
১
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং মিলিশিয়াদের সশস্ত্র সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া। ২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মা গাদ্দাফির পতনের পর থেকে দেশটি মূলত পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে ভেঙে পড়ে পুরো প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো। এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে এবং লিবিয়ায় স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি এক অভাবনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগের সূচনা হয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে (যা 'ইসলামাবাদ চুক্তি' নামে পরিচিত) সফল মধ্যস্থতা করার পর, বিশ্ব কূটনীতির আলোচনায় এখন নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গভীর আস্থাভাজন হয়ে ওঠার পর, ইসলামাবাদ এবার লিবিয়ার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটাতে সম্পূর্ণ গোপনে এক নতুন শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই কূটনৈতিক সাফল্য শুধু লিবিয়ার ভাগ্যকেই পুনর্নির্ধারণ করছে না, বরং বিশ্ব পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের মর্যাদা, প্রভাব এবং কৌশলগত অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে।
২
পটভূমি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
২০১১ সালের লিবীয় বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক শক্তির বহুমুখী হস্তক্ষেপের কারণে লিবিয়া একটি অন্তহীন প্রক্সি যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হয়। একদিকে জাতিসংঘ স্বীকৃত ত্রিপোলিভিত্তিক পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকার এবং অন্যদিকে তবরুক ও বেনগাজিভিত্তিক সামরিকভাবে শক্তিশালী পূর্বাঞ্চলীয় লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি—এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কেন্দ্রের লড়াইয়ে দেশটিতে কোনো স্থায়ী সরকার গঠন সম্ভব হয়নি।
আমেরিকা, তুরস্ক, মিশর, রাশিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় দেশগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের কারণে লিবিয়া সংকট দিন দিন আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মতো একটি দক্ষিণ এশীয় দেশকে লিবিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে দেখা যাওয়াটা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের জন্য একটি বড় চমক। কিন্তু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বিশ্ব দরবারে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উত্থান হুট করে ঘটেনি, বরং এটি তাদের ধারাবাহিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ফসল।
৩
পরাশক্তিদের আস্থা ও ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল।
বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লিবিয়ায় পাকিস্তানের এই গোপন মধ্যস্থতার বিষয়ে পুরোপুরি অবগত এবং তিনি নিজে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক সফল চুক্তিতে ইসলামাবাদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করার পর, ট্রাম্প প্রশাসন লিবিয়ার জটিল বহুপাক্ষিক দ্বন্দ্বে পাকিস্তানের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান কৌশল হলো মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমিয়ে কূটনৈতিক ও টেকসই উপায়ে সমাধান খোঁজা, আর এই কৌশলে তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত "কূটনৈতিক চ্যানেল" হয়ে উঠেছে ইসলামাবাদ।
সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে এই শান্তি উদ্যোগে রিয়াদও পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। লিবিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় সৌদি আরবের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে, যা তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। লিবিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষই গত বছরের শেষের দিকে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা কামনা করলে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়, যা ইসলামাবাদের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি বড় প্রমাণ।
৪
প্রস্তাবিত লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণ পরিকল্পনা।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণ পরিকল্পনার একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া ফেলেছে। প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, দেশটিতে একটি সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে, যা প্রধান দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসবে।
ক। ক্ষমতার ভারসাম্য: গভর্মেন্ট অব ন্যাশনাল কনসেনসাস।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় লিবিয়ায় 'গভর্মেন্ট অব ন্যাশনাল কনসেনসাস অ্যান্ড প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল' (Government of National Consensus and Presidential Council) নামক একটি বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে ছত্রিশ (৩৬) মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতা অংশীদারিত্ব চুক্তি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এই জ্যামিতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের মূল রূপরেখাটি নিম্নরূপ:
