
১
সিনেমা দেখার জন্য আমার অন্যতম পছন্দের জায়গা ঢাকার উত্তরা’র সেন্টার পয়েন্টের স্টার সিনেপ্লেক্স। ঢাকার অন্যান্য ব্রাঞ্চগুলোর তুলনায় এখানকার পরিবেশকে আমার কাছে সবসময়ই সবচেয়ে ঝকঝকে ও পরিপাটি মনে হয়। গত শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার শো-তে দেখতে গিয়েছিলাম নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্র “বনলতা সেন”।
ব্যক্তিগত ভালো লাগা ও সিনেমা দেখার নিজস্ব উপলব্ধি থেকেই এই রিভিউ। অনেকেই আমার অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধির সাথে একমত নাও হতে পারেন। আমার মতে জীবনানন্দ দাশের জীবন, তার সাহিত্যিক সংগ্রাম এবং ‘বনলতা সেন’-এর খোঁজে নির্মাতার যে অন্তহীন ক্ষুধা—তারই এক সমান্তরাল কোলাজ এই চলচ্চিত্র।
২
কবিতা থেকে সেলুলয়েড: প্রেক্ষাপট ও বিনির্মাণ।
‘বনলতা সেন’ কবিতার ব্যবচ্ছেদ বা বিশ্লেষণ করতে গেলে কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনের অভিজ্ঞতা ও মনস্তত্ত্বের প্রসঙ্গ আসা অনিবার্য। কারণ, প্রতিটা লেখকই তার অজান্তে লেখনীর ভাঁজে নিজের জীবনের অমোঘ ছাপ রেখে যান। নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল এই সিনেমায় কবিতার মূল আত্মার খোঁজে পৌরাণিক এবং ঐতিহাসিক চরিত্র, ঘটনা ও চিরন্তন মানব-সংগ্রামকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। এর জন্য তিনি কখনো অনবদ্য অভিনয়, কখনো তীক্ষ্ণ সংলাপ, কখনো অমোঘ কবিতার লাইন, আবার কখনোবা জটিল মেটাফোরের আশ্রয় নিয়েছেন।
এটি কোনো সরল তথ্যচিত্র (Documentary) নয়। যদি তাই হতো, তবে হয়তো লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এর রূপকে তৎকালীন কবি-সাহিত্যিকদের ঈর্ষা ও বিরূপ ভাবনা, কিংবা কবির মৃত্যুর পর লাবণ্য দাশের সেই বিখ্যাত আক্ষেপ দিয়েই সিনেমাটি শেষ হতে পারত। ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ির এক কোণায় দাঁড়িয়ে ভূমেন্দ্র গুহকে লাবণ্য দাশ বলেছিলেন:
“তোমার দাদা তো বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়ে গেলেন, কিন্তু আমার আর ছেলেমেয়েদের জন্য কী রেখে গেলেন বলো?”
কিন্তু নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল ‘বনলতা সেন’ সিনেমার মাধ্যমে কবির জীবনীকার হতে চাননি; তিনি চেয়েছেন ‘বনলতা সেন’ কবিতার ভেতরের চিরন্তন শান্তি ও নারীরূপের অন্বেষণ করতে। আর তাই তাকে পৌরাণিক কাল থেকে শুরু করে জীবনানন্দের সমসাময়িক কাল পর্যন্ত কবির পথের পিছু পিছু হাঁটতে হয়েছে। আর এভাবেই চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে ইতিহাসের পাতা থেকে একে একে উঠে এসেছে কিশোরী মুনিয়া, কবির কাকা অতুলানন্দ দাশের মেজো মেয়ে শোভনা (যাকে কবির জীবনের ‘আসল’ বনলতা বা প্রেমিকা ভাবা হয়) কিংবা লীলা নাগ-এর মতো চরিত্ররা। পর্দায় একে একে হাজিরা দিয়েছে ভূমেন্দ্র গুহ, বুদ্ধদেব বসু, সজনীকান্ত দাস, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রসঙ্গও।
নির্মাতা “বনলতা সেন”-কে কোনো রক্ত-মাংসের সাধারণ নারী হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তাকে দেখিয়েছেন হাজার বছরের মানব সভ্যতায় পুরুষের চিরন্তন শান্তি ও আশ্রয়ের এক অবিনশ্বর মেটাফোর হিসেবে। বিদিশা বা শ্রাবস্তী নগরীর মতো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত এই চরিত্রটি কখনো কিশোরী মুনিয়া, কখনো পিসতুতো বোন শোভনা, আবার কখনো যৌনপল্লির বিশাখার মতো বহুবিধ রূপে পর্দায় আবর্তিত হয়েছে। পরিচালকের বিশ্লেষণে বনলতা হলো এক পরাবাস্তব চেতনা বা 'অলীক আলো', যাকে কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা বৈষয়িক সীমায় বেঁধে রাখা যায় না। মূলত কবি জীবনানন্দ দাশের মনের গহীনে থাকা বিষণ্ণতা, একাকীত্ব এবং ক্লান্তি দূর করার যে চিরকালীন হাহাকার, তারই এক কাব্যিক ও মানসিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে বনলতা সেন-কে এই চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
৩
পড়ার টেবিল থেকে পর্দার ক্যানভাস।
