
১
স্মৃতির ক্যানভাসে কিছু কিছু জিনিস চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে যায়, যার কোনো বিকল্প হয় না। আমাদের ছোটবেলা থেকে শুরু করে জীবনের একটা বড় অংশের স্মৃতিগুলোকে পরম যত্নে সজীব করে রেখেছিল Yashica MF-2 ক্যামেরা। বলতে গেলে, তখনকার দিনে আমাদের আনন্দ-বেদনা আর উৎসবের যত স্মৃতি, তার সবটুকুই রচিত হতো এই একটা ক্যামেরাকে ঘিরে।
স্কুলজীবনে প্রথম এই ক্যামেরাটি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেই মুগ্ধতা কাটার আগেই জীবনে এলো নতুন অধ্যায়। ভাটিয়ারিতে মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেওয়ার পর, প্রথম টার্মের ছুটিতেই চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে সম্ভবত ১৮/২২শত টাকায় একটা Yashica MF-2 ক্যামেরা কিনেছিলাম। ব্যস, তারপর থেকে সেই যে আমাদের পথচলা শুরু, তা আর থামেনি। এরপর ক্যামেরা পাল্টেছিলাম ২০০১ সালে সিয়েরালিওন থেকে ছুটিতে আসার পথে, দুবাই থেকে ক্যামেরা কিনেছিলাম। আমার কত শত ভ্রমণের সঙ্গী, কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার নীরব সাক্ষী Yashica MF-2 ক্যামেরাটা!
২
তখনকার দিনে ছবি তোলার রোমাঞ্চটাই ছিল আলাদা! বাজারে গিয়ে ফুজি ফিল্মের (Fuji Film) রোল কিনে আনা, হিসেব করে করে ছবি তোলা, আর ছবি শেষ হলে অধীর আগ্রহে স্টুডিওতে ডেভেলপ করতে দেওয়া—সব মিলিয়ে যে প্রবল উত্তেজনা কাজ করত, তা আজকের ফিল্মবিহীন ডিজিটাল যুগে বোঝানো অসম্ভব। স্টুডিও থেকে প্রিন্ট হয়ে আসা ঝকঝকে ছবিগুলো প্রথমবার হাতে পাওয়ার সেই আনন্দ ছিল এক কথায় দারুণ, অনন্য!
একাডেমির কঠোর ট্রেনিং থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অপারেশন—সবখানেই ক্লান্তিহীন, বিশ্বস্ত সেবা দিয়ে গেছে Yashica MF-2। আমি জানি, আমার মতো সেই প্রজন্মের ক্যামেরাপাগল আরও অনেকের জীবনের গল্পটা ঠিক একই রকম। অথচ সময়ের প্ল্যাটফর্মে ‘মাসুদ রানা’ বা ‘রানা মাসুদ’-এর নামের মতো সবকিছু কত দ্রুত বদলে যায়! আমার বন্ধু রানাকে দেখি FIM-92 Stinger launcher-এর মতো বিশাল লেন্স, দামি ক্যামেরা আর স্নাইপারদের মতো Ghillie suit পরে ছবি তুলে বেড়াচ্ছে। সে সময়ে কি আর এতশত জাঁকজমক ছিল! কিন্তু প্রযুক্তির এই জৌলুস আমাদের সেই সাধারণ ক্যামেরার আবেগকে ছুঁতে পারে না।
ক্যামেরাটার সহনশীলতার কথা মনে হলে এখনো অবাক হই। ১৯৯৫ সালের দিকের ঘটনা, একবার অপারেশনে যাওয়ার পথে অসাবধানতাবশত সাঙ্গুর কোন এক ঝিরির পানিতে ক্যামেরাটা পড়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম হয়তো শেষ! কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কোনো রকম হার না মেনে, ঠিকঠাক সার্ভিস দিয়ে গেছে প্রিয় Yashica MF-2 ক্যামেরা।
৩
আজ এত বছর পর পেছনের দিকে তাকালে বুকটা এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ায় ভরে ওঠে। এই ছবিটার কথাই ধরা যাক, বিয়ের পর দিন সকালে তোলা হয়েছিল। সময়ের স্রোতে এখন অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে, কিন্তু Yashica MF-2 ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হওয়া সেই দিনগুলো আজও ঠিক আগের মতোই জীবন্ত, আগের মতোই অমলিন।
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩১ মে ২০২৬