
১
ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ব্যাক-চ্যানেল বা পরোক্ষ কূটনীতি অবশেষে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজা ও লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক সামরিক আগ্রাসন এবং যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সমস্ত কূটনৈতিক আলোচনা ও খসড়া চুক্তি সংক্রান্ত যোগাযোগ স্থগিত করেছে তেহরান। ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর গভীর অনুপ্রবেশ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১২ শতকের ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গ দখল। তেহরানের নীতি নির্ধারণী মহল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের টোপ দিলেও, নিজস্ব 'প্রতিরোধ অক্ষ' তথা হিজবুল্লাহ ও হামাসের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে তারা কোনো একপাক্ষিক বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে যাবে না।
কূটনৈতিক এই অচলাবস্থার সমান্তরালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সংঘাত সরাসরি আকাশযুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার প্রমাণ কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার জবাবে সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন সেন্টকমের পাল্টা বিমান হামলা। একের পর এক অত্যাধুনিক মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতকরণ এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম ঘাঁটিতে মার্কিন সেনা হতাহতের ঘটনা প্রমাণ করে যে, ছায়া যুদ্ধ ছেড়ে দুই পক্ষ এখন সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে। এই তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কা লেগেছে, ব্লুমবার্গ-এর তথ্যমতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৭% বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলার ছাড়িয়েছে। ইরান যদি তার হুমকি অনুযায়ী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালী আংশিক বা সম্পূর্ণ ব্লক করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার কবলে পড়বে। ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া একমুখী শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তেহরান যে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, তা কুয়েত, লেবানন ও গাজা ফ্রন্টের চলমান সামরিক বাস্তবতার সাথে মিলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও সর্বাত্মক আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২
আলোচনা স্থগিতের নেপথ্য কারণ: গাজা ও লেবানন নীতি।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের বর্তমান অনমনীয় গাজা ও লেবানন নীতিই ওমান টকস স্থগিতের মূল নেপথ্য কারণ। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তাঁর নিয়মিত ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, আঞ্চলিক যেকোনো শান্তিচুক্তি বা সমঝোতার মূল ভিত্তি হতে হবে গাজা এবং লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। তেহরানের কৌশলগত অবস্থান হলো—কেবল নিজস্ব স্বার্থ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তারা ওয়াশিংটনের সাথে কোনো একক চুক্তিতে যাবে না। ইরানের নীতি নির্ধারণী মহলের মতে, ইসরাইল যদি তাদের আঞ্চলিক মিত্র হিজবুল্লাহ এবং হামাসের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ওমান টকসের খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনার আর কোনো কার্যকারিতা থাকে না। মূলত দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের সাম্প্রতিক গভীর সামরিক অনুপ্রবেশ এবং ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গ দখলের ঘটনাই ইরানকে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক সংস্থাগুলোর মতে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা বার্তা আদান-প্রদান স্থগিত করে ইরান ওয়াশিংটনকে এই বার্তাই দিল যে, পুরো 'প্রতিরোধ অক্ষের' নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্ভব নয়।
৩
দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের গভীর ইনকার্সন ও বোফোর্ট দুর্গ দখল।
ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস লিটানি নদী অতিক্রম করে গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গভীর স্থল অভিযানের মাধ্যমে কৌশলগত ও ঐতিহাসিক ১২ শতকের বোফোর্ট দুর্গ দখল করে সেখানে ইসরাইলি পতাকা উত্তোলন করেছে, যা চলমান কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল ভেঙে যাওয়ার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এই বিজয়ের পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে সামরিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বৈরুতসহ হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে অভিযান আরও জোরদার ও সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাব এবং লেবাননে গভীর অনুপ্রবেশের ফলেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান ওমান টকস স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ক। কৌশলগত বোফোর্ট দুর্গ দখল।
ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গটি দক্ষিণ লেবাননের একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত, যা প্রাকৃতিকভাবেই লিটানি নদী ও উত্তর ইসরাইলের বিস্তীর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বাদশ শতকের ক্রুসেডারদের নির্মিত এই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাসে যেকোনো বাহিনীর জন্য আধিপত্য বিস্তারের প্রতীক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক বিশাল বিজয়ের স্মারক হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৮ বছর এখানে ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর সফল প্রতিরোধ ও পরবর্তীতে দুর্গটি পুনরুদ্ধার লেবানিজদের জাতীয় বীরত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছিল। সম্প্রতি আইডিএফ কর্তৃক পুনরায় এই দুর্গে ইসরাইলি পতাকা উত্তোলন হিজবুল্লাহর প্রতিরক্ষামূলক দুর্ভেদ্যতার মিথ ভেঙে দিয়েছে এবং হিজবুল্লাহ সমর্থকদের মনস্তত্ত্বে গভীর আঘাত হানাসহ বড় ধরনের হতাশা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা জেনস এবং মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষকদের মতে, এই ঐতিহাসিক ঘাঁটির পতন হিজবুল্লাহর দক্ষিণ লেবাননের সামগ্রিক প্রতিরোধ ও নজরদারি ব্যবস্থাকে মারাত্মক সামরিক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।
খ। নেতানিয়াহুর অনমনীয় অবস্থান।
ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর হিজবুল্লাহর প্রতিরক্ষামূলক ব্যর্থতা এবং ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস-এর আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু সামরিক কৌশল কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ সংস্থা জেনস এবং সামরিক পর্যবেক্ষণ সাইটগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ইসরাইলি কমান্ডো ও সাঁজোয়া বাহিনী লিটানি নদী অতিক্রম করে এই অভিযান শুরু করে। বিগত মাসগুলোতে তীব্র বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর বাঙ্কার ও ভূগর্ভস্থ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার পর, আইডিএফ ড্রোন প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং ত্রিমাত্রিক সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে চারপাশ থেকে দুর্গটি অবরুদ্ধ করে ফেলে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতৃত্বের শূন্যতা, তীব্র জ্যামিংয়ের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বিমান প্রতিরক্ষার অভাবের কারণে হিজবুল্লাহ এই কৌশলগত পাহাড়ের চূড়াটি ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে ১ জুনের মধ্যে আইডিএফ দুর্গটি দখল করে নেয়।
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে সামরিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং "নাটকীয় মোড়" আখ্যা দিয়ে বৈরুতসহ লেবাননের সমস্ত হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সামরিক অভিযান আরও জোরদার ও সম্প্রসারণের নির্দেশ দেন। ইসরাইলের এই অনমনীয় ও চরম আগ্রাসী মনোভাবের কারণে তেহরান স্পষ্ট বুঝতে পারে যে, ওয়াশিংটন ইসরাইলকে থামানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে, ইরানের নীতি নির্ধারণী মহল প্রতিরোধ অক্ষের নিরাপত্তা ও নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ওমানে চলমান সমস্ত পরোক্ষ আলোচনা ও খসড়া চুক্তি সংক্রান্ত যোগাযোগ স্থগিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বোফোর্ট দুর্গের পতন এবং নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী অবস্থানই মূলত ওয়াশিংটন-তেহরান ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতিকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
৪
সামরিক পাল্টা আঘাত: মার্কিন-ইরান আকাশযুদ্ধ ও পারস্পরিক বিমান হামলা।
ওমান টকস ভেস্তে যাওয়ার সমান্তরালে মার্কিন-ইরান সামরিক উত্তেজনা নতুন চরমে পৌঁছেছে, যার বড় প্রমাণ ব্লুমবার্গ এবং ইউক্রেনীয় সামরিক সংস্থা মিলিটারনি-এর রিপোর্ট অনুযায়ী কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে ইরানের ফাতেহ-১১০ মিসাইল হামলা। মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর এই ধারাবাহিক ড্রোন ভূপাতিতকরণ, বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং সরাসরি ভূখণ্ডে পাল্টা আঘাতের ঘটনাই ওমান টকসের কূটনৈতিক খসড়া চুক্তিকে সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছে।
ক। কুয়েত ঘাঁটিতে আঘাত ও সেনাহতাহতের বিবরণ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ এবং সামরিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক পোর্টালগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, কুয়েতের প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা ইরানি 'ফাতেহ-১১০' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়। তবে ইন্টারসেপ্ট করার পর ক্ষেপণাস্ত্রটির অত্যন্ত ভারী ও জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিচে মার্কিন সেনারা অবস্থান করা মূল 'ফ্লাইট লাইন' বা হ্যাঙ্গারের ওপর এসে আছড়ে পড়ে। মার্কিন সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ঘাঁটিতে কর্মরত অন্তত ৫ জন মার্কিন সক্রিয় সেনা ও বেসামরিক ঠিকাদার আহত হয়েছেন। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এবং চিকিৎসকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, আক্রান্তদের ক্ষতগুলো আশঙ্কাজনক না হওয়ায় তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
খ। মার্কিন ও ইরানি ড্রোন ধ্বংসের বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামরিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাইটগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের ফলে উভয় পক্ষের কোটি কোটি ডলার মূল্যের ড্রোন বহরের ব্যাপক বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে গত ২৮ মে আছড়ে পড়া ইরানি ফাতেহ-১১০ ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আমেরিকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও আধুনিক একটি MQ-9 Reaper ড্রোন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় আরেকটি ড্রোন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার। এর পাশাপাশি, ইয়েমেনের মারিব প্রদেশের আকাশে হুথি বিদ্রোহীরা বিমান বিধ্বংসী মিসাইল দিয়ে আমেরিকার আরেকটি MQ-9 Reaper ড্রোন ভূপাতিত করে, যার ধ্বংসাবশেষের ছবি ও ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। এছাড়াও গালফ নিউজ এবং ইরানের বার্তা সংস্থা ইরনা-এর বরাতে জানা যায়, ৩১ মে ২০২৬ তারিখে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী তেহরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী এবং শত্রুতামূলক মিশনে নিয়োজিত একটি মার্কিন MQ-1 প্রিডেটর ড্রোনকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে সফলভাবে ভূপাতিত করার দাবি করে। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, মার্কিন ড্রোনটির এই অনুপ্রবেশ ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি এবং যুক্তরাষ্ট্র আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে তার জবাব দেওয়ার ‘বৈধ ও সুনিশ্চিত’ অধিকার তেহরান সর্বদা সংরক্ষণ করে।
গ। ইরানের গোরুক ও কেশম দ্বীপে আমেরিকার বিমান হামলা।
ইরানের ধারাবাহিক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন ড্রোনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে পাল্টা আঘাত হানে। আল-জাজিরা-র ১ জুন ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনী গত সপ্তাহান্তে ইরানের গোরুক শহর ও কৌশলগত কেশম দ্বীপে দেশটির রাডারসহ ড্রোন–সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ‘আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। সেন্টকম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছে, মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের সহায়তায় চালানো এই হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, একটি স্থলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ও একমুখী হামলার জন্য প্রস্তুত দুটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে, যেগুলো আঞ্চলিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজের জন্য ‘স্পষ্ট হুমকি’ ছিল।
৫
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাত্ক্ষণিক ধাক্কা।
ওমান টকস ভেস্তে যাওয়া এবং কুয়েত-লেবানন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হতেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পণ্য বাজার ও ব্লুমবার্গ- এর ডেটা অনুযায়ী, শান্তি আলোচনা স্থগিতের খবরের সাথে সাথেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৫% থেকে ৭% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড-এর মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৫ থেকে ৯৭ ডলারের ওপরে উঠে গেছে এবং একই সময়ে মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রুড-এর দামও প্রায় ৬% বেড়ে ৯২ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী এই অঞ্চলে মার্কিন-ইরান সরাসরি সামরিক সংঘাতের কারণে তেলের শিপিং বা লজিস্টিকস খরচও রাতারাতি বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক এনার্জি অ্যানালিস্টদের আশঙ্কা, ইরান যদি তাদের হুমকি অনুযায়ী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালী আংশিক বা সম্পূর্ণ ব্লক করার দিকে হাঁটে, তবে তেলের দাম খুব দ্রুতই ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা পার হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় মন্দার মুখে ফেলবে।
৬
ওমান টকসের আকস্মিক সমাপ্তি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-ইরান প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাত প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্য এখন আর কোনো প্রক্সি যুদ্ধের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, প্রতিরোধ অক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে মধ্যপ্রাচ্যে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মার্কিন চেষ্টা কখনো সফল হবে না। তবে এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এবং সামরিক সংঘাতের পরিধি আরও বাড়লে এর সম্ভাব্য ফলাফল হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। একদিকে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করার মরিয়া চেষ্টা এবং অন্যদিকে ইরান ও ইয়েমেনের মাধ্যমে মার্কিন স্বার্থে ধারাবাহিক ড্রোন-মিসাইল হামলা সমগ্র আরব উপদ্বীপকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের খপ্পরে ফেলে দেবে, যা আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ওয়াশিংটনকে একপাক্ষিক চাপ প্রয়োগের নীতি পরিহার করে ইসরাইলের আগ্রাসী সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে লাগাম টানতে হবে। গাজা এবং লেবাননে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তেহরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যদি কূটনৈতিক ব্যাক-চ্যানেলগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে বৈশ্বিক শক্তিগুলো ব্যর্থ হয়, তবে হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মানদাব প্রণালী সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হওয়ার মতো চরম ঝুঁকি তৈরি হবে, যার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা ছাড়িয়ে যাবে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে, যা ইতিমধ্যে যুদ্ধ-জর্জরিত বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আঞ্চলিক প্রতিটি পক্ষের যৌথ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেওয়া ছাড়া বিশ্বনেতৃত্বের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২ জুন ২০২৬