
১
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিশীল প্রেক্ষাপটে কোনো চিরস্থায়ী শত্রু বা মিত্র থাকে না, থাকে কেবল চিরস্থায়ী জাতীয় স্বার্থ—এই ধ্রুব সত্যটিই আজ ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের টানাপোড়েনে চরমভাবে বাস্তব রূপ নিয়েছে। বাইরে থেকে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির অক্ষকে পাথরের মতো নিশ্ছিদ্র মনে হলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ এবং ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক সমীকরণ মোদি সরকারের কৌশলগত বিশ্বাসের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ওমান উপসাগরে মার্কিন হামলায় ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু এবং তার বিপরীতে হোয়াইট হাউসের উদাসীনতা দিল্লির স্বনির্মিত ‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তিকে এক রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একইসাথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক ধাক্কা, এশিয়ার দুর্বলতম মুদ্রায় রুপির রূপান্তর এবং দেশের অভ্যন্তরে মুসলিম নিপীড়নকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভারতের উদীয়মান শক্তির দাবিকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অন্যদিকে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের অভাবনীয় কূটনৈতিক পুনরুত্থান এবং প্রতিবেশীদের সাথে চীনের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা দিল্লির কৌশলগত স্বাধীনতাকে খর্ব করে বৈশ্বিক প্যারাডক্সের জালে আবদ্ধ করে ফেলেছে।
২
ওমান উপসাগরের রক্তক্ষয় ও কূটনৈতিক ফাটল।
৯ জুন ২০২৬ তারিখে ওমান উপসাগরে পালাউয়ের পতাকাধারী তেল ট্যাংকার ‘সেত্তেবেলো’-তে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হলে দুদেশের সম্পর্কে তীব্র কূটনৈতিক ফাটল ধরে। আমেরিকা এই হামলার পেছনে ট্যাংকারটির ইরানি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার দাবি করলেও ভারত একে অনাকাঙ্ক্ষিত ও নির্মম ঘটনা হিসেবে দেখে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ১২ জুন ২০২৬ তারিখে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিওকে ফোন করে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। তবে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যকার এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন বর্তমান ভূরাজনীতিতে ইরান যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ক। জয়শঙ্করের তীব্র প্রতিবাদ ও রুবিওর কঠোর অবস্থান।
নিহত ভারতীয় নাবিকদের ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের তীব্র প্রতিবাদের জবাবে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম উদাসীন। মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে এই অঞ্চলে নৌনিরাপত্তা রক্ষায় মার্কিন বাহিনী প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ জারি রাখবে। দুঃখজনকভাবে, তিন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনায় রুবিও কোনো দুঃখ প্রকাশ করেননি এবং নয়াদিল্লির কাছে কোনো ক্ষমাও চাননি। এমনকি ভবিষ্যতে এমন রক্তক্ষয়ী ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে আমেরিকার কৌশলগত অংশীদার ভারতকে তিনি কোনো আশ্বাস পর্যন্ত দেননি। এই অনমনীয় আচরণ মূলত ওয়াশিংটনের চোখে দিল্লির কৌশলগত স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার এবং দ্বিপক্ষীয় বিশ্বাসের জায়গাটি ভেঙে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।
খ। ট্রাম্প-মোদি রসায়ন বনাম পর্দার পেছনের ফাটল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের কূটনৈতিক ফাটলটি এমন সময়ে প্রকাশ পায় যখন ট্রাম্প মোদিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন এবং ফ্রান্সে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি চলছিল। তবে বাইরে দুই নেতার সুসম্পর্ক দেখানো হলেও বৈঠকের পর ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যু নিয়ে করা প্রশ্নটি ট্রাম্প কেবল দায়সারাভাবে এড়িয়ে যান। ট্রাম্প মন্তব্য করেন, "আমরা ওই মানুষদের সবাইকে ভালোবাসি," যা মোদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা ছিল না। এমনকি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জোট ‘কোয়াড’-সংক্রান্ত প্রশ্নটিও তিনি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান, যা প্রমাণ করে বাইরে সম্পর্ক পাথরের মতো শক্ত মনেহলেও ভেতরে কৌশলগত জায়গাটি নড়বড়ে হয়ে গেছে।
