
১
২০২৬ সালের মে মাসটি ইউক্রেন যুদ্ধের ইতিহাসে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে। রয়টার্স এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিবৃতি অনুযায়ী, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ১,৫৬৭টি ড্রোন এবং ৫৬টি মিসাইলের ঐতিহাসিক হামলার পর, ২৪ মে ২০২৬ তারিখ ভোরে রাশিয়া আবারও ইউক্রেনজুড়ে এক বিধ্বংসী বিমান হামলা চালায়। মার্কিন গণমাধ্যম NPR এবং CBS News-এর প্রতিবেদন অনুসারে, এই হামলায় কিয়েভকে লক্ষ্য করে একযোগে ৬০০টি ড্রোন এবং ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করা হয়। তবে এই হামলার আসল ভয়াবহতা লুকিয়ে ছিল রাশিয়ার নবনির্মিত হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল 'ওরেসনিক' (Oreshnik)-এর প্রয়োগের মধ্যে, যা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও তাদের অফিশিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে নিশ্চিত করেছে। কিয়েভের দক্ষিণে বিলা ৎসেরকভা অঞ্চলে আঘাত হানা এই ওরেসনিকের আত্মপ্রকাশ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে এটি মূলত একটি MIRV বা বহুমুখী ওয়ারহেডসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র, যা মহাকাশের কাছাকাছি গিয়ে আলাদা হয়ে একই সাথে ভিন্ন ভিন্ন ৬টি লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত করতে সক্ষম। শব্দের চেয়ে ১০ গুণ দ্রুতগতির এই অপ্রতিরোধ্য মিসাইলের ব্যবহার ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডামি ড্রোনের ঝাঁক তৈরি করে ন্যাটোর প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের 'স্যাচুরেশন পয়েন্ট' পরীক্ষা করাই ছিল মস্কোর মূল কৌশল। ফলে এই হামলাকে কেবল ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে সাধারণ আক্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর উদ্দেশ্যে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে একটি চূড়ান্ত, সুনির্দিষ্ট এবং সরাসরি 'কৌশলগত সতর্কবার্তা'।
২
ওরেসনিক প্রযুক্তি: এক মিসাইলে বহুমুখী লক্ষ্যবস্তু।
রুশ ভাষায় 'ওরেসনিক' শব্দের অর্থ 'হ্যাজেলনাট গাছ' হলেও, এই কোমল নামের আড়ালে মূলত লুকিয়ে আছে এক প্রলয়ঙ্কারী সামরিক প্রযুক্তি। ওরেসনিক হলো রাশিয়ার একটি আধুনিক ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল (IRBM), যা অত্যন্ত জটিল MIRV (Multiple Independently Targetable Re-entry Vehicle) প্রযুক্তিসম্পন্ন। মার্কিন গণমাধ্যম NPR এবং CBS News-এর প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের পর যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে মহাকাশের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন এর মূল বডি বা বাস (Bus) থেকে ৬টি স্বাধীন উপ-ক্ষেপণাস্ত্র বা ওয়ারহেড আলাদা হয়ে যায়। এই প্রতিটি ওয়ারহেড সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ভূ-কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁত ও স্বাধীনভাবে আঘাত করতে সক্ষম। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল টেলিগ্রাম স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, ২৪ মে ২০২৬-এর হামলায় বিলা ৎসেরকভা অঞ্চলে এই ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত ধ্বংসক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে। সামরিক গবেষকদের মতে, ওরেসনিকের এই ক্লাস্টার সদৃশ বিভাজন প্রক্রিয়াটি মূলত একটি একক উৎক্ষেপণেই শত্রুপক্ষের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি বা বাঙ্কারকে একযোগে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এর ফলে প্রচলিত একক ওয়ারহেডের মিসাইলের তুলনায় ওরেসনিকের কার্যকারিতা ও বিধ্বংসী রূপ কয়েক গুণ বেশি মারাত্মক হয়ে উঠেছে।
MIRV প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক দিক হলো এর অপ্রতিরোধ্য গতি ও পেনিট্রেশন ক্ষমতা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অফিশিয়াল বক্তব্য এবং ক্রেমলিনের প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, শব্দের চেয়ে ১০ গুণ দ্রুতগতিতে (Mach 10) ছুটতে সক্ষম এই মিসাইলটি লক্ষ্যবস্তুর ওপর অবিকল 'উল্কাপিণ্ডের মতো' আছড়ে পড়ে। এই অতি-উচ্চ গতির কারণে সৃষ্ট গতিশক্তি বা কাইনেটিক এনার্জি ব্যবহার করে ওরেসনিক কোনো বিস্ফোরক ছাড়াই মাটির তিন থেকে চার তলা গভীরে থাকা সুরক্ষিত সামরিক বাঙ্কারও অনায়াসে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। আমেরিকার শীর্ষ থিংক-ট্যাঙ্ক Institute for the Study of War (ISW) এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সাময়িকীগুলোর ডকট্রিন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর কাছে থাকা কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেই এই ওরেসনিককে আটকানো সম্ভব নয়। ন্যাটোর সর্বাধুনিক প্যাট্রিয়ট (Patriot) বা ইউরোপীয় IRIS-T ডিফেন্স সিস্টেমগুলো মূলত প্রথাগত ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইল ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু ওরেসনিকের হাইপারসনিক গতি এবং একই সাথে ৬টি ভিন্ন দিকে ছুটে যাওয়া ওয়ারহেড ট্র্যাক ও ইন্টারসেপ্ট করার মতো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনো ন্যাটোর রাডার বা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের নেই। এরফলে ইউক্রেনের আকাশে ওরেসনিকের এই সফল মহড়া ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা বলয়কে এক প্রকার সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং অসহায় হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে।
৩
ন্যাটোর প্যাট্রিয়ট এবং 'স্যাচুরেশন গেম'।
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাকে অকার্যকর করতে রাশিয়া যে নতুন যুদ্ধকৌশল গ্রহণ করেছে, সামরিক পরিভাষায় তাকে বলা হচ্ছে 'স্যাচুরেশন গেম' (Saturation Game)। আমেরিকার শীর্ষ সামরিক গবেষণা সংস্থা Institute for the Study of War (ISW)-এর সাম্প্রতিক ডিফেন্স অ্যানালিসিস এবং ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সূত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, রাশিয়ার এই বিপুল পরিমাণ ড্রোনের সাথে অত্যাধুনিক মিসাইলের মিশ্রণ মূলত একটি নিখুঁত ও পরিকল্পিত সামরিক চাল। এই কৌশলে রাশিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে সস্তা ডামি বা ডেকয় (Decoy) ড্রোন আকাশে ওড়ায়, যেগুলোর মূল কাজ কোনো ক্ষতি করা নয়, বরং শত্রুপক্ষের রাডারকে বিভ্রান্ত করা। যখন শত শত ড্রোন একসাথে ইউক্রেনের আকাশসীমায় প্রবেশ করে, তখন প্রতিরক্ষামূলক রাডার স্ক্রিনগুলো লক্ষ্যবস্তুর আধিক্যে সম্পূর্ণ জ্যাম বা 'স্যাচুরেটেড' হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সামরিক সাময়িকীগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ডামি ড্রোনগুলো নিখুঁতভাবে আসল মিসাইলের মতো সিগন্যাল তৈরি করে, যার ফলে প্রতিরক্ষাবাহিনী বাধ্য হয়ে তাদের মহামূল্যবান ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এসব সস্তা ড্রোনের পেছনেই খরচ করে ফেলে। মে ২০২৬-এর রেকর্ড ব্রেকিং হামলায় রাশিয়ার এই সস্তা ডেকয় ড্রোন এবং আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সুসমন্বিত নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক কৌশলটি ইউক্রেনের আকাশে ন্যাটোর নজরদারি ব্যবস্থাকে এক প্রকার অন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
