
রংপুরের আরকে রোড। আমাদের পাড়াতেই, বাসা থেকে হাঁটার দূরত্বে, রাস্তার ওপারেই ছিল ফাস্টফুডের দোকানটা। নামটা এখন ভুলে গেছি, তবে মেন্যুকার্ডের আইটেমগুলো ছিল দারুণ, আর দামেও ঢাকার চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী! ওটা এখন আছে কি না জানি না।
এখন রংপুরে গেলে অবশ্য বসা হয় গ্র্যান্ড প্যালেসের কফিশপ কিংবা স্কাইলনের রুফটপ রেস্টুরেন্টে। ওখানকার বাটার গার্লিক নান আর বিফ (ঢাকায় যেটা আসলে মহিষের মাংস) শিক কাবাব বেশ ভালো লাগে। ছবিতে আমার সাথে থাকা যে দুজন ভদ্রলোক (?) কে দেখা যাচ্ছে, তারা স্কাইলন হোটেল ও রেস্টুরেন্টের মালিকপক্ষ এবং কপালের ফেরে আমার ছোটবেলার বন্ধু। নিয়তি!
প্রথম ছবিতে আমার বাঁ পাশে বসা এনামুল হক সোহেল রংপুরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। অনেক কিছু নিয়েই তার ব্যবসা (মাদকদ্রব্য ছাড়া)। সে একজন ভালো গলফার, পর্যটক এবং নানাবিধ সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত। ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে আমরা একসাথে পড়েছি। আমরা একসাথে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতাম এবং মেয়ে ক্লাসমেটদের বাউন্ডারির বাইরে দেখে উদাস হতাম! অনেক কিছুর পরও সে অতিশয় ভদ্রছেলে, তাই ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজেও পড়েছে। আমি অবশ্য প্রথমত দুষ্টামি এবং দ্বিতীয়ত, বাংলা সাহিত্যের মাহবুবা ম্যাডামের সাথে ‘লাভ অ্যান্ড হেট’ রিলেশনের কারণে স্কুলছাড়া হয়ে কারমাইকেল কলেজে পড়েছি। আমার লেখালেখির পেছনে বাবা, আর ‘বাংলা সাহিত্য’টার প্রতি অনুরাগ তৈরি করে দেওয়ার পেছনে ম্যাডামের অবদান আছে। আজ দুজনেই জীবনের ওপারে। আল্লাহ ওনাদের বেহেশত নসিব করুন।
আমার ডান পাশে বসে যে মানুষটা মিটিমিটি হাসছে, তার নাম মাসুদ রানা। সে অবশ্য এখন রানা মাসুদ নামেই বেশি পরিচিত। রংপুরের গাছপালা থেকে শুরু করে পশুপাখি, নদী এবং নারী—সবাই তাকে চেনে। ভুল বললাম, পুরুষরাও তাকে ভালোভাবে চেনে। পেশাগত জীবনে সেও একজন সফল ব্যবসায়ী (এককথায়, সব জায়গাতেই চেয়ারম্যানের পদটা তার জন্য নির্ধারিত)। সে একজন ভালো সংগঠক, জনহিতৈষী এবং দারুণ ফটোগ্রাফার; দুর্দান্ত পাখির ছবি তোলে এবং এজন্য দেশে-বিদেশে, বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে মডেল ফটোগ্রাফার হিসেবে সে জঘন্য; আমার পোখারার অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে। সে একজন কবি ও সাহিত্যিক, বাংলা ব্যাকরণ মেনে দারুণ সব কবিতা লেখে, যদিও তার অনেকগুলোই আমার মাথার ওপর দিয়ে যায়। ইদানীং যেহেতু সে গান লিখছে (কারণটা জানি না), তাই সে অবশ্যই একজন গীতিকার। একসময় সাংবাদিকতার সাথেও যুক্ত ছিল। বৃষ্টির দিনে সে ফুল ভলিউমে এলভিস প্রিসলি ছেড়ে কালো রঙের সিআরভি (CR-V) গাড়িটা চালাতে ভালোবাসে; কারণ সে প্রকৃতি ভালোবাসে (নারী ছাড়া?)।
মাসুদ রানা আমার শহুরে বন্ধু, ওর সাথে পরিচয় রংপুর টাউন হল মঞ্চে। যারা ভাবেন সংস্কৃতিচর্চায় আমার এই সামান্য পথটুকু হাঁটা স্রেফ শখের বশে, বিষয়টা আসলে সেরকম নয়। এই জার্নিটা শুরু হয়েছিল ক্লাস থ্রিতে, ডিসির মোড়ের ‘সবুজ সেনা’ নামে একটা কালচারাল ক্লাবে গান শেখার মধ্য দিয়ে। এরপর ক্লাস ফাইভ-এ ‘অন্বেষা কচিকাঁচার আসর’—আনিসুল হক ভাইয়ের সাথে। ক্লাস এইটে রংপুর শিশু একাডেমির আয়োজনে একটা প্রতিযোগিতায় মাসুদ রানা'র সাথে পরিচয় হয়; তারপর একসাথে স্কাউটিং, ক্যাম্পিং ইত্যাদি।
এরপর অনেকটা বছর আমাদের যোগাযোগ ছিল না। অবশেষে যখন তাকে খুঁজে পেলাম, তখন তার মুখের আদল ঠিক থাকলেও নামের আদল পাল্টে গেছে। ‘মাসুদ রানা’ বয়সকালে ‘রানা মাসুদ’ হয়ে গেছে—একদম যাকে বলে 69! বিখ্যাত হলে মানুষের কত কী-ই না হয়!
এই যেমন ছোটবেলার সিঙ্গারা হাউস, নেহালের নেহারি, জলযোগের গুড়ের মিষ্টি, নৃপেনের রসমঞ্জুরি, মালদহের মোগলাই পরোটা, মিঠু হোটেলের বিরিয়ানি কিংবা ঢাকা হোটেলের কাটলেটের জায়গাটা বড়বেলায় কফিশপ, ফাস্টফুড, জুসবার আর পিৎজা শপ দখল করেছে। আরকে রোডেই একটা ছোট চটপটির হাউস ছিল, আমি চটপটির দোকানে ফুচকা খেতে যেতাম। বরাবরই প্রথাবিরোধী! হয়তো হুমায়ুন আজাদ প্রিয় লেখকদের একজন বলেই এমন স্বভাব! সেই চটপটির দোকানের দেয়ালে ঝোলানো র্যাকে অনেক বই শোভা পেত। দু-একবার পৃষ্ঠা উল্টেও দেখেছি। কতশত স্মৃতি!
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩০ মে ২০২৬