
১
ইতালিতে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাই-প্রোফাইল সাক্ষাতের সমান্তরালেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আছড়ে পড়ল মার্কিন প্রশাসনের এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত। আট বছর আগের এক ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে আমেরিকার ‘ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার’ ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন সামরিক কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটিকে পাকাপাকিভাবে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে, ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিসের হাত ধরে ঘটা করে ‘ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড’ (PACOM)-এর নাম বদলে রাখা হয়েছিল ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ (INDOPACOM)। সেই সময় এই রূপান্তরের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং নয়াদিল্লিকে প্রধান অক্ষ করে এশীয় অঞ্চলে চীনা ড্রাগনের একাধিপত্য রুখে দেওয়া। কিন্তু হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে পেন্টাগনের এই বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত গভীর কূটনৈতিক জল্পনার জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর একে ‘ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য রক্ষা’র প্রয়াস বলে দাবি করলেও, এই নামকরণের রাজনীতির নেপথ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের গোপন ও লেনদেনভিত্তিক বোঝাপড়া রয়েছে বলে মনেহয়।
গত কয়েক মাস ধরে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শুল্ক এবং প্রযুক্তিগত যুদ্ধ চরম মাত্রায় পৌঁছালেও, ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পাশে সরিয়ে রেখে একক বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। আমেরিকার এই আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পিছুটান স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের একাধিপত্য রুখতে গঠিত চারদেশীয় অক্ষ ‘কোয়াড’ (QUAD)-কে এক গভীর এবং নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই রূপান্তর ওয়াশিংটনের প্রধান মিত্র হিসেবে নয়াদিল্লির অনন্য সামরিক ও রাজনৈতিক মর্যাদাকে যেমন বিশ্বমঞ্চে ম্লান করেছে, তেমনি ভারতের স্বাধীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও এক বিশাল বড় ধরণের ধাক্কা দিয়েছে। ফলস্বরূপ, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় এবং জ্বলন্ত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—চীনের ক্ষোভ প্রশমন, বাণিজ্যিক শুল্ক হ্রাস ও নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে ট্রাম্প কি তবে ভারতকে একাকী রেখেই এশিয়ার নতুন কোনো মাস্টারপ্ল্যান সাজাচ্ছেন? ট্রাম্পের এই পরিবর্তিত অবস্থান মূলত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যে এক আসন্ন বড় ধরনের প্রলয়ঙ্করী ঝড়েরই স্পষ্ট পূর্বাভাস দিচ্ছে।
২
নাম বদলের নেপথ্যে: কৌশলগত অবস্থান নাকি লেনদেনের রাজনীতি?
পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই কমান্ডের যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে, সেটির প্রতি সম্মান জানাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতে, ইউএসপিএসিওএম (USPACOM) নামটি পুনর্বহাল করার মাধ্যমে এই অঞ্চলের দায়িত্বরত সামরিক কর্মীদের মধ্যে একটি গভীর গর্বের অনুভূতি এবং সম্মিলিত চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে। তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এই নাম পরিবর্তনের ফলে মাঠপর্যায়ে সামরিক অভিযান, বাহিনীর অবস্থান কিংবা কমান্ডের মূল দায়িত্বক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসছে না। কাগজে-কলমে এই বিশেষ কমান্ডের আওতাভুক্ত এলাকা এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে ভারতের পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্তই বিস্তৃত থাকছে। অর্থাৎ, নাম থেকে 'ইন্দো' শব্দটিকে ছেঁটে ফেলা হলেও ভারত মহাসাগরের পূর্বাংশ এখনো পেন্টাগনের এই কমান্ডেরই নজরদারিতে থাকবে। তা সত্ত্বেও, বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এই ধরনের সিদ্ধান্তের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থাকে যা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। প্রশাসনিকভাবে সব ঠিক থাকার আশ্বাস দেওয়া হলেও, বিশ্বব্যাপী অংশীদারদের কাছে এটি একটি মিশ্র বার্তা পাঠিয়েছে। আর এই কারণেই আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক মহলে এই আকস্মিক সিদ্ধান্তটি নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশ্ব কূটনীতি ও সামরিক পরিমণ্ডলে 'নাম' কখনো কেবলই সাধারণ কোনো শব্দ নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজিক বার্তা বহন করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস এই কমান্ডের বিশাল পরিধি ও গুরুত্ব বোঝাতে রসিকতা করে বলেছিলেন, এর সীমা ‘হলিউড থেকে বলিউড এবং পেঙ্গুইন থেকে মেরু ভাল্লুক’ পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের অধীনে সেই ‘বলিউড’ তথা ভারতের কৌশলগত অংশটি যেন মার্কিন সামরিক মানচিত্রের অগ্রাধিকার থেকে কিছুটা আড়ালে চলে গেল। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে যখন সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হাই-প্রোফাইল বার্ষিক সাংরি-লা ডায়ালগে হেগসেথ তাঁর পুরো বক্তব্যে একবারের জন্যও ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের এই শব্দচয়ন বর্জন করা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি নীতি পরিবর্তনেরই একটি স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী লক্ষণ। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন চীনের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারতকে কেন্দ্রীয় অংশীদার ভাবার চেয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক ও লেনদেনভিত্তিক কূটনীতিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
৩
