
১
প্রেক্ষাপট ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমা টা এবছরের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন হলে মুক্তি পেয়েছে। এরপর ২৪ মে ২০২৬ তারিখে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-তেও রিলিজ করা হয়েছে। এর আগে দু’বার প্ল্যান করেও ব্যাটে-বলে না মেলায়, গতকাল (২৫ মে ২০২৬) উত্তরা সেন্টার পয়েন্ট সিনেপ্লেক্সে সন্ধ্যা সাতটা দশ মিনিটের শো’তে সিনেমা টা উপভোগ করলাম। দেরি করে দেখার কারণে রিভিউটাও একটু দেরিতেই দেওয়া।
পরিচালক: তানিম নূর।
মূল উৎস: কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘কিছুক্ষণ’।
প্রধান কাস্ট: মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, শরিফুল রাজ, সাবিলা নূর, আজমেরী হক বাঁধন, ইন্তেখাব দিনার, জাকিয়া বারী মম প্রমুখ।
সিনেমা’র ধরণ: সাইকোলজিক্যাল/ফিলোসফিক্যাল ফ্যামিলি ড্রামা।
রেটিং: প্রথম আলো: ৯/১০, সিনে ব্রস: ৩.৫/৫, প্লেক্স (আন্তর্জাতিক): ৯/১০।
২
সিনেমার মূল প্লট ও প্রেক্ষাপট।
পুরো গল্পটাই আবর্তিত হয়েছে একটি রাতের ট্রেন জার্নিকে কেন্দ্র করে। এটি গতানুগতিক কমার্শিয়াল সিনেমার মতো কোনো নির্দিষ্ট 'হিরো' বা 'হিরোইন' কেন্দ্রিক গল্প নয়, বরং পুরো ট্রেন যাত্রাটাই এখানে মূল চরিত্র। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের সেই চেনা সুর ও দার্শনিক ভাবনাকে পরিচালক তানিম নূর নিজস্ব নির্মাণশৈলী দিয়ে বেশ চমৎকারভাবে সেলুলয়েডে রূপ দিয়েছেন। সিনেমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনে আনন্দের চেয়ে হয়তো দুঃখই বেশি, কিন্তু সেই ক্ষণিকের সুখ আর পারস্পরিক সহমর্মিতাই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
সিনেমায় চিত্রা (সাবিলা নূর) রাজশাহী যাওয়ার পথে ট্রেনে এক অদ্ভুত সহযাত্রীর মুখোমুখি হয়। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে ডাক্তার আশহাব (শরিফুল রাজ), যে তার মানসিক রোগাক্রান্ত মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। একই ট্রেনে ক্ষমতা ধরে রাখার টানাপোড়েনে থাকা শিক্ষামন্ত্রী (চঞ্চল চৌধুরী), গভীর এক শোক ও স্মৃতির বোঝা বয়ে বেড়ানো বাবা রশিদ উদ্দিন (মোশাররফ করিম), এক গর্ভবতী নারী (আজমেরী হক বাঁধন)—এমন নানা স্তরের মানুষের গল্প এক সুতোয় গেঁথেছেন পরিচালক। ট্রেনের একেকটি বগি যেন খণ্ড খণ্ড এক জীবন্ত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। গল্প বলার এই চেনা ধরণ আমরা আমজাদ হোসেনের গল্পে তৌকির আহমেদের 'জয়যাত্রা' (নৌকা) কিংবা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলামের 'অনিল বাগচীর একদিন' (বাস) সিনেমাতেও দেখেছি।
৩
সিনেমার শক্তিশালী দিক।
# অনবদ্য অভিনয় ও কাস্টিং: এই সিনেমার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট এর কাস্টিং ডিরেকশন। সিনেমায় মোশাররফ করিম (রশিদ উদ্দিন) নিজেকে পরিচয় দেন 'অঙ্কের দৈত্য' হিসেবে। আমার কাছে মনে হয়েছে মোশাররফ করিম আসলে অভিনয়ের দৈত্য, আর তাই গর্ব করে বলা যেতেই পারে আমাদের একজন ‘মোশাররফ করিম’ আছেন, তিনি আমাদের সম্পদ। চঞ্চল চৌধুরী মন্ত্রীর চরিত্রে যথারীতি সাবলীল। ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব থেকেই বলছি, শ্যামল মাওলার অভিনয় দুর্দান্ত লেগেছে। এই সিনেমায় ‘আজিজ' চরিত্রে তিনি নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন। কী mesmerising অভিনয়! মম, বাঁধন এবং নবাগতা লাবণ্য চৌধুরী (রুবি) যার যার চরিত্রে দারুণ ছিলেন। ডাক্তার আশহাব চরিত্রে শরিফুল রাজ অসাধারণ ছিলেন। অভিনেতা হিসেবে তাকে বেশ আন্ডাররেটেড বলে মনেহচ্ছে। স্ক্রিনে তাকে মাঝেমাঝে কলকাতার অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতো লাগছিল। সাবিলা নূরের অভিনয়ে এখনও এক্সপ্রেশনের অভাব স্পষ্ট। নিতু চরিত্রে শিশু শিল্পী, তৃধা পল-এর পাকা পাকা ডায়ালগে মাঝে মাঝে বিরক্ত হলেও সে সুন্দর অভিনয় করেছে।
# সেরা ডায়ালগ: ‘জানাজার নামাজে কোনো আযান হয় না। কারণ, সেই আযান তার জন্মের সময় আমরা তার কানে দিয়ে দেই। এই এক ওয়াক্তের আযান আর শেষ নামাজ- এর মধ্যবর্তী সময়টুকুই আমাদের জীবন।’
# ওয়ান হানড্রেড পার্সেন্ট ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি: বিরতির সময় দর্শকদের দিকে তাকিয়ে এবং হল থেকে বের হওয়ার সময় তাদের মন্তব্য শুনে বুঝলাম, সিনেমাটি বর্তমান সময়ের পরিচ্ছন্ন পারিবারিক ছবির অভাব দারুণভাবে পূরণ করেছে।
# ভিএফএক্স ও সিনেমাটোগ্রাফি: বরকত হোসেন পলাশের সিনেমাটোগ্রাফি এবং ট্রেনের ভেতরের ফ্রেমিং চমৎকার ছিল। সিনেমায় রোমান্টিক দৃশ্যে উজ্জ্বল/ঝকঝকে আলো এবং শোকের দৃশ্যে আলো-ছায়ার ব্যবহার ভাল লেগেছে। কালার গ্রেডিং ও ভিজ্যুয়াল কোয়ালিটিতে একটা ঝকঝকে আন্তর্জাতিক ভাব ছিল।
# মিউজিক: জাহিদ নীরবের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর গল্পের গভীরতা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে আইয়ুব বাচ্চুর "উড়াল দেবো আকাশে" আর অর্ণবের "মাঝে মাঝে তব দেখা পাই" সিনেমাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
৪
সিনেমার দুর্বল দিক বা যেখানে ট্রিম করা যেত।
# প্রথমার্ধের ধীরগতি: ট্রেনের পরিবেশ ও চরিত্রগুলোর জটিলতা দেখাতে গিয়ে ফার্স্ট হাফ কিছুটা স্লো লেগেছে। অফিশিয়াল রানটাইম ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট না হয়ে অপ্রয়োজনীয় সংলাপ ছেঁটে এটি অনায়াসেই ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের একটি টানটান কমপ্যাক্ট রূপ পেতে পারত।
# সেকেলে ও ‘ক্রিঞ্জ’ হিউমার: শামিমা নাজনিনের একঘেয়ে অভিনয় এবং হুমায়ূন আহমেদের স্বভাবসুলভ রসবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিচালক এখানে কিছু সস্তা কমেডির আশ্রয় নিয়েছেন। যেমন—ব্যান্ডদলের ক্যামেরাম্যানকে বক্সার শর্টস পরিয়ে ভাঁড় বানানো কিংবা আরেফিন জিলানীর ওমন স্থূলভাবে কলা খাওয়ার দৃশ্য। এগুলো সিনেমার ক্লাসি মেজাজটাকে এক ধাক্কায় নিচে নামিয়ে দেয়।
# স্ক্রিপ্ট রাইটিং ও কিছু চরিত্রের গভীরতার অভাব: চঞ্চল চৌধুরীর স্ত্রীর (বাঁধন) বা বড় চাচার (ইন্তেখাব দিনার) ব্যাকস্টোরি আরেকটু স্পষ্ট হতে পারত। তাছাড়া, মন্ত্রীর ছোটবেলার ফ্ল্যাশব্যাক (বিশেষ করে শিক্ষককে চোর সাব্যস্ত করা) এবং চিত্রার বিয়ের অনুষ্ঠানের দীর্ঘ ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। টুকটাক কিছু সংলাপ দিয়েও ওসব কভার করা যেত। সবচেয়ে মেলোড্রামাটিক লেগেছে শেষ মুহূর্তে হেলিকপ্টারে ডাক্তার এজাজ ও ফারুক আহমেদের আগমন। এই সস্তা কমার্শিয়াল টুইস্টটি মূল জার্নির লিনিয়ার গতি ও ঘোরটাকে এক নিমেষে ভেঙে দেয়।
# তামাক ও অ্যালকোহলের অতি-ব্যবহার: ওটিটি-র তথাকথিত 'বাস্তবসম্মত' ট্রেন্ডের দোহাই দিয়ে সিগারেট বা মদ্যপানের দৃশ্য রাখা হলেও, এই জীবনমুখী চলচ্চিত্রে তা সংযত করা যেত। একজন দক্ষ অভিনেতার পক্ষে কোনো বাহ্যিক টুল ছাড়াই কেবল চোখের অভিব্যক্তি বা নীরবতা দিয়ে মানসিক যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। এগুলো এড়ানো গেলে পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ত।
৫
শেষ কথা ও ব্যক্তিগত রেটিং।
আপনি যদি জীবনমুখী, ধীরস্থির এবং গভীর ভাবনার প্লট-ড্রিভেন সিনেমা পছন্দ করেন, তবে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আপনার জন্য একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা হবে। এককথায়, স্ত্রীকে সাথে নিয়ে পপকর্ন খেতে খেতে একটা ভাল সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা হলো। বাসায় ফেরার পথে গাড়িতে দুজনের আলোচনায় যেটা বুঝলাম, সিনেমা নিয়ে আমাদের দুজনের ভাবনাটা অভিন্ন।
ভালো সিনেমার জয় হোক, এগিয়ে যাক আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি।
হ্যাপি ওয়াচিং। আমার রেটিং: ৪/৫।
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৬ মে ২০২৬