
১
পারস্যের তিন মহান সাধক ও কবি—জালালুদ্দিন রুমি, হাফিজ এবং ওমর খৈয়ামের সমাধিস্থল দর্শন করার পরিকল্পনাটা আমার দীর্ঘদিনের। মূলত সুফিজম নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েই এই আধ্যাত্মিক ভ্রমণের ইচ্ছাটা মনের ভেতর দানা বাঁধে। সেই সুপ্ত বাসনা থেকেই গত বছর তুর্কিয়ে ভ্রমণের সময় মাওলানা রুমির স্মৃতিধন্য 'কোনিয়া' (Konya) শহরটিকে আমার ট্যুর প্ল্যানে যুক্ত করি।
ক্যাপাডোসিয়া এবং পামুক্কালের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য উপভোগ শেষে আমরা যেদিন কোনিয়া পৌঁছালাম, সেদিন ছিল পবিত্র ঈদ-উল-আযহার আগের দিন। হোটেলের লবিতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ওই দিন সন্ধ্যায় রুমি সেন্টার ফর স্পিরিচুয়ালিটি অ্যান্ড দ্য আর্টস-এ ঐতিহ্যবাহী ‘সেমা নাচ’ (Sema Ceremony)-এর আয়োজন রয়েছে। বিশ্বজুড়ে যা "দারবিশ নাচ" (Whirling Dervishes) নামে পরিচিত। বেশ উন্মুখ হয়েই টিকিট কাটলাম। কিন্তু বিধি বাম! শেষ মুহূর্তে অজ্ঞাত কারণে সেদিনের অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়ে যায়। রুমির নিজের শহরে বসেই তাঁর অনুসারীদের এই পবিত্র নৃত্য দেখার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
২
পরদিন ঘুরে দেখলাম মাওলানা রুমির সমাধিক্ষেত্র, মেভলানা জাদুঘর, তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ও সুফি সাধক শামস তাবরিজি’র সমাধি, প্রাচীন গুহানগরী সিল্লে (Sille) এবং কোনিয়া শহরের বিভিন্ন প্রান্ত, সেলজুক স্থাপত্য ইত্যাদি। এরপর এক বুক দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণতা নিয়ে রওনা হলাম আন্তালিয়ার উদ্দেশ্যে। আন্তালিয়া ভ্রমণ শেষে ইস্তানবুলে ফিরলাম।
৩
কোনিয়ার সেই অপূর্ণতা পূর্ণতা পেল ইস্তানবুলে ফিরে। বসফরাস প্রণালীতে রাতের ‘সী ক্রুজ’ উপভোগ করার সময় হঠাৎ করেই সেখানে পরিবেশিত হলো সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত সেমা নাচ। লণ্ঠনের আলো আর সুফি সঙ্গীতের মূর্ছনায় দারবিশদের সেই ঘূর্ণন যেন বসফরাসের জলরাশিকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
চোখের সামনে যখন শুভ্র পোশাক পরিহিত সুফি দারবিশরা এক হাত পরম মমতায় আকাশের দিকে আর অন্য হাত মাটির দিকে বাড়িয়ে ঘোরেন, তখন চারপাশের বাতাসে সম্মোহনের মতো এক অদ্ভুত ও অপার্থিব শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতকে বিখ্যাত পারস্য কবি ও সুফি সাধক হযরত জালালুদ্দিন রুমি (রাঃ)-এর কালজয়ী দর্শন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘মেভলেভি তরিকা’র হাত ধরেই মূলত এই ঐতিহাসিক ও পবিত্র নৃত্যের উৎপত্তি ঘটেছিল। তবে এটি কোনো সাধারণ বিনোদনমূলক লোকনৃত্য কিংবা চাক্ষুষ প্রদর্শনী নয়, এটি আসলে পরমাত্মার সাথে মিলনের এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের এক গভীর আধ্যাত্মিক উপাসনা ও আত্মিক ধ্যান। এই নৃত্যের প্রতিটি সূক্ষ্ম অঙ্গভঙ্গি, পরিহিত বিশেষ পোশাক এবং অবিরাম চক্রাকার ঘূর্ণনের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে ইসলামের সুফিবাদের এক পরম রহস্যময় জীবনদর্শন। মূলত দারবিশদের এই ঐতিহ্যবাহী 'সেমা' অনুষ্ঠানটি মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণু থেকে শুরু করে বিশাল সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রের চিরন্তন ও সার্বজনীন ঘূর্ণন গতিকে নিজের দেহের ভেতর ধারণ করার এক অনন্য প্রক্রিয়া। তাঁরা এই