
১
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে জেন-জি (Gen Z) আন্দোলন এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঢেউ তুলেছে। প্রচলিত শাসনব্যবস্থার প্রতি তীব্র হতাশা, আকাশছোঁয়া বেকারত্বের জ্বালা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এই তরুণ প্রজন্মকে একটি অভিন্ন ছাতার নিচে এনেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও যুববিদ্রোহের সাফল্য স্বভাবতই ভারতের রাজনৈতিক মহলেও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে লাদাখে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা এবং সম্প্রতি ভারতের মূল ভূখণ্ডে আলোড়ন তোলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র আকস্মিক উদয় এটিই প্রমাণ করছে যে, ভারতের বিশাল তরুণ জনসংখ্যাও এখন এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছে। ডিজিটাল মাধ্যমে সংযুক্ত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন এই নতুন প্রজন্ম প্রচলিত দলগুলোর চেনা ছক ও পুরোনো রাজনৈতিক এজেন্ডাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক অভিনব রূপান্তর চাইছে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই যুব-আন্দোলনের ঢেউয়ে ভারতের কোণায় কোণায় জমে থাকা তরুণদের চাপা অসন্তোষ ও ক্ষোভ এখন আর শুধু স্মার্টফোনের চারকোনা স্ক্রিনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই, তা আছড়ে পড়ছে বাস্তবের রাজপথে। ভারতের ১৪৩ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২৬% থেকে ২৮% অংশই হলো এই জেন-জি প্রজন্ম, যা বিশ্বের বৃহত্তম যুবশক্তি হিসেবে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে এক অনস্বীকার্য চালিকাশক্তি হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থার চরম অস্থিতিশীলতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি এবং যুবসমাজের প্রতি নীতিনির্ধারকদের চরম উদাসীনতা এই প্রযুক্তিবন্ধু প্রজন্মকে এক ইস্পাতকঠিন জোটে পরিণত করেছে। ব্যালট পেপারের ধার না ধেরে কেবল ক্ষুরধার মিম, ইনস্টাগ্রাম রিলস আর ঝাঁঝালো হিউমারকে হাতিয়ার করে গড়ে ওঠা রাজপথের আন্দোলন প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোর অহংকারকে চূর্ণ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
২
জেন-জি আন্দোলনের সম্ভাব্য কারণ ও ক্ষেত্র।
ভারতে বর্তমানে জেনারেশন জেডের বিশাল জনমিতি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক অভূতপূর্ব ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী এই জনগোষ্ঠী সংখ্যায় প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৬% থেকে ২৮%। এই বিপুল তরুণ সমাজ শুধু সংখ্যার দিক থেকেই অগ্রগামী নয়, বরং তারা ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারকারী এবং নিজস্ব অধিকার নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। কর্মসংস্থানের অভাব, সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থার চরম অস্থিতিশীলতা এবং প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর অবহেলা এই প্রজন্মকে একটি অভিন্ন ক্ষোভের প্ল্যাটফর্মে দাঁড় করিয়েছে। ফলে, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ভারতের এই ডিজিটাল প্রজন্মও এখন যেকোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
ক। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীব্র কর্মসংস্থান সংকটই জেন-জিদের অসন্তোষের প্রধান কারণ। যদিও ২০২৩ সালের সরকারি পরিসংখ্যানে সামগ্রিক বেকারত্ব ৫.১% দেখানো হয়েছে, কিন্তু শিক্ষিত তরুণদের (১৫-২৯ বছর) মধ্যে এই হার ছিল ১৩.৪% এবং গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে তা ১৫% থেকে ১৯% পর্যন্ত পৌঁছায়। শ্রমবাজারের এই সংকটের গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে বিশ্বব্যাংকের ডেটা বলছে যে, গত বছর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। আবার আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার ভারতীয়দের মধ্যে ৬৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত স্নাতক পাস। এই হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (NEET)-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও কারিগরি ত্রুটি শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। বছরের পর বছর কোটা শহরের মতো জায়গায় দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রমের পরও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা তরুণদের ভবিষ্যৎকে এক চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
