
১
এবারের ঈদুল আজহার বিশেষ নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম আলোচিত এবং একই সাথে সমলোচিত একটি কাজ হলো নির্মাতা জাকারিয়া শৌখিনের ‘মায়া পাখি’। নাটকটিতে অভিনয় করেছেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, সাদিয়া আয়মান নীহা, শাহেদ শরীফ খান এবং এই প্রজন্মের উঠতি অভিনেত্রী শিরতাজ জেবিন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জেবিন ‘সুমাইয়া’-র নেতিবাচক চরিত্রে নিজের অভিনয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, “‘মায়া পাখি’ নাটকটির গল্প আমাদের করপোরেট জগতের অন্ধকার জীবনের গল্প।” নাটকটি একদিকে যেমন দর্শকদের মাঝে আলোচনা ও সাড়া ফেলেছে, অন্যদিকে এর নির্মাণশৈলী এবং বাস্তবতা নিয়ে উঠেছে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন। একজন সাধারণ ও সচেতন দর্শক হিসেবে ‘মায়া পাখি’ নাটকটি দেখার পর এর ভালো, মন্দ এবং নির্মাণ কাঠামোর একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরলাম।
২
করপোরেট বাস্তবতার খণ্ডিত চিত্র।
নাটকটির মূল প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে একটি করপোরেট অফিসকে কেন্দ্র করে, যেখানে বসের (শাহেদ শরীফ খান) সুনজরে থাকার জন্য সুমাইয়া (জেবিন) ও মায়ার (নীহা) মধ্যকার এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও পেশাগত প্রতিযোগিতা দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টরে ভালো-মন্দ দুই দিকই বিদ্যমান। তবে এই নাটকে যে অন্ধকার দিকটি দেখানো হয়েছে, তা হয়তো পুরো সেক্টরের সার্বিক চিত্রকে প্রতিফলিত করে না; কারণ অন্যান্য পাঁচটা সেক্টরের মতো এখানেও খারাপের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যাটাই বেশি। তবে গতানুগতিক প্রেমের বাইরে গিয়ে এই ভিন্নধর্মী বিষয়বস্তুকে সামনে আনার যে প্রয়াস, তার জন্য সংশ্লিষ্টদের চেষ্টাটি অবশ্যই প্রশংসনীয়।
৩
চিত্রনাট্যের দুর্বলতা ও যত্নের অভাব।
গল্পের মূল ভাবনাটি যথেষ্ট সম্ভাবনাময় হলেও, চিত্রনাট্য ও পরিচালনার ক্ষেত্রে গল্পের বাঁধন ছিল ভীষণ ঢিলেঢালা। কিছু কিছু দৃশ্য এতই অপরিপক্ব ছিল যে, নাটকের সিরিয়াস বা গম্ভীর মুহূর্তগুলোকেও বেশ ‘ফানি’ মনে হয়েছে। বিশেষ করে করপোরেট অফিসের ভেতরের পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ এবং কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড মোটেও বাস্তবসম্মত বা পেশাদার মনে হয়নি।
৪
গোয়েন্দা বিভাগ ও তদন্ত প্রক্রিয়ার অবাস্তব রূপায়ন।
নাটকের সবচেয়ে দুর্বল ও খাপছাড়া দিক ছিল ডিবি অফিস এবং সেখানকার কর্মকর্তাদের উপস্থাপন। অফিসের অভ্যন্তরীণ দৃশ্যগুলোর সেট বা ইন্টেরোগেশন রুমের কৃত্রিমতা ও যত্নের অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো—যা হয়তো ঢাকার চেনা শ্যুটিং হাউসগুলোর চিরন্তন সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়েছে। ইন্টেরোগেশন রুমের ভেতরের দৃশ্য এবং পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া যেভাবে দেখানো হয়েছে, তার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। নির্মাতাদের বোঝা উচিত, কল্পনা দিয়ে ফ্যান্টাসি তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু পর্দায় বাস্তবতার রূপায়ন করতে হলে গভীর গবেষণার প্রয়োজন। এই ধরনের দৃশ্য চিত্রায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেক্টরে কাজ করেছেন বা করছেন—এমন পেশাদার ব্যক্তিদের পরামর্শ বা কারিগরি সহযোগিতা নেওয়া উচিত ছিল।
৫
অভিনয় ও নান্দনিকতা।