বৃত্তাকার ঘূর্ণনের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রতি সমগ্র সৃষ্টিজগতের নিঃশর্ত, পবিত্র এবং শাশ্বত ভালোবাসাকে অত্যন্ত নিখুঁত ও নান্দনিকভাবে উদযাপন করেন। এই নৃত্যের গূঢ় আধ্যাত্মিক অর্থ হলো—দারবিশরা তাঁদের উন্মুখ ডান হাত আকাশের দিকে মেলে ধরে সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে স্বর্গীয় অনুগ্রহ, দয়া ও ভালোবাসা গ্রহণ করেন। এরপর সেই পবিত্র আলো ও আশীর্বাদ নিজের কাছে বিন্দুমাত্র জমিয়ে না রেখে বাম হাতের মাধ্যমে নিখিল পৃথিবীর সমস্ত সাধারণ মানুষের মাঝে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেন।
এই সেমা নৃত্যে অংশ নেওয়া সুফি সাধকদের পরনের বিশেষ পোশাকের প্রতিটি অংশের পেছনেও রয়েছে এক গভীর ও বৈরাগ্যময় রূপক অর্থ। দারবিশদের মাথায় থাকা লম্বা ও উঁচু টুপিটি (Sikke) আসলে মানুষের ভেতরের চিরন্তন অহংকারের সমাধি পাথর এবং শুভ্র লম্বা স্কার্ট সদৃশ পোশাকটি (Tennure) অহংকারের কাফন হিসেবে প্রতীকায়িত হয়। মূল অনুষ্ঠানটি শুরু করার ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁরা শরীর থেকে যে কালো রঙের কোটটি খুলে ফেলেন, তা মূলত পার্থিব জগতের অন্ধকার রূপ মোহ ও কবরকে নির্দেশ করে। এই কালো কোটটি গা থেকে সম্পূর্ণ আলগা করে ফেলার আধ্যাত্মিক অর্থ হলো—দারবিশরা তাঁদের জাগতিক ও পার্থিব সমস্ত মোহ-মায়া পুরোপুরি ত্যাগ করে পরম পবিত্র আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করছেন। ঐতিহ্যবাহী সুফি বাঁশি 'নে' (Ney) এবং ড্রামের গম্ভীর ও হৃদয়স্পর্শী সুরের মূর্ছনায় পুরো আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে মোট চারটি ভিন্ন ধাপে বা ‘সেলাম’-এ সম্পন্ন করা হয়। এই প্রতিটি ধাপ মানুষকে পর্যায়ক্রমে অহংকার থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মিক রূপান্তর এবং স্রষ্টার ভালোবাসায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার এক শাশ্বত ও অলৌকিক পথ প্রদর্শন করে থাকে। নিখুঁতভাবে এক পায়ে ভর দিয়ে বাম থেকে ডানে দারবিশরা যেভাবে দীর্ঘক্ষণ অবিরাম গতিতে চক্রাকারে ঘুরে চলেন, তা সাধারণ মানুষের চোখ ও বিজ্ঞানের কাছে এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়। এতো দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গতিতে ঘোরার পরেও তাঁদের শরীরে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি আসে না কিংবা কোনো প্রকার মাথা ঘোরার অনুভূতি হয় না, যা মূলত গভীর ধ্যানের এক পরম ও চরম পর্যায়। সুফি সংস্কৃতির এই অনন্য আধ্যাত্মিক গভীরতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই ২০০৮ সালে ইউনেস্কো মেভলেভি সেমা অনুষ্ঠানকে "মানবজাতির মৌখিক এবং অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম" হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃতি প্রদান করে।
৪
ইস্তানবুলের সেই রাতে বসফরাসের মৃদু হাওয়া আর দারবিশদের আধ্যাত্মিক ঘূর্ণন দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, কোনিয়ার সেই মন খারাপটা আসলে একটা উপহার ছিল। তা না হলে হয়তো ইস্তানবুলের সেই জাদুকরী রাতে সেমা নাচের মর্ম এত গভীরভাবে ছুঁয়ে যেত না। সুফিবাদের এই দর্শন আমাদের শেখায়—সবকিছুর পেছনেই একজন পরম চালিকাশক্তি আছেন, আর তাঁর কাছে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম হলো নিঃশর্ত ভালোবাসা।
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৮ জুন ২০২৬