
১
আফ্রিকান-আমেরিকান স্লেভ ট্রেড বা দাস ব্যবসার নির্মম ইতিহাসের কথা বলতে গেলে আমাকে ফিরে যেতে হয় আমার শৈশবে। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) অ্যালেকজান্ডার মারে পামার হ্যালি (Alexander Murray Palmer Haley), বা অ্যালেক্স হ্যালির বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘রুটস’ (Roots) নামে একটা সাদাকালো ড্রামা সিরিজ দেখানো হতো। কুন্তা-কিন্তের সেই হৃদয়বিদারক লড়াই শৈশবের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তবে স্লেভ ট্রেডের সেই প্রায় ভুলে যাওয়া বীভৎস ইতিহাস যে আমার পরবর্তী কর্মজীবন বা ভ্রমণ পিপাসু মনের সাথে এভাবে জড়িয়ে যাবে, তা ভাবিনি। ২০০১ সালে সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে যোগ দেওয়ার পর সেই ইতিহাস আমার সামনে এসে দাঁড়ায় একদম বাস্তব রূপে।
২
টাগরিন ক্যাম্প ও ট্রাইশার্ক বোটের দিনগুলো।
সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে আমি তখন বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৪ এর অধীনে ‘বি রাইফেল কোম্পানি’র কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত। আমার কোম্পানির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় দুটি সিওবি (Company Operating Base) ছিল—যার একটি ‘ইয়ংরো’ (Yongro) এবং অন্যটি ‘টাগরিন’ (Tagrin) নামে জায়গায়।
টাগরিন ক্যাম্পের ঠিক পাশেই ছিল ফেরিঘাট। সেখানে বাধা থাকত আমার কোম্পানির ৩টি হাই-স্পিড ইউটিলিটি ক্রাফট, যা সামরিক পরিভাষায় ‘ট্রাইশার্ক বোট’ (Tri-Shark Boat) নামে পরিচিত। বোটগুলোর হাল (Hull) ডিজাইনের বিশেষত্ব এবং ক্ষিপ্র গতির কারণে হাঙরের সাথে তুলনা করে এর নামকরণ করা হয়েছিল "শার্ক"। এই বোটগুলো থাকার মূল কারণ ছিল নদীপথে টহল বা রিভারাইন পেট্রোলিং (Riverine Patrol)। টাগরিন থেকে পেপেল আইল্যান্ড, বান্স আইল্যান্ড এবং তাসো আইল্যান্ড সহ বিস্তীর্ণ জলসীমায় আমাদের নিয়মিত টহল দিতে হতো। এছাড়া বিভিন্ন সময় উচ্চপদস্থ সামরিক বা ইউএন-এর বেসামরিক কর্মকর্তা এলে তাদের বান্স আইল্যান্ড ভিজিট করানোর দায়িত্বও আমাদের ওপর পড়ত। কোম্পানি কমান্ডার হওয়ার কারণে আমার প্রায় প্রতিটি ছুটির দিনই কেটে যেত এই প্রটোকল ডিউটিতে। আর এই ডিউটির সূত্র ধরেই আমি পরিচিত হই ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাথে।
৩
বান্স আইল্যান্ড: ‘উইন্ডওয়ার্ড কোস্ট’-এর কুখ্যাত দাস দুর্গ।
সিয়েরা লিওন নদী অববাহিকায় অবস্থিত এই বান্স আইল্যান্ড (Bunce Island) ছিল মূলত পশ্চিম আফ্রিকার দাস ব্যবসার অন্যতম প্রধান ও কুখ্যাত কেন্দ্র। যদিও ‘রুটস’ উপন্যাসের মূল চরিত্র কুন্তা-কিন্তেকে গাম্বিয়া নদী অববাহিকা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তবে বান্স আইল্যান্ড ছিল ঠিক একই ব্রিটিশ দাস বাণিজ্য নেটওয়ার্কের প্রধান চালিকাশক্তি—যা ইতিহাসে ‘উইন্ডওয়ার্ড কোস্ট’ (Windward Coast) নামে পরিচিত।
দ্বীপের প্রতিটি বালুকণার সাথে জড়িয়ে আছে আলেক্স হ্যালির ‘রুটস’ উপন্যাসের মতো মানবতার চরম অপমান গাথা। উপন্যাসে যেভাবে আফ্রিকানদের বন্দি করে জাহাজের অন্ধকার খোলে গাদাগাদি ও শিকলবন্দি অবস্থায় আটলান্টিক মহাসাগর পার করানোর বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার জীবন্ত ও সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই বান্স আইল্যান্ড। গাম্বিয়া থেকে সিয়েরা লিওন পর্যন্ত বিস্তৃত এই উপকূল থেকেই ‘লর্ড লিগোনিয়ার’ (Lord Ligonier)-এর মতো বিশালাকার দাসবাহী জাহাজগুলো হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ বন্দিকে বোঝাই করে আমেরিকার মেরিল্যান্ড, সাউথ ক্যারোলিনা ও জর্জিয়ার রাইস প্ল্যান্টেশনে নিয়ে যেত।
