
১
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘কঠিন’ হামলার হুমকির পরপরই ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসসহ একাধিক শহরে বড় ধরনের বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই আকস্মিক ও জোরালো হামলার সত্যতা নিশ্চিত করার পর সমগ্র অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই মার্কিন আগ্রাসনের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক তরল জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনকারী এই কৌশলগত জলপথটি অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশগুলোর দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই মুখোমুখি সামরিক অবস্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় এক অভূতপূর্ব ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম দিয়েছে।
২
হামলার প্রেক্ষাপট ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি।
গত মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬ তারিখে ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান পরিকল্পিতভাবে এই হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে, যদিও মার্কিন সেন্টকম একে একটি সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে দুই পাইলটকে অক্ষত উদ্ধারের কথা জানায়। তবে ট্রাম্প এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি ইরানি আঘাত হিসেবে গণ্য করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের প্রায় ২০টি সামরিক স্থাপনায় একযোগে জোরালো বিমান হামলা চালায়।
এই হামলার পর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় ঘোষণা করেন, “আমরা গতকাল তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি এবং আজকেও তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি” । একই সাথে তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ইরানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে এবং দেশটি দ্রুত একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে যাচ্ছে। তিনি তেহরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে সাফ জানিয়ে দেন, তারা যদি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে সই করতে রাজি না হয়, তবে পরবর্তী ধাপে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
৩
মার্কিন অভিযান: ২০টি নিশানায় একযোগে আঘাত।
সেন্টকমের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী প্রায় চার ঘণ্টা ধরে ইরানের অভ্যন্তরে একযোগে জোরালো হামলা চালায়। মূলত কৌশলগত হরমুজ উপকূল এবং এর আশেপাশের সামরিক অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে এই বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের অভ্যন্তরে থাকা প্রায় ২০টি সুনির্দিষ্ট সামরিক নিশানায় নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে তাদের বাহিনী।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্যমতে, মার্কিন হামলায় প্রধান প্রধান বিস্ফোরণগুলো ঘটেছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের অন্যতম প্রধান নৌঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস। সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণের পাশাপাশি মার্কিন হামলা প্রতিহত করতে কর্তৃপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার বিকট শব্দ পাওয়া গেছে। এদিকে মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখের নিকটবর্তী জাস্ক অঞ্চল এবং গোরগানসহ দেশের অন্যান্য কৌশলগত পয়েন্টে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে যে, কেশম দ্বীপ ও সিরিক বন্দরে মার্কিন বাহিনীর চালানো বিমান হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং দুটি বেসামরিক পানির ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
৪
ইরানের পাল্টা জবাব: ২১টি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা।
মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরান কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানেই থাকেনি, বরং অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে। আইআরজিসি প্রেস উইংয়ের দাবি অনুযায়ী, তারা ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে (বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডান) অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোর মোট ২১টি নিশানায় একযোগে সফল হামলা চালিয়েছে।
প্রধান প্রধান পাল্টা আঘাতের বিবরণ দিতে গিয়ে আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ৪টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তাদের দাবি, এতে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে; যদিও জর্ডান ও মার্কিন বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ৫টি ক্ষেপণাস্ত্রই আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। অন্যদিকে আল-জাজিরা আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রতিবেদন অনুসারে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর ও শেখ ইসা বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালানো হলে বাহরাইন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করে তা প্রতিহত করে। এছাড়া কুয়েতের আলী আল সালেম ও আহমদ আল জাবের মার্কিন বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানো হয় এবং কুয়েত সামরিক বাহিনী উচ্চ সতর্কতায় থেকে এগুলো প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করেছে।
৫
হরমুজ প্রণালি বন্ধ: অবরুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি পথ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাবটি পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। ইরানি সংবাদ সংস্থা ‘মেহের’-এর পরিবেশিত সামরিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইরানের সামরিক হাই কমান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আইআরজিসি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই নির্দেশ অমান্য করে কোনো জাহাজ অবৈধভাবে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে তাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং ইতিমধ্যে হরমুজে প্রবেশ করতে যাওয়া দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলেও তেহরান দাবি করেছে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখ্য যে, এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তরল জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধানতম লাইফলাইনটি আকস্মিক বন্ধের ঘোষণা আসার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন অর্থনৈতিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
৬
কূটনৈতিক তৎপরতা ও বর্তমান পরিস্থিতি।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা বা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। এই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হতে থাকে।
বর্তমান চরম ও নজিরবিহীন সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই গত বুধবার সকালে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদল জরুরি ভিত্তিতে ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে। সিএনএন ডিপ্লোম্যাটিক ব্যুরোর দেওয়া বিশেষ প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কাতার মূলত ওয়াশিংটনের সাথে পরোক্ষ আলোচনা করে দুই পক্ষের মধ্যকার বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। মধ্যস্থতাকারী এই দলটি দুই দেশকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঠের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন আলোচনার টেবিল ছেড়ে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানের দিকেই বেশি ঝুঁকছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের মুখোমুখি হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দৃঢ়তা পরীক্ষা করছে। নিরাপদ থাকতে চাইলে মার্কিন বাহিনীকে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে হবে”। অন্যদিকে, তেহরানের অবস্থান জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটন বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সব ধরনের ‘কূটনৈতিক যোগাযোগ’ পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
৭
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই নজিরবিহীন সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা বিশ্বকে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এই সংকট আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক ধ্বংসাত্মক বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ করণীয় হলো—উভয় পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধের ময়দান থেকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জ্বালানি পথকে সচল করা। ওয়াশিংটন যদি উসকানিমূলক হুমকি বন্ধ না করে এবং তেহরান যদি কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেয়, তবে জ্বালানি সংকটের চরম ধাক্কায় বিপর্যস্ত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতি। পরিশেষে, রক্তক্ষয়ী সংঘাত এড়াতে বিশ্বনেতাদের এখনই কার্যকর ও জোরালো চাপ সৃষ্টি করতে হবে, অন্যথায় মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১১ জুন ২০২৬