
৮
পূর্ব আফ্রিকার দেশ, তানজানিয়ার বাগামায়োর উন্মুক্ত বাজারে যে দাসদের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চাবুকের আঘাতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যেত, তাদের এই নরকযন্ত্রণা শুরু হতো আসলে আরও হাজার মাইল দূরে, আফ্রিকার গহীন অববাহিকায়। ১৯ শতকে ওমানি আরব এবং সোয়াহিলি বণিকরা (যাদের মধ্যে ‘টিপ্পু টিপ’ বা ‘আহমদ বিন মুহাম্মদ’ ছিল অন্যতম কুখ্যাত) সুসংগঠিত ক্যারাভান বা সশস্ত্র দল নিয়ে হানা দিত আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে। বর্তমান কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, উগান্ডা, মালাউই, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং জাম্বিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের শান্ত আদিবাসী গ্রামগুলো ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। মধ্যরাতে হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ আর আগুনের শিখায় কেঁপে উঠত গ্রামগুলো। আরব বণিকরা স্থানীয় উপজাতীয় প্রধানদের একাংশের সাথে অস্ত্র ও কাপড়ের বিনিময়ে চুক্তি করত, যাতে তারা প্রতিদ্বন্দী গোত্রের মানুষদের বন্দি করে দেয়।
সুস্থ-সবল তরুণ, নারী ও শিশুদের বেছে বেছে লোহার শিকলে বেঁধে ফেলা হতো। এরপর শুরু হতো ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও অমানবিক ‘ডেথ মার্চ’। কঙ্গোর জঙ্গল কিংবা মালাউই ও ট্যাঙ্গানিকা হ্রদের তীর থেকে ভারী হাতির দাঁতের বোঝা দাসদের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হতো। পায়ে হেঁটে উপকূলের দিকে আসার এই যাত্রাপথ ছিল ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি। চাবুকের অবিরাম আঘাত, তীব্র খাদ্য ও পানির অভাব এবং কলেরায় আক্রান্ত হয়ে অর্ধেকেরও বেশি বন্দি পথেই মারা যেত। যারা দুর্বল হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত, ক্যারাভান চালকরা অন্যদের মনে ভয় ধরাতে তাদের সেখানেই বর্শা দিয়ে গেঁথে ফেলত কিংবা বন্য পশুর খাদ্য হিসেবে ফেলে রেখে যেত। এই দীর্ঘ রক্তঝরা পথ পাড়ি দিয়ে বেঁচে থাকা কঙ্কালসার মানুষগুলোর শেষ গন্তব্য ছিল তানজানিয়ার উপকূলীয় ট্রানজিট পয়েন্ট—বাগামায়ো। এই পর্বে বাগামায়ো’র স্লেভ ট্রেড নিয়ে লিখতে যাচ্ছি।
৯
২০১১ সালের ৯ মে।
সোনালী রোদ এসে পড়েছে ভারত মহাসাগরের বুকে। জাঞ্জিবারের ঐতিহাসিক ‘স্টোন টাউন’ ফেরিঘাটে যখন পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা লোকজনের কোলাহলে বেশ চঞ্চল। আমার গন্তব্য—মানব ইতিহাসের অন্যতম এক বীভৎস ও ট্রাজিক স্মৃতি বিজড়িত স্থান, তানজানিয়ার উপকূলীয় শহর বাগামায়ো (Bagamoyo)। স্টোন টাউন থেকে মূল ভূখণ্ডের দার-এস-সালাম বন্দরে যাওয়ার জন্য সকাল সকাল ফেরিঘাট ধরলাম। ফাস্ট ফেরিগুলো বেশ ঝকঝকে, টিপটপ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন; এসি, ক্যাফেটেরিয়া এবং লাগেজ রাখার সুবিধা রয়েছে। পর্যটকদের জন্য এই জলপথ ভ্রমণ তাই যেমন আরামদায়ক, তেমনি রোমাঞ্চকর। ইকোনমি, বিজনেস এবং ভিআইপি, এই তিন ক্লাসের টিকেট পাওয়া যায়, আমি ভিআইপি ক্লাসের টিকেট কেটে আরামদায়ক সিটে বসে পড়লাম। ঘড়ির কাঁটা ধরে ফেরি ছাড়ল। ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি কেটে "কিলিমানজারো ফাস্ট ফেরিস" রাজহাঁসের মতো এগিয়ে চলল।