(১) প্রধানমন্ত্রীর পদ। জাতিসংঘ স্বীকৃত পশ্চিমাঞ্চল ভিত্তিক সরকারের বর্তমান প্রধান আবদুলহামিদ দ্বিবাহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
(২) প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। পূর্বাঞ্চল ভিত্তিক লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ডেপুটি কমান্ডার সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাবেন।
এই ক্ষমতার ভাগাভাগি লিবিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো পক্ষই নিজেদের বঞ্চিত মনে না করে।
খ। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট সংক্রান্ত বিশেষ কর্তৃত্ব।
লিবিয়ার ভূরাজনীতিতে ক্ষমতার মূল উৎস হলো দেশটির তেলসম্পদ। দেশের অধিকাংশ বড় তেলক্ষেত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাদ্দাম হাফতারের পিতা ও লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রধান ফিল্ড মার্শাল খলিফা হাফতারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় খলিফা হাফতারকে বাজেট সংক্রান্ত বিশেষ কর্তৃত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। লিবিয়ার তেল উৎপাদন ও সরবরাহ সচল না থাকলে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন অসম্ভব, তাই এই অর্থনৈতিক সমীকরণটিকে খসড়া পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান এই পুরো প্রক্রিয়াটি যাতে সক্রিয়ভাবে বজায় থাকে এবং উভয় পক্ষ চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর গ্যারান্টারের ভূমিকা পালন করবে। তবে একটি পাকিস্তানি নির্ভরযোগ্য সূত্র সতর্ক করে জানিয়েছে যে, এই পরিকল্পনাটি এখনো বিস্তারিত আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগে আরও অনেক দরকষাকষি বাকি।
৫
পর্দার আড়ালের কূটনীতি: রাওয়ালপিন্ডি থেকে ওয়াশিংটন।
পাকিস্তানের সামরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত এই গোপন কূটনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করেছে। রাওয়ালপিন্ডিতে জেনারেল আসিম মুনিরের সাথে সাদ্দাম হাফতারের বৈঠকের পর পরই ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সবুজ সংকেত মূলত একটি সুপরিকল্পিত চেইনের সফল বাস্তবায়ন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে, পরাশক্তিদের আস্থাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান কীভাবে বিশ্বমঞ্চে একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সূক্ষ্ম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘদিনের লিবীয় সংকট কাটাতে রাওয়ালপিন্ডির সামরিক প্রজ্ঞা এবং ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সমর্থনের এই মেলবন্ধনই এখন শান্তি ফেরানোর প্রধান চালিকাশক্তি।
ক। রাওয়ালপিন্ডি-ওয়াশিংটন কূটনৈতিক চেইনের প্রভাব।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার এই অদৃশ্য সমন্বয় লিবিয়ার বিবদমান পক্ষগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট টেবিল বা আলোচনায় বসাতে বাধ্য করেছে। রাওয়ালপিন্ডিতে যে খসড়া ও রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়, ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মূলত কূটনৈতিক বিবৃতির মাধ্যমে সেটির ওপরেই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর দিয়েছে। এই দ্বিমুখী পদক্ষেপের কারণে লিবিয়ার পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের নেতারাই এই শান্তি প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন থাকায় এই উদ্যোগটি কেবল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাচ্ছে। এই নিখুঁত কূটনৈতিক চেইনের সাফল্য বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের যৌথ সক্ষমতা এবং প্রভাবকে নতুন করে প্রমাণ করেছে।
খ। নিরপেক্ষ পক্ষ থেকে প্রধান প্রভাবক হয়ে ওঠা।
লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকা, তুরস্ক বা মিশরের মতো পরাশক্তিগুলোর বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকলেও, তাদের প্রতি একপক্ষের তীব্র ক্ষোভ ও অবিশ্বাস রয়েছে। এই জটিল শূন্যস্থানে পাকিস্তান একটি অনন্য ও নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে দুই পক্ষের কাছেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। একদিকে জাতিসংঘ আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পূর্বের হাফতার বাহিনীর কাছে জেএফ-১৭ ও সুপার মুশাক বিমান বিক্রির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রাখা হয়েছে, অন্যদিকে পশ্চিমের সরকারের সাথেও রয়েছে চমৎকার রাজনৈতিক সংযোগ। কোনো নিজস্ব আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের এজেন্ডা না থাকায় ইসলামাবাদের এই দ্বিমুখী গ্রহণযোগ্যতা লিবিয়ার দেড় দশকের পুরনো অবিশ্বাস দূর করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছে।
৬
আঞ্চলিক শক্তির গ্রিন সিগন্যাল ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ।
