
১
২০২৬ সালের শুরুতে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে বিধ্বংসী যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তা কেবল তেহরানের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোকেই গুঁড়িয়ে দেয়নি, বরং এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের চেনা ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশলগত মিত্রতাকেও আমূল বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে এরফলে নজিরবিহীন ও চরম শীতলতা দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের একপেশে যুদ্ধংদেহী নীতি এবং রিয়াদের নিজস্ব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার আপ্রাণ প্রয়াস—এই দুইয়ের তীব্র টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এখন এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বজায় থাকা মার্কিন নিরাপত্তা বলয় ও অন্ধ নির্ভরযোগ্যতার নীতি থেকে সরে এসে সৌদি আরব এখন সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বকীয় কূটনৈতিক পথ অনুসরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন আধিপত্যকামী সিদ্ধান্তকে রিয়াদের এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের একক কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ও স্বাধীন আঞ্চলিক নেতৃত্বের যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে।
২
‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ এবং রিয়াদের কৌশলগত ‘না’।
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন আধিপত্য ও উদ্ধার অভিযান সংক্রান্ত 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' পরিকল্পনাটি রিয়াদের আপত্তির মুখেই ভেস্তে যায়। মার্কিন প্রশাসন এই কৌশলগত মিশনটি সফল করতে সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের পূর্ণ অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই প্রস্তাবে স্পষ্ট 'না' বলে দেন। রিয়াদের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস চরম ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের এই বিশেষ সামরিক পরিকল্পনাটি বাতিল করতে বাধ্য হয়।
ক। মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অনুমতি প্রত্যাখ্যানের নেপথ্য কারণ।
সৌদি আরবের এই স্বাধীনচেতা ও সাহসী সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়ানো। রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, মার্কিন হামলায় তেহরানের পতন না হলে ইরান পাল্টা জবাবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। এই জলপথ বন্ধ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ধসে পড়ার পাশাপাশি সরাসরি সৌদি আরবের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ত। তাছাড়া মার্কিন নীতির ওপর অন্ধ নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বকীয় আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাও রিয়াদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণে নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে সৌদি আরব কূটনীতিকে বেছে নেয়।
খ। ট্রাম্পের ক্ষোভ ও মার্কিন ইন্টারসেপ্টর প্রত্যাহারের হুমকি।
রিয়াদের কৌশলগত অবাধ্যতায় ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবে সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেন। তিনি সৌদির আকাশসীমা সুরক্ষায় ব্যবহৃত অত্যন্ত জরুরি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ স্থগিত রাখার কথা বলেন, যা রিয়াদের জন্য চিন্তার কারণ। এই ইন্টারসেপ্টরগুলো ব্যবহার করেই মূলত সৌদি সামরিক বাহিনী এতদিন ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত হামলা অত্যন্ত সফলভাবে প্রতিহত করে আসছিল। সম্পর্কের এই নজিরবিহীন টানাপোড়েনের জেরে ওয়াশিংটন এখন সৌদি আরব থেকে তাদের স্থায়ী সেনা ও সামরিক উপস্থিতি দ্রুত কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির এই নতুন মেরুকরণ প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একক আধিপত্যের দিন ক্রমান্বয়ে ফুরিয়ে আসছে।
৩
কূটনৈতিক অবজ্ঞা ও দূরত্বের বহিঃপ্রকাশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যকার সাম্প্রতিক ফাটলটি শুধু সামরিক অনাগ্রহ বা রণকৌশলের টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের গভীর নীতিগত অমিল এখন প্রকাশ্য কূটনৈতিক আচরণের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের শীর্ষ নেতৃত্বের বেশ কিছু পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ এই ক্রমবর্ধমান দূরত্বের অকাট্য প্রমাণ দেয়। মূলত একপেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার মার্কিন প্রবণতা এবং রিয়াদের নিজস্ব স্বার্থরক্ষা—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে দীর্ঘদিনের মিত্রতায় বড় ধস নেমেছে।
ক। সৌদি যুবরাজের জি-৭ সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের বার্তা।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে উপস্থিত থাকলেও সেখানে যাননি সৌদি যুবরাজ। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পশ্চিমাদের এই বিশেষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোটের আমন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদের এই সাহসী পদক্ষেপটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকামী নীতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের একপেশে ও হঠকারী যুদ্ধ পরিচালনার প্রতি রিয়াদের তীব্র অসন্তোষেরই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বর্জনের মাধ্যমে।
খ। মার্কো রুবিওর রিয়াদ বর্জন এবং কূটনৈতিক পাল্টা জবাব।
দূরত্বের এই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সফরসূচি। তিনি এই বিশেষ সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং বাহরাইনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে গেলেও রহস্যজনকভাবে সৌদি আরবকে এড়িয়ে যান। রিয়াদের নীতি নির্ধারকেরা যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণকে একটি পরিকল্পিত কূটনৈতিক অবজ্ঞা এবং স্পষ্ট উসকানি হিসেবেই তীব্রভাবে দেখছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই রিয়াদ বর্জনকে মূলত জি-৭ সম্মেলন বর্জনের বিপরীতে ওয়াশিংটনের একটি কূটনৈতিক পাল্টা জবাব বলে মনে করা হচ্ছে।
৪
যুদ্ধ শুরুর আগে সৌদি আরবের সতর্কবার্তা।
ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগেই রিয়াদ এই সামরিক অভিযানের ভয়াবহতা নিয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছিল। রিয়াদের এই অনীহা ও সতর্কবার্তার পেছনে মূলত কাজ করেছে তাদের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা চিন্তা। সেই সময়ে সৌদি নেতৃত্ব অত্যন্ত জোরালোভাবে ট্রাম্প প্রশাসনকে যেকোনো ধরনের হঠকারী সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়। কিন্তু ওয়াশিংটন রিয়াদের সেই বাস্তবসম্মত পরামর্শ ও উদ্বেগকে উপেক্ষা করেই এই অঞ্চলে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেয়।
ক। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকটের গভীর আশঙ্কা।
সৌদি আরবের মূল ও প্রধান আশঙ্কা ছিল মার্কিন হামলার পর ইরানের শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা বা না থাকা নিয়ে। রিয়াদ বুঝতে পেরেছিল, হামলায় যদি ইরানি সরকারের পতন না ঘটে, তবে তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে। কৌশলগত এই জলপথটি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিশ্বের সামগ্রিক জ্বালানি বাজার সম্পূর্ণ ধসে পড়ার এক তীব্র ঝুঁকি ছিল। আর বৈশ্বিক অর্থনীতির এই নজিরবিহীন বিপর্যয় ও চরম সংকটের সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হতো খোদ সৌদি আরবকেই। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতেই রিয়াদ শুরু থেকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক অনড় ও দূরদর্শী অবস্থান বজায় রেখেছিল।
খ। সীমিত প্রভাব ও বাধ্যবাধকতার বাস্তব উপলব্ধি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার একদম প্রাথমিক দিনগুলোতে সৌদি আরব অনীহা সত্ত্বেও মার্কিন বাহিনীকে তাদের নিজস্ব সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেয়। কারণ ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রথম তীব্র ধাক্কাটি সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডের ওপরই আসার বড় আশঙ্কা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি ও মার্কিন আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সৌদি নেতৃত্ব এক বড় রাজনৈতিক সত্য অনুবাধন করে। তারা বুঝতে পারে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এতদিনের সুগভীর ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও মার্কিন নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব অত্যন্ত সীমিত।
৫
আবুধাবি-রিয়াদ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং ওপেক ফাটল।
ইরান সংকটকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে শুধু রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কই তলানিতে ঠেকেনি, বরং আঞ্চলিক ক্ষমতার অন্যতম দুই স্তম্ভ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যেও তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এখন সম্পূর্ণ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে। ইরান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরের ফাটলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন শুধু রাজনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক অর্থনীতি ও একক নেতৃত্বের ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ক। আমিরাতের আক্রমণাত্মক নীতি বনাম সৌদির গভীর উদ্বেগ।
