ‘গ্রাউন্ড জিরো’ হিসেবে কাজ করছে একটি অত্যন্ত দূরদর্শী, গোপনীয় এবং বিশালাকার জ্বালানি অবকাঠামো ম্যাট্রিক্স—যাকে আমরা 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' পাইপলাইন নামে চিনি। এই পাইপলাইনের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যা আটলান্টিক জোটের চিরচেনা ব্লকিং স্ট্র্যাটেজিকে সম্পূর্ণরূপে অকেজো করে দিতে সক্ষম।
পাশ্চাত্যের নীতিনির্ধারকেরা যখন নিষেধাজ্ঞা আর সামরিক বলয় তৈরির পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধকালীন সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, বেইজিং এবং মস্কো তখন নীরবে বৈশ্বিক নিরাপত্তার সম্পূর্ণ নতুন এক মহাদেশীয় সমীকরণ সাজিয়ে ফেলেছে। এই নতুন ইউরেশীয় অক্ষের মূল শক্তি হলো রাশিয়ার অফুরন্ত কাঁচামাল ও জ্বালানির সাথে চীনের পৃথিবীর বৃহত্তম শিল্প উৎপাদন ক্ষমতার এক অভূতপূর্ব কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক একীভূতকরণ। ওয়াশিংটন যেখানে ভেবেছিল ইউক্রেন যুদ্ধের পর কঠোর নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে রাশিয়াকে দেউলিয়া ও একঘরে করে ফেলবে, সেখানে তারা মূলত দুই পরাশক্তিকে আরও কাছাকাছি এনে একটি অভেদ্য অর্থনৈতিক দুর্গ গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সমান্তরাল বিশ্বব্যবস্থা কেবল সামুদ্রিক অবরুদ্ধকরণের ‘মালাক্কা ডিলেমা’র ভয়কেই চিরতরে দূর করেনি, বরং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনে পেট্রোডলারের কৃত্রিম চাহিদাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এরফলে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ট্রিলিয়ন পেট্রোডলার আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে ফেরত আসার পথ তৈরি হচ্ছে, যা মার্কিন ঋণভিত্তিক অর্থনীতিতে চরম মুদ্রাস্ফীতি বা হাইপারইনফ্লেশনের এক অনিবার্য গাণিতিক সত্যকে উস্কে দিচ্ছে। গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো এখন ব্রিকস প্লাস জোটের মাধ্যমে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের বাইরে একটি নিরাপদ ও সার্বভৌম বিকল্পের বাস্তব রূপরেখা প্রত্যক্ষ করছে। 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' তাই কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পাইপলাইন নয়, বরং এটি ইউরেশীয় ভূখণ্ডে পশ্চিমা একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন বহুমেরু (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থার উদয়ের ইশতেহার।
২
ইউরেশীয় জ্বালানি দুর্গের ভিত্তি: পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২ ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল মস্কোর আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ করে তাদের দেউলিয়া করা; কিন্তু ক্রেমলিন ও বেইজিং এই সংকটকে এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সুযোগে রূপান্তর করেছে। এই কৌশলের মূল চালিকাশক্তি হলো 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' পাইপলাইন, যা রাশিয়ার সাইবেরিয়ার ইয়ামাল উপদ্বীপের বিশাল গ্যাসক্ষেত্র থেকে মঙ্গোলিয়ার ভূখণ্ড হয়ে সরাসরি চীনের শিল্পোন্নত উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পাইপলাইনের ধারণক্ষমতা রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিম-১ পাইপলাইনের প্রায় সমান, যা আগে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করত। এর বাস্তব উদাহরণ হলো, রাশিয়া তার যে গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে কয়েক দশক ধরে জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলোকে সস্তা জ্বালানি দিয়ে এসেছে, সেই একই উৎস এখন স্থায়ীভাবে বেইজিংয়ের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, ইউরোপ যেখানে বিকল্প এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, সেখানে চীন রাশিয়ার এই পাইপলাইনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির নিশ্চয়তা পাচ্ছে। এই বাজার পরিবর্তনের ফলে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোম্পানি গ্যাজপ্রম তার হারানো ইউরোপীয় রাজস্বের বিকল্প খুঁজে পেয়েছে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির চিরস্থায়ী 'অক্সিজেন' নিশ্চিত করেছে।