৩
ইরান যুদ্ধের মাশুল: ভারতের অর্থনীতিতে চরম আঘাত।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যকার ফাটল স্পষ্ট করে ভারতের অর্থনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ভারতের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা দেশের ভেতরের প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত্তি আজ আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র ধাক্কা খেতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে যে অর্থনৈতিক শক্তিকে ভারত তার ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল, তা এখন যুদ্ধের মাশুল দিয়ে বিপর্যস্ত।
ক। জ্বালানি সংকট ও আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি।
ভারত তার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের প্রায় ৮৯ শতাংশ তেল আমদানি করায় বিশ্ববাজারের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশকে সরাসরি আঘাত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এই লাগামহীন মূল্যস্ফীতির ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামগ্রিক ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত রুট হরমুজ প্রণালিতে তীব্র অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার কারণে ভারত জুড়ে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। এরফলে বর্তমানে ভারতের কৃষি ও গৃহস্থালি খাতে সার এবং রান্নার গ্যাসের তীব্র ও অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে। এই বহুমুখী জ্বালানি সংকট ও ঘাটতি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
খ। রেমিট্যান্সের পতন ও বিশ্ব অর্থনীতিতে র্যাঙ্কিং বিপর্যয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় সেখানকার স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে কর্মরত ভারতীয় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ব্যাপক হারে কমে গেছে। একইসঙ্গে সামুদ্রিক মালবাহী জাহাজের বীমা খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের পণ্য রপ্তানি খাতও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ফলে দুই বছর আগের ‘বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি’ হওয়ার অহংকার ভেঙে ভারত উল্টো বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং-এ ষষ্ঠ স্থানে নেমে গেছে। এই মন্দার জেরে ভারতীয় রুপি বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে এবং দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি পাচার হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রেকর্ড পরিমাণ টাকা তুলে নিয়ে ভারতের শেয়ার ও ঋণ বাজার ছেড়ে তাইওয়ান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নিরাপদ দেশে বিনিয়োগ করছে।
৪
মোদির রাজনৈতিক সংকট ও উদীয়মান ভারতের ভাবমূর্তি।
নরেন্দ্র মোদির পুরো রাজনীতিই আবর্তিত হয় ভারতের জাতীয়তাবাদী শক্তি প্রদর্শন এবং বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী ‘উদীয়মান ভারত’-এর ভাবমূর্তি বা 'বিশ্বগুরু' রূপ তুলে ধরার ওপর। কিন্তু মার্কিন হামলায় নিজেদের নাগরিকদের রক্ষা করতে না পারা এবং এরআগে আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতের উপকূলের কাছে একটি ইরানি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা ভারতের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ভারত মহাসাগর অঞ্চলের মূল নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে ভারতের যে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, তা এই ব্যর্থতার ফলে এখন সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হওয়ার পথে। একইসময়ে দেশের ভেতরে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চলমান নির্যাতন বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভেঙে ফেলার মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে এবং অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি বজায় রাখতে সরকারের এই চরম ব্যর্থতা প্রধানমন্ত্রী মোদির বহু যত্নে গড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ভাবমূর্তিকে এক বিশাল ধাক্কা দিয়েছে।
