
১
ভূ-রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলে কিছু নেই—এই ঐতিহাসিক সত্যকে আবারও প্রমাণ করতে যাচ্ছে জেনেভায় আগামী ১৯ জুন তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হতে যাওয়া বহুল আলোচিত আমেরিকা-ইরান চুক্তি। কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তির নাটকীয় ও সফল মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন এই ঐতিহাসিক সমঝোতা চূড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে, তখন তার সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনিটি লেগেছে তেল আবিবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক বাস্তববাদী (Pragmatic) পররাষ্ট্রনীতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কেবল চমকে দেয়নি, বরং চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই তাকে এক চরম রাজনৈতিক ও কৌশলগত খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শর্তহীন ও অন্ধ সমর্থনকে পুঁজি করে নেতানিয়াহু যে কট্টরপন্থী আঞ্চলিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছিলেন, ২০২৬ সালের পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী সমীকরণে মার্কিন প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কাছে তা আজ সম্পূর্ণ অকার্যকর। ওয়াশিংটনের এই নাটকীয় মোড় পরিবর্তন কেবল নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ও ভঙ্গুর কোয়ালিশন সরকারকেই পতনের মুখে ফেলেনি, বরং দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা আমেরিকা-ইসরায়েল যৌথ সামরিক ও গোয়েন্দা স্বার্থের চিরচেনা দেয়ালে এক অভূতপূর্ব ও গভীর ফাটল ধরিয়েছে।
২
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু রসায়নে আকস্মিক ধস।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, কৌশলগত গোলান মালভূমি সংযুক্তিকরণ এবং ইরানের সাথে হওয়া পরমাণু চুক্তি (JCPOA) বাতিল করার মতো বড় পদক্ষেপগুলো ট্রাম্প-নেতানিয়াহু রসায়নকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। সে সময় ওয়াশিংটনের শর্তহীন সমর্থন তেল আবিবের কট্টরপন্থী এজেন্ডা ও নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে চরম শক্তিশালী করে তোলে। দুই নেতার এই আদর্শিক ও কৌশলগত বোঝাপড়া দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের সবচেয়ে সুবর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল।
তবে ২০২৬ সালের এই দ্বিতীয় পর্বে এসে মার্কিন প্রশাসনের চিরচেনা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এক অপ্রত্যাশিত রূপ ধারণ করেছে। বছরের শেষভাগে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পকে এখন মার্কিন অভ্যন্তরীণ জনসমর্থন ধরে রাখার তীব্র লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী, রক্তক্ষয়ী ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক সংঘাত থেকে আমেরিকাকে সফলভাবে বের করে আনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল করার অর্থনৈতিক তাগিদ থেকে ওয়াশিংটন বাধ্য হয়েই কূটনীতির এক নতুন ও বাস্তবমুখী পথ বেছে নিয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে পাকিস্তান, কাতার এবং তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তির ত্রিপক্ষীয় মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে এই ঐতিহাসিক জেনেভা চুক্তি সম্পাদন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, ট্রাম্পের কাছে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা পুরোনো আদর্শিক অবস্থানের চেয়ে আমেরিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই এখন সবচেয়ে মুখ্য। ট্রাম্পের এই চরম বাস্তববাদী ও চতুর ‘ডিল-মেকিং’ চরিত্রটিই রাতারাতি তেল আবিবকে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণে একাকী করে দিয়েছে, যা বর্তমান নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন।
৩
নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিপর্যয়।
আমেরিকা-ইরানের এই ঐতিহাসিক সমঝোতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এমন আকস্মিক কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েলের ভেতরে নেতানিয়াহুর একচ্ছত্র নেতৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা এখন তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বহিরাগত শত্রুর ভয় দেখিয়ে দেশের ভেতরের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার যে কৌশল তিনি এতদিন ব্যবহার করে আসছিলেন, তা এক নিমেষেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে থাকা নেতানিয়াহুর ওপর এখন তিনটি সুনির্দিষ্ট দিক থেকে এক অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ বিপর্যয় নেমে আসছে।
ক। ‘ইরান জুজু’র অবসান ও ন্যারেটিভের মৃত্যু।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিগত দুই দশকের কট্টরপন্থী রাজনীতির মূল ভিত্তিই ছিল ইরানকে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য একমাত্র ও পরম শত্রু হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করা। দেশের ভেতরের যেকোনো অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক অসন্তোষ কিংবা ব্যক্তিগত দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে তিনি সবসময়ই ইরানের পরমাণু হামলার হুমকির কথা বলতেন। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে এখন ওয়াশিংটন খোদ তেহরানের সাথে হাত মেলানোয় এবং নতুন চুক্তি করায় নেতানিয়াহুর সেই বহু পুরোনো ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক ন্যারেটিভটিই আন্তর্জাতিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের জনগণের কাছে ইরানের জুজু দেখিয়ে পার পাওয়ার আর কোনো সুযোগ তার হাতে অবশিষ্ট থাকছে না।
খ। কট্টরপন্থী জোটের ভাঙন ও সরকার পতনের ঝুঁকি।
ইসরায়েলের বর্তমান ভঙ্গুর কোয়ালিশন সরকার মূলত টিকে আছে ইতামার বেন-গ্যভির বা বেজালেল স্মোটরিচের মতো অতি-ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সরাসরি সমর্থনে। ট্রাম্পের এই নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপকে এই চরমপন্থীরা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বিক সার্বভৌমত্বের সাথে এক চরম ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো পরম বন্ধুকেও এই পরমাণু চুক্তি থেকে বিরত রাখতে না পারার সম্পূর্ণ দায় তারা এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার ওপর চাপাচ্ছে। এই ক্ষোভ থেকে তারা যেকোনো মুহূর্তে বর্তমান জোট সরকার থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে পারে, যা ইসরায়েলে দ্রুত আগাম নির্বাচন ডেকে এনে নেতানিয়াহু যুগের চিরতরে অবসান ঘটাবে।
গ। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা এস্টাবলিশমেন্টের ক্ষোভ।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) এবং কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের (Mossad) একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে নেতানিয়াহুর একরোখা ও যুদ্ধংদেহী কূটনীতির তীব্র সমালোচনা করে আসছিল। ওয়াশিংটনের মতো তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও প্রধান কৌশলগত মিত্রের সাথে এমন অভূতপূর্ব দূরত্ব তৈরি হওয়াকে দেশের নিরাপত্তা প্রধানরা নেতানিয়াহুর চরম কূটনৈতিক ও কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন। আমেরিকার সাথে এই ফাটল ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করে সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট এখন প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের কারণে দেশের ভেতরে তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ দিন দিন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে।
৪
আমেরিকা-ইসরায়েল যৌথ স্বার্থে বড় ফাটল।
ঐতিহাসিকভাবে অটুট ও অবিচ্ছেদ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া ওয়াশিংটন-তেল আবিব অক্ষের পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের জায়গায় এই জেনেভা চুক্তি এক গভীর ও নজিরবিহীন ফাটল তৈরি করেছে। দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা এজেন্ডা যেভাবে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করত, এই চুক্তির মাধ্যমে সেই যুগপৎ পথচলায় আকস্মিক স্থবিরতা নেমে এসেছে। ওয়াশিংটনের এই নতুন অবস্থান প্রমাণ করে যে, পরাশক্তিগুলোর বৈশ্বিক সমীকরণে চিরস্থায়ী বন্ধুত্বের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থই এখন ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন নমনীয় ইরান নীতি তেল আবিবকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সম্পূর্ণ একা করে দিয়েছে, যা দুই দেশের দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা গভীর অংশীদারিত্ব ও যৌথ স্বার্থের ভিতকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
ক। একতরফা সামরিক পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা।
মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে এককভাবে ইরানের পারমাণবিক কিংবা কৌশলগত সামরিক স্থাপনাগুলোতে বড় ধরনের কোনো বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা (Pre-emptive strike) চালানো এখন কার্যত অসম্ভব। অতীতে ইসরায়েল যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নিলে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাল হয়ে দাঁড়াত, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তেহরানের সাথে সম্পাদিত নিজস্ব চুক্তি রক্ষা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধ এড়ানোই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। ফলশ্রুতিতে, নিজেদের আঞ্চলিক কূটনীতি ও স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার তাগিদে আমেরিকা এখন ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক বা একতরফা সামরিক সিদ্ধান্তকে কেবল নিরুৎসাহিতই করবে না, বরং তা রুখে দিতে আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করে কঠোরভাবে বাধা দেবে, যা তেল আবিবের সামরিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেছে।
