
১
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত মানচিত্রে পাকিস্তানের অবস্থান একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম এক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘ সাত দশক ধরে পাকিস্তান মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি এবং ভারতের প্রধান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক থিঙ্কট্যাংক, মার্কিন নীতি-নির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর মতো আর্থিক সংস্থাগুলো পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার মূলধারা থেকে আলাদা করে 'মেনাপ' (MENAP - Middle East, North Africa, and Afghanistan-Pakistan) অঞ্চলের অংশ হিসেবে পুনর্মূল্যায়ন করছে। এই স্থানান্তর কেবল একটি তাত্ত্বিক ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের গভীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট, আফগান সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা। পাকিস্তান তার এই নতুন কৌশলগত পরিচয়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন ভারত-কেন্দ্রিক দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে নিজের ভাগ্যকে যুক্ত করছে। এই ভূ-রাজনৈতিক অক্ষ পরিবর্তনের ফলে একদিকে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা চিরতরে অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, অন্যদিকে ভারতের জন্য এই অঞ্চলে তার একক আধিপত্য বিস্তারের পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হয়েছে। তবে এই শূন্যতা কেবল ভারতের একাধিপত্যের দিকেই মোড় নিচ্ছে না, বরং তা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদী ভূ-কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক উপস্থিতিকে আরও বেশি উস্কে দিচ্ছে। চূড়ান্ত বিচারে পাকিস্তানের 'মেনাপ' যাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে এমন এক সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য নীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
২
মেনাপ (MENAP) ফ্রেমওয়ার্কের ধারণা ও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি।
'মেনাপ' শব্দসংক্ষেপটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং আফগানিস্তান-পাকিস্তান (Middle East, North Africa, and Afghanistan-Pakistan) অঞ্চলকে নির্দেশ করে। ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাকে (MENA) একসাথে দেখা হলেও, একবিংশ শতাব্দীতে এসে ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন ও রান্ড কর্পোরেশন (RAND Corporation বা Research ANd Development Corporation)- এর মতো প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাংকগুলো এই জোটে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে যুক্ত করে নতুন এই ধারণার জন্ম দেয়। এই অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নিরাপত্তা সংকট, চরমপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ধরন প্রায় একই রকম হওয়ায় বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকরা একে একটি একক নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করছেন। আর পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পেছনে মূল কারণ হলো এর দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, যা মূলত এর পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত অর্থাৎ আফগানিস্তান কেন্দ্রিক। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজ-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের ডুরান্ড লাইন ও খাইবার পাখতুনখাওয়া অঞ্চলে সন্ত্রাসী হামলা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সীমান্ত কেন্দ্রিক অস্থিরতা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর উন্নয়নমুখী বাস্তবতার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিক্ষুব্ধ অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতির সাথে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।
৩
স্থানান্তরের মূল চালিকাশক্তি: কেন এই মনোযোগ পরিবর্তন?
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি বিগত দুই দশকে সম্পূর্ণভাবে ভারত-কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর তথ্যমতে, ভারতের বিশাল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামরিক আধুনিকায়ন এবং 'কোয়াড' বা 'জি-২০' এর মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে এর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা পাকিস্তানকে এই অঞ্চলে ক্রমশ কোণঠাসা ও একাকী করে তুলেছে। ফলে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার এই অসম প্রতিযোগিতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে মেনাপ অঞ্চলের অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যা তাকে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবং দরকষাকষির নতুন শক্তি প্রদান করে।
পাকিস্তানের এই ভূ-রাজনৈতিক স্থানান্তরের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো এর ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ওপর তীব্র আর্থিক নির্ভরতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর সাম্প্রতিক বেইলআউট প্যাকেজ ও শর্তাবলীর দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তানের অর্থনীতি সচল রাখতে প্রতি বছর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে শত কোটি ডলারের সেফ ডিপোজিট, তেল ঋণ এবং সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। এই দেশগুলোর সাথে পাকিস্তানের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক সংযোগ তাকে দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক বলয়ের সাথে অনেক বেশি শক্তভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে।
৪
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ ও ভারতের ওপর এর প্রভাব।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কাশ্মীর ইস্যু ও দ্বিপাক্ষিক বৈরিতার কারণে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে। সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে মেনাপ ফ্রেমওয়ার্কের দিকে ধাবিত করায় আঞ্চলিক জোট হিসেবে সার্কের পুনরুজ্জীবনের শেষ আশাটুকুও তিরোহিত হলো। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক একীভূতকরণ এখন আর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, যা এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর অর্থনৈতিক বিকাশে বড় ধাক্কা।
পাকিস্তানের অনুপস্থিতি এবং নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়েছে। ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসি এখন পাকিস্তানের কোনো বাধা ছাড়াই এই অঞ্চলের দেশগুলোতে কার্যকর করা সহজ হচ্ছে। তবে এটি ভারতের জন্য একই সাথে এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরীক্ষা, কারণ মালদ্বীপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন বা নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন প্রমাণ করে যে, পাকিস্তান ছাড়াও এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা ভারতের জন্য এককভাবে অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল।
৫
চীন এবং সিপেক (CPEC)-এর নতুন বৈশ্বিক সমীকরণ।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর স্বপ্নের প্রকল্প 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' -এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অংশ হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক। বেইজিং-ভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক 'চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' -এর বিশ্লষণ অনুযায়ী, চীনের কাছে পাকিস্তান কেবল দক্ষিণ এশিয়ার কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়, বরং এটি হলো মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি আরব সাগর, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় পৌঁছানোর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং নিরাপদ রুট।
পাকিস্তান যখন নিজেকে মেনাপ অঞ্চলের অংশ হিসেবে তুলে ধরে, তখন চীনের সিপেক-এর গুরুত্ব আর কেবল পাকিস্তান বা দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর তখন মূলত চীনকে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগর এবং উত্তর আফ্রিকার উদীয়মান বাজারের সাথে যুক্ত করার একটি প্রধান বাণিজ্য ও জ্বালানি মহাসড়কে রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান মেনাপ অঞ্চলে যুক্ত হয়ে চীনের বৈশ্বিক ভূ-কৌশলগত এজেন্ডাকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও শক্তিশালী ও অপরিহার্য করে তুলছে, যা প্রকারান্তরে আমেরিকার এই অঞ্চলের একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
৬
পাকিস্তানের 'মেনাপ' অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলে এক নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করবে। আগামী দিনগুলোতে পাকিস্তান হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিপাক্ষিক দ্বন্দ্বে নিজের শক্তি ক্ষয় না করে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের গ্রিন এনার্জি ট্রানজিশন এবং সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০' -এর অধীনে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে পাকিস্তানের বিশাল জনশক্তি ও সামরিক কৌশল নতুন বাজার খুঁজে পাবে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদে সহায়ক হবে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো পাকিস্তানের এই সরে যাওয়াকে কাজে লাগিয়ে ভারতের সাথে নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি 'বিমসটেক' বা উপ-আঞ্চলিক ব্লকের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক সংযোগ আরও বাড়াতে পারবে। তবে এই স্থানান্তরের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে না, কারণ পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি এবং ভারতের সাথে তার সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি পুরোপুরি শান্ত হবে না।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তানের এই কৌশলগত অক্ষ পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাবকে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী করে তুলবে। পাকিস্তান যত বেশি মেনাপ অঞ্চলের দিকে ঝুঁকবে, গোয়াদর বন্দর ও সিপেক করিডোর তত বেশি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সাথে চীনের সংযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, যা ভারতকে তার নিজের অঞ্চলেই এক ধরনের পরোক্ষ চীনা বেষ্টনী বা ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ নীতির মুখে দাঁড় করাবে। ভারতের জন্য ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জটি হবে কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা নয়, বরং চীনের এই বিশাল অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বিস্তারকে টেক্কা দেওয়া। পাকিস্তান যদি সফলভাবে মেনাপ অঞ্চলের নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগকে নিজের অনুকূলে ধরে রাখতে পারে, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার চাপ থেকে মুক্ত হয়ে মধ্যপ্রাচ্য-ভিত্তিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে। দক্ষিণ এশিয়া থেকে পাকিস্তানের এই মেনাপ যাত্রা তাই কেবল একটি দেশের ভৌগোলিক পরিচিতির পরিবর্তন নয়, এটি এশিয়ার সামগ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ মানচিত্রকে নতুন রূপ দেওয়ার এক মহাকাব্যিক সূচনা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৫ জুন ২০২৬