'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' কেবল একটি সাধারণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি আটলান্টিক জোটের সামরিক ও অর্থনৈতিক নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে ইউরেশীয় অঞ্চলের এক স্থায়ী এবং অভেদ্য ভূ-রাজনৈতিক একত্রীকরণ। ওয়াশিংটন এবং ন্যাটো যেখানে বৈশ্বিক সমুদ্রপথ ও ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা (SWIFT) ব্যবহার করে যেকোনো দেশের অর্থনীতি ধসিয়ে দিতে পারে, সেখানে এই সম্পূর্ণ স্থলভিত্তিক পাইপলাইন নেটওয়ার্ক মার্কিন নৌবাহিনীর সামুদ্রিক অবরোধ বা 'মালাক্কা ডিলেমা'র ভয়কে চিরতরে মুছে দিয়েছে। ব্লুমবার্গ এবং দ্য ইকোনমিস্টের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুসারে, এই জ্বালানি বাণিজ্যের সেটেলমেন্ট হচ্ছে সম্পূর্ণ মার্কিন ডলারকে বর্জন করে—রুবেল এবং ইউয়ান মুদ্রায়, যা পশ্চিমা আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে গাণিতিকভাবে শূন্য করে দিয়েছে। এরফলে অতীতে ইরান বা ভেনিজুয়েলা যেভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, রাশিয়া ও চীন সম্পূর্ণ নিজস্ব সমান্তরাল পেমেন্ট সিস্টেম (CIPS ও SPFS) ব্যবহার করে সেই ফাঁদ সফলভাবে এড়িয়ে গেছে। রাশিয়া তার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং চীন তার বিশালাকার শিল্প উৎপাদন ক্ষমতাকে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে এমনভাবে যুক্ত করেছে যে, পশ্চিমা শক্তির পক্ষে এই মহাদেশীয় অর্থনৈতিক ব্লকে ফাটল ধরানো অসম্ভব। পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২ প্রমাণ করছে যে, ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার একমেরু অর্থনৈতিক হাতুড়ির দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং ইউরেশীয়ার এই নতুন জ্বালানি দুর্গ বিশ্বকে একটি অপরিবর্তনীয় বহুমেরু (Multipolar) কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
৩
ডি-ডলারাইজেশন এবং ৯০% বাস্তবায়ন: আর্থিক অস্ত্রের নিষ্ক্রিয়করণ।
পাশ্চাত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্র, অর্থাৎ বৈশ্বিক সুইফট (SWIFT) ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে সম্পূর্ণ অকেজো করে চীন-রাশিয়া অক্ষ এক ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। বেইজিং শীর্ষ সম্মেলনের পর যে তথ্যটি ওয়াশিংটন ধামাচাপা দিতে মরিয়া, তা হলো—বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০% মার্কিন ডলারকে সম্পূর্ণ বর্জন করে নিজস্ব মুদ্রায় সম্পন্ন হচ্ছে। ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এবং বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এই বিশাল লেনদেন এখন একচেটিয়াভাবে ইউয়ান এবং রুবেলের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে, যা পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়াটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাশিয়ার আর্থিক বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থা 'SPFS' এবং চীনের 'CIPS' (Cross-Border Interbank Payment System) একীভূত হয়ে কাজ করছে। এরফলে ঐতিহ্যগত ব্যবস্থার মার্কিন ডলার ও সুইফটের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে তৈরি হয়েছে ইউয়ান-রুবল চালিত সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত এক নতুন ইউরেশীয় অক্ষ। রয়টার্স এবং ব্লুমবার্গ-এর অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমান্তরাল আর্থিক নেটওয়ার্কটি সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমা এক্তিয়ারের বাইরে কাজ করায় এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। অতীতে ডলার-নির্ভরশীলতার কারণে কোনো দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লে যেখানে তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে যেত, সেখানে রাশিয়া ও চীন এখন ডলার ছাড়াই তাদের রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য সচল রেখেছে। এই সফল কৌশলটি কেবল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সংস্কৃতির বিপরীত প্রতিক্রিয়াই দেখায়নি, বরং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সামনেও ডলার-মুক্ত বাণিজ্যের একটি বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ মডেল তুলে ধরেছে।
