
১
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডানপন্থী পপুলিস্ট 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' (ম্যাগা) আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে ইসরাইলকে নিয়ে তীব্র সংশয় ও ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত কট্টর ইসরাইলপন্থী অবস্থান যখন পুনর্বিবেচনার মুখে এবং তেল আবিবের সাথে তাদের কূটনৈতিক দূরত্ব ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, তখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও নতুন সমীকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের সম্পর্কের সাম্প্রতিক এই টানাপোড়েনের সমান্তরালে, ভারতের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক দিন দিন আরও ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত হয়ে উঠছে। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ফিলিস্তিনপন্থী থাকলেও, বিগত কয়েক দশকে এবং বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনামলে এই সম্পর্কে এক আমূল ও কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, ভূরাজনীতি এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে এই দুই দেশ একে অপরের অন্যতম নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারে পরিণত হয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের বলয় থেকে বের হয়ে তেল আবিব এখন দিল্লির সাথে তাদের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক অক্ষকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
২
প্রতিরক্ষা এবং সামরিক সহযোগিতা (Defense Partnership) ।
ভারত ও ইসরাইলের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্কের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে মূলত তাদের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা খাতের ওপর। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে ইসরাইলি সামরিক সরঞ্জামের বিশ্বের বৃহত্তম ক্রেতা। প্রতি বছর ভারত ইসরাইল থেকে বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও যুদ্ধাস্ত্র আমদানি করে আসছে। এরমধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো অত্যাধুনিক ড্রোন 'হেরন' (Heron), বিধ্বংসী মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম 'বারাক ৮' (Barak 8) এবং শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা। এই বিশাল ও ধারাবাহিক সামরিক বাণিজ্যের কারণে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। কেবল অস্ত্র কেনাবেচাতেই এটি সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর পারস্পরিক আস্থার একটি বড় স্মারক। বিগত কয়েক দশকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির নানা পরিবর্তনের মধ্যেও এই প্রতিরক্ষা বন্ধন বিন্দুমাত্র শিথিল হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভিন্ন সমীকরণের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অংশীদারিত্ব দিন দিন আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।
বর্তমানে এই সম্পর্ক কেবল প্রথাগত ক্রেতা-বিক্রেতার একপাক্ষিক সমীকরণে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা যৌথ উৎপাদনে রূপ নিয়েছে। ভারত সরকারের 'মেক ইন ইন্ডিয়া' প্রকল্পের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইসরাইল এখন ভারতের সাথে যৌথভাবে প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) করছে। এর ফলে দুই দেশ যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি ভারতের মাটিতেই বিভিন্ন অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'দ্য ওয়ার' এবং 'আল জাজিরা'-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও এই সহযোগিতা সচল ছিল। ভারতের ‘আদানি ডিফেন্স’ এবং ইসরাইলের ‘এলবিট সিস্টেমস’ যৌথভাবে হায়দ্রাবাদের কারখানায় উন্নত সামরিক ড্রোন তৈরি করে ইসরাইলে রপ্তানি করেছে। যুদ্ধের মতো চরম সংকটের সময়েও এই যৌথ উৎপাদন এবং অস্ত্র সরবরাহ প্রক্রিয়া সচল থাকা দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে। এটি দেখায় যে বৈশ্বিক চাপ বা সমালোচকদের কোনো মন্তব্যই তাদের এই সামরিক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বাধাগ্রস্ত করতে পারছে না। ফলে দিল্লির মাটিতে তৈরি হওয়া ইসরাইলি প্রযুক্তি এখন দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও ভূরাজনৈতিক অক্ষকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
৩
ভূরাজনীতি এবং 'আইটুইউটু' (I2U2 Quartet) ।
মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান এখন ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। প্রখ্যাত ভূরাজনৈতিক সাময়িকী 'দ্য ডিপ্লোম্যাট' ও 'ফরেন পলিসি' ম্যাগাজিনের বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলে দুই দেশের স্বার্থ অভিন্ন। ২০২১ সালে গঠিত 'আইটুইউটু' (I2U2) জোট—যা ভারত, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত—এই সম্পর্কের বড় প্রমাণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই শক্তিশালী বহুপাক্ষিক জোটটিকে অনেকেই এখন 'পশ্চিম এশীয় কোয়াড' (West Asian Quad) নামে অভিহিত করছেন। এই নতুন সমীকরণ পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একই সাথে এটি আরব বিশ্বের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। এই চার দেশের জোটগত অবস্থান কৌশলগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এর মাধ্যমে পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সংযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরাইল ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এই ভূরাজনৈতিক অক্ষটি প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক মেরুকরণের যুগে দুই দেশের কৌশলগত বোঝাপড়া কতটা গভীর ও দূরদর্শী।
জি-২০ সম্মেলনে ঘোষিত 'আইএমইসি' (IMEC) তথা ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর এই অক্ষকে আরও বাস্তব রূপ দিয়েছে। এই মেগা প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য হলো ভারতকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব হয়ে সরাসরি ইসরাইলের সাথে যুক্ত করা। এই অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত মহাপরিকল্পনাটি দুই দেশের বাণিজ্যিক পথকে সুগম করার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। এই সংযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ভারতের আদানি গ্রুপ ইতিমধ্যেই ইসরাইলের কৌশলগত 'হাইফা বন্দর' বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি এখন সরাসরি ভারতের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই বিশাল বিনিয়োগ কেবল একটি সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি নয়, বরং এটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক অক্ষের প্রতীক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও, ভারতের এই বিশাল অর্থনৈতিক উপস্থিতি ইসরাইলকে বড় স্বস্তি দিচ্ছে। হাইফা বন্দরের উন্নয়ন ও আইএমইসি করিডোর ভবিষ্যতে এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যে ভারত-ইসরাইল জুটিকে চালকের আসনে বসাবে। ফলে এই সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব দুই দেশের ভূরাজনৈতিক অক্ষকে সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি অজেয় করে তুলছে।
৪
কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আদর্শিক মিল (Diplomatic Alignment) ।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থান ইসরাইলের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ ও দৃঢ় সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আকস্মিক হামলার পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম সারির বিশ্বনেতাদের একজন হিসেবে ইসরাইলের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও বিভিন্ন সংস্থায় ফিলিস্তিন ইস্যুতে হওয়া বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে ভারত ভোটদানে বিরত থাকে। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'দ্য হিন্দু' এবং 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অবস্থান ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির এক বড় পরিবর্তন। ভারত কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে একদিকে গাজার সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জন্য নিয়মিত মানবিক সহায়তা ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরাইলের চালানো সামরিক অভিযান ও তাদের 'সন্ত্রাসবাদ বিরোধী' বয়ানকে কূটনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। বিশ্বমঞ্চে যখন গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরাইল তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি, তখন ভারতের এই পরোক্ষ কূটনৈতিক ঢাল তেল আবিবের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও দিল্লির এই সুচিন্তিত অবস্থান দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক অনন্য ও গভীর মাত্রায় নিয়ে গেছে।
অনেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারত ও ইসরাইলের এই ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে দুই দেশের বর্তমান শাসকদলের আদর্শিক মিল রয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং ইসরাইলের ডানপন্থী লিকুদ (Likud) পার্টির রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ লক্ষ্য করা যায়। উভয় দলই নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের এক ধরনের উগ্র চরমপন্থার ঐতিহাসিক ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। এই অভিন্ন বয়ানের ওপর ভিত্তি করে দুই পক্ষই একে অপরের কট্টর জাতীয়তাবাদী নীতি ও সুরক্ষামূলক পদক্ষেপকে পরোক্ষভাবে জোরালো সমর্থন জানায়। এই আদর্শিক মিলের কারণে দুই দেশের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যেও একে অপরের প্রতি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। মোদী এবং নেতানিয়াহুর মধ্যকার ব্যক্তিগত রসায়নও এই রাজনৈতিক ও আদর্শিক অক্ষকে শীর্ষ পর্যায়ে আরও বেশি বেগবান করতে ভূমিকা রেখেছে। এরফলে এই সম্পর্ক কেবল দুটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বা সামরিক চুক্তি নয়, বরং এটি গভীর রাজনৈতিক দর্শনের এক মেলবন্ধন। এই আদর্শিক অক্ষের কারণেই ওয়াশিংটনের সাথে দূরত্ব তৈরি হলেও, দিল্লির সাথে ইসরাইলের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন আরও অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠছে।
৫
কৃষি, পানি এবং বেসামরিক প্রযুক্তি খাত।
সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রের বাইরেও ইসরাইলের আধুনিক বেসামরিক প্রযুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ টেকসই উন্নয়নে অত্যন্ত বড় ভূমিকা রাখছে। ইসরাইলি দূতাবাস ও ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইসরাইলের প্রত্যক্ষ ও কারিগরি সহযোগিতায় ইতিমধ্যে প্রায় ৩০টিরও বেশি অত্যাধুনিক 'সেন্টার অব এক্সিলেন্স' গড়ে তোলা হয়েছে। বিশেষ করে ইসরাইলের বিশ্বখ্যাত উন্নত ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি এবং পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার আধুনিক প্রযুক্তি ভারতের খরাপ্রবণ ও কৃষিপ্রধান রাজ্যগুলোতে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছে। রাজস্থান ও গুজরাটের মতো শুষ্ক ও জলকষ্টে ভোগা অঞ্চলগুলোর কৃষকরা এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কম পানিতে অধিক ফলন ঘরে তুলতে পারছেন। এই কার্যকর প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল নীতিনির্ধারক পর্যায়েই আটকে রাখেনি, বরং ভারতের তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের জীবনেও এর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তৃত করেছে। উচ্চপর্যায়ের ভূরাজনীতি ও প্রতিরক্ষার পাশাপাশি এই বেসামরিক সহযোগিতা ভারত-ইসরাইল অক্ষকে সাধারণ জনগণের স্তরে আরও বেশি ফলপ্রসূ, সুদৃঢ় এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে রূপ দিয়েছে।
৬
মার্কিন রাজনীতিতে যেখানে ইসরাইলকে দেওয়া বিপুল সামরিক সহায়তা ও অন্ধ সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং হোয়াইট হাউসের সাথে তেল আবিবের সম্পর্কে ফাটল স্পষ্ট হচ্ছে, সেখানে ভারতের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে ইসরাইল নীতি নিয়ে তৈরি হওয়া এক ধরনের ক্লান্তি বা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝে ভারত কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই তেল আবিবের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতের জন্য ইসরাইল কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষিত ‘প্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি ও নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য উৎস’। অন্যদিকে বৈশ্বিকভাবে ক্রমশ একঘরে হতে থাকা এবং পশ্চিমা মিত্রদের চাপের মুখে পড়া ইসরাইলের জন্য ভারত হলো একটি বিশাল ‘অর্থনৈতিক বাজার এবং নির্ভরযোগ্য ভূরাজনৈতিক মিত্র’। এই পারস্পরিক প্রয়োজনীয়তা দুই দেশের সম্পর্ককে কোনো সাময়িক চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি স্থায়ী কৌশলগত অক্ষে রূপান্তর করেছে। বৈশ্বিক কূটনীতির কঠিন মঞ্চে যখন বহু পুরনো মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন দিল্লির এই অবিচল বন্ধুত্ব ইসরাইলের জন্য এক বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।
ভারত ও ইসরাইলের এই উদীয়মান অক্ষ আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আরও গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রতিরক্ষা খাতের যৌথ উৎপাদন থেকে শুরু করে হাইফা বন্দরের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ এবং আইএমইসি (IMEC) করিডোরের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা—সবকিছুই এই সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের দিকে ইঙ্গিত করে। এই অক্ষটি প্রমাণ করে যে বর্তমান বহুমেরু কেন্দ্রিক বিশ্বে কোনো একক পরাশক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল না থেকে নতুন আঞ্চলিক জোট গঠন করা কতটা জরুরি। দিল্লির মাটিতে উৎপাদিত সামরিক প্রযুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ভারতের কৌশলগত অংশগ্রহণ আগামী দিনে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বাণিজ্যের ভারসাম্য নির্ধারণে চালকের ভূমিকা পালন করবে। এটি কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানোর একটি বৈশ্বিক প্রয়াস বলা যেতে পারে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৭ জুলাই ২০২৬