
১
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অভূতপূর্ব মার্কিন-ইরান সরাসরি সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্ববাসী যখন একটি বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল, ঠিক তখনই নতুন করে লেবাননে তীব্র আঘাত হেনেছে ইসরাইল। প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ইঙ্গিত অনুযায়ী—১৪ জুন ২০২৬ (রোববার) তারিখে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক প্রাথমিক শান্তি চুক্তি সই হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ঠিক এই চূড়ান্ত মুহূর্তেই লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইসরাইলের আকস্মিক ও ভয়াবহ বিমান হামলা পুরো শান্তি প্রক্রিয়াকে এক গভীর ও নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তার ৮০তম জন্মদিনে তড়িঘড়ি করে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য পাওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত "শান্তি কূটনীতি", অন্যদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিজস্ব নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার অনমনীয় সামরিক অবস্থান—এই দুইয়ের তীব্র টানাপোড়েনে এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে: কোন পথে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য চুক্তি এবং এর চূড়ান্ত পরিণতিই বা কী?
২
শেষ মুহূর্তে বৈরুতে ইসরাইলের আঘাত ও হিজবুল্লাহ ফ্রন্ট।
১৪ জুন ২০২৬ তারিখে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপশহর ঘোবেইরিতে ইসরাইলের চালানো আকস্মিক বিমান হামলায় অন্তত ৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনীতিতে এক ভয়াবহ ঝাঁকুনি দিয়েছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি' প্রকাশিত দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাতে বৈরুত হামলার এই প্রাথমিক হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। হামলার পরপরই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ যৌথ সামরিক ইশতেহার জারি করা হয়, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে, হিজবুল্লাহ কর্তৃক ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত সংলগ্ন বসতি শোমেরা ও শ্লোমিতে তিনটি রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সুনির্দিষ্ট জবাবেই এই পালটা বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইসরাইলি প্রশাসনের পক্ষ থেকে হিজবুল্লাহর এই রকেট হামলাকে দুই পক্ষের মধ্যে পূর্বঘোষিত অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি চরম ও অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে, যদিও হিজবুল্লাহর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শ্লোমি এলাকার কাছাকাছি খালি জায়গায় পড়ায় সেখানে কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার একটি বহুল প্রত্যাশিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঠিক আগমুহূর্তে বৈরুতের ঘনবসতিপূর্ণ শহরতলিতে ইসরাইলের এই ভারী বোমাবর্ষণকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা কেবল একটি সামরিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না, বরং একে অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পুঞ্জীভূত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২ মার্চ ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক ইসরাইলি আগ্রাসনে লেবাননে ইতিমধ্যে নিহতের সংখ্যা ৩,৭৮৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং একই সময়ে আহতের সংখ্যা ১১,৬৯৯ জন ছাড়িয়ে গেছে, যার ফলে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ ১০ লাখের বেশি মানুষ স্থায়ী ও সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক পৃষ্ঠপোষক তেহরান শুরু থেকেই ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনায় একটি অনমনীয় শর্ত দিয়ে আসছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে অবশ্যই লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধের আইনি নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতায় যখন ১৪ জুনের মধ্যে ওয়াশিংটন-তেহরান প্রাথমিক শান্তি চুক্তি সই হওয়ার কথা ছিল, ঠিক তখন বৈরুতে এই হামলা চালিয়ে ইসরাইল মূলত ইরান ও হিজবুল্লাহকে একটি বড় ধরনের পালটা হামলার উসকানি দেওয়ার কৌশলগত চাল চেলেছে। ইসরাইল মূলত হিজবুল্লাহর সাথে তাদের ফ্রন্টলাইন যুদ্ধকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও স্বায়ত্তশাসিত রাখতে চায়, যেন তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের চুক্তি হলেও লেবাননে তাদের সামরিক আধিপত্য বজায় থাকে। তবে ফার্স নিউজ এবং সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির ঠিক আগমুহূর্তে বৈরুতে ইসরাইলের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের ফলে ক্ষুব্ধ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অবিলম্বে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া স্থগিত করার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শান্তি কূটনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
৩
ট্রাম্পের জন্মদিন, "অস্বাভাবিক জেদ" ও মার্কিন শান্তি কূটনীতি।
১৪ জুন ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ৮০তম জন্মদিনের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুগান্তকারী শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য মাত্রা যোগ করতে পারত। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত হওয়ার আভাস দেওয়ার পরপরই ট্রাম্প অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া একটি পোস্টে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন যে, রোববারের (১৪ জুন ২০২৬) মধ্যেই এই বহুল প্রতীক্ষিত প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ঠিক এই চূড়ান্ত মুহূর্তেই বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরাইলি বিমান হামলার ঘটনায় শান্তি প্রক্রিয়া প্রচণ্ড ধাক্কা খেলে ট্রাম্প অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এই আকস্মিক হামলাকে সম্পূর্ণ "অনুচিত এবং অনভিপ্রেত" বলে কঠোর মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক রকেট হামলাকে অত্যন্ত "ছোট, সামান্য ও গুরুত্বহীন" আখ্যা দিয়ে যুক্তি দেন যে, যেহেতু ওই ঘটনায় কেউ নিহত, আহত বা বড় কোনো ক্ষয়খতির শিকার হয়নি, তাই একে কেন্দ্র করে চলমান এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনাকে কোনোভাবেই ভেস্তে বা বাধাগ্রস্ত করা মোটেও উচিত হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসন যখন তার জন্মদিনের দিনই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই ইরানের অভ্যন্তরে এর তীব্র নীতিগত ও রাজনৈতিক বিরোধিতা তৈরি হয়, যা তেহরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং সিএনএন ও ফার্স নিউজের বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই তড়িঘড়ি করে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রবণতাকে ইরানের শক্তিশালী সামরিক এলিট বাহিনী ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ ট্রাম্পের এক ধরনের "অস্বাভাবিক জেদ" হিসেবে কঠোর সমালোচনা করেছে। আইআরজিসি-এর শীর্ষ নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, বৈরুতে ইসরাইলি আগ্রাসন অব্যাহত থাকা অবস্থায় এবং খসড়া চুক্তির রাজনৈতিক, আইনি ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো বিশেষজ্ঞ স্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে রোববারই এই চুক্তি স্বাক্ষর করার কোনো সম্ভাবনা নেই। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সম্ভাব্য চুক্তির খসড়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত সামরিক প্রভাব হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় তেহরান ও মাশহাদের রাস্তায় কট্টরপন্থীরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভ শুরু করেছে। ইরানের নীতিনির্ধারকদের এই অভ্যন্তরীণ দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং আইআরজিসি-এর অনমনীয় অবস্থানের কারণে ট্রাম্পের জন্মদিনে চুক্তি সইয়ের যে বিশাল কূটনৈতিক পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল, তা ১৪ জুনের শেষ প্রহরে এসে এক চরম অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে আটকে যায়।
মার্কিন-ইরান আলোচনার এই চরম নাটকীয় ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা কূটনৈতিক সাফল্যের বিষয়ে এখনো পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন এবং তারা পর্দার আড়ালে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবিসি নিউজের জনপ্রিয় টকশো ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ স্পষ্ট করে বলেন যে, ইরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আইআরজিসি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সর্বোচ্চ নেতার স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবের কারণে আলোচনা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। তবে আল জাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রকাশিত ওয়াল্টজের দাবি অনুযায়ী, এই সমস্ত দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং বৈরুতের মাঠপর্যায়ের প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দক্ষ মার্কিন আলোচক দল বিশ্বাস করে যে সমঝোতার পথ এখনো পুরোপুরি খোলা রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন এখনো শতভাগ আত্মবিশ্বাসী যে ইরানি আলোচকদের সাথে একটি চূড়ান্ত টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব, যা শুধু লেবানন নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। তবে মার্কিন এই অদম্য আশাবাদের বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের এই অতি-উৎসাহী শান্তি কূটনীতি শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং তেহরানের অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থী বিক্ষোভের দেয়ালে আছড়ে পড়বে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
৪