৪
মালাক্কা ডিলেমা ও স্থলভাগের লাইফলাইন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তাদের নৌবাহিনী, যা বিশ্বের প্রধান প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ—বিশেষ করে কৌশলগত মালাক্কা প্রণালী নিয়ন্ত্রণ করে, যা চীনের জ্বালানি আমদানির প্রধান রুট। ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক কৌশল ছিল, যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই সামুদ্রিক পথ অবরুদ্ধ করে বেইজিংয়ের জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া, যা ভূ-রাজনীতিতে ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে পরিচিত। তবে রাশিয়া ও চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইন এবং ইউরেশীয় রেলওয়ে নেটওয়ার্ক এই বহুল আলোচিত কৌশলগত সংকটকে চিরতরে মিটিয়ে দিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী ও তার মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক কার্গো জাহাজ ও ট্যাঙ্কারের পুরোনো ব্যবস্থার বিপরীতে এখন গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকা এক স্থলভাগের লাইফলাইন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পূর্ণ স্থলভিত্তিক জ্বালানি ও মালবাহী নেটওয়ার্কের ওপর কোনো পশ্চিমা ব্লকেড কার্যকর করা অসম্ভব। ভবিষ্যতে যদি কখনো দক্ষিণ চীন সাগর বা মালাক্কা প্রণালীতে তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তবুও চীনের শিল্প ও উৎপাদন খাত সাইবেরিয়ার এই অভেদ্য লাইফলাইনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও তেলের সরবরাহ পেয়ে সম্পূর্ণ সচল থাকবে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক শক্তির ব্ল্যাকমেইল করার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা পশ্চিমা সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য এক চরম লঙ্ঘন। সমুদ্রের ওপর পশ্চিমা একক আধিপত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইউরেশীয় ভূখণ্ডে যে অভেদ্য নিরাপত্তা প্রাচীর তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বকে একমেরু ব্যবস্থা থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুমেরু সামরিক বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
৫
পেট্রোডলারের পতন এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ ঋণের সংকট।
বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে মার্কিন ডলারের একচেটিয়া প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দীর্ঘদিনের ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার পতন মার্কিন অর্থনীতির জন্য এক অস্তিত্ব সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার যখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে তার উপযোগিতা হারাবে, তখন সেই উদ্বৃত্ত মুদ্রা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে ফেরত আসতে বাধ্য হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডলার যদি বিশ্বের অবিসংবাদিত রিজার্ভ কারেন্সি বা প্রধান সংরক্ষিত মুদ্রার মর্যাদা হারায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অভ্যন্তরীণ ঋণব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ হলো, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান ওপেক দেশগুলো এখন চীনের কাছে ইউয়ানে এবং অন্যান্য দেশের কাছে স্থানীয় মুদ্রায় তেল বিক্রির বিষয়ে সক্রিয় আলোচনা করছে, যা পেট্রোডলারের কফিনে শেষ পেরেক। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার বাজারে ডলারের জোগান আকস্মিকভাবে বেড়ে গেলে হাইপারইনফ্লেশন বা চরম মুদ্রাস্ফীতি আর কোনো দূরবর্তী অর্থনৈতিক তত্ত্ব থাকবে না, বরং তা একটি অনিবার্য গাণিতিক সত্যে পরিণত হবে। চীন ও রাশিয়া ব্রিকস প্লাস (BRICS+) জোটের মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে পরিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের আর্থিক হাতুড়ি ও নিষেধাজ্ঞার ভয় না পেয়েও বিকল্প মুদ্রায় সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। ডলারের আধিপত্য খর্ব হওয়ার অর্থ হলো আমেরিকার কৃত্রিম সচ্ছলতার অবসান, যা পশ্চিমা বিশ্বকে এক মারাত্মক এবং অপরিবর্তনীয় অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
