
১
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি বর্তমানে জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যের লড়াই এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষের নতুন রণকৌশল একাকার হয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর ইরান-বিরোধী অবস্থান, একের পর এক সামরিক আগ্রাসনের হুমকি এবং সম্প্রতি ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির আকস্মিক অবসান এই অঞ্চলের বিদ্যমান নিরাপত্তা সমীকরণকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা এবং যৌথ বিমান হামলার ধাক্কা সামলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান তার অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নীতিতে যে আমূল পরিবর্তন এনেছে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আকস্মিক প্রয়াণের পর তেহরানের শাসনক্ষমতায় যে নতুন এবং আপসহীন প্রজন্মের উত্থান ঘটেছে, তা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হিসাব-নিকাশকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রশাসনের সামরিক বাগাড়ম্বর এবং অন্যদিকে ইরানের ‘ট্রিগারে রাখা আঙুল’—এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি পুনরায় এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতের নাটকীয় পরিবর্তন, ইসরায়েলি লবির বিষাক্ত ব্র্যান্ডে রূপান্তর এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত নিরপেক্ষতা মধ্যপ্রাচ্যের দাবার ছকে এক নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিন্যাস তৈরি করেছে, যার ভবিষ্যৎ পরিণতি সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
২
ভার্সাই চুক্তির অবসান এবং ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী রূপ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের তৎকালীন কূটনীতিবিদদের মধ্যে ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদের ‘হল অব মিররস’-এ স্বাক্ষরিত দেড় পৃষ্ঠার যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক চরম পরিহাস হিসেবে দেখা হচ্ছিল। আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ভঙ্গুর চুক্তিটি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের জানান যে, ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারকটি সম্পূর্ণভাবে ‘শেষ হয়ে গেছে’। ট্রাম্প ইরানের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘অসুস্থ মানসিকতার’ এবং ‘সহিংস’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের সাথে আর কোনো প্রকার সম্পর্ক না রাখার ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের এই একতরফা ও মৌখিক ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রকাশ ঘটে যখন তিনি ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল ‘খার্গ দ্বীপ’-এ সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালানোর হুমকি দেন। এই হুমকির পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে এবং ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ড ইউনিট ‘খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ থেকে একটি কড়া বিবৃতি জারি করা হয়। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, খাতাম আল-আম্বিয়া কমান্ড সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, ইরানের সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর যেকোনো আগ্রাসনে যদি এই অঞ্চলের কোনো দেশ বা সামরিক ঘাঁটি থেকে সহায়তা বা সমর্থন দেওয়া হয়, তবে সেই সমর্থনের উৎসকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
৩
ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার নতুন বিন্যাস: ‘বিপ্লবের সন্তান’দের উত্থান।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও কৌশলগত মোড় আসে যখন দেশটিতে এক গভীর নেতৃত্ব পরিবর্তন শুরু হয়। প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ভয়াবহ যৌথ বিমান হামলার শিকার হয়ে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, যা তেহরান প্রশাসনের পুরোনো নেতৃত্ব কাঠামোকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলী ভায়েজ এবং জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভ্যালি নাসরের যৌথ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই হামলার ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটেনি, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এক সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্ম। বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, যার বয়স মাত্র ৫৬ বছর, তিনি তাঁর পিতার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, বাস্তববাদী এবং আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম।
নতুন এই নেতৃত্ব কাঠামোর মূল স্তম্ভ হলেন দেশটির বর্তমান পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান কমান্ডার আহমদ ভাহিদি। লন্ডনভিত্তিক বিখ্যাত থিংক-ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল এই নেতৃত্বকে ‘বিপ্লবের সন্তান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি কয়েক দশক ধরে ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ এমন একটি সতর্ক ও রক্ষণশীল কৌশল অবলম্বন করে আসছিলেন, যা অনেক সময় ইরানের আঞ্চলিক নীতিকে স্থবির করে রেখেছিল। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিরা অত্যন্ত সাহসী এবং আক্রমণাত্মক; তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে দ্বিধা করছে না, আবার প্রয়োজন হলে শক্ত অবস্থানে থেকে কূটনীতির টেবিলও নিয়ন্ত্রণ করছে। স্পিকার গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শক্ত অবস্থানে থেকে আলোচনা চালাতে পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি অপরিহার্য, কারণ ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতায় কোনো দুর্বলতা দেখলে শত্রু পক্ষ আবারও যুদ্ধের পথ বেছে নেবে।
