
১
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আধুনিক যুদ্ধগুলো কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একে অপরকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি ও নির্মম খেলা। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত সম্প্রতি অতিক্রম করেছে তার দেড় হাজার তম দিন—যা স্থায়িত্বের দিক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট সময়সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। দেড় হাজার দিনের এই রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী সংঘাতের পর আজ বিশ্ব অর্থনীতি এবং যুদ্ধরত দুই দেশের সামনে যে আর্থিক খতিয়ান দাঁড়িয়েছে, তার সহজ সমীকরণ হলো ‘৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষত’। এই বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতি কেবল ইউক্রেনের অবকাঠামো বা রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ববাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। ফ্রন্টলাইনের সামরিক স্থবিরতা যখন দুই পক্ষকে এক অন্তহীন ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন রণক্ষেত্রের পরিধি সীমান্ত ছাড়িয়ে আঘাত হানছে রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডে। একদিকে ইউক্রেনীয় ড্রোনের দূরপাল্লার নিশানা আর অন্যদিকে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ছারখার হওয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিড—সব মিলিয়ে এই সংঘাত এখন এক অর্থনৈতিক মহাপ্রলয়ে রূপ নিয়েছে।
২
ধ্বংসস্তূপে ইউক্রেন: একটি অর্থনীতির অবলুপ্তি ও পুনর্গঠনের আকাশচুম্বী ব্যয়।
যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও মানবিক ধকলটি গেছে ইউক্রেনের ওপর দিয়ে, যার ফলে ১৫০০ দিন পর এসে দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো এখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও ধ্বংসোন্মুখ। বিগত দেড় হাজার দিনে রুশ সামরিক আগ্রাসনের মুখে পড়ে ইউক্রেনের প্রাক-যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতার ভিত্তিগুলো প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ায় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ হওয়ায় দেশটি এখন সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।
ক। অবকাঠামোগত ক্ষতি।
রাশিয়ার ক্রমাগত ও সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউক্রেনের জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতের লাইফলাইনগুলো। দেশটির প্রধান প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, জাতীয় গ্রিড, রেলওয়ে নেটওয়ার্ক, বাণিজ্যিক বন্দর এবং ভারী শিল্পাঞ্চলগুলো ক্রমান্বয়ে রুশ হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যা ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে ইউক্রেনীয়দের চরম মানবিক সংকটে ফেলতে এবং শিল্প উৎপাদনকে শূন্যে নামিয়ে আনতে রাশিয়ার এই কৌশলগত বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও গ্রিড ধ্বংসের নীতি যুদ্ধ অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এই নজিরবিহীন ভৌত ও স্ট্রাকচারাল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিবেদনে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। তাদের যৌথ আর্থিক হিসাব ও মূল্যায়ন মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের কেবল মৌলিক ও ভৌত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্যই এই মুহূর্তে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিপুল পরিমাণের এই তহবিল জোগাড় করা এবং তা দিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে পুনরুজ্জীবিত করা ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য আগামী কয়েক দশকে সবচেয়ে বড় এবং কঠিনতম অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।
খ। উৎপাদন ও রপ্তানি বিপর্যয়।
ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোর ওপর রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর নৌ-অবরোধের কারণে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কোমর ভেঙে পড়েছে। এরফলে বৈশ্বিক বাজারে শস্য, গম এবং সূর্যমুখী তেলের মতো অতিপ্রয়োজনীয় কৃষিজাত পণ্যের নিয়মিত রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা ইউক্রেনের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ বন্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকট ও মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে। যুদ্ধের তীব্রতায় দেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ মানুষ নিজ ভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থী হতে বাধ্য হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, যার ফলে শিল্প ও কৃষি উভয় খাতেই দক্ষ জনবলের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এই বহুমুখী মানবিক ও বাণিজ্যিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউক্রেনের জাতীয় আয়ের ওপর, যেখানে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যানুযায়ী, দেশটির বর্তমান জিডিপি যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ইতিমধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংকুচিত হয়ে গেছে।
