
১৬
আটলান্টিক আর ভারত মহাসাগরের নোনা জলে ধুয়ে যাওয়া স্লেভ ট্রেডের বীভৎস ইতিহাসের খোঁজে আমার এই ট্রেইলিং-এর সূচনা হয়েছিল আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে, ২০০১ সালে। সিয়েরা লিওনের কুখ্যাত বান্স আইল্যান্ডের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে যে ‘ব্ল্যাক ট্রেইল’-এর পথরেখা আমি ধরেছিলাম, ২০১১ সালের মে মাসে জাঞ্জিবারের স্টোন টাউনে এসে তার বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছিল। মাঝখানের দীর্ঘ এক দশকে আমি ঘুরেছি আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে—কঙ্গো, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, কেনিয়া আর তানজানিয়ার ধূলিধূসরিত পথ ধরে। এই দীর্ঘ পথচলার উদ্দেশ্য নিছক ট্রাভেলিং ছিল না, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় অপরাধের শিকার হওয়া মানুষদের আবেগ, তাদের অবরুদ্ধ ক্ষোভ আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসকে নিজের ভেতর অনুভব করার এক ব্যাকুল চেষ্টা ছিল। শৈশবে বিটিভি’র পর্দায় দেখা অ্যালেক্স হ্যালির ‘রুটস’ ড্রামা সিরিজে কুন্তা-কিন্তের সেই শিকল ভাঙার অমানুষিক লড়াই আমার মনে যে গভীর দাগ কেটেছিল, তা-ই যেন পরবর্তী জীবনে আমাকে টেনে নিয়ে গেছে এই ট্র্যাজেডির উৎপত্তিস্থলগুলোতে। এই দীর্ঘ অনুসন্ধানী যাত্রার শেষ অধ্যায় ছিল জাঞ্জিবারের স্টোন টাউন। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগরের ‘উইন্ডওয়ার্ড কোস্ট’ থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের সোয়াহিলি উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই দাস বাণিজ্যের রুটগুলোর সংযোগ নিয়ে লেখা আর্টিকেল এই পর্বেই শেষ করতে যাচ্ছি।
১৭
দুই মহাসাগরের সংযোগ: আটলান্টিক থেকে ভারত মহাসাগরের রক্তঝরা পথ।
২০০১ সালে সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে কোম্পানি'র কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমার এই দীর্ঘ 'ব্ল্যাক ট্রেইল' বা কৃষ্ণ-ইতিহাসের অনুসন্ধান শুরু হয়। টাগরিন ক্যাম্পের 'ট্রাইশার্ক বোট' নিয়ে নদীপথে টহলের সুবাদে বেশ কয়েকবার পা রেখেছি 'উইন্ডওয়ার্ড কোস্ট'-এর কুখ্যাত দাস দুর্গ—বান্স আইল্যান্ডে। এই সিরিজের প্রথম পর্বেই লিখেছিলাম, সেখানে ধান চাষে পারদর্শী স্থানীয় মেন্দে উপজাতির মানুষদের বন্দি করে পেপেল আইল্যান্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড নরককুণ্ডে আটকে রাখা হতো, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনা ও জর্জিয়ার রাইস প্ল্যান্টেশনে দাস হিসেবে পাঠানো। এরপর সেখান থেকে বন্দিদের নিয়ে আসা হতো ফ্রিটাউনের "কিং জিমি মার্কেটে", যা ইতিহাসে ‘স্লেভ স্টেপস’ নামে পরিচিত, যেখানে হাত-পা মেপে ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ক্রেতাদের কাছে তাদের চূড়ান্তভাবে বিক্রি করা হতো। এখান থেকেই বিশালাকার জাহাজে করে হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে আটলান্টিক মহাসাগর পার করে আমেরিকায় পাঠানো হতো, যারা পরবর্তীতে সেখানে গড়ে তোলে আফ্রিকান-আমেরিকান জেনারেশন। তবে এই চরম নির্মমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার এক অবিনশ্বর স্মারক হিসেবে আজো টিকে আছে ফ্রিটাউনের বিশালাকার ‘কটন ট্রি’, যেখানে ১৭৯২ সালে পুনর্বাসিত মুক্ত দাসরা (Black Loyalists) প্রথম মিলিত হয়ে গান গেয়ে নিজেদের স্বাধীনতার আনন্দ প্রকাশ করেছিল।
পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক রুটের এই ক্ষত বুকে জমা রাখার ঠিক দশ বছর পর, ২০১১ সালের মে মাসে আমি পা রাখি পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ায়, যেখানে দাস ব্যবসার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভারত মহাসাগর। এই রুটের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল উপকূলীয় শহর বাগামায়ো, যার সোয়াহিলি নামের আক্ষরিক অর্থ—“তোমার হৃদয় বিসর্জন দাও”—কারণ চোখের সামনে আদিগন্ত মহাসাগরের নোনা জল দেখে বন্দিরা বুঝত নিজ ভূমিতে ফেরার সব আশা শেষ। তবে তাদের এই নরকযন্ত্রণা শুরু হতো আরও হাজার মাইল দূরে কঙ্গো, উগান্ডা, রুয়ান্ডা বা বুরুন্ডির গহীন অববাহিকায়, যেখান থেকে ওমানি আরব ও টিপ্পু টিপের মতো সোয়াহিলি বণিকরা মানুষদের লোহার শিকলে বেঁধে ভারী হাতির