বাহ্যিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার সমান্তরালে ভারতের অভ্যন্তরে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং তীব্র গণ-অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত এই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে ‘ককরোচ পার্টি’র মতো কট্টর ও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির আকস্মিক উত্থান ঘটছে, যা মোদির একক আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে। একইসঙ্গে সরকারের নীতি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে দেশব্যাপী তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে, যা দমনে আইটি সেল বা সরকারি আইন কোনো কাজ করছে না। ডিজিটাল দুনিয়ায় সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ এবং রাজপথের রাজনৈতিক অচলাবস্থা মোদি সরকারের নিয়ন্ত্রণকে আলগা করে দিচ্ছে। বাইরে মার্কিন আগ্রাসনের সামনে নতজানু নীতি এবং ভেতরে সামাজিক-রাজনৈতিক বিভাজন উদীয়মান ভারতের অভ্যন্তরীণ ভিতকে মারাত্মকভাবে নড়বড়ে করে তুলেছে।
৫
দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য বদল: পাকিস্তানের পুনরুত্থান।
গত এক দশক ধরে মোদি সরকার আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার নীতি নিয়ে চলেছিল। পাকিস্তানকে আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বহীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল নয়াদিল্লি, কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিহাসে সেই সমীকরণ আজ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই অঞ্চলের কৌশলগত পট পরিবর্তনে পাকিস্তানের সামরিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর রেশ ধরে আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা এবং কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনীতিকে অকার্যকর করে দেয়। ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক নীতিতে পাকিস্তান পুনরায় অপরিহার্য হয়ে ওঠায় আমেরিকার সাথে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। হোয়াইট হাউসের এই নীতিগত পরিবর্তনের ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোদ পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে অত্যন্ত সমীহ করে নিজের "প্রিয় ফিল্ড মার্শাল" হিসেবে সম্বোধন করেন, যা দিল্লির জন্য ছিল এক বিরাট ধাক্কা। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার চরম যুদ্ধাবস্থা নিরসনে পাকিস্তান ও কাতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'ব্যাক-চ্যানেল' মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করায় মার্কিন প্রশাসনের কাছে ইসলামাবাদ পুনরায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ অক্ষের এই নতুন ও গভীর কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক "লেক লুসার্ন সামিট"-এর উদ্বোধনী মঞ্চে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার প্রথম দফার এই শান্তি আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে এসে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের কূটনৈতিক দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি অন-ক্যামেরা রসিকতা করে মন্তব্য করেন যে, গত তিন মাসে তিনি অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে আসিম মুনিরের সাথে বেশি কথা বলেছেন এবং বর্তমানে তাঁর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুজন মানুষ আছেন—যাঁদের একজন ভারতীয় ও অন্যজন পাকিস্তানি। জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেন, সেই ভারতীয় ব্যক্তিটি হলেন তাঁর নিজের স্ত্রী ঊষা ভ্যান্স এবং পাকিস্তানি ব্যক্তিটি হলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। মার্কিন প্রশাসনের এই নজিরবিহীন সুনজর ও কৃতজ্ঞতার ওপর ভর করেই গত ১৪ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বিশ্বমঞ্চে প্রথম আমেরিকা ও ইরানের প্রাথমিক শান্তিচুক্তির ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান এভাবে একটি জটিল বৈশ্বিক সামরিক সংঘাতকে নিজেদের একক কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে।
৬
রুবিওর ভারত সফর এবং আলগা হওয়া ‘কোয়াড’ বন্ধন।
মে মাসে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিওর ভারত সফরটি ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির বাহ্যিক প্রচার এবং ভেতরের বাস্তবতার মধ্যকার বড় ফারাককে স্পষ্ট করেছে। বাইরে থেকে এই অংশীদারত্বকে নিশ্ছিদ্র দেখানোর চেষ্টা হলেও মূলত মার্কিন এককেন্দ্রিক নীতির কারণে দুই দেশের কৌশলগত যুক্তির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই সফরের সমীকরণ প্রমাণ করে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলটি এখন আর কোনো একক নীতিতে চলছে না, বরং প্রতিটি দেশ নিজস্ব স্বার্থ দেখছে।