খ। গোয়েন্দা ও সাইবার সহযোগিতায় স্থবিরতা।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলমান অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ সাইবার অপারেশনের চিরচেনা স্বাচ্ছন্দ্য ও গভীরতা এই চুক্তির ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। জেনেভা চুক্তিকে সফলভাবে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ওয়াশিংটন এখন তেহরানের ক্ষোভ বা উসকানি এড়াতে চাইবে, যার কারণে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কিংবা আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে পরিচালিত অনেক যৌথ গোপন অপারেশন বা স্তব্ধ করে দেওয়া সাইবার হামলাগুলো আমেরিকা হয়তো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেবে। এর ফলে মোসাদ ও সিআইএ-র (CIA) পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয়ের জায়গায় এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি হবে, যা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড বা ড্রোন অপারেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে চরম একাকী এবং তথ্যগত দিক থেকে অনেকটাই দুর্বল করে তুলবে।
গ। আঞ্চলিক একাকীত্ব ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের ভবিষ্যৎ।
আরব দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে ভূ-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর মাধ্যমে বিপুল উৎসাহে শুরু হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে। সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রভাবশালী সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো যখন স্পষ্ট দেখবে যে স্বয়ং ওয়াশিংটনই তাদের প্রধান নিরাপত্তা ছাতা হওয়া সত্ত্বেও তেহরানের শিয়া শাসকগোষ্ঠীর সাথে আপস ও চুক্তি করছে, তখন তারা তেল আবিবের সুরক্ষাবলয়ে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এর পরিবর্তে রিয়াদ বা আবুধাবি নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলের কট্টর যুদ্ধংদেহী নীতির অংশীদার না হয়ে, ওয়াশিংটন-তেহরানের এই নতুন ভারসাম্যের সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে ইরানের সাথে নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সমঝোতা বাড়াতে বেশি গুরুত্ব দেবে, যা ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে চরম আঞ্চলিক একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেবে।
৫
ওয়াশিংটন-তেহরানের ঐতিহাসিক চুক্তির অবধারিত পরিণতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মানচিত্রে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। মার্কিন সুরক্ষাবলয়ের একচ্ছত্র সুবিধা হারিয়ে ইসরায়েল এখন চরম আঞ্চলিক একাকীত্বের মুখোমুখি হবে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নীতি পুনর্গঠন করতে বাধ্য করবে। ওয়াশিংটন যেহেতু তেহরানের সাথে সম্পাদিত চুক্তি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, তাই ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের একক ও উসকানিমূলক সামরিক পদক্ষেপ বা ইরানি স্থাপনায় আকস্মিক আঘাত (Pre-emptive strike) হানার চেষ্টাকে আমেরিকা এখন আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ঢাল হয়ে সমর্থন করবে না, বরং কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা স্তব্ধ করে দেবে। একই সাথে, ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়া এতদিন চলছিল, তা বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়বে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রভাবশালী সুন্নি রাষ্ট্রগুলো এখন তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী সুরক্ষাবলয়ে যোগ দেওয়ার চেয়ে ওয়াশিংটন-তেহরানের এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যকে কাজে লাগিয়ে ইরানের সাথে নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও কূটনৈতিক যোগসূত্র বাড়াতে অনেক বেশি আগ্রহী হবে, যা প্রকারান্তরে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একাধিপত্যের অবসান ঘটাবে।
এই নজিরবিহীন ভূ-রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইসরায়েলের নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বড় ধরনের সংস্কার এবং নতুন কৌশলগত দূরদর্শিতার বিকল্প নেই। প্রথমত, ইসরায়েলি এস্টাবলিশমেন্টকে বুঝতে হবে যে আমেরিকার ওপর অন্ধ ও শতভাগ নির্ভরশীলতার দিন শেষ, তাই দেশের ভেতর নেতানিয়াহুর একরোখা ও চরমপন্থী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি বাস্তবমুখী ও নমনীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলকে কেবল সামরিক শক্তির দাপট দেখানোর পথ পরিহার করে পাকিস্তান, কাতার ও তুরস্কের মতো উদীয়মান মধ্যস্থতাকারী শক্তিগুলোর সাথে নতুন করে কূটনৈতিক সংলাপের চ্যানেল তৈরি করতে হবে। সিআইএ এবং মোসাদের মধ্যকার ফাটল ধরা গোয়েন্দা সমন্বয়কে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার অবাস্তব জেদ ছেড়ে, পরমাণু কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি বা ‘রিজিওনাল সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরিতে অংশীদার হতে হবে। চূড়ান্ত বিচারে, ওয়াশিংটন-তেহরানের এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন তেল আবিবকে ঘরের মাটিতে এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করালেও, তা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বহুপক্ষীয় ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে, যেখানে একপেশে যুদ্ধের চেয়ে বাস্তবমুখী কূটনীতিই হবে মূল চালিকাশক্তি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৭ জুন ২০২৬