ন্যাটো ইউক্রেনের আকাশ সুরক্ষায় তাদের সর্বাধুনিক 'প্যাট্রিয়ট' (Patriot), জার্মান প্রযুক্তির IRIS-T এবং মার্কিন-নরওয়েজিয়ান NASAMS ডিফেন্স সিস্টেম সরবরাহ করেছে, যা এতদিন বেশ কার্যকর ছিল। তবে রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো একযোগে এত বিপুল পরিমাণ লক্ষ্যবস্তু আকাশে ছুড়ে দেওয়া, যাতে ন্যাটোর এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের স্টক বা গোলাবারুদ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। Kyiv Independent এবং Reuters-এর গ্রাউন্ড রিপোর্ট অনুযায়ী, একটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারির পক্ষে সীমিত সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুই মোকাবেলা করা সম্ভব, এবং যখন এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি তার সর্বোচ্চ ক্ষমতার 'স্যাচুরেশন পয়েন্ট'-এ পৌঁছায়, ঠিক তখনই ঘটে আসল বিপর্যয়। ক্রেমলিন ঠিক সেই মোক্ষম মুহূর্তে ওরেসনিকের মতো অপ্রতিরোধ্য হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে তাদের মূল স্ট্র্যাটেজিক আঘাতটি নিশ্চিত করে, যখন ইউক্রেনের ডিফেন্স সিস্টেমগুলো পুনরায় রিলোড হওয়ার সময় পায় না। মে মাসের এই ধারাবাহিক ও বিধ্বংসী হামলায় প্যাট্রিয়টের এই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং ইউক্রেনের সামগ্রিক ব্যালিস্টিক ডিফেন্সের তীব্র ঘাটতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। ওরেসনিকের মতো মারণাস্ত্র ঠেকাতে ন্যাটোর বর্তমান বিমান প্রতিরক্ষা ডকট্রিন যে কতটা অপর্যাপ্ত, তা এখন পশ্চিমা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য গভীরতম চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪
ন্যাটোর উদ্দেশ্যে বার্তা: পারমাণবিক ছায়া ও রেড-লাইন।
কিয়েভ-এর উপরে এই বিধ্বংসী হামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর নিখুঁত ভূ-রাজনৈতিক সময়োপযোগিতা বা টাইমিং। পশ্চিমা বিশ্ব ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো যখন ইউক্রেনকে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানার জন্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (যেমন এটিএসিএমএস বা স্টর্ম শ্যাডো) ব্যবহারের সবুজ সংকেত দিচ্ছে, ঠিক তখনই ক্রেমলিন এই ওরেসনিক মিসাইলের মাধ্যমে তার পাল্টা জবাব দিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম CBS News এবং Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ মে ২০২৬-এর এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পুতিনের একটি সরাসরি ও আনুপাতিক কাউন্টার-মেসেজ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কাজা কালাস এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক যৌথ বিবৃতিতে এই হামলাকে ক্রেমলিনের একটি সুনির্দিষ্ট "রাজনৈতিক ভয় দেখানোর কৌশল" (Political intimidation) হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার যে 'রেড-লাইন' বা চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করছিল, ওরেসনিকের এই সফল উৎক্ষেপণ মূলত সেই রেখাটিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে, যা ন্যাটোর যুদ্ধকালীন রণকৌশলকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে।
ওরেসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের আত্মপ্রকাশের পেছনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক উপাদানটি হলো এর দ্বৈত-সক্ষমতা (Dual-capable) বা পারমাণবিক ছায়া। সামরিক ডকট্রিন এবং NPR-এর প্রতিরক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওরেসনিক মিসাইলটি প্রচলিত বা প্রথাগত (Conventional) বিস্ফোরক বহনের পাশাপাশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক (Nuclear) ওয়ারহেড বহনেও সমানভাবে সক্ষম। যদিও মে মাসের এই হামলায় কোনো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি, তবুও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং পশ্চিমা নেতারা এটিকে ক্রেমলিনের "বেপরোয়া পারমাণবিক মহড়া" (Reckless nuclear brinkmanship) হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এই হামলার মাধ্যমে ভ্লাদিমির পুতিন মূলত ন্যাটোকে স্পষ্ট দেখালেন যে, ইউরোপের যেকোনো প্রান্তে নিখুঁত ও অপ্রতিরোধ্য পারমাণবিক আঘাত হানার সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রাশিয়ার হাতে রয়েছে। এই কৌশলগত প্রদর্শনটি ন্যাটোর পূর্ব ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলোর—বিশেষ করে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ার মতো বাল্টিক রাষ্ট্রসমূহের—ওপর এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে। ওরেসনিকের এই ওয়েক-আপ কল ন্যাটোর সামগ্রিক প্রতিরক্ষা বলয়কে এক গভীর পারমাণবিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা শীতল যুদ্ধের পর ইউরোপের বুকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকট।
