
১
২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য কেবল যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেনি, দেখেছে কয়েক দশকের চেনা সমীকরণের নাটকীয় পতন ও এক নতুন ভূরাজনৈতিক যুগের উদয়। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুর পর যে মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তা মাত্র তিন মাসের মাথায় এক অভাবনীয় মোড় নিয়েছে। খামেনি-পরবর্তী নতুন নেতৃত্বে তেহরানের ঘুরে দাঁড়ানো এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের সাথে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানো আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর যৌথ উপস্থিতিতে আগামী ১৯ জুন ২০২৬ তারিখে জেনেভায় যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, তা কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিই নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতিতে এক নতুন দিগন্ত। আদর্শিক অনমনীয়তার দেয়াল ভেঙে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই বাস্তবমুখী অবস্থান প্রমাণ করে যে, চরম সংকটের মুখেও শান্তির পথ তৈরি করা সম্ভব। খামেনি-পরবর্তী এই নতুন অধ্যায় মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে টেকসই, স্থিতিশীল এবং প্রগতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
২
কৌশলগত বিশ্লেষণ: চাপের মুখে ‘বাস্তববাদী’ কূটনীতি।
২০২৬ সালের এই চুক্তিটি পূর্ববর্তী সকল সমীকরণকে ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি এবং তেহরানের ঐতিহ্যগত অনমনীয় অবস্থান—উভয় পক্ষই এখানে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে বাস্তবমুখী কূটনীতি বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিধ্বংসী যুদ্ধ এড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটন এবং তেহরানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাই এই ঐতিহাসিক সমঝোতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
ক। নেতৃত্বের পরিবর্তন ও তেহরানের নমনীয়তা।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মোজতবা খামেনিকে একজন "বাস্তববাদী" নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা তেহরানের নীতি পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ইরানের এই নতুন নেতৃত্ব পূর্বসূরিদের কট্টর আদর্শিক অনমনীয়তার চেয়ে দেশের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ ও বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাকেই এখন প্রধান অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তেহরানের এই কৌশলগত নমনীয়তা এবং ওয়াশিংটনের সাথে সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তই এই জটিল চুক্তির পথকে সুগম করেছে।
খ। ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির সীমাবদ্ধতা।
আমেরিকা ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিজেদের শীর্ষ নেতৃত্বকে হারানোর পরও ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সামরিক টিকে থাকার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। দেশটির মূল সামরিক শক্তি ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস’ এবং তাদের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একই সাথে মার্কিন ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তেহরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে তাদের শক্তি এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এই অনমনীয় প্রতিরোধ দেখে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত অনুধাবন করতে পেরেছে যে, সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করানো অসম্ভব।
গ। ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এই চুক্তিটি ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি মোক্ষম সুযোগ। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প মার্কিন ভোটারদের কাছে বড় কোনো যুদ্ধ জড়াতে চাননি। বরং মধ্যপ্রাচ্যের এই বিধ্বংসী যুদ্ধ থেকে মার্কিন বাহিনীকে নিরাপদে বের করে এনে তিনি নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। বিশ্বমঞ্চে নিজেকে একজন সফল ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী 'ডিল-মেকার' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাড়না থেকেই ট্রাম্প ইরানের সাথে দ্রুত এই সমঝোতা সম্পন্ন করেন।
৩
চুক্তির মূল স্তম্ভ এবং তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক স্বস্তি।
২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক চুক্তির ঘোষিত ফ্রেমওয়ার্কটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক অভূতপূর্ব ও বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সম্পাদিত এই সমঝোতাটি মূলত এমন কিছু সুনির্দিষ্ট স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের যুদ্ধংদেহী পরিবেশকে রাতারাতি বদলে দিতে শুরু করেছে। দীর্ঘ তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই চুক্তিটি কেবল যে সামরিক উত্তেজনা প্রশমন করেছে তাই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং উভয় পক্ষের বাস্তবমুখী অবস্থানের কারণে এই চুক্তির প্রতিটি শর্তই অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ক। সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।
এই চুক্তির প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি হলো লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সক্রিয় ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ করা। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধবিরতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার পর আঞ্চলিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের তৈরি হওয়া তীব্র সামরিক উত্তেজনা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এই স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, মার্কিন-ইরান আলোচনার বাইরে থাকা ইসরাইল এখনো তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থানের কারণে এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করা যেকোনো পক্ষের জন্যই এখন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এই স্থায়ী সামরিক স্থবিরতা দীর্ঘ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘকাল পর একটি টেকসই ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
খ। হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ ও মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি এবং বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে আগামী শুক্রবারের মধ্যে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তটি এই চুক্তির অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সাফল্য। যুদ্ধের কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কার্যত অচল হয়ে থাকা এই প্রণালিটি এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর আরোপিত কঠোর অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। ট্রাম্পের "বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো, তেলের প্রবাহ চলুক" এমন আহ্বান বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটে থাকা অর্থনীতিগুলোকে এক বিশাল এবং তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিয়েছে।
গ। অর্থনৈতিক প্রণোদনা, জব্দকৃত তহবিল ও ৩০০ বিলিয়ন ডলারের রূপরেখা।
চুক্তির অর্থনৈতিক স্তম্ভটিকে আরও শক্তিশালী করতে ইরানের জন্য এক বিশাল পুনর্গঠন তহবিল এবং জব্দকৃত অর্থ অবমুক্তির একটি সুনির্দিষ্ট আর্থিক রোডম্যাপ এই সমঝোতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান যদি চুক্তির শর্তসমূহ বাস্তবে পূরণ করে তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর একটি শক্তিশালী জোটের অর্থায়নে গঠিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল পুনর্গঠন তহবিলে তারা প্রবেশাধিকার পাবে। এর পাশাপাশি, চূড়ান্ত সমঝোতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে রাখা প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ ধাপে ধাপে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়েও নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের কট্টরপন্থীরা যেন এই অর্থ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য কঠোর শর্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই কেবল এই বিশাল তহবিল ছাড় করা হবে।
ঘ। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও ৬০ দিনের সময়সীমা।
এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল ও কৌশলগত স্তম্ভটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণের জন্য ৬০ দিনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া। ইরান এই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনোই কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না এবং চূড়ান্ত আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা নতুন পারমাণবিক স্থাপনা সম্প্রসারণ করবে না। তবে দেশটির বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মজুতকৃত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত চুক্তিতে স্পষ্ট না হওয়ায় এই বিষয়গুলো আগামী ৬০ দিনের নিবিড় আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে দুই পক্ষ যদি একটি নিখুঁত ও যাচাইযোগ্য তদারকি ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে, তবেই কেবল মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক যুদ্ধের কালো মেঘ কেটে যাবে।
৪
ভূরাজনৈতিক ফাটল: ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সংঘাত ও ইসরাইলের একাকীত্ব।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে দীর্ঘদিনের অবিচ্ছেদ্য মিত্র মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্কের ওপর, যা এখন এক গভীর ফাটলের মুখে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের মূল কৌশলগত লক্ষ্যই ছিল মার্কিন সামরিক শক্তিকে সরাসরি ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতাকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই একক ও আকস্মিক শান্তি চুক্তি নেতানিয়াহুর সেই বহু বছরের লালিত ভূরাজনৈতিক স্বপ্নকে এক নিমেষেই বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়ে ইসরাইল এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক চরম একাকীত্ব ও কৌশলগত দেউলিয়াত্বের মুখোমুখি হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তন তেলআবিবকে এক গভীর নিরাপত্তা সংকটের আবর্তে ফেলে দিয়েছে।
ইসরাইলকে সম্পূর্ণ আলোচনার বাইরে রেখে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ঘোষণা আসার ঠিক আগমুহূর্তেও তেলআবিব বৈরুতের উপকণ্ঠে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে তীব্র বিমান হামলা চালিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ওয়াশিংটন-তেহরান সম্ভাব্য সমঝোতাটিকে যেকোনো মূল্যে ভণ্ডুল করে দেওয়া, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চরম ক্ষুব্ধ করেছে এবং তিনি প্রকাশ্যে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ট্রাম্প ইতোমধ্যে নেতানিয়াহুকে "উন্মাদ", "অকৃতজ্ঞ" এবং "বিচক্ষণতাহীন" নেতা বলে আখ্যায়িত করেছেন, যা দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যকার নজিরবিহীন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংঘাতকে স্পষ্ট করে তোলে। এই চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে ইসরাইল লেবাননে তার সমস্ত সামরিক আগ্রাসন স্থগিত করতে এবং সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে এই বাধ্যবাধকতা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং ডানপন্থী মহলে নেতানিয়াহুর জন্য এক অপূরণীয় 'কৌশলগত পরাজয়' ও চরম রাজনৈতিক ফাঁদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫
ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা: আগামী ৬০ দিনের চ্যালেঞ্জ ও টেকসই শান্তির রোডম্যাপ।
এই সমঝোতা স্মারক মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে নাকি এটি কেবলই আরেকটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আগামী ৬০ দিনের নিবিড় ও জটিল কারিগরি আলোচনার ওপর। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে টেকসই রূপ দিতে হলে উভয় পক্ষকেই চরম রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও বাস্তবমুখী দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং পারমাণবিক কর্মসূচির মতো সংবেদনশীল অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ ধরে রাখতে হলে মূলত তিনটি প্রধান ও স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জের দিকে আন্তর্জাতিক মহলকে কড়া নজর দিতে হবে।
ক। পারমাণবিক মজুত ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ।