ট্রাম্প-শি জিনপিং বোঝাপড়া এবং মার্কিন চীননীতি।
সামরিক কমান্ডের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের ঠিক এক মাস আগেই চীনের বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি বহুল আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত কয়েক মাস ধরে শুল্ক, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং ইরান ইস্যুতে দুই পরাশক্তির মধ্যে চরম উত্তেজনা চললেও, বেইজিং সফরে ট্রাম্প দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পাশে সরিয়ে রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ওপরই বিশেষ জোর দেন। ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি তাঁর প্রথম মেয়াদের মতোই বহুপাক্ষিক জোট গঠনের চেয়ে সি জিনপিংয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখাকেই বেশি শ্রেয় মনে করছেন। একই সাথে তিনি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জোটের চেয়ে দুই দেশের মধ্যকার ‘লেনদেনভিত্তিক সমঝোতা’ (Transactional Diplomacy)-কে এখন বেশি পছন্দ করছেন। যদিও এই পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে ওয়াশিংটন চীনের সমস্ত আঞ্চলিক লক্ষ্য বা আধিপত্যকে পুরোপুরি মেনে নিচ্ছে। তবে এটি অন্তত প্রমাণ করে যে, এই মুহূর্তে বেইজিংকে চটিয়ে বা তাদের সাথে বড় কোনো সংঘাতে জড়িয়ে নতুন কোনো উত্তেজনা তৈরি করতে চান না ট্রাম্প। আর মার্কিন সামরিক কমান্ডের নাম থেকে ‘ইন্দো’ ছেঁটে ফেলে আবার পুরোনো ‘প্যাসিফিক কমান্ডে’ ফিরে যাওয়া মূলত ট্রাম্পের সেই কৌশলী চীননীতিরই এক বড় প্রমাণ। মূলত চীনের ক্ষোভ প্রশমন এবং ওয়াশিংটন-বেইজিং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে মসৃণ রাখতেই পেন্টাগনের এই প্রতীকী পিছুটান বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৪
কোয়াড-এর কফিনে শেষ পেরেক?
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য রুখতে আমেরিকার বিশেষ নেতৃত্বে ২০০৭ সালে গঠিত হয়েছিল ‘কোয়াড’। এই চতুর্দেশীয় অক্ষের মূল সদস্য রাষ্ট্রগুলো হলো ভারত, আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া। সূচনালগ্ন থেকেই এই জোটটিকে এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে হোয়াইট হাউস যেন এই বহুপাক্ষিক জোটের প্রতি আগের সেই আগ্রহ ও উদ্দীপনা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের ফলে জোটের বাকি সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। মার্কিন প্রশাসনের এই শৈথিল্য দেখে ভারতের রাজনৈতিক মহল এবং কূটনৈতিক বোদ্ধারা এখন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। ভারতের বর্ষীয়ান কংগ্রেস সাংসদ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ শশী তরুর ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানতে চেয়েছেন, মার্কিন সামরিক কমান্ডের এই সিদ্ধান্ত কি আসলে কোয়াড-এর কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকে দিল?
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এখন কোয়াড-এর চেয়ে দক্ষিণ চীন সাগরকে ‘পাখির চোখ’ করতে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। সেই লক্ষ্য পূরণে তারা জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপিন্সকে সাথে নিয়ে ‘স্কোয়াড’ (SQUAD) নামক একটি নতুন সামরিক অক্ষ গঠনের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এই নতুন অক্ষের মূল ফোকাস বা মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সরাসরি দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতাকে প্রতিহত করা। ফিলিপিন্সকে যুক্ত করে গঠিত এই নতুন সমীকরণটি স্পষ্টতই ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশলে এক বড় ধরনের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের আভাস দেয়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরোনো জোট কোয়াড-এর ওপর, যার ফলে এই জোটে ভারতের যে একটি কেন্দ্রীয় ও সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা ছিল, তা অনেকটাই ম্লান হতে বসেছে। নতুন এই 'স্কোয়াড' গঠনে ভারতকে রাখা হয়নি, কারণ ভারতের মূল মনোযোগের জায়গা দক্ষিণ চীন সাগর নয়, বরং ভারত মহাসাগর। ফলে ওয়াশিংটন যখন তার সামরিক কৌশল পরিবর্তন করছে, তখন নয়াদিল্লি নিজেকে কিছুটা একঘরে বোধ করতে বাধ্য হচ্ছে। আমেরিকার এই নতুন অক্ষের প্রতি পক্ষপাত মূলত প্রমাণ করে যে, তারা এখন ভারতের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে গিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেশি তৎপর।
বিগত এক দশক ধরে বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার মূল ভিত্তিই ছিল ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে একটি প্রধান ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা। ওয়াশিংটনের কৌশলগত নীতি নির্ধারকরা বিশ্বাস করতেন যে, শক্তিশালী ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এশিয়া অঞ্চলে চীনা ড্রাগনকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই কারণেই ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভারতকে খুশি করতে এবং তাকে বিশেষ মর্যাদা দিতেই সামরিক কমান্ডের নাম বদলে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে মার্কিন সামরিক কমান্ডের নাম থেকে সেই ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ পড়া ভারতের জন্য একটি বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক ধাক্কা। এর সোজা অর্থ হলো, ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তায় ভারতের সেই বিশেষ এবং অনন্য মর্যাদাটি আর আগের মতো অক্ষুণ্ন নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং লেনদেনভিত্তিক কূটনীতিতে ভারত এখন আর আমেরিকার অপরিহার্য কোনো কৌশলগত মিত্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। নাম পরিবর্তনের এই প্রতীকী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পেন্টাগন আসলে ভারতকে বার্তা দিল যে, মার্কিন স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা যেকোনো পুরোনো কৌশল ত্যাগ করতে পারে।
৫
কেন দূরত্ব বাড়ছে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের?
বিগত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির কারণে নয়াদিল্লির সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে এক বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও দুই দেশের নিজস্ব স্বার্থ ও কূটনৈতিক দ্বিমত এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বাণিজ্য সংঘাত থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে আমেরিকার আকস্মিক নীতি পরিবর্তন ভারতকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। মূলত ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্ত ও ভারতের জাতীয় স্বার্থের সংঘাতই এই দূরত্ব বাড়ার প্রধান কারণ।
ক। নোবেল বিতর্ক ও ক্ষোভ।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের এক সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি এই যুদ্ধ সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রেখেছেন। এই ঘটনার পর ট্রাম্পের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার, যা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের এই নোবেল পাওয়ার ইচ্ছাকে কূটনৈতিকভাবে সমর্থন না করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হন বলে জানা যায়। ট্রাম্পের এই ব্যক্তিগত অসন্তোষের প্রভাব পরবর্তীকালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ও কৌশলগত সম্পর্কের ওপর সরাসরি গিয়ে পড়ে।
খ। রুশ তেল ও বাণিজ্য যুদ্ধ।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারত তা উপেক্ষা করে মস্কো থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনা বজায় রাখে। ভারতের এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার সিদ্ধান্তকে ট্রাম্প প্রশাসন মোটেও ইতিবাচকভাবে নেয়নি। একই সাথে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক নিয়ে পুরনো মতবিরোধের জেরে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ভারতের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এই বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণেই ট্রাম্প ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোয়াড সম্মেলনে তাঁর সফর বাতিল করেছিলেন।
গ। পাকিস্তানের গুরুত্ব বৃদ্ধি।
ভারতকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে দেওয়া অতিরিক্ত ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব। ট্রাম্প অত্যন্ত কৌশলে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে মার্কিন-ইরান কূটনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ইসলামাবাদের সাথে ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক ও নতুন ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সাথে জঙ্গিবাদের সংযোগ নিয়ে ভারতের যে আন্তর্জাতিক লড়াই, তা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে ধাক্কা খেয়েছে।
৬
মার্কিন সামরিক কমান্ডের নাম পরিবর্তনের এই ঘটনাটি আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি পরিবর্তন ও ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের চলমান টানাপোড়েনেরই এক বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং বহুপাক্ষিক জোটের চেয়ে ব্যক্তিগত স্তরের লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি নয়াদিল্লির সাথে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত দূরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা কিংবা বাণিজ্যিক শুল্ক সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই দেশের অন্দরে ক্ষোভের পারদ অনেক আগেই চড়েছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষায় ভারতের উদাসীনতা এবং ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে হঠাৎ অতিরিক্ত ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দেওয়া। সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত সাংরি-লা ডায়ালগে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মুখ থেকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটির অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটনের সামরিক মানচিত্রে ভারতের অগ্রাধিকার এখন আড়ালে চলে গেছে।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় এবং জাজ্বল্যমান প্রশ্নটি হলো—কোয়াড কি তবে সত্যিই ভাঙনের মুখে? এশিয়ায় চীনের একাধিপত্য ও বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে যে চতুর্দেশীয় অক্ষ গড়ে উঠেছিল, আমেরিকার উদাসীনতায় তা আজ কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। ওয়াশিংটন এখন কোয়াডের চেয়ে দক্ষিণ চীন সাগরকে ‘পাখির চোখ’ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপিন্সকে নিয়ে গঠিত নতুন সামরিক জোট ‘স্কোয়াড’ (SQUAD)-এর দিকে বেশি ঝুঁকছে, যেখানে ভারতের কোনো স্থান নেই। বেইজিংয়ের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া যত দৃঢ় হবে, কোয়াড এবং এই অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান ততটাই গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হবে। শিনজো আবে কিংবা জিম ম্যাটিসরা ভারতকে সাথে নিয়ে যে ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ অঞ্চলের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ট্রাম্পের বেইজিং-ঘেঁষা নীতির কারণে তা আজ মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম। মার্কিন সেনার নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটির এই আনুষ্ঠানিক বিদায় আসলে কোয়াড জোটের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার মতোই এক প্রতীকী ইঙ্গিত।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৮ জুন ২০২৬