৫
বৈশ্বিক সংকল্পের পরীক্ষা (Test of Global Resolve) ।
ইউক্রেনের বুকে ওরেসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের এই নজিরবিহীন আঘাতকে পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্যের বিরুদ্ধে এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং জার্মানির চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী ফ্রিডরিশ মার্জসহ ন্যাটোর শীর্ষ নেতারা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) প্রধান উরসুলা ফন ডের লিয়েন ২৪ মে ২০২৬-এর এই আক্রমণকে ন্যাটোর জন্য একটি "বৈশ্বিক সংকল্পের পরীক্ষা" (Test of global resolve) বলে উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters এবং CBS News-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার মাধ্যমে ক্রেমলিন পশ্চিমা বিশ্বকে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও রূঢ় বার্তা দিয়েছে। বার্তাটি হলো—কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, কোনো কিছুতেই রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন চেইন (Military production line) ভেঙে পড়েনি। বরং তারা ন্যাটোর চেয়েও দ্রুত গতিতে অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মারণাস্ত্র তৈরি ও তা যুদ্ধক্ষেত্রে সফলভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম। এই হামলা পশ্চিমা দেশগুলোর ইউক্রেন নীতির কার্যকারিতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এবং ন্যাটো জোটের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছে।
৬
ইউক্রেনের আকাশে ওরেসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নজিরবিহীন আত্মপ্রকাশ প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত আর কেবল রাশিয়া এবং ইউক্রেনের আঞ্চলিক সীমান্ত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন হাই-টেক প্রযুক্তির এক বৈশ্বিক শক্তিমত্তার প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছে। ওরেসনিকের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর তৈরি করা বহু বিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষামূলক বলয়কে বিশ্বমঞ্চে এক প্রকার অকার্যকর এবং অসহায় ঘোষণা করলেন। আমেরিকার শীর্ষ সামরিক গবেষণা সংস্থা Institute for the Study of War (ISW) এবং আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বিশ্ব যদি রাশিয়ার এই 'চূড়ান্ত সতর্কবার্তা'কে হালকাভাবে নেয় এবং ইউক্রেন সংকট নিরসনে অতিসত্বর কোনো কার্যকর কূটনৈতিক পথ না খোঁজে, তবে এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। ওরেসনিকের এই মহড়া মূলত আগামী দিনে একটি সরাসরি রাশিয়া-ন্যাটো পারমাণবিক যুদ্ধের (Direct Russia-NATO Nuclear Conflict) প্রথম খসড়া বা রূপরেখা তৈরি করে দিল। মার্কিন গণমাধ্যম CBS News-এর ভূ-রাজনৈতিক প্যানেলের ইঙ্গিত অনুযায়ী, পশ্চিমা দূরপাল্লার মিসাইলের জবাব যদি মস্কো এভাবে হাইপারসনিক ও পারমাণবিক-সক্ষম মিসাইল দিয়ে দিতে থাকে, তবে যেকোনো মুহূর্তের একটি ছোট কৌশলগত ভুল বা মিসক্যালকুলেশন (Miscalculation) পুরো ইউরোপ মহাদেশকে একটি নিয়ন্ত্রণহীন পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই ওরেসনিকের এই গর্জন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো সাময়িক জয় নয়, এটি বৈশ্বিক নেতাদের জন্য বিশ্বযুদ্ধের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকার এক চূড়ান্ত ও চরম হুঁশিয়ারি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৫ মে ২০২৬