ডিসপ্লে-তে একটা ইংরেজি মুভি দেখতে দেখতে, প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের চমৎকার সমুদ্রযাত্রা শেষে এসে পৌঁছলাম দার-এস-সালাম বন্দরে। দার-এস-সালাম বা আরবি থেকে অনূদিত ‘শান্তির আবাস’, তানজানিয়ার বৃহত্তম শহর, প্রধান বন্দর এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। শহরটি বেশ জনবহুল হলেও এর সমুদ্র উপকূলীয় অংশটি বেশ সাজানো-গোছানো। অনেকগুলো ছবি তুললাম। জাঞ্জিবারে আমার গাইড ছিল নাযা নামে একটা ছেলে, সে দার-এস-সালামে আমার জন্য গাইড এবং ট্যুর প্ল্যান রেডি করে রেখেছিল। আর তাই গাইড ছেলেটি বন্দরের চেক-ইন কাউন্টারের কাছেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
১০
দার-এস-সালাম পোর্ট থেকে বাগামায়োর দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। সময়স্বল্পতার কারণে এবং একদিনের মধ্যেই জাঞ্জিবারে ফিরে আসার তাড়া থাকায়, রাউন্ড ট্রিপ-এর জন্য একটি ট্যাক্সিক্যাব ভাড়া করলাম ১০০ ইউএস ডলারে। ট্যাক্সি শহর ছেড়ে মসৃণ পিচ ঢালা পথ ধরে ছুটে চলল উত্তর দিকে। যতক্ষণে বাগামায়ো শহরে পৌঁছালাম, ততক্ষণে মনের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সোয়াহিলি ভাষার ‘বোয়াগা মোয়ো’ (Bwaga moyo) শব্দ থেকে এই শহরের নাম। যার আক্ষরিক অর্থ—“তোমার হৃদয়কে সমর্পণ করো” কিংবা “হৃদয় বিসর্জন দাও”। কঙ্গো বা মালাউই-এর জঙ্গল থেকে বেঁচে ফেরা বন্দিরা যখন এই উপকূলে এসে পৌঁছাত এবং চোখের সামনে আদিগন্ত মহাসাগরের নোনা জল দেখত, তখন তারা বুঝত—সব শেষ। নিজের চেনা আকাশ, চেনা মাটি বা পরিবারে ফিরে যাওয়ার আর কোনো আশাই অবশিষ্ট নেই। এখান থেকে তাদের জাহাজে করে চিরতরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ওমান, পারস্য উপসাগর বা জাঞ্জিবারের উন্মুক্ত বাজারে। তারা সেখানেই তাদের জীবনের শেষ আশাটুকু, তথা ‘হৃদয়’ বিসর্জন দিয়ে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করত।
১১
কাওলে ধ্বংসাবশেষ, সুলতানের প্রাসাদ ও বাওবাবের নীরবতা (Kaole Ruins)।
বাগামায়ো শহরে ঢোকার ঠিক আগে প্রথমে গেলাম কাওলে ধ্বংসাবশেষ দেখতে। এটি ১৩-১৫ শতকের একটি প্রাচীন সোয়াহিলি বসতি। এখানে ওমানি সুলতানদের আমলের এবং তারও আগের প্রাচীন পাথরের মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, ওমানি ধাঁচের কবরস্থান এবং সুলতান ও রাজকর্মচারীদের প্রাসাদের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। ভাঙা দেয়ালগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, দাস ব্যবসার চূড়ান্ত রূপ ধারণ করার বহু আগে থেকেই এই উপকূল আরব বণিকদের বাণিজ্যিক দখলে ছিল। এই ধ্বংসাবশেষের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু প্রাচীন, বিশালাকার বাওবাব গাছ (Baobab Trees)। আফ্রিকার প্রতীক এই দীর্ঘায়ু গাছগুলো যেন একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। কয়েক শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাওবাব গাছগুলোর ছায়াতলে একসময় শিকলবন্দি দাসদের বসিয়ে রাখা হতো। নির্বাক বাওবাব গাছগুলোর ডালপালার দিকে তাকিয়ে আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম। মনে হলো, এই গাছগুলো যদি কথা বলতে পারত, তবে মানুষের ওপর মানুষের করা অত্যাচারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী হতো ওরাই।
১২
ওল্ড পোর্ট (The Old Port)।
