
১
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা এক অভূতপূর্ব সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে ইরানের ওপর ব্লকেড আরোপের ঘোষণা এবং প্রতিটি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে নিরাপত্তা ব্যয় বাবদ ২০ শতাংশ হারে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত এই সংকটকে নতুন ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। তবে এই উত্তেজনার সমান্তরালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্ত্রাগারে তৈরি হয়েছে এক গভীর সংকট, যা পেন্টাগনের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন বাহিনীর প্রধান প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক অস্ত্রের নাটকীয় হ্রাস এখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিএসআইএসের মতো শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাংকগুলোর মতে, বর্তমান হারে এই সংঘাত ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার অব্যাহত থাকলে তা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন এবং উচ্চ মাত্রার সামরিক ঝুঁকি তৈরি করবে। মূলত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে বহু-আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিচালনার প্রথাগত সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তা টমাহক এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের এই তীব্র ঘাটতির কারণে এখন তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই অস্ত্রের সংকট চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধ মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যদি একই গতিতে চলতে থাকে, তবে তা বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের সামগ্রিক ভারসাম্যকে চিরতরে ভেঙে দিতে পারে।
২
পারস্য উপসাগরে সংঘাতের তীব্রতা এবং অস্ত্রাগারের বর্তমান চিত্র।
হরমুজ প্রণালির সংকটের শুরু থেকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের সামরিক বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করতে কয়েক দফায় শত শত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হেনেছে। কিন্তু এই আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে হাজার হাজার প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। থিংক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলন স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, বর্তমানে মার্কিন অস্ত্রের মজুত তাদের প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।
ক। থাড ও প্যাট্রিয়টের আশঙ্কাজনক হ্রাস।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘর্ষের প্রাথমিক ধাপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে মার্কিন বাহিনীকে তাদের সবচেয়ে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ মোতায়েন করতে হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করেছে। 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (সিএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুসারে, চলমান যুদ্ধের ধকলের কারণে মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে তাদের 'থাড' ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার অন্তত অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছে। একই সাথে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি 'প্যাট্রিয়ট' ব্যবস্থারও প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ মজুত-সংক্রান্ত হিসাব সম্পর্কে অবগত তিন কর্মকর্তা সিএসআইএসের এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এই আশঙ্কাজনক হ্রাস মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ এই দুটি ব্যবস্থার ওপরই মার্কিন ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভরশীল।
থাড ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের এই নাটকীয় ঘাটতি পেন্টাগনকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও এক চরম প্রতিরক্ষামূলক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রতিরক্ষামূলক এই ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎপাদন অত্যন্ত জটিল এবং ধীরগতির হওয়ায় এই শূন্যতা দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সিএসআইএসের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, পেন্টাগন বর্তমানে প্রতি মাসে মাত্র ২০টির মতো নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে, যা বর্তমান যুদ্ধের চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য কোনো নতুন থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পূর্বাভাস বা সময়সূচিই নেই। ফলে ইরানের সাথে এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যদি একই গতিতে চলতে থাকে, তবে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন যদি দ্রুত তাদের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল পুনর্নির্ধারণ করতে না পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে।
খ। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট।
টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের এই নজিরবিহীন ঘাটতি মার্কিন নৌবাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ দূরপাল্লার সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার অস্ত্র ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। সিএসআইএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগন তাদের মোট টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশই এই সংঘাতে ব্যবহার করে ফেলেছে। শান্তিকালীন ধীরগতির উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতি রাতারাতি পূরণ করা ওয়াশিংটনের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফলে, এই সংকটের কারণে পেন্টাগন এখন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের মতো বড় প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার রণকৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
৩
ধীরগতির উৎপাদন লাইন: সংকটের মূল কারণ।
অস্ত্রের এই ঘাটতি দ্রুত পূরণের কোনো সহজ পথ পেন্টাগনের সামনে খোলা নেই, কারণ আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। সিএসআইএসের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং মার্কিন মেরিন কোরের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান জানিয়েছেন যে, পেন্টাগনের প্রধান প্রধান ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎপাদন বা আবার মজুত করার গতি অত্যন্ত ধীর।
ক। মাসিক সরবরাহের অপর্যাপ্ততা।
চলতি অর্থবছর সরবরাহের সময়সূচি অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রতি মাসে নির্মাতাদের কাছ থেকে মাত্র ১৫টির মতো নতুন টমাহক এবং ২০টির মতো নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। যেখানে একটি বড় ধরনের বিমান বা নৌ হামলায় এক রাতেই এর চেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয়, সেখানে এই মাসিক সরবরাহ অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালে পেন্টাগনের কাছে কোনো নতুন থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পূর্বাভাস বা সময়সূচিই নেই।
খ। পূর্বাবস্থায় ফেরার দীর্ঘ সময়।
সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক অবস্থায় মার্কিন অস্ত্রের মজুতকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে কমপক্ষে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগবে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহবিষয়ক এক্সপার্ট জন ফেরারি একটি বড় কাঠামোগত ত্রুটি তুলে ধরে বলেছেন যে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণের জন্য মার্কিন কংগ্রেস কোনো জরুরি সম্পূরক ডলার বা বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করেনি। ফলে পুরো বিষয়টি শান্তিকালীন স্বাভাবিক ও ধীরগতির বার্ষিক আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে।
