
১
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ভূকম্পন অবশেষে এক প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছে, যা বিশ্ববাসীকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১৮ জুনের ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক ও সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস রাতভর একে অপরের ওপর বিধ্বংসী আকাশপথ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড কর্তৃক ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু গুঁড়িয়ে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেহরান তার চরম প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া দেখায়। আইআরজিসি বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল ৮৫টি সামরিক স্পটে একযোগে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও শক্তিশালী ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই আকস্মিক ও নজিরবিহীন পাল্টাপাল্টি হামলা কেবল দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াই ধূলিসাৎ করেনি, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
২
সংঘাতের পটভূমি: কীভাবে ভাঙল ঐতিহাসিক ১৮ জুনের সমঝোতা?
২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে মধ্যপ্রাচ্যে যে আপেক্ষিক শান্তির আশা দেখা গিয়েছিল, তা মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু ওমান উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যকার এই বিশ্বাসের দেয়াল ধসে পড়ে।
ক। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও মার্কিন অভিযোগ।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক পোস্টে দাবি করে যে, ইরান আন্তর্জাতিক জলপথে নিরীহ বেসামরিক নাবিকবোঝাই তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ‘অযৌক্তিক ও বিপজ্জনক’ হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ওমান উপকূলের অদূরে দুটি জাহাজে অজ্ঞাত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়, যার একটির কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তৃতীয় একটি জাহাজে আগুন ধরে যায়। এই ঘটনাকে যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে সেন্টকম ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
খ। ইরানের তেল বিক্রির মার্কিন সুবিধা বাতিল এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা।
আমেরিকার পক্ষ থেকে অবিলম্বে ইরানের তেল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ‘সাময়িক মওকুফ’ বা বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হয়। মূলত আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানকে এই সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করা হয় এবং ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে ইরানের তেল খাতের সব কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা পদক্ষেপের পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত মার্কিন তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭২ ডলার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৫.৩ শতাংশ বেড়ে ৭৫ ডলার পার হয়ে যায়।
গ। সমঝোতার ১০ নম্বর শর্ত ভঙ্গের পাল্টা অভিযোগ তেহরানের।
যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারকের ‘১০ নম্বর শর্ত’ লঙ্ঘনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলে। ইরানের শীর্ষ আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স-এ এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমঝোতা সইয়ের ২০ দিনের মাথায় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল, দক্ষিণ ইরানে সামরিক হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে সমর্থন করার মাধ্যমে ওয়াশিংটন প্রমাণ করেছে যে তাদের কখনোই বিশ্বাস করা যায় না।
৩
মার্কিন সেন্টকমের আকস্মিক ও সর্বাত্মক হামলা: ইরানের ৮০ লক্ষ্যবস্তু বিধ্বস্ত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অভিযোগে কেবল সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হরমুজ প্রণালির ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি বিমান হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী একে একটি ‘নিখুঁত ও সফল’ অপারেশন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ক। হামলার বিস্তৃতি ও লক্ষ্যবস্তুর ধরণ।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, তাদের বিমানবাহিনী নিখুঁত যুদ্ধাস্ত্রের সাহায্যে ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের ৬০টিরও বেশি নৌযান। এছাড়া ইরানের উপকূলীয় রাডার স্থাপনা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করার দাবি করে ওয়াশিংটন।
খ। দক্ষিণ ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
