
১
Shams-e Tabriz to-ee mayeh-ye shadani-ye ma,
Ruz o shab az rokh-e to rowshan o nourani-ye ma.
হে তাবরিজের শামস! তুমিই তো মোর আনন্দের আধার,
তোমার ঐ মুখের ছোঁয়ায় কাটে মনের অন্ধকার।
দিন রজনী তোমায় হেরে দীপ্ত হলো প্রাণ,
তোমার আলোয় আলোকিত আজ হৃদয়-মন আমার।
সুফিবাদের ইতিহাসে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি এবং শামস-ই-তাবরিজির সম্পর্কটি আধ্যাত্মিক রূপান্তরের এক অনন্য ও কালজয়ী অধ্যায়। ১২৪৪ সালের ৩০ নভেম্বর তুরস্কের কোনিয়া শহরে এই দুই মহাজাগতিক আত্মার প্রথম ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটেছিল। সুফি দর্শন ও বিশ্বসাহিত্যের গবেষকদের মতে, এই বন্ধন কেবল সাধারণ কোনো বন্ধু বা প্রচলিত গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল না। এটি ছিল মূলত দুটি মহাসমুদ্রের মিলন, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে ঐশ্বরিক প্রেমের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
২
সাক্ষাতের পূর্বে রুমি ছিলেন একজন প্রখ্যাত প্রথাগত ইসলামিক পণ্ডিত, ফতোয়াদানকারী এবং মাদ্রাসার সম্মানিত শিক্ষক। কিন্তু রহস্যময় সুফি সাধক শামসের স্পর্শে রুমির ভেতরের সুপ্ত আধ্যাত্মিক প্রতিভা ও তীব্র ঐশ্বরিক প্রেম (ইশ্ক) জাগ্রত হয়। শামস তাকে বইয়ের শুষ্ক জ্ঞান এবং সামাজিক মর্যদার ঊর্ধ্বে উঠে হৃদয়ের গভীর আলো সন্ধান করতে শিখিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর রুমি তার কিতাবপত্র ও শিক্ষকতা ছেড়ে শামসের সান্নিধ্যে গভীর ধ্যানে মগ্ন হন।
Man mardeh bodam zandeh shodam, geryeh bodam khandeh shodam,
Dowlat-e eshq amad o man dowlat-e payandeh shodam.
মৃতপ্রায় ছিলাম আমি, জীবন ফিরে পেলাম,
অশ্রুভেজা চোখ ছিল মোর, হাসিতে হারালাম।
প্রেমের সেই পরম ঐশ্বর্য এলো যখন দ্বারে,
অমর এক সাম্রাজ্যের চিরন্তন রাজা হলাম।
৩
সুফি দর্শনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রুমি ও শামসের এই বন্ধন ছিল মূলত একে অপরের ‘আধ্যাত্মিক দর্পণ’ বা স্পিরিচুয়াল মিরর। শামস রুমির মাঝে এমন এক পবিত্র পাত্র দেখেছিলেন, যা তার নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক আলো ধারণ করতে সক্ষম ছিল। অন্যদিকে রুমি শামসের মাঝে অবলোকন করেছিলেন স্বয়ং স্রষ্টার অনাবিল সৌন্দর্য ও আলোর প্রতিফলন। তারা বাহ্যিক জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘খালওয়াত’ বা নির্জনতায় আধ্যাত্মিক সংলাপে লিপ্ত থাকতেন।
রুমির পরিবার ও ভক্তরা শামসের প্রতি তার এই চরম আসক্তিকে সহজভাবে নিতে পারেনি এবং তাদের হিংসার কারণে শামস দুবার কোনিয়া ত্যাগ করেন। ১২৪৮ সালের দিকে শামস যখন চিরতরে নিখোঁজ হন, তখন রুমি তীব্র বিরহ ও বিচ্ছেদ ব্যথায় ভেঙে পড়েন। এই গভীর বেদনাই একজন পণ্ডিত রুমিকে বিশ্বসেরা মরমী কবিতে রূপান্তরিত করে। শামসের স্মরণে তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজি', যেখানে তিনি নিজের নামের বদলে শামসের নাম ব্যবহার করেন।
Man kiyam? To, to kiyi? Man, ey ajab
Man to-am ya to mani dar jan o tan?
আমি কে? তুমি! তুমি কে? আমি! একী পরম বিস্ময়!
আমাতে কি তুমি, নাকি তোমাতে আমি হলাম লয়?
এই যে দেহ, এই যে আত্মা, কিসের ভেদাভেদ—
তুমি-আমির সীমানা ভেঙে একই তো প্রাণ রয়!
৪
কোনিয়ার যে নির্দিষ্ট স্থানটিতে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, সুফি ঐতিহ্যে তাকে "মারাজ আল-বাহরাইন" বা "দুই সমুদ্রের মিলনস্থল" বলা হয়। বর্তমানে কোনিয়ার কেন্দ্রস্থলে, মেভলানা মিউজিয়াম এবং শামসের মাজারের সন্নিকটে এই ঐতিহাসিক স্থানটি একটি বিশেষ স্মারক মনুমেন্ট দ্বারা চিহ্নিত ও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি বছর ডিসেম্বরের 'শেব-ই আরুস' বা রুমির প্রয়াণ উৎসবে সারা বিশ্বের লাখ লাখ সুফি অনুরাগী ও পর্যটক আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রতীক এই মিলনস্থলটি দর্শন করতে আসেন। ২০২৫ সালের জুন মাসে তুর্কিয়ে ভ্রমণের সময় এই জায়গাটা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১১ জুন ২০২৬