৬
বেইজিং: বিশ্বের নতুন মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র।
বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান উত্থান এবং কূটনৈতিক সাফল্য পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য এক প্রকাশ্য উপহাসে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যখন নিষেধাজ্ঞা আর সামরিক জোটের পুরোনো সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, বেইজিং তখন বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির এক নতুন এবং অপরাজেয় মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মাত্র এক বছরের ভগ্নাংশের মধ্যে চীন ফ্রান্সের ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, যুক্তরাজ্যের কিয়ার স্টারমার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব রাজনৈতিক খেলোয়াড়কে আতিথেয়তা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের কেন্দ্রীয় অবস্থান প্রমাণ করেছে। লোরি ইনস্টিটিউট এবং বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২০টিরও বেশি দেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এর বাস্তব উদাহরণ হলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরেশিয়া—সবখানেই এখন ওয়াশিংটনের পরিবর্তে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতা এবং অর্থনৈতিক মডেলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এই নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণে চীন যেখানে বৈশ্বিক বাজারকে পৃথিবীর বৃহত্তম শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক অক্সিজেন সরবরাহ করছে, সেখানে রাশিয়া তার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, কাঁচামাল এবং অবাধ গতিশীল সামরিক শক্তি দিয়ে একে সুরক্ষিত রাখছে। এই দুই পরাশক্তির অভূতপূর্ব সমন্বয় গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোকে পশ্চিমা একমেরু ব্যবস্থার বাইরে একটি শক্তিশালী এবং নিরাপদ বিকল্প পথ দেখাচ্ছে। বেইজিংয়ের এই কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে এবং বিশ্বজুড়ে এখন বেইজিং-মস্কো অক্ষের এক নতুন বহুমেরু (Multipolar) যুগের সূচনা ঘটেছে।
৭
‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২’ পাইপলাইন কেবল কোনো সাধারণ দ্বিপাক্ষিক গ্যাস সংযোগ নয়, বরং এটি ইউরেশীয় ভূ-খণ্ডে পশ্চিমা একক আধিপত্যের চিরতরে অবসানের এক জীবন্ত দলিল। ওয়াশিংটন যখন পুরোনো নিষেধাজ্ঞা ও সামুদ্রিক ব্লকেডের সমীকরণে আটকে আছে, বেইজিং-মস্কো অক্ষ তখন সমান্তরাল আর্থিক পেমেন্ট সিস্টেম ও স্থলভিত্তিক লাইফলাইনের মাধ্যমে এক অভেদ্য বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তুলেছে। বাণিজ্য থেকে মার্কিন ডলারের ৯০ শতাংশ বর্জন এবং সৌদি আরবসহ ওপেক দেশগুলোর বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়া প্রমাণ করে যে পেট্রোডলারের কৃত্রিম সাম্রাজ্য এখন খণ্ডবিখণ্ড। ট্রিলিয়ন ডলারের এই রিভার্স ক্যাশফ্লো আমেরিকার ঋণভিত্তিক অর্থনীতিকে হাইপারইনফ্লেশন ও অনিবার্য দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা মূলত ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া আর্থিক ব্ল্যাকমেইলেরই বিপরীত প্রতিক্রিয়া। বেইজিং এখন বিশ্বের নতুন ভূ-রাজনৈতিক মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র, যেখানে চীনের অতুলনীয় শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা এবং রাশিয়ার অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের মেলবন্ধন এক অপরাজেয় জোটের জন্ম দিয়েছে। গ্লোবাল সাউথ আজ আমেরিকার ‘আর্থিক হাতুড়ি’র ভয় উপেক্ষা করে এই নতুন বাস্তবতাকে আলিঙ্গন করছে, যা পশ্চিমা নিরাপত্তা ও নব্য-উপনিবেশবাদী কাঠামোর জন্য এক চরম এবং অপরিবর্তনীয় পরাজয়।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২২ মে ২০২৬