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নেতানিয়াহুর বাধ্যবাধকতা।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি বিষয়ক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘লেভান্ট ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্স’-এর বিশিষ্ট পরিচালক সামি নাদেরের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ইসরাইলের আকস্মিক বিমান হামলার পেছনে সামরিক কৌশলের চেয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও বাধ্যবাধকতাই সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সামি নাদের স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ইসরাইল বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উত্তেজনাকর জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দেশের কট্টর ডানপন্থী শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর মোকাবিলায় চরম নমনীয়তা ও ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে তার তীব্র সমালোচনা করছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এবং রয়টার্সের রাজনৈতিক প্রতিবেদনে সামি নাদেরের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংঘাত না বাড়ানোর এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার নীতি বা গাইডলাইন মেনে নেওয়ার কারণেও নেতানিয়াহু নিজ দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। ফলে, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা পিঠ বাঁচাতে এবং হিজবুল্লাহ ফ্রন্টকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও স্বায়ত্তশাসিত রাখার একটি মরিয়া কৌশল হিসেবেই নেতানিয়াহু এই চরম মুহূর্তে বৈরুতে ভারী বোমাবর্ষণের পথ বেছে নিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই হামলার টাইমিং বা সময় নির্বাচন মূলত ইসরাইলের কট্টরপন্থী ভোটারদের আশ্বস্ত করার এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চাল, যা নেতানিয়াহুর টিকে থাকার লড়াইয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। সিএনএন এবং আল জাজিরার কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু খুব ভালো করেই জানেন যে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় ইতিমধ্যে ৩,৭৮৩ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে তেল আবিবকে কোণঠাসা করেছে; কিন্তু অভ্যন্তরীণ নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে তার এই কঠোর সামরিক অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। ইসরাইলের ডানপন্থী দলগুলো প্রচার করছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর হলে তা হরমুজ প্রণালি ও লেবানন সীমান্তে ইসরাইলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, যা ফার্স নিউজের প্রতিবেদনেও হাইলাইট করা হয়েছে। এমতাবস্থায়, সামি নাদেরের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হচ্ছে, বৈরুতের এই রক্তাক্ত ঘটনা কেবল হিজবুল্লাহর রকেটের জবাব নয়, বরং এটি নেতানিয়াহু কর্তৃক মার্কিন শান্তি কূটনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কট্টরপন্থীদের সন্তুষ্ট করার এবং নির্বাচনকালীন সময়ে নিজের ভঙ্গুর ক্ষমতাকে সুরক্ষিত রাখার একটি সুনিপুণ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হাতিয়ার।
৫
ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও আরাগচির সংকট।
১৪ জুন ২০২৬ তারিখে ওয়াশিংটনের সাথে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইরানের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন রাজনৈতিক ফাটল ও তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা দেশটির নীতিনির্ধারকদের চরম বিপাকে ফেলেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজের প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই চুক্তি কার্যকর হলে কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দীর্ঘদিনের সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কায় ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদ এবং রাজধানী তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবনের সামনে কট্টরপন্থীরা জড়ো হয়ে এক বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সিএনএন ও আল জাজিরার কূটনৈতিক সংবাদে জানা যায়, কালো চাদর পরিহিত নারীসহ শত শত উত্তেজিত কট্টরপন্থী বিক্ষোভকারী ইরানের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের পদত্যাগ দাবি করে ‘আরাগচি নিপাত যাক’ বলে তীব্র স্লোগান দিতে থাকেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি স্পষ্ট করেছিলেন যে, প্রস্তাবিত খসড়া চুক্তির বিনিময়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হলেও হরমুজ প্রণালির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ আগের মতো থাকবে না; আর ওয়াশিংটনকে দেওয়া এই কৌশলগত "অতিরিক্ত ছাড়ের" বিষয়টিকেই দেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী ও চরম আত্মসমর্পণ হিসেবে সাব্যস্ত করে ইরানি কট্টরপন্থীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
৬
চুক্তি কি সত্যিই ভেস্তে যাবে?
১৪ জুন ২০২৬-এর বৈরুত হামলার পর বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তিটি এখন এক সুতোয় ঝুলছে। 'লেভান্ট ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যাফেয়ার্স'-এর পরিচালক সামি নাদেরের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরাইল হিজবুল্লাহ ফ্রন্টকে ওয়াশিংটন আলোচনার বাইরে রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও, ইরান শুরু থেকেই লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধের বিষয়টিকে চুক্তির অন্যতম প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং সিএনএন-এর কূটনৈতিক প্রতিবেদন অনুসারে, এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে নাকি সম্পূর্ণ ভেস্তে যাবে, তা এখন মূলত দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে: প্রথমত, বৈরুতের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলার জবাবে ইরান ও তাদের মিত্র হিজবুল্লাহ সরাসরি ইসরাইলের ওপর বড় ধরনের কোনো পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ বা প্রতিশোধ নেয় কি না; এবং দ্বিতীয়ত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রতিশ্রুত 'শান্তি কূটনীতি' রক্ষার্থে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করে লেবাননে সব ধরনের হামলা পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখতে পারেন কি না।
৭
১৪ জুনের বৈরুত হামলা ও এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এটিই সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতিতে টেকসই শান্তি স্থাপন কেবল দুটি দেশের আলোচনার টেবিলে কিংবা ট্রাম্পের অতি-উৎসাহী ব্যক্তিকেন্দ্রিক কূটনীতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন-তেহরান প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি এখন এক সুতোয় ঝুলছে এবং এর ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী "রণকৌশল" এবং ইরানের ভেতরের "অভ্যন্তরীণ কট্টরপন্থী ক্ষোভকে" দক্ষতার সাথে সামাল দেওয়ার ক্ষমতার ওপর। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি, রয়টার্স এবং কাতারভিত্তিক আল জাজিরার কূটনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সম্ভাব্য চুক্তিকে যদি ইতিহাসের পাতায় আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে সমাহিত হওয়া থেকে বাঁচাতে হয়, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অবিলম্বে তার কূটনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। ওয়াশিংটনকে কেবল তেহরানের ওপর শর্ত চাপানোর নীতি পরিহার করে ইসরাইলের ওপর কার্যকর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেন তারা লেবাননে সব ধরনের সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা পুরোপুরি এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়; অন্যথায় হিজবুল্লাহ ও ইরানের সমন্বিত পালটা প্রতিরোধ এই শান্তি প্রক্রিয়াকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেবে।
ভবিষ্যৎ করণীয় হিসেবে বিশ্ব শান্তির স্বার্থে এই মুহূর্তে প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে একটি বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, এই বিশেষ সেলকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে লেবানন ও ইসরাইল সীমান্তে একটি তাৎক্ষণিক এবং বাধ্যতামূলক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে, যা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে আশ্বস্ত করবে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মধ্যস্থতাকারীদের উচিত হবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে বিবেচনায় নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির হাতকে শক্তিশালী করা এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইরানের সার্বভৌমত্বকে পুরোপুরি ক্ষুণ্ণ না করে একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যপন্থা তৈরি করা। সিএনএন ও ফার্স নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির খসড়া থেকে যদি ইরানের কৌশলগত স্বার্থ ও লেবাননের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই অঞ্চল আরও বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে। পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন যদি বিশ্বমঞ্চে কেবল একটি প্রচারণামূলক চুক্তির "অস্বাভাবিক জেদ" ত্যাগ করে ইসরাইলের আগ্রাসন রোধে কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, তবেই কেবল এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির বার্তা বয়ে আনতে সক্ষম হবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৫ জুন ২০২৬