খ। ডিজিটাল সংযোগ ও মিম-বিপ্লব।
ভারতের বিশাল স্মার্টফোন নেটওয়ার্ক এবং সোশ্যাল মিডিয়া জেন-জিদের প্রথাবিরোধী আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দেশে বর্তমানে ৮৫ কোটির বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন এবং ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটে যুক্ত। ২০২৪ সালের শুরুতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ভারতীয়দের সংখ্যা ৪৯.১ কোটিতে পৌঁছায়, যা এই তরুণদের একটি বিশাল ভার্চুয়াল কমিউনিটি তৈরিতে সাহায্য করেছে। কোনো চেনা প্রথাগত নেতৃত্ব ছাড়াই কেবল ক্ষুরধার মিম (Memes), ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং টুইটার ট্রেন্ডের মাধ্যমে তারা মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষকে এক ছাতার নিচে সংগঠিত করতে পারছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই অ্যালগরিদমকে কাজে লাগিয়ে ‘ককরোচ জনতা party’ (CJP)-র মতো প্ল্যাটফর্মগুলো স্ক্রিনের দেয়াল ভেঙে বাস্তবের রাজপথে সফলভাবে গণবিক্ষোভ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
গ। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব ও প্রজন্মগত ব্যবধান।
ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে নতুন প্রজন্মের এক গভীর আদর্শিক ও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পারিবারিক শাসন, স্বজনপ্রীতি এবং পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, যা আধুনিক তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা যেখানে প্রথাগত ভোটব্যাংকের রাজনীতি করেন, সেখানে জেন-জি প্রজন্ম কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ডিজিটাল স্বাধীনতার মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে স্পষ্ট জবাবদিহি চায়। এই গভীর প্রজন্মগত ব্যবধান ও যোগ্য নেতৃত্বের সংকট তরুণদেরকে প্রচলিত শাসনকাঠামোর প্রতি সম্পূর্ণ বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে। ফলে, তারা নিজেদের আর কেবল ‘পাঁচ বছর পর পর ভোটের মাধ্যম’ হিসেবে দেখতে রাজি নয়, বরং প্রতিনিয়ত অধিকার আদায়ের এক স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
৩
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP): অপমান থেকে জন্ম নেওয়া অভিনব ডিজিটাল বিদ্রোহ।
ভারতের প্রথাবিরোধী ইন্টারনেট বিপ্লব ও জেন-জি আন্দোলনের সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ হলো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)। এটি কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক মোর্চা নয়, বরং লাখ লাখ হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণের এক অভিনব ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিবাদ (Satirical Movement)। "Voice of the Lazy & Unemployed" স্লোগান এবং 'আরশোলা' লোগো নিয়ে গড়ে ওঠা এই দলটির মূল দর্শন হলো—পারমাণবিক বিস্ফোরণেও আরশোলা যেভাবে টিকে থাকে, চরম প্রতিকূল অর্থনৈতিক বাজার এবং ভঙ্গুর চাকরির পরিস্থিতিতেও ভারতের যুবসমাজ আরশোলার মতোই লড়াই করে টিকে থাকবে। এই ব্যতিক্রমী রূপকটি ব্যবহার করে জেন-জি প্রজন্ম ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, অবহেলিত সাধারণ জনতাকে আর সহজে দমানো যাবে না।
এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও বিস্ফোরক মন্তব্য। ১৫ মে ২০২৬ তারিখে একটি মামলার শুনানির সময় মাননীয় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশের বেকার যুবকদের একাংশকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেন যে, কর্মহীন তরুণদের অনেকেই "আরশোলা (Cockroaches)-এর মতো আচরণ করছে", যারা স্থায়ী চাকরি না পেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা আরটিআই (RTI) কর্মী সেজে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকমেইল বা আক্রমণ করে বেড়ায়। প্রধান বিচারপতি পরে দাবি করেন, তিনি ভুয়া ও জাল ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় আসা ব্যক্তিদের উদ্দেশে এমন মন্তব্য করেছিলেন এবং গণমাধ্যম তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছে, তবে ততক্ষণে তার এই অপমানজনক কথাই তরুণদের প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তম্ভের এই মন্তব্যটি আকাশছোঁয়া বেকারত্বের বাজারে যুবসমাজের আত্মসম্মানে আঘাত করায় ১৬ মে ২০২৬ তারিখে বোস্টন ইউনিভার্সিটির পাবলিক রিলেশনসের স্নাতক ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দিপকে রসিকতা ও ক্ষোভের মিশেলে 'ককরোচ জনতা পার্টি' গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন; চালুর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় এর ইনস্টাগ্রাম পেজের ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অফিশিয়াল ফলোয়ারের চেয়েও অনেক বেশি।
বাহ্যিকভাবে এটি মিম ও হিউমার-ভিত্তিক মনে হলেও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত তাদের অফিশিয়াল ইশতেহারে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা, প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন, বিচারপতিদের অবসরের পর সরকারি লাভজনক পদ না দেওয়া, নারীদের জন্য ৫০% আসন সংরক্ষণ এবং তথ্যের অধিকার (RTI) রক্ষায় অ্যাক্টিভিস্টদের পূর্ণ সুরক্ষার মতো অত্যন্ত গভীর ও বৈপ্লবিক দাবি তোলা হয়েছে। এই আন্দোলন এখন আর শুধু স্ক্রিনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই, তা আছড়ে পড়েছে বাস্তবের রাজপথে। ৬ জুন ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লির যান্তর মন্তরে শত শত তরুণ প্রতীকী আরশোলার মুখোশ ও প্লাকার্ড হাতে প্রথম মাঠপর্যায়ের বৃহৎ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে এবং সরাসরি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান তোলে, "তেলাপোকা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে"। একই সাথে তারা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ ও যমুনা নদী পরিষ্কারের মতো বাস্তবমুখী সামাজিক কাজের মাধ্যমে প্রতিবাদের এক নতুন ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
৪
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও মেরুকরণ।
যদি এই জেন-জি আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক বড় ধরনের 'প্যারাডাইম শিফট' বা আদর্শিক পরিবর্তন ঘটবে। এএনআই এবং বিভিন্ন মূলধারার গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির এই উত্থানে বিজেপি, কংগ্রেস বা আঞ্চলিক দলগুলো তরুণ ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে; এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী শিবিরের আন্দোলনে বাংলাদেশের আদলে 'দফা এক, দাবি এক' স্লোগান ব্যবহার করতে দেখা গেছে। একই সাথে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই দলের মেম্বারশিপ গ্রহণ করায় প্রথাগত দলগুলোর ওপর চাপ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে, লাদাখে পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন এবং এই ককরোচ মুভমেন্ট প্রমাণ করে যে, তরুণরা প্রথাগত দলগুলোর ওপর ভরসা না করে নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে পুরোপুরি সক্ষম।
এই গণজোয়ার রুখতে গিয়ে সরকারের দমনমূলক নীতি ও সাইবার প্রতিরোধ ব্যবস্থা রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংঘাতের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। পিটিআই (PTI) এবং লুধিয়ানা পুলিশের তথ্যমতে, ২১ মে ২০২৬ তারিখে সরকারের বিশেষ অনুরোধে সিজেপির অফিশিয়াল 'এক্স' হ্যান্ডেল ব্লক করা হয়, পাঞ্জাব পুলিশ হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিং লিংক নিয়ে সতর্কতা জারি করে এবং সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দিপকের মহারাষ্ট্রের বাসভবনের বাইরে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দ্য টেলিগ্রাফের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে যে, সরকার যদি এই ডিজিটাল ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে শুধুমাত্র আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখে কঠোর দমনের পথ বেছে নেয়, তবে তরুণদের ক্ষোভ আরও তীব্র হবে। লাদাখে সোনাম ওয়াংচুককে আটক করা কিংবা দিল্লির যান্তর মন্তরের আন্দোলন দমনের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সংঘাতময় রূপ নিতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
৫
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ: 'মুভমেন্ট' নাকি 'মোমেন্ট'?
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই অভূতপূর্ব প্রসার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক রূপ নেবে নাকি সাময়িক ইন্টারনেট ট্রেন্ড হয়েই হারিয়ে যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিশ্লেষণ চলছে। নাগরিক সমাজের প্রচার গোষ্ঠী ‘ভারত জোড়ো অভিযান’-এর জাতীয় আহ্বায়ক যোগেন্দ্র যাদব দ্য টেলিগ্রাফ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিজেপি আন্দোলনের তাৎপর্য নিয়ে বলেন, “আমি এখনো সিজেপিকে কোনো আন্দোলন (মুভমেন্ট) হিসেবে দেখি না; এটিকে একটি মুহূর্ত (মোমেন্ট) হিসেবে ধরাই ভালো।” তার মতে, এই মোমেন্ট বা মুহূর্তটি আসলে সমসাময়িক ভারতের এক গভীর বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে, যা মোদি সরকারের প্রতি তরুণদের ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি এবং প্রথাগত বিরোধী দলগুলোর শূন্যতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। সংসদীয় বিরোধী দলগুলো তরুণদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে না পারার কারণেই হঠাৎ করে এমন একটি বিকল্প প্রতিবাদের জায়গার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এই ক্ষণস্থায়ী 'মুহূর্ত' যেকোনো সময় এক বিশাল গণআন্দোলনে রূপ নেওয়ার সব উপাদান ধারণ করে, যা বিভিন্ন সমীক্ষায় প্রতীয়মান। পোলস্টার ‘সিভোটার’-এর সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চান, যা তরুণদের তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক অসন্তোষের প্রমাণ। যদিও বিশ্বমঞ্চে মোদির জনপ্রিয়তা এখনো অনন্য এবং গত মার্চে প্রকাশিত ‘মর্নিং কনসাল্ট’-এর এক জরিপে দেখা যায় যে ভারতের ৬৮ শতাংশ মানুষ তার কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, তবুও এই জেন-জি ঢেউকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ব্যালট বাক্সের রাজনীতিতে এটি সরাসরি তাৎক্ষণিক কোনো নির্বাচনী হুমকি তৈরি না করলেও, দেশের কর্মক্ষম বিশাল যুবসমাজের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দীর্ঘমেয়াদে ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণী কাঠামোর জন্য এক বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
৬
ডিজিটাল স্ক্রিনের ধারালো মিম থেকে শুরু হয়ে দিল্লির যান্তর মন্তরের রাজপথে আছড়ে পড়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কিংবা লাদাখের যুব-বিক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে, ভারতের রাজনীতিতে জেন-জি প্রজন্ম এক নতুন ব্যাকরণ তৈরি করছে। বাহ্যিকভাবে একে কেবলই রসিকতা কিংবা সাময়িক ক্ষোভ মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে শিক্ষিত যুবসমাজের তীব্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার এক বাস্তব দলিল। প্রতিবেশী বাংলাদেশ বা নেপালের মতো কোনো রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান কিংবা প্রথাগত শাসনকাঠামো ভেঙে ফেলার উগ্র রূপ ধারণ না করলেও, এই আন্দোলন ক্ষমতার অলিন্দে থাকা নীতিনির্ধারকদের এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। আরশোলার মতো শত প্রতিকূলতার মুখেও টিকে থাকার যে জেদ এই তরুণরা মিমের আড়ালে তুলে ধরছে, তা আসলে ভারতের ভেঙে পড়া সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থা, আকাশছোঁয়া বেকারত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবের বিরুদ্ধে এক যুগান্তকারী নাগরিক পাহারাদার।
নির্বাচন কমিশনের খাতায় হয়তো কোনোদিন এই ব্যঙ্গাত্মক দলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আসবে না, তবে ভারতের কোটি কোটি তরুণের মনস্তত্ত্বে এবং সমাজ সংস্কারের ভাবনায় তারা যে স্থায়ী দাগ কেটে গেছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ভার্চুয়াল স্পেসের ক্ষোভকে যমুনা নদী পরিষ্কার বা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের মতো বাস্তব ও গঠনমূলক কাজের সাথে যুক্ত করে এই প্রজন্ম প্রতিবাদের এক ইতিবাচক ও আধুনিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্বমঞ্চে ভারতের বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তা যতই সুসংহত থাকুক না কেন, দেশের কর্মক্ষম বিশাল জনগোষ্ঠীর এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে অবহেলা করা দীর্ঘমেয়াদে যেকোনো একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কিবোর্ডের বোতাম থেকে শুরু হওয়া এই আরশোলা-বাহিনীর অহিংস প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত এটাই প্রমাণ করল যে, একটি সুতীক্ষ্ণ আইডিয়া বা মিম আজ পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী উপায়ে রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়ে সমান্তরাল এক অদৃশ্য শক্তির উত্থান ঘটাতে পারে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৭ জুন ২০২৬