"আমরা অভদ্রতার জবাব অভদ্রতায় নয়, পদক্ষেপে দিই: নির্ভীকভাবে এবং চরম বীরত্বের সাথে।"
— ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (উৎস: নিজের এক্স অ্যাকাউন্ট পোস্ট)
৪
প্রতিরোধ অক্ষের পুনর্গঠন ও আঞ্চলিক রণকৌশল।
গত কয়েক বছরে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের জোট বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ একের পর এক নজিরবিহীন ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে পেজার ও ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ এবং বিমান হামলার মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে; সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে এবং গাজায় হামাস ভয়াবহ মানবিক ও সামরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এবং নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সব বিপর্যয় সত্ত্বেও ইরানের মূল প্রতিরোধ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রয়েছে এবং তারা হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা প্রদর্শন করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
হামাসের শুরা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দারবিশের সঙ্গে তেহরানে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, ইরান মুসলিম বিশ্ব এবং প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি তার সমর্থন নীতি থেকে এক চুলও নড়বে না। তিনি ঘোষণা করেন যে, আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষায় প্রয়োজন হলে ইরান সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন দেবে। কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে আলোচনা চলছিল, সেখানেও ইরান তার মূল দাবি—অর্থাৎ আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত থেকে পিছপা হয়নি, যা প্রমাণ করে যে নতুন তেহরান প্রশাসন অত্যন্ত দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছে।
৫
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সখ্যতায় নজিরবিহীন ফাটল ও উপনিবেশের ধাক্কা।
মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটেছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে। প্রথম মেয়াদে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ করার পরও, বর্তমান মেয়াদে ইসরায়েলকে যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেওয়ায় ট্রাম্প দেশটির ডানপন্থী মহলে চরম ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। ইসরায়েলের প্রভাবশালী ‘চ্যানেল ১৪’-এর প্রাইমটাইম শোর উপস্থাপক ইনন মাগাল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি ‘লুজার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তার ইহুদি জামাতা জ্যারেড কুশনারকে কটাক্ষ করেছেন। এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াকভ বারদুগো ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ১৯৩৮ সালের হিটলারের প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেনের তোষণনীতির সঙ্গে তুলনা করে আধুনিক যুগের ‘চেম্বারলেন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
জায়নবাদীরা বুঝতে পেরেছে যে তাদের মূল অভিভাবকের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছে। সাবেক ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালনের একটি সাক্ষাৎকার এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যেখানে তিনি স্বীকার করেছেন যে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ধর্মীয় জায়নবাদী আন্দোলন মূলত একটি ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ’ ধারণ করে, যা হিটলারের ‘মাইন কাম্ফ’-এর উল্টো সংস্করণ মাত্র। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, জায়নবাদীরা বারবারই সেই পরাশক্তির বিরুদ্ধে অবাধ্য হয়েছে যার ওপর তারা নির্ভরশীল ছিল—যেমনটি ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের ২২ জুলাই জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে ব্রিটিশ প্রশাসনিক সদর দপ্তরে ইহুদি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ইরগুন’ কর্তৃক বোমা হামলার মাধ্যমে, যেখানে ৯১ জন নিহত হয়েছিলেন। ওবামা প্রশাসন কর্তৃক বৃহত্তম ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পাওয়ার পরও নেতানিয়াহুর অকৃতজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে জো বাইডেনকে নজিরবিহীন তিরস্কার একই ঐতিহাসিক অকৃতজ্ঞতার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে।
৬
আমেরিকার অভ্যন্তরে জনমতের সুনামি এবং আইপ্যাকের পতন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েল ইস্যুতে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৫৭ শতাংশই এখন ইসরায়েল এবং নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি চরম বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। সামগ্রিকভাবে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ফিলিস্তিন ইস্যুটি এখন মার্কিন রাজনীতির প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে এসে মূলধারার বিতর্কের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছে।