লিবিয়ার এই জটিল শান্তি প্রক্রিয়াটি কেবল মার্কিন কিংবা সৌদি সমর্থনের ওপর ভর করে চলছে না, বরং এর পেছনে রয়েছে আঙ্কারা ও দোহার মতো প্রধান আঞ্চলিক শক্তির সবুজ সংকেত। তুরস্ক এবং কাতারের মতো দেশগুলো লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারের মূল পৃষ্ঠপোষক হওয়ায়, এই আলোচনায় অংশ নিতে তাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। যেহেতু এই আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেরা লিবিয়া সংকটে সরাসরি যুদ্ধরত পক্ষ ছিল, তাই তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ অন্য পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো না। এই কৌশলগত শূন্যস্থানে পাকিস্তান একটি সম্পূর্ণ "নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য" বিকল্প মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছে, যা এই উদ্যোগকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দিচ্ছে। তবে আঞ্চলিক পরাশক্তিদের এই গ্রিন সিগন্যালের সমান্তরালে লিবিয়ার মাঠপর্যায়ের বহুমুখী অভ্যন্তরীণ সংকট ও স্বার্থের সংঘাত এই শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে এক বিশাল বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
ক। আঙ্কারা-দোহা অক্ষের সমর্থন ও কৌশলগত সমীকরণ।
লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারের প্রধান দুই স্তম্ভ তুরস্ক এবং কাতারের সক্রিয় অনুরোধ এই গোপন শান্তি আলোচনাকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। অতীতে লিবিয়ার সংকটে সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার কারণে আঙ্কারা বা দোহা নিজে থেকে সামনে এলে পূর্বাঞ্চলীয় হাফতার পক্ষ তা শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করত। এই কারণেই তারা পর্দার আড়ালে থেকে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতা করার জন্য বেছে নিয়েছে, কারণ ইসলামাবাদের সাথে উভয় পক্ষেরই চমৎকার সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। এই ত্রিদেশীয় ও পরোক্ষ বোঝাপড়া লিবিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা কেন্দ্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব এবং রাজনৈতিক দেয়াল ভাঙতে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে। পরাশক্তিগুলোর এই সম্মিলিত কৌশলগত ছাড় ও সমর্থনই মূলত লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণ পরিকল্পনার এই জটিল ছকটিকে আলোর মুখ দেখতে সাহায্য করেছে।
খ। স্থায়ীত্বের চ্যালেঞ্জ ও তারেক মেগেরিসির সতর্কবার্তা।
ভূরাজনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান 'ইনফরমমি'-র পরিচালক তারেক মেগেরিসি এই সম্ভাব্য চুক্তির দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কঠোর সতর্কতা জারি করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতে আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক প্রশংসা পাওয়া রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর মধ্যকার শান্তি চুক্তিও মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। লিবিয়ার মাটিতে শত শত সশস্ত্র স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনী, তেল সম্পদের হিস্যা ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজস্ব গোপন এজেন্ডা এতটাই জটিল যে যেকোনো মুহূর্তে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রস্তাবিত ৩৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনায় সামান্য অনিয়ম বা পারস্পরিক অবিশ্বাস দেখা দিলেই পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৭
লিবিয়ার দীর্ঘ দেড় দশকের অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাস, রক্তক্ষয়ী ইতিহাস এবং ভূরাজনৈতিক জটিলতা দূর করে এই ৩৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতা অংশীদারিত্ব চুক্তিটি বাস্তবে রূপ দেওয়া পাকিস্তানের কূটনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। তবে এই উদ্যোগের বর্তমান অগ্রগতি এবং পরাশক্তিদের সমর্থন এটিই প্রমাণ করে যে, ইসলামাবাদ এখন আর কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা বৈশ্বিক সংকটের জট খোলার এক নির্ভরযোগ্য কারিগর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যদি রাওয়ালপিন্ডি এবং ইসলামাবাদের যৌথ দূরদর্শিতায় লিবিয়ার মরুভূমিতে শান্তির সুবাতাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তবে তা বিশ্ব পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের মর্যাদা ও কৌশলগত প্রভাবকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক শান্তির অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
লিবিয়া সংকটের এই প্রস্তাবিত সমাধান কেবল উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির একক পুনর্জন্ম ঘটাবে না, বরং তা সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার নতুন যুগের সূচনা করবে। পরাশক্তিদের আস্থা, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন এবং লিবিয়ার নিজস্ব পক্ষগুলোর পাকিস্তানের প্রতি এই গভীর নির্ভরতা একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বন্দুকের নল নয়, বরং কূটনৈতিক টেবিলের প্রজ্ঞাই জয়ী হয়। ইতিহাসের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসা পাকিস্তান যেভাবে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং ত্রিপোলির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করছে, তা বিশ্ববাসীকে এই আশাবাদই জোগায় যে—যতই জটিল হোক না কেন, আন্তরিক ও নিরপেক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে পৃথিবীতে শান্তির আলো জ্বালানো সম্ভব।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৭ জুলাই ২০২৬