
১
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য যেন এক শতাব্দীর পুরোনো ভূরাজনৈতিক বারুদশালা, যেখানে কূটনীতির প্রতিটি ব্যর্থ চেষ্টা নতুন কোনো মহাবিপর্যয়ের স্ফুলিঙ্গ ছড়াচ্ছে। একদিকে বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী ও কৌশলগত নৌশক্তির প্রাণকেন্দ্র 'হরমুজ প্রণালি', অন্যদিকে ভূমধ্যসাগরীয় রাজনীতির জটিল সমীকরণ 'বৈরুত' এবং রক্তাক্ত 'গাজা'—এই তিন প্রান্তের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত প্রমাণ করছে যে, পরাশক্তিগুলোর তথাকথিত মধ্যস্থতা আজ সম্পূর্ণ অকার্যকর। গত এপ্রিলের মার্কিন-ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হরমুজে ড্রোন ভূপাতিত করা এবং কুয়েত-বাহরাইনে ইরানের নজিরবিহীন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পারস্য উপসাগরকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। একই সময়ে, ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তিচুক্তির কয়েক দিনের মাথায় দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় লেবানন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ সেনা সদস্যদের প্রাণহানি এবং গাজায় অব্যাহত গণহত্যা প্রমাণ করে যে, মাঠপর্যায়ে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো অস্তিত্ব নেই। ইতামার বেন-গভিরের মতো চরমপন্থীদের আস্ফালন এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর নিজ স্বার্থে লেবাননকে 'দাবার ঘুঁটি' বানানোর এই নোংরা খেলায় মধ্যপ্রাচ্যে কূটনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে গেছে।
২
হরমুজের জলসীমায় বারুদের গন্ধ: মার্কিন-ইরান মুখোমুখি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত ৮ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় স্থায়ী শান্তি ফেরানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের জুন মাসের শুরুতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালি এলাকায় ইরানের সামরিক আস্তানায় হামলার দাবি নিশ্চিত করে। মার্কিন সেন্টকমের তথ্যমতে, প্রণালির দিকে ধেয়ে আসা ইরানের চারটি একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন (One-way attack drones) সফলভাবে ভূপাতিত করেছে মার্কিন বিমান বাহিনী। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ওই অঞ্চলে ইরানের উপকূলীয় নজরদারি রাডার সাইটগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা ও বোমাবর্ষণ চালায়। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই ইরানি ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক নৌচলাচল, আঞ্চলিক সামুদ্রিক যান চলাচল এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য এক তাৎক্ষণিক ও বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছিল। কূটনীতি যখন তেহরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা পারস্য উপসাগরে মার্কিন পরাশক্তির সামরিক উপস্থিতি কমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তখনই হরমুজের জলসীমা মূলত ওয়াশিংটন-তেহরানের শক্তির প্রদর্শনী এবং মুখোমুখি সংঘাতের মূল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অতর্কিত অ্যাকশনের জবাবে গত ৬ জুন ২০২৬ তারিখ ভোররাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক পাল্টা আক্রমণ চালায় ইরান। ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি মার্কিন মিত্র বাহরাইন ও কুয়েতের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে সাতটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। হামলার পর বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায় যে, বাহরাইন ও কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ সতর্কতায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আকাশেই সফলভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বাহরাইন একে তাদের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ (২০২৬) নম্বর প্রস্তাবের স্পষ্ট অবমাননা বলে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক এই প্রস্তাবে ইরানের হামলা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা আন্তর্জাতিক নৌচলাচল ব্যাহত করার যেকোনো প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়েছিল। মূলত হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করা, নৌ-মাইনের অবস্থান গোপন রাখা কিংবা সাগরে মাইন বসিয়ে ২০ হাজারের বেশি আটকে পড়া নাবিককে জিম্মি করার এই ইরানি কৌশল বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে হুমকির মুখে ফেলে পশ্চিমাদের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি পুরোনো কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর রণকৌশল।
৩
বৈরুতের দাবার ঘুঁটি: ইসরাইলি আগ্রাসন ও লেবানন সংকট।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবানন সরকারের মধ্যে নতুন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু সেই চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় তা ভেস্তে যায়। শনিবার লেবানন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নাবাতিয়েহ ও মারজাইউন শহরের সংযোগ সড়কে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। এই হামলায় লেবানন সশস্ত্র বাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং একজন ক্যাপ্টেনসহ অন্তত তিনজন সেনা সদস্য নিহত হন। একই দিনে দক্ষিণাঞ্চলের সাকসাকিয়াহ গ্রামে আরেকটি ইসরাইলি বিমান হামলায় আরও ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে এই নতুন সহিংসতায় মোট ৯ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি, কফার তিবনিত গ্রামের কাছে অবস্থানরত তাদের সেনাদের ওপর হিজবুল্লাহ হামলা চালাতে পারে—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই সন্দেহভাজন গাড়িটিতে এই আক্রমণ চালানো হয়। তারা আরও দাবি করে, তাদের মূল অভিযানটি মূলত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে, লেবাননের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নয়।