৪
মেন্দে উপজাতি এবং আমেরিকার রাইস প্ল্যান্টেশন।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও নির্মম পরিহাস ছিল দাস নির্বাচনের প্রক্রিয়া। বান্স এবং পেপেল আইল্যান্ডের আশেপাশের স্থানীয় আফ্রিকানরা (বিশেষ করে মেন্দে উপজাতি) চমৎকার ধান চাষ জানত। আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনা ও জর্জিয়ার শ্বেতাঙ্গ রাইস প্ল্যান্টেশন মালিকদের কাছে এই অঞ্চলের দাসদের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি, কারণ তারা আমেরিকায় গিয়ে ধানের খামার গড়ে তোলার প্রযুক্তি ও কৌশল জানত। ‘রুটস’ উপন্যাসে কুন্তা-কিন্তেদের আমরা আমেরিকার যে বিশাল চাল বা ধানের খামারে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে দেখি, তার মূল চালিকাশক্তির বড় অংশ সরবরাহ করা হতো সিয়েরা লিওনের এই দ্বীপগুলো থেকেই। পেপেল আইল্যান্ডের বন্দিশিবিরগুলো ছিল হাজার হাজার ‘কুন্তা-কিনতে’র কান্নার নীরব সাক্ষী, যেখানে শিকল পরা অবস্থায় দিনের পর দিন তারা অপেক্ষা করত জাহাজের অন্ধকার খোলে ওঠার জন্য।
৫
কিং জিমি মার্কেট: দাস বিক্রির আদি ঘাট।
ফ্রিটাউন শহরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দাস ব্যবসার আরেকটি লোমহর্ষক কেন্দ্র। সিয়েরা লিওনের রাজধানী ফ্রিটাউনের বিখ্যাত ‘কটন ট্রি’ এলাকার ঠিক ৩০০-৪০০ মিটার দূরে, সিয়েরা লিওন নদীর তীরে অবস্থিত "কিং জিমি মার্কেট" (King Jimmy Market) । এই এলাকাটিই ছিল মূলত দাসদের মূল কেনাবেচা এবং জাহাজে তোলার ঘাট, যা ইতিহাসে ‘স্লেভ স্টেপস’ (Slave Steps) নামে পরিচিত।
যুদ্ধ, অনাহার বা অপহরণের মাধ্যমে বন্দি করা আফ্রিকানদের প্রথমে এই ঘাটে এনে হাত-পা মেপে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হতো। এরপর এখান থেকে ছোট নৌকায় করে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো পেপেল ও বান্স আইল্যান্ডের সুরক্ষিত আন্ডারগ্রাউন্ড বন্দিশালায়। পুরো ফ্রিটাউন শহরটিই তখন কাজ করত দাস ব্যবসার একটি বিশাল ট্রানজিট জোন হিসেবে।
৬
কটন ট্রি: শিকল থেকে মুক্তির অবিনশ্বর স্মারক।
সব নির্মমতার শেষে ফ্রিটাউনের বুকেই জড়িয়ে আছে স্বাধীনতার এক পরম ইতিহাস। কটন ট্রি (Cotton Tree) এলাকাটি আজো সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ইতিহাসের সুন্দরতম পরিহাস এটাই যে, যে সিয়েরা লিওন একসময় লাখ লাখ মানুষের শিকলবন্দি হওয়ার সাক্ষী ছিল, সেই দেশেরই ‘কটন ট্রি’ হয়ে উঠেছিল আফ্রিকা মহাদেশে দাসপ্রথার বিলুপ্তি এবং মুক্ত মানুষের এক অবিনশ্বর স্মারক।
১৭৯২ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যে কৃষ্ণাঙ্গ দাসরা ব্রিটিশদের পক্ষে লড়ে মুক্তি পেয়েছিল (ইতিহাসে যারা Black Loyalists নামে পরিচিত), তাদের নোভা স্কোশিয়া থেকে জাহাজে করে সিয়েরা লিওনে পুনর্বাসিত করা হয়। তারা যখন এই উপকূলে এসে পৌঁছায়, তখন তারা এই বিশাল কটন ট্রির নিচে সমবেত হয়ে একটি ধন্যবাদ জ্ঞাপন সভার আয়োজন করে এবং গান গেয়ে তাদের স্বাধীনতার আনন্দ প্রকাশ করে। এই মুক্ত দাসদের (Freed Slaves) আগমনের কারণেই পরবর্তীতে এই শহরটির নাম রাখা হয়েছিল 'ফ্রি টাউন' (Freetown) বা মুক্ত শহর।
৭
২০০১ সালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সেই দিনগুলোতে ফ্রিটাউনের এই ঐতিহাসিক কটন ট্রি কিংবা বান্স আইল্যান্ডের ধ্বংসাবশেষের মাঝে দাঁড়িয়ে ইতিহাসকে স্পর্শ করা নিশ্চিতভাবেই আমার জীবনের এক অনন্য ও গভীর অভিজ্ঞতা ছিল।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ জুন ২০২৬