
১
একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য সবসময়ই একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, যার ভূকম্পন বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিকে বারবার বিপর্যস্ত করে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইরান এবং ফিলিস্তিনের প্রতিরোধকামী সংগঠন হামাসের মধ্যকার সমীকরণ এই অঞ্চলে অত্যন্ত জটিল সামরিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। বিগত কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতি এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সমঝোতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এখন এক অনিয়ন্ত্রিত অস্থিরতার রূপ নিয়েছে। বিশ্বরাজনীতির পরাশক্তিগুলোর একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ এবং কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার নতুন সংঘাতের আগুন এবং ইসরাইলের অনড় অবস্থান ও নতুন আঞ্চলিক শক্তির দিকে নজর দেওয়া—সব মিলিয়ে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক মোড় নিয়েছে।
২
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্মুখ সংঘাত: ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির অবসান।
বিগত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতি সচল হয়েছিল। তবে অতি সম্প্রতি সেই সমস্ত আশার ওপর ছাইচাপা দিয়ে আবারও শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাত।
ক। মার্কিন সেন্টকমের আকস্মিক বিমান হামলা।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে ইরানের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং স্বাধীনভাবে নৌযান চলাচলে ইরানের হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে আনতে তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে ৯০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে এই হামলা পরিচালনা করেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম 'ফারস' এবং 'মেহের' নিউজের বরাতে জানা গেছে, এই হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহরগুলো এবং উত্তরাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দরে বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং সেখানকার দুটি জেটি ও সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ এবং বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর আট সদস্যসহ মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
খ। ইরানের সামরিক প্রতিক্রিয়া ও পাল্টা ড্রোন হামলা।
মার্কিন বিমান হামলার জবাবে ইরানও চুপচাপ বসে থাকেনি, বরং তারা অত্যন্ত দ্রুত এবং মারাত্মক পাল্টা আঘাত হেনেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এবং সামরিক সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের ৩টি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে বিপুলসংখ্যক আক্রমণকারী আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে। ইরানের এই পাল্টা হামলায় কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, কাতারে অবস্থিত একটি স্যাটেলাইটভিত্তিক আগাম সতর্কতা অ্যান্টেনা এবং বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান জ্বালানি সংরক্ষণাগারকে নিখুঁতভাবে নিশানা করা হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মোহসিন রাজেয়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যা দুই দেশের সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
৩
ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ফাঁদ ও জ্বালানি সংকট।
এই সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীর প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে।
ক। ট্রাম্পের নির্বাচনী সমীকরণ ও মার্কিন জনমত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তহীন বিদেশি যুদ্ধ থেকে বের করে আনবেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মনোযোগ দেবেন। তবে ইরানের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় ভেস্তে যাওয়ায় ট্রাম্প এখন এক রাজনৈতিক ফাঁদে আটকা পড়েছেন। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, মার্কিন জনগণের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তার দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগামী নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যার আগে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্প এখন সামরিক বা কূটনৈতিক কোনো পথেই ইরানের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু অর্জন করতে পারছেন না, যা তাকে একটি বদ্ধ বাক্সে বন্দি করে ফেলেছে।
খ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি।
এই যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হয়—তাতে দুই পক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রাতারাতি প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লরা ব্লুমেনফেল্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের সামনে এখন মার্কিন ইতিহাসের মহামন্দার সময়কার প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার কালো ইতিহাস তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যদি তেলের দাম এভাবে বাড়তে থাকে, তবে মার্কিন ভোটাররা আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
৪
লেবানন সীমান্তে ইসরাইলের অনড় অবস্থান।
ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই ইসরাইল তার উত্তর সীমান্তে লেবানন ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ক। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সেনা প্রত্যাহারের অস্বীকৃতি।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে তেল আবিব কোনো অবস্থাতেই লেবাননে তাদের স্বঘোষিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে আলোচনার পর তিনি বিশ্বাস করেন ইসরাইল লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নেবে, কিন্তু কাৎজ সেই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষ্যমতে, ‘লেবাননে প্রবেশের জন্য আমরা কারও অনুমতি চাইনি এবং সেখানে থাকার জন্যও আমাদের কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই।’ তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না লেবাননে হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্র হচ্ছে এবং উত্তর ইসরাইলের বাসিন্দাদের ওপর থেকে হুমকি দূর হচ্ছে, ততক্ষণ ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সেখানে অবস্থান করবে।
খ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ।
লেবাননের বেসামরিক জনগণের ওপর ইসরাইলি বিমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি ৬ থেকে ১৩ মার্চের মধ্যে লেবাননের বেসামরিক ঘরবাড়িতে চালানো তিনটি সুনির্দিষ্ট ইসরাইলি বিমান হামলা পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, এসব হামলায় মোট ২৪ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জনই ছিল নিষ্পাপ শিশু। অ্যামনেস্টি এই নির্বিচার হামলাগুলোকে 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে গণ্য করে এর আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী এই বেসামরিক মৃত্যুর বিষয়ে সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
৫
নতুন শত্রুর সন্ধানে ইসরাইল: তুরস্কের উত্থান।
ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক কৌশলের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখতে এবং আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখতে সবসময় একটি ‘বাহ্যিক শত্রু’ বা থ্রেড পারসেপশনের ওপর নির্ভর করে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখেই ইসরাইলি নীতিনির্ধারকরা এখন এক নতুন শত্রুর নাম সামনে নিয়ে আসছেন।
ক। 'তুরস্কই হলো নতুন ইরান'।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আগামী নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেট ইহুদি নেতাদের এক সম্মেলনে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ‘তুরস্কই হলো নতুন ইরান।’ ইসরাইলি নীতিনির্ধারকদের মতে, আঙ্কারা এখন সৌদি আরব ও পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে একটি শক্তিশালী বৈরী সুন্নি অক্ষ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই নতুন সুন্নি হুমকি মোকাবিলা করতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতোমধ্যে ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে একটি পাল্টা ‘ষড়ভুজাকার জোট’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
খ। তুর্কি সামরিক শক্তির খতিয়ান।
কাগজে-কলমে এবং বাস্তবেও তুরস্ককে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ন্যাটোর মধ্যে তুরস্কের রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী, যার সক্রিয় সদস্য সংখ্যা সাড়ে তিন লাখের বেশি এবং বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ২৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এছাড়া তুরস্কের নিজস্ব উন্নত অস্ত্রশিল্প যেমন—আসেলসান ও ড্রোন নির্মাতা বায়কার, বিশ্ববাজারে চালকবিহীন ড্রোন (UAV) চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ পূরণ করছে। তাদের সর্বাধুনিক জেটচালিত কমব্যাট ড্রোন ‘কিজিলএলমা’ এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি নৌবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি ইসরাইলের সমুদ্র তীরবর্তী গ্যাসক্ষেত্রগুলোর জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
গ। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তির সমীকরণ।
তুরস্ক ছাড়াও মিসরের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিসরের বর্তমান নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা সাড়ে চার লাখ এবং তাদের শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে আমেরিকান আব্রামস ট্যাংক ও ফরাসি রাফাল জেট। সম্প্রতি সিনাই উপদ্বীপে মিসরীয় সেনাবাহিনীর ‘বদর ২০২৬’ লাইভ-ফায়ার সামরিক মহড়া দেখে খোদ নেতানিয়াহু নেসেটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ এবং চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষকদের মতে, আঙ্কারা, কায়রো, রিয়াদ বা ইসলামাবাদের মধ্যে কোনো যৌথ সামরিক কমান্ড বা আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। তাই ইসরাইল যেভাবে এই সুন্নি অক্ষের জুজু দেখাচ্ছে, তা মূলত নেতানিয়াহু ও বেনেটের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সুবিধা এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল মাত্র।
৬
গাজায় হামাসের কৌশলগত প্রশাসনিক রদবদল।
এই সামগ্রিক আঞ্চলিক সংকটের সমান্তরালে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস এক ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ক। ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ বিলোপ।
টানা এক হাজার দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধের পর হামাস গাজায় তাদের দীর্ঘ ২০ বছরের বেসামরিক শাসন কাঠামোতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গাজার গভর্নমেন্ট মিডিয়া অফিসের ডিরেক্টর জেনারেল ড. ইসমাইল আল-থোয়াবতা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে হামাস তাদের ‘সরকারি জরুরি কমিটি’ ভেঙে দিচ্ছে এবং বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব ‘গাজার প্রশাসনের জাতীয় কমিটি’র (NCAG) হাতে তুলে দিচ্ছে। এই জাতীয় কমিটি মূলত একটি নিরপেক্ষ টেকনোক্র্যাট বা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো, যা মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত হয়েছিল। হামাস স্পষ্ট করেছে যে তারা হঠাৎ করে সব ছেড়ে দিচ্ছে না, বরং ধাপে ধাপে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে যাতে গাজার সিভিল সার্ভিসে কোনো প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি না হয়।
খ। কৌশলগত পিছু হটা, আত্মসমর্পণ নয়।
ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাইডন সার এবং তেল আবিবের সামরিক কর্মকর্তারা হামাসের এই পদক্ষেপকে একটি ‘রাজনৈতিক চাল’ বা ‘প্রতারণা’ হিসেবে দেখছেন এবং গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেসামরিক প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়ানো হামাসের কোনো পরাজয় বা আত্মসমর্পণ নয়, বরং এটি তাদের একটি গভীর সামরিক কৌশল। গত প্রায় দুই দশক ধরে হামাসকে একসাথে সরকার পরিচালনা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ—এই দুটি কঠিন কাজ করতে হয়েছে। এখন গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিয়ে হামাস তাদের ওপর থেকে সরাসরি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে চায়। এর ফলে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি অক্ষুণ্ন রেখে সম্পূর্ণ মনোযোগ ফিলিস্তিনের মূল মুক্তিসংগ্রাম এবং সামরিক শক্তি পুনর্গঠনে দিতে পারবে, যা ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার জন্য এক নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
৭
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বহুমুখী সংঘাতের চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এই অঞ্চলের সংকট আর কোনো একক রাষ্ট্র বা একক গোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়াকে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। অন্যদিকে ইসরাইলের লেবানন সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি এবং একই সাথে তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী সুন্নি রাষ্ট্রগুলোকে ‘নতুন হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রয়াস এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গাজায় হামাসের বেসামরিক প্রশাসন থেকে সরে এসে খাঁটি সামরিক ও রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরের কৌশলগত চালটি প্রমাণ করে যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। এই বহুমুখী সংঘাতের প্রতিটি উপাদান—তা ওয়াশিংটনের নির্বাচনী সমীকরণ হোক, বিশ্ববাজারের তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি হোক, কিংবা ভূমধ্যসাগরে তুর্কি নৌবাহিনীর মহড়া হোক—সবকিছুই একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এই ঐতিহাসিক সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রের শক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে রক্ষা করতে এবং রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে চান, তবে তাকে অতি দ্রুত একটি টেকসই এবং বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করতে হবে, কারণ কেবল বোমা মেরে ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। একইভাবে ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদেরও বুঝতে হবে যে, একের পর এক নতুন কাল্পনিক শত্রু তৈরি করে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৯ জুলাই ২০২৬