জিয়াউল ফারুক অপূর্ব বরাবরের মতোই নিজের চরিত্রে যথেষ্ট ভালো অভিনয় করেছেন। তবে তিনি ২০১৭ সালের পবিত্র ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া তার ক্যারিয়ারের মাইলফলক নাটক ‘বড় ছেলে’-র অভিনয়ের মানকে এখনও অতিক্রম করতে পারেননি। আরিয়ানের পরিচালনায় নির্মিত সেই নাটকটি আজ অবধি অপূর্বর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও কালজয়ী কাজ বলে মনেকরি। বসের চরিত্রে শাহেদ শরীফ খানের অভিনয় বড্ড 'রোবটিক' লেগেছে। 'নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট'কে শ্যুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার করার সুবিধা পেতেই তাকে কাস্ট করা হয়েছে কীনা—এমন প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। সাদিয়া আয়মান নীহা’র অভিনয় ছিল মোটামুটি মানের, তার আরও পরিপক্বতার সুযোগ ছিল। নবাগতা হিসেবে সুমাইয়ার মতো একটি চ্যালেঞ্জিং ও নেতিবাচক চরিত্রে শিরতাজ জেবিন-এর চেষ্টা চোখে পড়ার মতো। তবে অভিনয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছাতে হলে তাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে।
৬
বৃষ্টির কমার্শিয়াল বনাম নান্দনিক রূপ।
‘মায়া পাখি’ নাটকটির রোমান্টিক দৃশ্যগুলো ছিল অত্যন্ত গতানুগতিক। এই নাটকে বৃষ্টিকে কেবল "কমার্শিয়াল ভ্যালু" বা দর্শক আকর্ষণের একটি সস্তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কেননা বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্যটি কোনো শৈল্পিক নান্দনিকতা ছড়াতে পারেনি; বরং ক্যামেরার কড়া অ্যাঙ্গেল ও কস্টিউমে এক ধরণের 'রগরগে' ভাবই বেশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অথচ মিজানুর রহমান আরিয়ানসহ আমাদের দেশের অনেকেই বৃষ্টি বা রোমান্সের নান্দনিকতার বিষয়টিকে পর্দায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেসব কাজে কস্টিউম বা শরীরের চেয়ে অভিনেতাদের শরীরী ভাষার পরিমিতিবোধ, চোখের ভাষা এবং বিশুদ্ধ আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা দেখতে চোখ আরাম পায়।
৭
শেষ কথা ও দর্শক ভাবনা।
নাটকটি ঘিরে ভার্চুয়াল জগতে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তার পেছনে সমাজ ও মনস্তত্ত্বের এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব কাজ করছে। বর্তমানে এক শ্রেণীর দর্শকের মাঝে নাটকটি নিয়ে এক ধরণের ‘মার মার কাট কাট’ ভাব বিরাজ করছে। বিশেষ করে করপোরেট সেক্টরে কর্মরত কতিপয় উচ্চাভিলাষী নারী এবং কিছু পুরুষতান্ত্রিক (Male Chauvinist) মনোভাবাপন্ন পুরুষদের মধ্যে এই নাটকটি নিয়ে এক ধরণের চরমপন্থী পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়েছে। এই দুই শ্রেণীই নাটকের গল্পটিকে বিনোদনের ঊর্ধ্বে গিয়ে বড্ড বেশি সিরিয়াস বা ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ইগো বা মতাদর্শের লড়াইয়ে জড়িয়ে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এটিকে ভাইরাল করেছেন। তবে এই তুমুল তর্ক-বিতর্ক ও সস্তা ভাইরালিটির আসল সুবিধাভোগী কিন্তু স্বয়ং নির্মাতা এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান; কারণ কন্টেন্ট ভালো হোক বা মন্দ, ভিউ এবং আলোচনার কাটতি আলটিমেটলি তাদের পকেটই ভারী করছে। যারা এটি নিয়ে ফেসবুক বা কমেন্ট বক্সে অতিরিক্ত সময় ও যুক্তি ব্যয় করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, বিনোদনকে বিনোদন হিসেবেই গ্রহণ করা শ্রেয়, কারণ শিক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয় রয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, সস্তা উপাদানের ওপর ভর করে নির্মিত এই ধরণের একটি দুর্বল ও অগোছালো নির্মাণ যখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে, তখন তা আমাদের নাট্য ইন্ডাস্ট্রির আরও অনেক রুচিশীল, গবেষণালব্ধ এবং সত্যিই ভালো কিছু কাজকে লাইমলাইট থেকে আড়ালে ফেলে দেয়। দর্শক হিসেবে আমাদের রুচির এই বিবর্তন সত্যিই ভাবনার অবকাশ রাখে।
রেটিং: ২/৫ (শুধুমাত্র শিল্পীদের অভিনয়ের চেষ্টার ওপর ভিত্তি করে)
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৪ জুন ২০২৬