ইসরাইলের এই আকস্মিক হামলাকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ওয়াশিংটনে চলমান শান্তি আলোচনার মাধ্যমে হামলা বন্ধের চেষ্টা চলাকালেই এই সংঘাত দক্ষিণ লেবাননের স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। গত ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে রকেট হামলা চালানোর পর ইসরাইল লেবাননে স্থল অভিযান এবং ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এর ফলে ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ১৯৮২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসানের পর এটিই লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরাইলের সবচেয়ে গভীর ও বিপজ্জনক অনুপ্রবেশ। এই সংকটের মাঝে লেবানন সরকার অভিযোগ করেছে যে, তেহরান ওয়াশিংটনের সাথে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দরকষাকষির ‘হাতিয়ার’ হিসেবে লেবাননকে ব্যবহার করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তারা মূলত লেবাননকে প্রকৃত শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করছেন। রাজনৈতিক এই ব্লেম-গেমের আড়ালে আসল সত্য হলো—লেবানন আজ হিজবুল্লাহ, ইরান ও ইসরাইলের ত্রিপক্ষীয় ছায়াযুদ্ধের এক রক্তাক্ত চারণভূমি।
৪
গাজার ক্ষত ও কূটনীতির কফিনে শেষ পেরেক।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ১১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ৯৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ২,৯৮৪ জন আহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৭৮২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। হরমুজ ও বৈরুতের নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের সমান্তরালে গাজার এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই গত ৪৮ ঘণ্টায় নতুন করে আরও পাঁচজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই চরম সংকটের মাঝে ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গণমাধ্যমে প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইসরাইলের স্বার্থের পরিপন্থী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কোনো শান্তিবাদী চুক্তি তিনি ‘হতে দেবেন না’। ইসরাইলি মন্ত্রিসভার এই সদস্যের জেনেশুনে রাষ্ট্রের ক্ষতি করার বিষয়টি নিয়ে খোদ ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার এবং আন্তর্জাতিক মহল তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে। বেন-গভিরের এমন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং ফিলিস্তিনি বন্দীদের অনাহারে রাখার পক্ষে সাফাই গাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যে প্রস্তাবই পাস করুক না কেন, মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা অনুপস্থিত থাকায় গাজার আগুন আজ লেবানন ও পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়েছে।
৫
‘হরমুজ থেকে বৈরুত’—এই ভৌগোলিক রেখাটি আজ মূলত একটি ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার জ্বলন্ত দলিল হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে ছড়িয়ে পড়া আগ্নেয়গিরির লাভা আজ পারস্য উপসাগর থেকে বৈরুতের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর স্বার্থান্বেষী কূটনীতি এবং ইতামার বেন-গভিরদের মতো উগ্রবাদীদের যুদ্ধংদেহী মানসিকতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক বিপজ্জনক ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নে’ নিয়ে গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৮১৭ (২০২৬) নম্বর প্রস্তাবের ক্রমাগত লঙ্ঘন প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এখন সম্পূর্ণ শূন্য। এখানে তথাকথিত যুদ্ধবিরতিগুলো আসলে কোনো স্থায়ী শান্তির বার্তা আনে না, বরং তা পরবর্তী বড় হামলার আগে নতুন করে বারুদ জোগাড়ের সাময়িক বিরতি মাত্র। বন্দুকের নল আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন যখন আলোচনার টেবিলকে শাসন করে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে টেকসই শান্তি কেবলই একটি অলীক শব্দে পরিণত হয়।
এই বহুমাত্রিক ভূরাজনৈতিক সংকটের সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সাপ্লাই চেইন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা নৌ-মাইন ব্যবহারের কৌশলে বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে তীব্র বৈশ্বিক মন্দা ডেকে আনবে। কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত আর কোনো ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর ফলে জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক মেরুকরণে বাধ্য হবে। অন্যদিকে, ইসরাইলি আগ্রাসনে লেবাননের ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়া এবং তেহরানের রাজনৈতিক দরকষাকষিতে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্র কেবল আঞ্চলিক মানচিত্রকেই ওলটপালট করবে না, বরং এর রেশ বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৬ জুন ২০২৬