
১
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সমঝোতার টেবিল যখন স্থায়ী শান্তি খোঁজার চেষ্টায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলা নতুন করে বৈশ্বিক যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালির সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের ভেতরে ১৭০টিরও বেশি কৌশলগত সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় ক্রুজ মিসাইল হামলা চালায়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে দূরগামী ভূ-রাজনৈতিক আঘাতটি এসেছে ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গোলেস্তান প্রদেশের কৌশলগত 'আক তাকেহ খান' রেলসেতুর ওপর, যা চীন ও রাশিয়ার মূল বাণিজ্য করিডোরকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মূলত ইরানের ভূখণ্ডে এই হামলা চালানো হলেও এর নেপথ্য উদ্দেশ্য ছিল বেইজিং ও মস্কোর বিকল্প বাণিজ্য অক্ষকে ভেঙে দেওয়া, যা এখন বিশ্ব পরাশক্তিগুলোকে এক অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, এই ঘটনা কেবল ওয়াশিংটন-তেহরান দ্বিপাক্ষিক সংঘাত নয়, বরং এটি চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই সংকটে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তীব্র করে তুলেছে।
২
হামলার পটভূমি: সমঝোতা স্মারকের মৃত্যু ও ট্রাম্পের রণনীতি।
১৭ জুন ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখবে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এই প্রণালির ওপর নিজেদের একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছিল তেহরান। গত মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে ০৩টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত হামলার পর পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। মার্কিন প্রশাসন এই হামলার পেছনে সরাসরি ইরানের হাত রয়েছে বলে দাবি করে।
বুধবার রাতে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় ঘোষণা করেন যে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ "শেষ" বা বাতিল বলে গণ্য করা হচ্ছে। এরপরই তার সরাসরি নির্দেশে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমান থেকে ইরানের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। পরবর্তীতে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেন, এটি ছিল হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক জাহাজে ইরানি হামলার চূড়ান্ত ও উপযুক্ত জবাব। ইরান যদি পুনরায় কোনো ধরণের উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নেয়, তবে এর চেয়েও কড়া সামরিক জবাব দেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
৩
আক তাকেহ খান রেলসেতু: কেন এই অবকাঠামো এত গুরুত্বপূর্ণ?
মার্কিন সেন্টকম সামরিক স্থাপনায় নিখুঁত হামলার দাবি করলেও, বুধবার রাতের হামলায় ইরানের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আঘাতটি ছিল গোলেস্তান প্রদেশের আক তাকেহ খান রেলসেতুর ওপর।
ক। চীন-তুর্কমেনিস্তান-ইরান করিডোরের প্রাণকেন্দ্র।
আক তাকেহ খান সেতুটি কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মূলত চীন-তুর্কমেনিস্তান-ইরান (KTI) আন্তর্জাতিক রেল করিডোরের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পয়েন্ট। এই রেলপথটি ইরান থেকে তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের ভূখণ্ড অতিক্রম করে সরাসরি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের সীমান্ত ও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পশ্চিমা সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চীন ও ইরান গত কয়েক বছর ধরে এই স্থলপথটির আধুনিকায়নে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা’র এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পারস্য উপসাগরে মার্কিন আধিপত্য ও সামুদ্রিক ব্লকেডের কারণে বেইজিং এই রুটকে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে এই রুটে চীনের পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
খ। রাশিয়ার 'উত্তর-দক্ষিণ' বাণিজ্য অক্ষ।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়ার পর থেকে রাশিয়া তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাকা সচল রাখতে বিকল্প রুটের সন্ধান করছিল। রয়টার্স-এর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে রাশিয়া এই মধ্য এশীয় করিডোর এবং আক তাকেহ খান রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইরানের সাথে বিপুল পরিমাণ ভারী কার্গো, শিল্প কাঁচামাল এবং সামরিক ড্রোন-সংক্রান্ত প্রযুক্তির আদান-প্রদান শুরু করে। এরফলে এই একক রেল রুটটি কার্যত চীন, রাশিয়া এবং ইরানের মধ্যকার একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত অক্ষ বা সাপ্লাই চেইনে পরিণত হয়েছিল। এই সেতুতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত তাই শুধু ইরানের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং বেইজিং ও মস্কোর সুরক্ষিত অর্থনৈতিক করিডোরে সরাসরি আঘাত হেনেছে।
৪
চীন ও রাশিয়ার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এবং 'অদৃশ্য' জোটের সমীকরণ।
ইরানের মূল ভূখণ্ডে এবং বিশেষ করে চীন-রাশিয়ার বাণিজ্যিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট করিডোরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসী হামলার পর বেইজিং ও মস্কোর নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন একে হরমুজ প্রণালির নৌ-নিরাপত্তা রক্ষার একটি সীমিত অভিযান হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, তবে চীন ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া বলছে ভিন্ন কথা।
ক। বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক কূটনীতি ও হুঁশিয়ারি।
চীন প্রথাগতভাবে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর নীতি এড়িয়ে চললেও, আক তাকেহ খান রেলসেতু ধ্বংসের পর তাদের সুর অনেকটাই কঠোর। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে যেকোনো ধরণের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে। বেইজিং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের বাণিজ্য করিডোর ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। মিডল এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চীন সরাসরি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে না নামলেও, তারা ইরানকে আরও উন্নতমানের রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন S-400 বা সমমানের চীনা ব্যবস্থা) সরবরাহ করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান শক্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