ইরানি গণমাধ্যম ‘ফারস’ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার সকালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা সিরিক, কেশম, হরমুজগান এবং মাহশাহর এলাকার বেসামরিক ও সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইরান এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি মার্কিন আগ্রাসন এবং একটি অসামরিক ও সামরিক স্টেশনের ওপর অবৈধ আকাশ হামলা হিসেবে তীব্র নিন্দা জানায়।
৪
ইরানের বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত: বাহরাইন ও কুয়েতে ৮৫টি মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা।
মার্কিন হামলার পর পরই ইরান কোনো রকম সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত হানে। আইআরজিসি তাদের নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ কমান্ডের মাধ্যমে এই বিশাল সামরিক অপারেশন পরিচালনা করে।
ক। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর প্রধান নিশানা।
ইরানের আইআরজিসি এক জরুরি সামরিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম নৌবহর-এর প্রধান ঘাঁটি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ-শক্তির মূল চালিকাশক্তি এই ঘাঁটির ওপর ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অহংকারে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
খ। কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে ড্রোন ও ব্যালেস্টিক মিসাইল বৃষ্টি।
বাহরাইনের পাশাপাশি কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ‘আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি’ লক্ষ্য করে ইরান একযোগে শক্তিশালী ড্রোন ও ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা চালায়। কুয়েতের সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, তাদের আকাশসীমায় দুটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩টি ড্রোন শনাক্ত করা হয়। কুয়েতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানি হামলার স্প্লিন্টারের আঘাতে কুয়েতের বেশ কয়েকটি প্রধান বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অচল হয়ে পড়েছে।
গ। মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার (MQ-9 Reaper) ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’-এর বরাতে জানা যায়, আইআরজিসি-র মুখপত্র হোসেইন মোহবি দাবি করেছেন যে, ইরানের বুশেহর প্রদেশের খোরমুজ এলাকার আকাশে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর ‘আকাশপথে আগ্রাসনের’ জবাব দিতে গিয়ে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক এবং অত্যন্ত মূল্যবান ‘এমকিউ-৯ রিপার’ ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে।
ঘ। খামেনির শেষকৃত্যের গুরুত্ব আড়াল করার মার্কিন অপচেষ্টার অভিযোগ
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে যে, আমেরিকার এই আকস্মিক বিমান হামলা ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির চলমান রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য এবং কোমে আয়োজিত লাখ লাখ মানুষের শোকমিছিলের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে থেকে আড়াল করার একটি ব্যর্থ ও উগ্র অপচেষ্টা মাত্র।
৫
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া প্রতিক্রিয়া: যুদ্ধবিরতি এখন ‘শেষ’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রাতভর পাল্টাপাল্টি হামলার পর তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রদান করেন।
ক। ‘লেনদেন শেষ, তারা অসুস্থ মানুষ’: ট্রাম্প।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেন যে, দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন সম্পূর্ণভাবে ‘শেষ’। তিনি বলেন, “আমি তাদের সঙ্গে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা জঘন্য। তারা অসুস্থ মানুষ এবং অসুস্থ মানুষেরা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা নৃশংস ও সহিংস প্রকৃতির লোক।”
“তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে তারা সেটি ব্যবহার করত। আমার বিবেচনায়, সব শেষ হয়ে গেছে।”
— প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন, আঙ্কারা)
খ। আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়’ ও ‘মিথ্যাবাদী’ আখ্যা।
ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন যে, ইরানের সাথে যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা করা মানে শুধুই সময়ের অপচয়, কারণ ইরানি নেতারা ‘মিথ্যাবাদী’। তিনি বলেন, মার্কিন আলোচকেরা চাইলে টেবিলে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারেন, তবে তার ব্যক্তিগত মতে, তারা কেবল নিজেদের সময় নষ্ট করছেন।
৬
সমঝোতা স্মারক বা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী?