ইরানের কাছে বর্তমানে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো চুক্তিতে সম্পূর্ণ অস্পষ্ট রয়ে গেছে। রাশিয়া এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সাময়িকভাবে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেও, মার্কিন কংগ্রেস ও ইসরাইল এর স্থায়ী ও সম্পূর্ণ ধ্বংস নিশ্চিত করতে চায়। চূড়ান্ত চুক্তি সফল করতে হলে ইরানকে তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির আন্তর্জাতিক সীমানা ও আইএইএ-এর কঠোর নজরদারি মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও চুল্লিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা না গেলে এই শান্তিচুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তেহরানের নতুন নেতৃত্বের জন্য এই পারমাণবিক সমঝোতাই হবে পশ্চিমাদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় ও কঠিন পরীক্ষা।
খ। হরমুজ প্রণালির ‘টোল’ বিতর্ক ও নিরাপত্তা।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক ব্যবহার নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার বিপরীতমুখী অবস্থান চুক্তির স্থায়িত্বকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে দাবি করেছেন এই আন্তর্জাতিক জলপথ "সম্পূর্ণ টোলমুক্ত" থাকবে, সেখানে ইরানের আধা-সরকারি সংস্থাগুলো ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি শেষে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ফি আদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছে। এর বাইরে, যুদ্ধের সময় ইরান কর্তৃক এই প্রণালিতে পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাইন অপসারণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্সের দ্রুত সমন্বয় করা প্রয়োজন। একই সাথে, জলপথটি সম্পূর্ণ নিরাপদ করার পাশাপাশি পশ্চিমা নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধ প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন মেলানো আগামী দিনগুলোর জন্য একটি জটিল কারিগরি চ্যালেঞ্জ। এই জলপথের মুক্ত ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার ওপরই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে।
গ। আঞ্চলিক প্রক্সি ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ।
ঘোষিত খসড়া চুক্তিতে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করার কোনো স্পষ্ট রূপরেখা রাখা হয়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন যে, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে ইরান যে বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে, তা যেন পুনরায় হিজবুল্লাহ বা হুথিদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনে ব্যবহৃত না হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন প্রশাসন ও তার মিত্ররা ইরানের আর্থিক লেনদেনের ওপর একটি কঠোর ও যাচাইযোগ্য আন্তর্জাতিক তদারকি ব্যবস্থা আরোপ করতে চায়। তেহরান যদি তাদের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষ’কে সম্পূর্ণ সামরিক নিষ্ক্রিয়তার দিকে পরিচালিত না করে, তবে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই এই চুক্তি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়বে। এরফলে আঞ্চলিক প্রক্সি ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের এই সমীকরণটিই আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের টেকসই শান্তির মূল চাবিকাঠি হতে যাচ্ছে।
৬
খামেনি-পরবর্তী যুগের প্রথম প্রহরে স্বাক্ষরিত ‘ট্রাম্প-তেহরান চুক্তি ২০২৬’ বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রুতা বলে কিছু নেই। দীর্ঘদিনের আদর্শিক সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ পরিহার করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই যেভাবে বাস্তববাদী কূটনীতির পথে হেঁটেছে, তা আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থার জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় অধ্যায়। তবে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য কেবল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে হোয়াইট হাউস ও তেহরানের নতুন নেতৃত্বের পারস্পরিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার ওপর। বিশেষ করে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সদিচ্ছা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের ডিল-মেকিং কৌশলের সঠিক বাস্তবায়নই এই চুক্তির মূল ভিত্তি। একই সাথে মার্কিন-ইরান সমঝোতার বাইরে থাকা ইসরাইলের ক্ষোভ দক্ষতার সাথে সামাল দেওয়ার ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করছে এই শান্তি প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব। আগামী ৬০ দিনের পরমাণু ও কারিগরি আলোচনা যদি সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়, তবে তা কেবল এই দুই দেশের শত্রুতার অবসানই ঘটাবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী ও সুদৃঢ় স্থিতিশীলতার জন্ম দেবে, যা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্রকে বদলে দিতে পারে।
এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে সফল করতে হলে উভয় পক্ষকে অতি দ্রুত কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ টোলমুক্ত ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে স্বস্তি এসেছে, তা বজায় রাখতে মাইন অপসারণে আন্তর্জাতিক টাস্কফোর্সকে পূর্ণ সহযোগিতা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইরানকে তার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য আন্তর্জাতিক মনিটরিং ব্যবস্থা মেনে চলতে বাধ্য করা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক প্রক্সি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে পরবর্তী আলোচনার টেবিলে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সমাধান করতে হবে, যেন কোনো পক্ষই চুক্তি লঙ্ঘন করার সুযোগ না পায়। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের একাকীত্ব—উভয় সংকটকে কূটনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করাই হবে আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ। যদি ওয়াশিংটন ও তেহরান এই ৬০ দিনের সময়সীমাকে কাজে লাগিয়ে একটি নিখুঁত রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে, তবে এই চুক্তিটি ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিকেও ছাড়িয়ে যাবে। চূড়ান্ত বিচারে, ২০২৬ সালের এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে এক নতুন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও টেকসই শান্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে অমর হয়ে থাকবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৬ জুন ২০২৬