খ। মস্কোর কৌশলগত পাল্টা চালের হুমকি।
রাশিয়ার ক্রেমলিন এই হামলাকে ওয়াশিংটনের "সন্ত্রাসী ও উস্কানিমূলক" আচরণ হিসেবে অভিহিত করেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে যে, মস্কো এই রুটটিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। রুশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্যরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এশীয় করিডোরগুলো বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সমীকরণ আরও জটিল হবে এবং মার্কিন মিত্র দেশগুলোর ওপর এর পরোক্ষ প্রভাব পড়বে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, রাশিয়া এখন ইরানকে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে নিখুঁত রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স বা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করতে পারে, যার ফলে পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
৫
মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের মেঘ: পাল্টাপাল্টি আঘাতের মানচিত্র।
বুধবার রাতের মার্কিন হামলার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) অবিলম্বে এর প্রতিশোধমূলক সামরিক অ্যাকশনে যায়। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, মঙ্গল ও বুধবারের মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন ইরানি নাগরিক ও সামরিক কর্মী নিহত হয়েছেন এবং চাবাহার শহরের একটি সাধারণ হাসপাতাল ও ইরানশাহর বিমানবন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই ক্ষয়ক্ষতির জবাবে আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়।
কুয়েত: মার্কিন বাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি 'ক্যাম্প আরিফজান'-এ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যার ফলে কুয়েত সরকারের দেওয়া তথ্যমতে অন্তত একজন আহত হন এবং সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি হয়।
বাহরাইন: মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর সংলগ্ন জুফাইর এবং শেখ ইসা সামরিক বিমান ঘাঁটিতে ইরান নিখুঁত হামলা চালায়।
কাতার: কাতারে অবস্থিত মার্কিন সেন্টকমের আঞ্চলিক সদর দফতর এবং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মার্কিন সামরিক স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং স্টেশনকে লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালায়।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, "সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্য দিতে হবে। আঘাত হানলে শত্রুদের পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।" একই সাথে ইরানি আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজায়ি মার্কিন প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, "পরবর্তী চপেটাঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকো।"
৬
ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য দেশের ভেতরে এক বিরাট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নভেম্বরের আসন্ন মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান পার্টি চরম বিপাকে পড়েছে।
“ভোক্তাদের কাছে এখন প্রধান বিষয় হলো জীবনযাত্রার ব্যয়। গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের এই মৌসুমে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আবার বাড়লে তা রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
— সারা চেম্বারলিন, প্রধান, মেইন স্ট্রিট পার্টনারশিপ
যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫৮ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং ৮৭ শতাংশ ভোটার যেকোনো মূল্যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত এড়ানোর পক্ষে। ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, কংগ্রেস এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে, তাই ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অবৈধ। এদিকে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঘোষণার সাথে সাথেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ১ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে এবং মার্কিন শেয়ার বাজারে বড় ধরণের ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, সামরিক বা কূটনৈতিক কোনোভাবেই ট্রাম্প ইরানের কাছ থেকে বড় কিছু অর্জন করতে পারছেন না, উল্টো তিনি নিজেকে একটি অবরুদ্ধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জালে জড়িয়ে ফেলেছেন।
৭
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক এই সামরিক অভিযান এবং চীন-রাশিয়ার কৌশলগত বাণিজ্য রুটে আঘাতের ফলে বিশ্ব এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। যদিও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মার্কিন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, ইরানের প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর দুই পক্ষ আবার আলোচনা টেবিলে বসতে পারে এবং বর্তমান হামলাগুলো মূলত আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি কৌশল; তবুও মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আশঙ্কাজনক। আক তাকেহ খান রেলসেতুর মতো একটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন ধ্বংসের পর ইরান, চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার সামরিক ও কৌশলগত অক্ষটি আরও বেশি সংহত হতে বাধ্য, যা ওয়াশিংটনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী প্রমাণিত হতে পারে। যদি এই সংকটের দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না হয়, তবে পারস্য উপসাগরের এই স্ফুলিঙ্গ খুব দ্রুতই এশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়বে, যার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার এবং একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সদৃশ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার বাস্তব শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আক তাকেহ খান রেলসেতুতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের মূল পরিণতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ওয়াশিংটনের বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্যের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি মনে করে থাকে যে সামরিক শক্তির জোরে তারা ইরানকে সম্পূর্ণ নতজানু করবে এবং চীন-রাশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি রুখে দেবে, তবে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হিসাব।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১০ জুলাই ২০২৬