৪
বিশ্বব্যাপী কৌশলগত প্রভাব এবং মার্কিন সামরিক ঝুঁকি।
ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান হারে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার অব্যাহত থাকলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেই মার্কিন সক্ষমতা কমাবে না, বরং বৈশ্বিক মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল করে দেবে। বিশেষজ্ঞদের প্রধান আশঙ্কা হলো, অস্ত্রের এই সংকট চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধ মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ক। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন ঝুঁকি।
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, "গত পাঁচ দিনের মতো একই গতিতে যদি এই যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে তা মার্কিন অস্ত্রের মজুত এতটাই কমিয়ে দেবে, যা এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন এবং উচ্চ মাত্রার সামরিক ঝুঁকি তৈরি করবে"। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রণালি বা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলায় যে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র রিজার্ভ রাখা প্রয়োজন ছিল, তা এখন মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
খ। উত্তর কোরিয়া ফ্রন্টের দুর্বলতা।
বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যদি কখনো যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়, তবে পিয়ংইয়ংয়ের বিশাল আর্টিলারি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে মার্কিন সেনা এবং সিউলকে রক্ষা করতে বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পেন্টাগন যদি ইরানের বিরুদ্ধে উচ্চ হারে প্রধান ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ব্যবহার চালিয়ে যায়, তবে উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে না।
গ। রাশিয়া-ইউক্রেন ফ্রন্টে নতুন মেরুকরণ ও যৌথ উৎপাদনের প্রচেষ্টা
ইরান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র সংকট এখন ইউরোপীয় রণক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে, বিশেষ করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইউক্রেন ফ্রন্টে এর ধাক্কা লেগেছে সবচেয়ে বেশি। পেন্টাগন তাদের নিজস্ব অস্ত্রাগার সুরক্ষিত রাখতে এবং এশিয়াসহ অন্যান্য ফ্রন্টের ঝুঁকি কমাতে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো, সরাসরি মার্কিন মজুত থেকে অস্ত্র সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কিয়েভকে স্বনির্ভর করে তোলা, যাতে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও টমাহকের ঘাটতি ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করতে না পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে রাতারাতি উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন লাইন গড়ে তোলা অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ বিষয়। ফলে, আমেরিকার এই অভ্যন্তরীণ অস্ত্রের সংকট ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়ার আগ্রাসী অভিযানকে আরও ত্বরান্বিত করার সুযোগ করে দিতে পারে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
৫
পেন্টাগনের পাল্টা পদক্ষেপ ও ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট।
অস্ত্রাগারের এই বিপজ্জনক শূন্যতা টের পেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন কিছু জরুরি আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে এবং সরবরাহ চেইনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে গত জুনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প 'ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট' কার্যকর করেছেন। এর পাশাপাশি, উৎপাদন লাইনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রতিরক্ষা দপ্তর বড় বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন চুক্তি সম্পাদন করেছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং সরবরাহ চেইনের সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিরক্ষা দপ্তর মার্কিন উদ্ভাবনের সেরা প্রযুক্তিগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় মার্কিন প্রশাসনের এই তৎপরতা প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিশ্রুতিরই বহিঃপ্রকাশ।
প্রশাসনিক এই তৎপরতা সত্ত্বেও পেন্টাগনের এই কৌশলগত উদ্যোগ কতটা দ্রুত ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সিএসআইএসের বিশ্লেষক মার্ক কানসিয়ান সতর্ক করে বলেছেন যে, ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট কার্যকর করা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য 'সহায়ক' হলেও এর সামগ্রিক প্রভাব হবে অত্যন্ত 'সীমিত'। কারণ, আধুনিক ও অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা রাতারাতি বা তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এছাড়া, সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের খরচ মেটাতে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে আইনপ্রণেতাদের কাছে সম্পূরক তহবিলের অনুরোধ জানালেও কংগ্রেসে এই প্রস্তাব পাস হওয়া বেশ কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে, আর্থিক বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন প্রক্রিয়ার এই সীমাবদ্ধতা পেন্টাগনের পাল্টা পদক্ষেপের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে।
৬
হরমুজ প্রণালির এই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংকট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক কৌশলের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পরাশক্তি হিসেবে ওয়াশিংটনের যে বহু-আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা (Multi-theater warfare capability) রয়েছে, তা টমাহক এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের এই তীব্র ঘাটতির কারণে এখন বড় ধরনের বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের শান্তিকালীন ধীরগতির উৎপাদন ব্যবস্থা যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কতটা অনুপযোগী, তা পেন্টাগনের বর্তমান অস্ত্র সংকটের মাধ্যমেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে। হোয়াইট হাউস কংগ্রেসে সম্পূরক তহবিলের অনুরোধ জানালেও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে তা পাস হওয়া এখন বেশ কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে, অস্ত্রের এই সীমাবদ্ধতা ট্রাম্প প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে চরম সামরিক আগ্রাসন নীতি থেকে সরে এসে পুনরায় কূটনৈতিক পথে হাঁটতে বাধ্য করতে পারে।
ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির বিরুদ্ধে মার্কিন থাড ও প্যাট্রিয়টের এই ব্যয়বহুল লড়াই ওয়াশিংটনকে এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চোরাবালির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একেকটি পাম্প স্টেশন বা রাডার সাইট ধ্বংসের বিপরীতে লাখো ডলারের ক্ষেপণাস্ত্রের এই ক্ষয় বেইজিং এবং পিয়ংইয়ংয়ের মতো প্রতিপক্ষদের জন্য এক নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি হরমুজ প্রণালির তথাকথিত 'অভিভাবকত্ব' বজায় রাখতে গিয়ে তাদের বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে, নাকি অস্ত্রাগার সুরক্ষায় সংযমের পথ বেছে নেবে। অস্ত্রের উৎপাদন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দূর করতে না পারলে, এই যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৪ জুলাই ২০২৬