সিনেমাটি দেখার সময় আমার মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছিল জীবনানন্দকে নিয়ে পড়া অজস্র বইয়ের পাতা। আকবর আলি খানের 'চাবিকাঠির খোঁজে', শাহাদুজ্জামান এর 'একজন কমলালেবু', আবু হাসান শাহরিয়ার সম্পাদিত 'জীবনানন্দ দাশ মূল্যায়ন ও পাঠোদ্ধার', হরিশংকর জলদাসের 'জীবনানন্দ ও তাঁর কাল', ক্লিন্টন বি সিলি’র 'অনন্য জীবনানন্দ', খোদ কবির উপন্যাস 'মাল্যবান' কিংবা লাবণ্য দাশের লেখা 'মানুষ জীবনানন্দ'—বইগুলোর বিভিন্ন পৃষ্ঠার লাইন যেন সেলুলয়েডের ফ্রেমে প্রাণ পাচ্ছিল। এছাড়াও অবশ্যই শ্লোকের মতো ভেসে উঠছিল ‘বনলতা সেন’ কবিতার লাইনগুলো।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিচালক পুরো সিনেমায় একটি সূক্ষ্ম ‘মেলানকলিক’ বা বিষাদময় আবহ জিইয়ে রাখতে দারুণভাবে সফল হয়েছেন।
৪
অভিনয় ও চরিত্রায়ন: যেখানে কাস্টিং-ই শক্তি।
এই সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল এর নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত কাস্টিং। প্রধান চরিত্রগুলোর অভিনয় এত জীবন্ত ছিল যে মনে হচ্ছিল ইতিহাসের পাতা থেকে তারা সোজা পর্দায় হেঁটে এসেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের কথা না বললেই নয়:
খায়রুল বাশার (জীবনানন্দ দাশ): পর্দায় তার উপস্থিতির সুযোগ কিছুটা কম থাকলেও, তিনি দুর্দান্তভাবে কবির বিষণ্ণতা ও মগ্নতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমি বরাবরই তার অভিনয় ও আবৃত্তির ভক্ত, এখানেও তিনি হতাশ করেননি।
সোহেল মণ্ডল (মহিন): বর্তমান সময়ের ঘোরগ্রস্ত তরুণের চরিত্রে তিনি দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তবে তার অতবার বক্সার শর্টস খোলা, পরা এবং পরে ঘুরে বেড়ার দৃশ্যগুলো কিছুটা আরোপিত বা বিজ্ঞাপন চিত্রের মতো লেগেছে; বিশেষ করে তার উদোম খোলা শরীর যেহেতু দেখানোর মতো আহামরি গোছের কিছু ছিল না।
অন্যান্য চরিত্র: লাবণ্য দাশের চরিত্রে মাইমুনা মম, শোভনা’র চরিত্রে রূপন্তী আকিদ এবং লীলা নাগের চরিত্রে নাজিবা বাশারের পরিমিত অভিনয় ভালো লেগেছে। আর ‘বনলতা সেন’ চরিত্রে মাসুমা রহমান নাবিলার পরিচ্ছন্ন ও মায়াবী উপস্থিতি ছিল এককথায় চমৎকার।
৫
কারিগরি নান্দনিকতা ও কিছু খটকা।
সিনেমার বিভিন্ন লোকেশন নির্বাচন, সেট ডিজাইন, পিরিয়ড কস্টিউম এবং সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অসাধারণ ও অত্যন্ত গোছানো। বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গীত পরিচালনা ও আবহ আবহ তৈরি করতে দারুণ সাহায্য করেছে। বিশেষ করে সিনেমার একমাত্র গান—"এখানে কেউ নেই"—এর লিরিক ও সুর দর্শককে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়।
তবে নির্মাতার ভাষ্য অনুযায়ী চিত্রনাট্য ১২ বার সংশোধন করা হলেও কিছু জায়গায় খটকা রয়ে গেছে। যেমন—শিমুল গাছের তলায় বসে মহিন কীভাবে হাত বাড়িয়ে ‘আপেল’ পেল, তা বোধগম্য হয়নি। এছাড়া সিনেমার অতিরিক্ত মেটাফোরের ব্যবহার সাধারণ দর্শকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারে। একটি দৃশ্যে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে নদীর পাড়ে হরিণ দেখানো হয়েছে; ন্যাচারাল দৃশ্যের সাথে এই এআই/ভিএফএক্স যুক্ত করার সময় দুটি ক্লিপের কালার গ্রেডিংয়ের কোনো মিল ছিল না, যা চোখে লেগেছে। ঈদে মুক্তি দেয়ার জন্য সম্পাদনায় তাড়াহুড়ো ছিল কি?
৬
বিরতির পরপরই হল থেকে কিছু দর্শককে উঠে চলে যেতে দেখেছি। তবে এই চলে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। জীবনানন্দ দাশের জীবন, জটিল মনস্তত্ত্ব এবং তার সাহিত্য সম্পর্কে যাদের পূর্বধারণা বা ভালো লাগা নেই, তাদের কাছে এই সিনেমাটি একটি বড় ধাঁধার মতো মনে হতে পারে। তবে যারা সাহিত্য ভালোবাসেন এবং সিনেমার ভিন্নধর্মী নান্দনিক ভাষা বুঝতে চান, তাদের জন্য এটি একটি অবশ্য শিক্ষণীয় ও উপভোগ্য চলচ্চিত্র। সব মিলিয়ে "বনলতা সেন" আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে একটি সাহসী ও চমৎকার প্রয়াস।
ব্যক্তিগত রেটিং: ৪ / ৫
-----------------------------
সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ জুন ২০২৬
লেন্সের চোখে: ঈশা দাস্তগীর