কাওলে প্রাসাদ ও বাওবাব গাছের নীরবতা পেরিয়ে আমি সোজা চলে গেলাম বাগামায়োর সেই ঐতিহাসিক প্রাচীন সমুদ্রবন্দরে। আজ যেখানে কেবল নীল জলরাশি আর স্থানীয়দের মাছ ধরার ছোট ছোট কাঠামোর নৌকা বা ঐতিহ্যবাহী 'ধো' (Dhow) অলসভাবে ভেসে আছে, ১৯ শতকে এখানেই রচিত হতো মানব সভ্যতার এক পরম ও নির্মম ট্রাজেডি। তৎকালীন কঙ্গো, উগান্ডা বা মালাউই-এর মতো আফ্রিকার প্রত্যন্ত জঙ্গল ও হ্রদ অঞ্চল থেকে চাবুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে যেসব হাজার হাজার আফ্রিকানদের পশুর মতো শিকার করে আনা হতো, তাদের এই পোর্টেই জল্লাদদের কড়া পাহারায় খোলা আকাশের নিচে অমানবিক অবস্থায় স্তূপ করে রাখা হতো। এটি ছিল মূল ভূখণ্ডের শেষ সীমানা, যেখান থেকে জঞ্জিবারের দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক নটিক্যাল মাইল। এরপর পালের নৌকার অন্ধকার তলায় গাদাগাদি করে, শিকলবন্দি অবস্থায় বাতাসহীন ও নোংরা পরিবেশে বোঝাই করা হতো এই হতভাগ্য মানুষদের। এখান থেকে রওনা হওয়া নৌকাগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য ছিল জঞ্জিবারের কুখ্যাত উন্মুক্ত দাস বাজার, যেখানে তাদের আত্মপরিচয় কেড়ে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হতো চিরদিনের জন্য। আজকের শান্ত এই সৈকতটি আসলে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বাধীনতা হরণ, কান্নার জল আর শেষ দীর্ঘশ্বাসের এক নীরব ও স্তব্ধ ঐতিহাসিক সাক্ষী।
১৩
দি ওল্ড ফোর্ট (The Old Fort)।
ওল্ড পোর্টের ঠিক কাছেই ইতিহাসের এক পাথুরে জল্লাদের মতো আজও দাঁড়িয়ে আছে ওল্ড ফোর্ট। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬০-এর দশকে আবদাল্লাহ সুলেমান আল-মারহেবি নামক এক কুখ্যাত আরব দাস ব্যবসায়ী নিজস্ব স্বার্থে এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ওমানি সুলতানের সৈন্যরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যাপক সংস্কার করে। ভারত মহাসাগরের জাহাজে তোলার ঠিক আগমুহূর্তে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা পরিশ্রান্ত দাসদের এই দুর্গের মাটির নিচের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ও বাতাসহীন প্রকোষ্ঠে পশুর মতো গাদাগাদি করে বন্দি করে রাখা হতো। জল ও খাবারের তীব্র সংকটে অনেক বন্দি এই দুর্গের ভেতরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত, আর বাকিরা লড়ত তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তের বাঁচার লড়াই। শতাব্দীর প্রাচীন এই দুর্গের ভেতরে যখন আমি পা রাখলাম, চারপাশের জমাটবদ্ধ নিস্তব্ধতা আর স্যাঁতসেঁতে হাওয়া যেন এক নিমেষে আমার গা শিউরে তুলল। দেয়ালগুলোর গায়ে হাত দিতেই মনে হলো, লোহার শিকলের ঘর্ষণ আর বন্দিদের আর্তনাদের সেই বীভৎস স্মৃতি পাথরগুলো আজও গ্রাস করে রেখেছে। শত বছর পার হয়ে গেলেও এই দুর্গের প্রতিটি কোণ যেন আজও সেইসব অসহায় মানুষদের কান্না, শেষ দীর্ঘশ্বাস আর বুকফাটা হাহাকারের এক জীবন্ত প্রতিধ্বনি।
১৪
ক্যারাভান সেরাই স্লেভ ট্রেড মিউজিয়াম (Caravan Serai Museum)।
আমার বাগামায়ো ভ্রমণের শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ছিল ‘ক্যারাভান সেরাই’। ১৯ শতকে নির্মিত এই দোতলা ভবনটি ছিল মূলত পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে কুখ্যাত দাস ব্যবসায়ী, ক্যারাভান চালক এবং ওমানি সুলতানদের তদারককারীদের থাকার প্রধান সরাইখানা। আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের গহীন জঙ্গল থেকে টিপ্পু টিপের মতো নিষ্ঠুর ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা যখন হাজার হাজার বন্দি মানুষ এবং টন টন হাতির দাঁতের বিশাল বহর নিয়ে উপকূলে আসত, তখন তারা এই ক্যারাভান সেরাইয়ের আঙিনায় তাঁবু খাটাত। এটি কেবল একটি সাধারণ সরাইখানা ছিল না, বরং এখান থেকেই দাস ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার অভ্যন্তরে পরবর্তী কোন কোন গ্রামে আক্রমণ চালানো হবে, কীভাবে নতুন দাস শিকার করা হবে এবং কোন রুট দিয়ে তাদের আনা হবে—তার চূড়ান্ত ও নৃশংস ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করত।