২০২৬ সালের ১৮ জুনের সমঝোতা স্মারকটি যেভাবে মাত্র ২০ দিনের মাথায় মুখ থুবড়ে পড়ল, তাতে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অন্ধকার। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
ক। খাতাম আল-আম্বিয়া কমান্ডের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড ইউনিট ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’-র সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স থেকে আল-জাজিরার মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অত্যন্ত বিপজ্জনক হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো দেশ বা পক্ষ যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করে, তবে সেই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অবকাঠামোকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর ফলে বাহরাইন, কুয়েত বা সৌদি আরবের মতো মার্কিন মিত্রদেশগুলো সরাসরি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় চলে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
খ। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
ইরানের সামরিক বাহিনী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ তেহরান মেনে নেবে না। তাদের মতে, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচলের একমাত্র পথ হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নির্ধারিত রুট।” ইতিমধ্যে ওমান ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা কর্তৃক চালিত ওমানের উপকূলঘেঁষা সাময়িক করিডোর ব্যবহার করতে চাওয়া একটি ভারতীয় তেল ট্যাঙ্কারকে আইআরজিসি রেডিও বার্তার মাধ্যমে সতর্ক করে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং ইরান অনুমোদিত রুট ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। এর অর্থ হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান ধমনীর ওপর ইরান একক সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
৭
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিচুক্তি ভেঙে গেলে ইসরায়েলের লাভ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়া এবং দুই দেশের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা পেয়ে থাকে, তবে তা হলো ইসরায়েল।
ক। লেবানন ও গাজায় জায়নবাদী আগ্রাসন আড়াল করার সুযোগ।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যেমনটা উল্লেখ করেছেন, এই হামলার পেছনে লেবানন ও গাজায় চলমান জায়নবাদী বা ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত রাখার একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। মার্কিন-ইরান সরাসরি সংঘাতের ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ গাজা ও লেবাননের মানবিক বিপর্যয় থেকে সম্পূর্ণ সরে গিয়ে পারস্য উপসাগরের দিকে নিবদ্ধ হবে। এটি ইসরায়েলকে তাদের আঞ্চলিক সামরিক অভিযানগুলো কোনো আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়াই দীর্ঘায়িত করার এক সুবর্ণ সুযোগ করে দেবে।
খ। চিরশত্রু ইরানকে দুর্বল করার মার্কিন শক্তি ব্যবহার।
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। কিন্তু একক শক্তিতে ইরানের মতো বিশাল দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যদি ইরানের আশিটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং আইআরজিসি-র নৌবহর ধ্বংস করে দেয়, তবে তা ইসরায়েলের প্রক্সি বা পরোক্ষ যুদ্ধকে সরাসরি মার্কিন কাঁধে তুলে দেওয়ার সমতুল্য। ইরানকে মার্কিন সামরিক শক্তি দিয়ে পিষে ফেলার এই দৃশ্য তেল আবিবের জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই এক মস্ত বড় ভূরাজনৈতিক বিজয়।
৮
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান এই রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত এবং রাতভর চালানো পাল্টাপাল্টি হামলা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কোনো সাময়িক সমঝোতা স্মারক বা যুদ্ধবিরতি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল নৌপথকে কেন্দ্র করে দুই দেশের যে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত, তা আজ এক চরম সামরিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। মার্কিন সেন্টকম কর্তৃক ইরানের সার্বভৌমত্বে আঘাত এবং তার জবাবে আইআরজিসি কর্তৃক কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটিতে ৮৫টি সুনির্দিষ্ট স্পটে ধ্বংসাত্মক হামলা বিশ্বকে এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দা এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার দিকে ধাবিত করছে। ট্রাম্পের ‘সব শেষ’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কূটনীতির দরজা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে এবং খাতাম আল-আম্বিয়া কমান্ডের মিত্রদেশগুলোর ওপর হামলার হুঁশিয়ারি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে।
এই চরম বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতৃত্ব এবং জাতিসংঘের ভূমিকা এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। একদিকে ইরানের তেল বিক্রির সুবিধা বাতিল করার ফলে সাধারণ বিশ্ববাজার যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একক রুটের কড়াকড়ি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে সম্পূর্ণ অচল করে দিতে পারে। এই সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধাবস্থার একমাত্র দৃশ্যমান সুবিধাভোগী হিসেবে ইসরায়েল লেবানন ও ফিলিস্তিনে তার আগ্রাসী থাবা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে। যদি অবিলম্বে কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা বা অলৌকিক কূটনৈতিক প্রয়াস না ঘটে, তবে এই আঞ্চলিক সংঘাত কেবল পারস্য উপসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা সমগ্র এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে এক অপূরণীয় ও বিধ্বংসী মহাবিপর্যয়ের মুখে আছড়ে ফেলবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচ এস, ঢাকা
৮ জুলাই ২০২৬