ক। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন চাপ।
ভারতে এসে মার্কো রুবিও দাবি করেন যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক একদম স্থিতিশীল রয়েছে এবং মার্কিন নীতির কারণে সম্পর্কে সৃষ্ট ফাটলকে তিনি পাত্তাই দেননি। তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা সরাসরি প্রকাশ্য বিবাদে না জড়িয়েও এই সফরে তাঁদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও রক্ষণশীল কূটনীতির প্রকাশ ঘটান। বিশেষ করে রুবিও যখন আগামী পাঁচ বছরে ভারতকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার একটি কঠিন লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেন, তখন নয়াদিল্লি গভীর নীরবতা পালন করে। মার্কিন এই সংরক্ষণবাদী প্রস্তাব মেনে নিয়ে এই বিশাল পরিমাণ পণ্য কিনলে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের এতদিনের যে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল, তা রাতারাতি বড় ধরনের ঘাটতিতে রূপ নেবে।
খ। ইন্দো-প্যাসিফিক ও ‘কোয়াড’-এর গুরুত্ব হ্রাস।
রুবিওর এই বহুল আলোচিত সফরের কূটনৈতিক ফল ছিল অত্যন্ত সীমিত, যেখানে খনিজ সহযোগিতা নিয়ে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হয়—যা আসলে ওয়াশিংটনের পুরোনো ‘প্যাক্স সিলিকা’ উদ্যোগের পুনরাবৃত্তি মাত্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কোয়াড এখন চীনকে ঠেকানোর বড় কোনো কৌশলগত জোট নয়, বরং এটি কেবল এক ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্কিন এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই রুবিওর সফরের সময় কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি সাধারণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধান সম্মেলন আয়োজন করা হয়নি। এর সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান প্রমাণটি মেলে গত ১৬ জুন, যখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর তাদের এই অঞ্চলের কৌশলগত নাম 'ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড' পরিবর্তন করে আবার পুরোনো 'প্যাসিফিক কমান্ড'-এ ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই নাম বদলের ঘটনাটিই অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে আমেরিকার বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলে ভারতের সংশ্লিষ্টতা থাকা ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার গুরুত্ব কতটা কমে গেছে।
৭
চীন ও ইসরায়েল সমীকরণ: ভারতের কোণঠাসা অবস্থান।
আমেরিকার বর্তমান সংরক্ষণবাদী নীতি, কৌশলগত অবহেলা এবং ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামরিক দুর্বলতা এরইমধ্যে দিল্লির পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে। ওয়াশিংটনের ওপর অন্ধ নির্ভরতার নীতি মার খাওয়ায় ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একপ্রকার একাকীত্ব ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই বহুমুখী সংকটের কারণে বিশ্বমঞ্চে সমমর্যাদা ধরে রাখার পরিবর্তে ভারতকে এখন নানামুখী কৌশলগত ছাড় ও আপসের পথে হাঁটতে হচ্ছে।
ক। বেইজিংয়ের প্রতি দিল্লির নমনীয়তা ও অরুণাচল বিতর্ক।
নয়াদিল্লি এখন বেইজিংয়ের প্রতি দৃশ্যত নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করছে, যা তাদের পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার সংবেদনশীল ঘটনাটি নিয়ে দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কোনো সিনেমা না বানানোর কঠোর নির্দেশ দিয়েছে মোদি সরকার। এমনকি সম্প্রতি ভারতের অরুণাচলের বিস্তীর্ণ এলাকা চীন নতুন করে দখল করেছে বলে স্থানীয়রা তীব্র অভিযোগ করলেও ভারত সরকার তা কৌশলগত কারণে সরাসরি অস্বীকার করে চলেছে। বেইজিংয়ের সাথে সীমান্ত উত্তেজনা এড়ানোর এই স্থায়ী চেষ্টার অংশ হিসেবে চীনের চতুর পাকিস্তান-ঘেঁষা নীতিকেও ভারত ইদানীং বেশ এড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে নিয়মিত ভারী সামরিক ও কৌশলগত সাহায্য করার বিষয়টিকেও ভারতের বর্তমান সামরিক নেতৃত্ব অত্যন্ত হালকাভাবে দেখছে। গালওয়ান, অরুণাচল ও পাকিস্তান সীমান্তে চীনের এই আধিপত্যবাদী আচরণকে হজম করা মূলত বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্বাভাবিক রাখার এক মরিয়া কূটনৈতিক প্রয়াস।