৩
রাশিয়ার অর্থনীতি: নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল এবং ‘শ্যাডো ফ্লিট’ যুদ্ধ।
পশ্চিমা দেশগুলোর প্রাথমিক ধারণা ছিল নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে, কিন্তু যুদ্ধের ১৫০০ দিন পার হওয়ার পরও মস্কোকে পুরোপুরি কাবু করা সম্ভব হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে ক্রেমলিন অক্ষত রয়েছে, বরং দীর্ঘমেয়াদি এই সংঘাতের ফলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষত ও সংকটের প্রকৃতি সাধারণ অর্থনীতির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মস্কোকে নানামুখী চোরাপথ ও গোপন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদকে যুদ্ধমুখী করার এক ঝুঁকিপূর্ণ নীতি তারা গ্রহণ করেছে।
ক। সামরিকীকৃত অর্থনীতি (War Economy) ।
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজেট ও অর্থনৈতিক নীতি এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে একটি সামরিক খাতকেন্দ্রিক বা ‘ওয়ার ইকোনমি’ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। ক্রেমলিন তাদের জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ অর্থই এখন জনকল্যাণমূলক খাত যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়ন থেকে ডাইভার্ট করে ট্যাংক, মিসাইল, গোলাবারুদ এবং ড্রোন উৎপাদনের পেছনে ঢালছে। রাষ্ট্রীয় কলকারখানাগুলোকে চব্বিশ ঘণ্টা সচল রেখে কেবল সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে বাধ্য করার এই নীতি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করেছে এবং সাময়িকভাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ঊর্ধ্বমুখী দেখাচ্ছে। কিন্তু এই কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি কোনো টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করছে না, কারণ উৎপাদিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা কোনো পুনঃউৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টি করে না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, সামরিক খাতের এই অতি-নির্ভরতা এবং বেসামরিক খাতগুলোর ক্রমাগত অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটি গভীর ও অনুৎপাদনশীল গর্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
খ। জ্বালানি যুদ্ধ ও কালোবাজারি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে রুশ গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনলেও রাশিয়া সম্পূর্ণ বিকল্প উপায়ে তার জ্বালানি বাণিজ্য সচল রেখেছে। পশ্চিমা বাজার হারানোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মস্কো এখন তার উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস চীন, ভারত এবং অন্যান্য এশীয় বাজারে আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে বেশ সস্তায় ও ডিসকাউন্টে বিক্রি করছে। এই বিশাল পরিমাণ জ্বালানি গোপনে বিশ্ববাজারে সরবরাহ করার উদ্দেশ্যে তারা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গড়ে তুলেছে প্রায় শত শত জাহাজের এক বিশাল গোপন নৌবহর বা 'শ্যাডো ফ্লিট' (Shadow Fleet)। এই গোপন বহরের মাধ্যমে ছদ্মনামে এবং ইন্সুরেন্স ছাড়াই সমুদ্রপথে তেল পাচার করা হচ্ছে, যা জ্বালানি বাজারে এক ধরণের রাষ্ট্রীয় কালোবাজারির জন্ম দিয়েছে। তবে এই বিকল্প পথ মোটেও মসৃণ নয়, কারণ পশ্চিমা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ক্লিয়ারিং সিস্টেম (SWIFT) থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং প্রতিনিয়ত ইউরোপ-আমেরিকার নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার কারণে মস্কোর জন্য লেনদেন সচল রাখা অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।
৪
বৈশ্বিক ক্ষত: ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের হিসাব ও বিশ্ববাজারের রক্তক্ষরণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের অর্থনৈতিক ক্ষত ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর মূল কারণ হলো এর বহুমুখী বৈশ্বিক প্রভাব, যা দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্ববাজারকে রক্তাক্ত করেছে। এই যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আর্থিক ক্ষতিকে আটকে রাখেনি, বরং সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাজার ব্যবস্থায় এক বড় ধরনের মন্থরতা তৈরি করেছে। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে প্রান্তিক অঞ্চলের অর্থনীতি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই এর নেতিবাচক ধাক্কা লেগেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ক। জ্বালানি ও খাদ্য সংকট।
যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এগুলোর দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যায়, যার তীব্র ধাক্কা ও অর্থনৈতিক খেসারত এখনো গ্লোবাল সাউথ বা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতিনিয়ত সামলাতে হচ্ছে। কৃষ্ণসাগর অববাহিকা থেকে শস্য ও সার রপ্তানি রুদ্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, যা মূলত আমদানিনির্ভর ও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর জাতীয় রিজার্ভ এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত রাসায়নিক সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির চেইন রিঅ্যাকশনের কারণে বিশ্বব্যাপী যে নজিরবিহীন মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বাজারের এই নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতির ফলে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে ক্রমান্বয়ে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
খ। সামরিক বাজেটের সুনামি।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বিশ্বজুড়ে গত শতকের শীতল যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির এক আত্মঘাতী ও অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ইউক্রেন সংকটের পর বৈশ্বিক নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে যাওয়ায় জার্মানি, জাপানসহ ইউরোপ ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তাদের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল নীতি ভেঙে বার্ষিক জিডিপির ন্যূনতম ২% বা তার চেয়েও বেশি অর্থ কেবল সামরিক খাতে বরাদ্দ করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিরক্ষার নাম করে বিশ্বব্যাপী বাজেট বরাদ্দের এই আমূল পরিবর্তনের ফলে উন্নয়নমূলক খাতের তহবিলগুলো ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা মানব সভ্যতার টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এক বড় বিপর্যয়। যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, সম্ভাব্য মহামারি প্রতিরোধ বা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক মানব উন্নয়নে ব্যয় হতে পারত, তা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে ডাইভার্ট করা হচ্ছে। দেশগুলোর যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং অস্ত্রের মজুদ গড়ার প্রতিযোগিতার কারণে শত শত বিলিয়ন ডলারের জনকল্যাণমুখী তহবিল এখন সরাসরি জমা হচ্ছে বহুজাতিক অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ডিফেন্স কন্ট্রাক্টরদের পকেটে।
৫
স্ট্র্যাটেজিক শিফট: ফ্রন্টলাইন থেকে অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের কৌশল।
যুদ্ধের দেড় হাজার দিন পেরোনোর পর রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের চিরাচরিত রণকৌশলে এক বিশাল ও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, যা আধুনিক যুদ্ধবিদ্যার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সংঘাতের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দুই পক্ষই এখন যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতায় এটি খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে যে, প্রথাগত সম্মুখ সমরে বড় কোনো সামরিক বা ভূখণ্ডগত বিজয় অর্জন এই মুহূর্তে আর কোনো পক্ষের জন্যই সহজে সম্ভব নয়। ফলে, রক্তক্ষয়ী সীমান্ত লড়াইয়ের চেয়েও এখনকার যুদ্ধটি মূলত রূপ নিয়েছে একে অপরকে অর্থনৈতিক ও কাঠামোগতভাবে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়ার এক নির্মম ‘অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণুতার যুদ্ধে’ (War of Attrition)। এই কৌশলের অংশ হিসেবে ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন তাদের সম্পূর্ণ যুদ্ধমনোভাব ও সামরিক সক্ষমতাকে ফ্রন্টলাইন থেকে অনেক দূরে ডাইভার্ট করেছে। তারা নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি এবং পশ্চিমা সহায়তায় তৈরি নতুন দূরপাল্লার ড্রোন ও নিখুঁত মিসাইল দিয়ে সরাসরি রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানছে। লক্ষ্যণীয়ভাবে, ফ্রন্টলাইন থেকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার গভীরে রাশিয়ার চুবাসিয়া অঞ্চলের ড্রোন পার্টস তৈরির কারখানা কিংবা তাতারস্তানের অন্যতম বৃহৎ 'তানেকো' তেল শোধনাগার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি টার্মিনালগুলোকে এখন নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। ইউক্রেনের এই দূরপাল্লার স্ট্র্যাটেজিক আক্রমণের প্রধান ও সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য হলো—রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কোষাগার সচল রাখার এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মূল অর্থায়নের উৎস যে বিশাল জ্বালানি খাত ও তেল বাণিজ্য, তাকে সম্পূর্ণ অচল ও বিপর্যস্ত করে দেওয়া।
ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রযুক্তির এই অভাবনীয় ও দূরপাল্লার আগ্রাসনের বিপরীতে ক্রেমলিনও বসে নেই, বরং তারা তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে আরও বিধ্বংসী ও প্রতিশোধমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। রাশিয়া এখন ইউক্রেনের সামরিক ঘাঁটির চেয়ে দেশটির বেসামরিক ও অর্থনৈতিক লাইফলাইনগুলোর ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে গ্লাইড বোমা, ক্রুজ মিসাইল এবং আত্মঘাতী ড্রোনের সমন্বয়ে তীব্র বিমান হামলা চালাচ্ছে। তাদের এই ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মূল নিশানা হলো ইউক্রেনের অবশিষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, জাতীয় গ্রিড, রেলওয়ে স্টেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ সাব-স্টেশনগুলো, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি। রাশিয়ার এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পুরোপুরি অচল করে দেওয়া, যাতে দেশের ভেতরে তীব্র মানবিক বিপর্যয় ও বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়। ক্রেমলিন মনে করছে, ইউক্রেনের এই অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও জাতীয় অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলে দেশটির রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং অর্থনৈতিকভাবে তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। এর ফলে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ও আর্থিক সাহায্যের ওপর ইউক্রেনের নির্ভরতা আগের চেয়ে আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমাদেরও ক্লান্ত করে তুলবে। দেড় হাজার দিন পরের এই স্ট্র্যাটেজিক শিফট বা কৌশলগত পরিবর্তন এটাই প্রমাণ করে যে, বর্তমান যুদ্ধটি এখন আর কেবল সীমান্ত পাহারা দেওয়ার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি পরিণত হয়েছে একে অপরের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক মহাপরিকল্পনায়।
৬
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আজ কেবল দুটি দেশের সীমানার লড়াই নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির এক দীর্ঘস্থায়ী ও সংক্রামক ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের এই আর্থিক ক্ষত দিন দিন আরও গভীর ও রক্তক্ষয়ী হবে, কারণ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য কূটনৈতিক আলোচনার সমস্ত পথ এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ বন্ধ। শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মুখোমুখি বসার প্রস্তাব রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সরাসরি ও কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা আলোচনার টেবিলে বড় ধরণের অচলাবস্থা তৈরি করেছে। এর বিপরীতে, ক্রেমলিনকে অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ করতে পশ্চিমা দেশগুলোর ২১তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ রাশিয়ার ওপর আরও তীব্রভাবে চড়াও হতে যাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক মেরুকরণকে চরম রূপ দিচ্ছে। এই সামগ্রিক অর্থনৈতিক মহাপ্রলয় ও নিষেধাজ্ঞা-পাল্টা নিষেধাজ্ঞার যুদ্ধ এটাই প্রমাণ করে যে, আধুনিক পৃথিবীতে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন কেবল ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর আসল ও নির্মম আঘাতটি পরোক্ষভাবে এসে লাগে বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের লিভিং রুম, জ্বালানির আকাশচুম্বী বিল এবং নিত্যপণ্যের বাজারের মুদি দোকানে। ফলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে রণক্ষেত্রের এই অন্তহীন হাহাকার আজো এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দূরবর্তী ভবিষ্যৎ পরিণতি বিশ্বের জন্য আরও ভয়াবহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং এক নতুন শীতল যুদ্ধের জন্ম দিতে যাচ্ছে। যদি এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে ইউক্রেনের মতো একটি কৃষি ও উৎপাদনশীল অর্থনীতির সম্পূর্ণ অবলুপ্তি ঘটবে, যার পুনর্গঠন ব্যয় পশ্চিমা জোটের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্ত ও পঙ্গু করে দেবে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ওপর আরোপিত স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা মস্কোকে বাধ্য করবে চীন ও ভারতের মতো এশীয় বাজারের ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হতে, যা বিশ্ব বাণিজ্যকে চিরতরে দুটি বিপরীতমুখী ব্লকে বিভক্ত করে ফেলবে। এর ফলে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং রিজার্ভ সংকটের চক্রে আটকে পড়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ তহবিলগুলো অস্ত্রের আধুনিকায়ন ও সামরিক বাজেটের সুনামিতে হারিয়ে যাওয়ায় মানব উন্নয়ন সূচক কয়েক দশক পিছিয়ে যাবে। অস্ত্র নির্মাতাদের পকেট ভারী করার এই আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা বিশ্বজুড়ে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে ধূলিসাৎ করে দেবে, যার ফলে আঞ্চলিক সংঘাতগুলো আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পরিশেষে বলা যায়, এই ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতের উপশম কত দিনে সম্ভব তা আজো অনিশ্চিত হলেও, এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতচিহ্ন ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার ফাটল আগামী প্রজন্মকে এক চরম অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৫ জুন ২০২৬