বর্তমানে তানজানিয়া সরকার এই ঐতিহাসিক সরাইখানাকে একটি বিশেষ জাদুঘরে রূপান্তর করেছে, যা অতীত ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। কাঠের তৈরি প্রাচীন সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত শীতলতা গ্রাস করল এবং বুকের ভেতরটা তীব্র এক বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল মানব সভ্যতার ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ও অন্ধকারতম এক অধ্যায়, যা বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে চারপাশের দেয়ালে যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে। জাদুঘরের প্রতিটি কক্ষ ও বারান্দা যেন আজও সেইসব অমানবিক আরব বণিকদের অট্টহাসি, চাবুকের শাঁই শাঁই আওয়াজ আর একই সাথে শত শত বছর আগে শিকলবন্দি নিরপরাধ আফ্রিকানদের দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
জাদুঘরের ভেতরে প্রদর্শনীর প্রতিটি উপাদান অত্যন্ত যত্ন ও গুরুত্বের সাথে সাজানো হয়েছে, যা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে স্তব্ধ করে দিতে বাধ্য। ভেতরের দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে ১৯ শতকের সেই ক্যারাভান রুটগুলোর মানচিত্র ও স্কেচ, যা অবলোকন করলে স্পষ্ট বোঝা যায় কীভাবে কঙ্গো বা মালাউই থেকে মানুষদের হাজার মাইল পথ পায়ে হেঁটে আসতে বাধ্য করা হতো। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য ছিল কাঁচের শোকেসগুলোর ভেতরে সাজানো দাসদের পায়ে ও গলায় পরানোর লোহার ভারী শিকল, হাতকড়া এবং ধারালো গলার রিং, যা বন্দিদের পালানোর সমস্ত পথ বন্ধ করে দিত। এর পাশাপাশি রয়েছে অবাধ্য বা পালাতে চাওয়া দাসদের চামড়া তুলে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত চাবুক এবং ক্যারাভান চালকদের আদিম অস্ত্রশস্ত্রের প্রদর্শনী, যা মানুষের ওপর মানুষের করা অকথ্য ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের এক অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১৫
মিউজিয়াম থেকে যখন বের হলাম, তখন বাগামায়োর আকাশে বিকেলের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। ভারত মহাসাগর থেকে বয়ে আসা বাতাসটাকে বড্ড ভারী মনে হচ্ছিল। ১৯ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশদের চাপে জঞ্জিবারের সুলতান দাস ব্যবসা বন্ধের চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে এই রুটের পতন ঘটে। সারাদিনের এই আবেগঘন আর স্তব্ধ করে দেওয়া জার্নি শেষে ট্যাক্সি নিয়ে দ্রুত ফিরে এলাম দার-এস-সালাম বন্দরে। বিকেলের ফিরতি ফেরিটি যখন স্টোন টাউনের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন সূর্য ডুবছে ভারত মহাসাগরের বুকে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আমি আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড থেকে আবার ফিরে যাচ্ছি সেই দ্বীপে—যেখানে বাগামায়ো থেকে পার হওয়া দাসদের চূড়ান্ত নিলাম হতো। এই ইতিহাস নিয়ে পরের পর্বে লিখব।
আজকের বাগামায়ো হয়তো একটি শান্ত, নিরিবিলি উপকূলীয় শহর। কিন্তু এর প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রাচীন বাওবাবের শিকড়ে আর জীর্ণ পাথরে লেপ্টে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতার ইতিহাস। ২০১১ সালের মে মাসের এই দিনটি আমার স্মৃতির পাতায় চিরকাল এক বীভৎস অথচ অবিকল্প শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে খোদাই করা থাকবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৪ জুন ২০২৬