মার্কিন রাজনীতিতে জনমতের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন ঘটেছে নিউইয়র্ক এবং কলোরাডোর সাম্প্রতিক নির্বাচনে। কলোরাডোর প্রথম সংসদীয় আসনে ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে বিজয়ী হয়েছেন আইনজীবী ও পিএইচডি শিক্ষার্থী মেলাত কিরোস, যিনি ইসরায়েলপন্থী শক্তিশালী লবিং গ্রুপ ‘আইপ্যাক’ থেকে ১৬ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পাওয়া দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নেতা ডায়ানা ডিগেটকে পরাজিত করেছেন। ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস-অ্যাকশন’ এই ফলাফলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছে যে, ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর আইপ্যাক এখন একটি ‘বিষাক্ত ব্র্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে। যদিও স্টকটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাজিয়া কাজী সতর্ক করে বলেছেন যে, এটি আসলে ডেমোক্রেটিক পার্টির ‘নেতানিয়াহু-পরবর্তী’ যুগের উদারপন্থী জায়নবাদের একটি নতুন কৌশল মাত্র, তবুও মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলি লবির একচেটিয়া আধিপত্য যে বড় ধাক্কা খেয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
৭
উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল ও ভূরাজনৈতিক নিরপেক্ষতা।
মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ আগ্রাসনের মুখে ইরানের নাটকীয় ও বিধ্বংসী পাল্টা হামলা—বিশেষ করে কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে হামলার ঘটনা উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর চোখ খুলে দিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের মতো দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে যে তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়, বরং উল্টো তাদের ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। এজন্য ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় তেহরান-রিয়াদ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর, বর্তমানে সৌদি আরব সমঝোতার জন্য একটি বিশেষ আঞ্চলিক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়েই একটি নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
৮
সামগ্রিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র আজ যে নতুন বিন্যাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা কেবল কোনো সাময়িক সামরিক উত্তেজনা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার রূপান্তর প্রক্রিয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা নীতি এবং ভার্সাই চুক্তির অবসান ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের গভীর সীমাবদ্ধতাকেই উন্মোচিত করেছে। ইরানের নতুন, তরুণ এবং আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের আক্রমণাত্মক কূটনীতি এবং ‘ট্রিগারে রাখা আঙুল’ মার্কিন প্রশাসনকে এই অঞ্চলে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে পুরোনো সামরিক আধিপত্যের ভয় দেখিয়ে আর কাজ হচ্ছে না। একই সাথে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ উগ্র শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতি এবং আমেরিকার যুবসমাজের মধ্যে ইসরায়েল-বিরোধী জনমতের যে ঐতিহাসিক সুনামি আমরা লক্ষ্য করছি, তা দীর্ঘমেয়াদে ওয়াশিংটন-তেল আবিব অক্ষের কৌশলগত ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ভরসা কমিয়ে ইরানের সাথে সম্পর্ক মেরামতের কূটনৈতিক প্রয়াস প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলের দেশগুলো এখন আর পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক জুয়া খেলার গুটি হতে প্রস্তুত নয়। সুতরাং, মার্কিন সামরিক বাহিনীর একতরফা হুমকি এবং ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি এই অঞ্চলে শান্তি আনার পরিবর্তে আমেরিকান বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন দাবার ছকে প্রতিটি চালই এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক। পারস্য উপসাগরে যেকোনো ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশ বা সামরিক দুঃসাহসিকতা এমন এক আঞ্চলিক যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে, যা হরমুজ প্রণালি বন্ধের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে। ইরানের সংসদীয় কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ির মার্কিন বাহিনীকে দেওয়া সরাসরি হুঁশিয়ারি কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের বার্তা প্রমাণ করে যে, তেহরান এখন যেকোনো পরিস্থিতির জবাব সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রেই দিতে প্রস্তুত। মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে আইপ্যাকের মতো লবিং গ্রুপের পরাজয় এবং বার্নি স্যান্ডার্সের মতো নেতাদের ‘বাতাসের গতি পরিবর্তনের’ ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এখন মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুনর্মূল্যায়নের সূচনালগ্নে রয়েছে। এই পরিবর্তনের পথ অত্যন্ত দীর্ঘ এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনের অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। নেতানিয়াহু বা ট্রাম্পের পরবর্তী যেকোনো ভুল পদক্ষেপ যদি গাজা বা ইরানের ওপর নতুন করে রক্তপাত ডেকে আনে, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক অন্ধকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গহ্বরে নিমজ্জিত করবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৯ জুলাই ২০২৬