চলমান যুদ্ধের সময়ে ইরানের ভেতরে ও বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধারাবাহিক ও আক্রমণাত্মক বিমান হামলা রিয়াদের নীতি-নির্ধারকদের চরম চিন্তায় ফেলে দেয়। সৌদি আরবের মূল আশঙ্কা ছিল যে, আমিরাতের এই লাগামহীন আগ্রাসী সামরিক ভূমিকার কারণে পুরো অঞ্চলের স্পর্শকাতর জ্বালানি অবকাঠামোগুলো ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হবে। তেহরান যদি ক্ষিপ্ত হয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে আঘাত হানে, তবে তার সুদূরপ্রসারী মাশুল পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে দিতে হতো। এই বিপর্যয় রুখতে রিয়াদ শুরু থেকেই তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় এবং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।
খ। ওপেক জোটে ঐতিহাসিক ভাঙন ও দীর্ঘমেয়াদি ফাটল।
আবুধাবি ও রিয়াদের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দ্বন্দের চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির মূল মঞ্চে। গত এপ্রিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত সৌদি আরবের একক নিয়ন্ত্রণে থাকা তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রভাবশালী বিশ্ব জোট 'ওপেক' থেকে নাটকীয়ভাবে নিজেদের সরিয়ে নেয়। ওপেকের ইতিহাসে আমিরাতের এই সদস্যপদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে রিয়াদের অর্থনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেল উৎপাদন এবং বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে সৌদির একচেটিয়া নীতির বিরুদ্ধে আবুধাবি দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তুষ্ট ছিল, যা এই যুদ্ধের সুযোগে বিস্ফোরিত হয়। এই ঐতিহাসিক ভাঙন প্রমাণ করে যে, দুই দেশের মধ্যকার ফাটলটি সাময়িক কোনো ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী এক ভূরাজনৈতিক দূরত্বের সূচনা করেছে।
৬
কঠিন ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সৌদি আরব এখন খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে যে, এককভাবে ওয়াশিংটনের ওপর অন্ধ নিরাপত্তা নির্ভরতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও আত্মঘাতী। মার্কিন প্রশাসন যেভাবে তাদের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক অংশীদারদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্বেগকে উপেক্ষা করে একপেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তা রিয়াদকে সম্পূর্ণ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এই কারণেই চলমান সংঘাতের একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দোহায় যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে, সৌদি আরব তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হওয়া ৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারককে রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে। ওয়াশিংটনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিপরীতে রিয়াদের এই স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে মার্কিন একক আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসানের ঘণ্টাই বাজিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন বলয় থেকে রিয়াদের এই কৌশলগত ও ঐতিহাসিক দূরত্ব প্রমাণ করে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন আর বাইরের কোনো শক্তির ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের এই দৃশ্যমান ফাটল রিয়াদকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বকীয় আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
ভবিষ্যত সম্ভাবনার দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সমীকরণ অঞ্চলটিকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সৌদি আরব যেভাবে মার্কিন 'প্রজেক্ট ফ্রিডম' প্রত্যাখ্যান করেছে এবং নিজস্ব আকাশসীমা সুরক্ষায় স্বাধীন নীতি অবলম্বন করছে, তাতে ভবিষ্যতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই হ্রাস পাবে। রিয়াদ এখন ওয়াশিংটনের বিকল্প হিসেবে বেইজিং ও মস্কোর মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও সামরিক অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছে। একই সঙ্গে ওপেকের অভ্যন্তরীণ ফাটল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করে একক আঞ্চলিক নেতৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাও রিয়াদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ। ইরান সংকট যদি কূটনৈতিকভাবে পুরোপুরি মিটে যায়, তবে হরমুজ প্রণালির অবাধ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রিয়াদ ও তেহরান যৌথভাবে কাজ করতে পারে। মার্কিন অস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের হুমকির জবাবে সৌদি আরব নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আত্মনির্ভরশীল করার পাশাপাশি অ-পশ্চিমা দেশগুলো থেকে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র আমদানির দিকে ঝুঁকবে। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক ভবিষ্যতের পথ উন্মোচন করেছে যেখানে আঞ্চলিক সিদ্ধান্তগুলো ওয়াশিংটন বা তেল আবিব থেকে নয়, বরং রিয়াদের মতো স্থানীয় রাজধানীগুলো থেকেই নির্ধারিত হবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩ জুলাই ২০২৬