খ। প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন।
একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের অতিরিক্ত কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা তাকে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যগত মিত্র ইরানের কাছ থেকে বহুদূরে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতি ভারতকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে আরও বেশি কোণঠাসা করেছে। একই সময়ে ভারতের একদম দোরগোড়ায় তথা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান গভীর সম্পর্ক দিল্লির জন্য নতুন এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করেছেন এবং ঢাকা বেইজিংয়ের প্রস্তাবিত আধুনিক জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করছে। এ ছাড়া প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর এবং তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ নিয়ে ভারত নিবিড় ও গভীর পর্যবেক্ষণ জারি রেখেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এই সমস্ত আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভারতের গভীর উদ্বেগের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন।
৮
আমেরিকা একসময় ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হলেও, ওয়াশিংটনের বর্তমান বাণিজ্যকেন্দ্রিক ও একতরফা নীতি সেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাসে গভীর চির ধরাল। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভাবছেন কোনোমতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই ঝোড়ো সময়টা পার করে দিতে পারলেই কূটনৈতিক সংকট কেটে যাবে এবং পুরোনো সমীকরণ ফিরে আসবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ভারতকে এটি উপলব্ধি করতে হবে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রূঢ় পরিমণ্ডলে মিষ্টি কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে অন্ধ অংশীদারত্বের অবাস্তব মোহ সবসময়ই আত্মঘাতী। বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসন যখন কোয়াডের গুরুত্ব কমিয়ে 'প্যাসিফিক কমান্ড' নাম পুনর্বহাল করে এবং ভারতকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার বাণিজ্যিক চাপ দেয়, তখন দিল্লির একমুখী কূটনীতির অসারতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না ওয়াশিংটন ভারতকে সমমর্যাদার অংশীদার ভাবছে এবং তার মূল আঞ্চলিক স্বার্থকে সম্মান করছে, ততক্ষণ অন্ধ মার্কিন-তোষণ নীতি দিল্লির কৌশলগত সার্বভৌমত্বকে আরও ভঙ্গুর করবে। এই বিভক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে ভারতকে নির্দিষ্ট কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিদায়ের আশায় বসে না থেকে নিজের অর্থনৈতিক ও সামরিক ভিত শক্তিশালী করতে হবে এবং বৈশ্বিক বিশ্বস্ততার নতুন ও স্বাধীন বিকল্প পথগুলো নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে।
এই কূটনৈতিক প্যারাডক্স থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতকে বুঝতে হবে যে, ফাঁপা জাতীয়তাবাদী প্রচার বা দেশের অভ্যন্তরীণ সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বিশ্বমঞ্চের আসল সত্য ও দুর্বলতাকে আড়াল করা যাবে না। একদিকে গালওয়ান ও অরুণাচল সীমান্তে চীনের আধিপত্যবাদী আচরণকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া, অন্যদিকে মার্কিন শক্তির সামনে নতজানু অবস্থান দিল্লির ভূরাজনৈতিক মেরুদণ্ডকে বিশ্ববাসীর সামনে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য যখন পাকিস্তানের সফল মধ্যস্থতা এবং বাংলাদেশ-চীন সামরিক ও অর্থনৈতিক করিডোর সমীকরণের দিকে হেলে পড়ছে, তখন ভারতের নমনীয় পররাষ্ট্রনীতি তাকে আরও বেশি কোণঠাসা করছে। মোদি সরকারের বহুল প্রচারিত 'বিশ্বগুরু' ভাবমূর্তিটি যে আসলে বৈশ্বিক বাস্তবতার চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চমক মাত্র, তা আজ হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং মার্কিন প্রশাসনের উদাসীন কূটনীতি প্রমাণ করে দিয়েছে। ভারতের টিকে থাকা এবং তার আঞ্চলিক নেতৃত্ব পুনর্প্রতিষ্ঠা এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সমীকরণকে বাস্তবসম্মত উপায়ে মোকাবিলা করার ওপর।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩ জুলাই ২০২৬