দাঁতের বোঝা মাথায় চাপিয়ে ১,০০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ ও অমানবিক ‘ডেথ মার্চ’-এ বাধ্য করত। চাবুকের অবিরাম আঘাত, ক্ষুধা ও কলেরায় আক্রান্ত হয়ে অর্ধেকেরও বেশি বন্দি পথেই মারা যেত এবং বেঁচে থাকা কঙ্কালসার মানুষগুলোকে বাগামায়োর ওল্ড ফোর্টের স্যাঁতসেঁতে প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হতো। কাওলে ধ্বংসাবশেষের প্রাচীন বাওবাব গাছগুলো কিংবা ‘ক্যারাভান সেরাই মিউজিয়াম’-এর কাঁচের শোকেসে রাখা লোহার ভারী শিকল ও ধারালো গলার রিং মানুষের ওপর মানুষের করা অকথ্য নির্যাতনের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিউজিয়ামের র্যাকে/শোকেসে তুলে রাখা নিদর্শন ওল্ড পোর্টের ঐতিহ্যবাহী 'ধো' নৌকার অন্ধকার খোলে গাদাগাদি করে জাহাজে তোলার আগমুহূর্তে দাসদের চরম অবমাননাকর বন্দিত্বের কথা আজও মনে করিয়ে দেয়।
১৮
পেঙ্গা আইল্যান্ড: বাছাই প্রক্রিয়া ও কোয়ারেন্টাইনের নিষ্ঠুরতা।
২০১১ সালের ৯ মে, বাগামায়োর মিউজিয়াম ও ওল্ড পোর্ট দেখা শেষ করে যখন আমি বিকেলের ফিরতি ফেরি "কিলিমানজারো ফাস্ট ফেরিস"-এ করে আবার জাঞ্জিবারের স্টোন টাউনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, তখন সূর্য ডুবছিল ভারত মহাসাগরের বুকে। মনের ভেতর তখন কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছিল বাগামায়ো থেকে পার হওয়া দাসদের পরবর্তী গন্তব্য, সেই বিভীষিকাময় ট্রানজিট পয়েন্ট—পাঙ্গে বা পেঙ্গা আইল্যান্ডের কথা। বাগামায়োর ওল্ড পোর্ট থেকে পালের নৌকায় তোলা সেই পরিশ্রান্ত ও ক্ষত-বিক্ষত বন্দিদের সরাসরি স্টোন টাউনের মূল বাজারে তোলা হতো না; বরং মাঝপথে এই দ্বীপে এনে নামানো হতো এক চরম ও অমানবিক ‘কোয়ারেন্টাইন স্টেশন’ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। কঙ্গোর জঙ্গল থেকে হাজার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আসার পর এবং ধো নৌকার অন্ধকার তলায় গাদাগাদি করে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার কারণে এই বন্দিদের শারীরিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় হতো যে, ক্রেতাদের সামনে তোলার আগে তাদের এক পৈশাচিক ‘বাছাই প্রক্রিয়া’র মধ্য দিয়ে যেতে হতো। পেঙ্গা আইল্যান্ড মূলত ছিল দাস ব্যবসার বাণিজ্যিক মুনাফা নিশ্চিত করার এক নির্মম ফিল্টার, যেখানে পৌঁছানোর পর বন্দি মানুষদের ভাগ্য নির্ধারিত হতো সম্পূর্ণ অমানুষিক এবং যান্ত্রিক কিছু মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে। মানুষের মাংস আর শ্রমের আন্তর্জাতিক বাজারের নিখুঁত হিসাব-নিকাশ মেলাতে এই দ্বীপের বুকে যে ভয়ঙ্কর ও পৈশাচিক অধ্যায় রচিত হয়েছিল, তা ভারত মহাসাগরের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ক্ষত হিসেবেই আজো রয়ে গেছে।
এই দ্বীপে বন্দিদের নামানোর পর আরব ও সোয়াহিলি দাস ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর যে পৈশাচিক স্ক্রিনিং চালাত, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল অসুস্থ এবং বাজারমূল্যহীন মানুষদের আলাদা করা। দীর্ঘ ও অমানুষিক সমুদ্রযাত্রায় যারা জলশূন্যতা, কলেরা বা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হতো কিংবা চাবুকের আঘাতে স্থায়ীভাবে পঙ্গু ও বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ত, দাস ব্যবসায়ীদের হিসেবের খাতায় তারা ছিল নিছকই ‘অকেজো পণ্য’। এই দ্বীপে এনে সেইসব অসুস্থ, দুর্বল ও মুমূর্ষু মানুষদের কোনো রকম খাবার, পানি বা ন্যূনতম চিকিৎসা ছাড়াই খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখা হতো। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও শিউরে ওঠার মতো দিকটি ছিল, সংক্রামক ব্যাধি যেন অন্য সুস্থ দাসদের দেহে ছড়াতে না পারে এবং নৌকার ধারণক্ষমতা যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য অনেক জ্যান্ত মানুষকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সরাসরি সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হতো। হাঙর অধ্যুষিত এই সমুদ্রের নীল জলরাশি এক নিমেষে গ্রাস করে নিত সেইসব নিরপরাধ মানুষদের।
পেঙ্গা আইল্যান্ডের এই নরককুণ্ডে কেবল তারাই টিকে থাকত, যাদের জীবনশক্তি ছিল অলৌকিক রকমের তীব্র এবং যারা সব রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও কোনোমতে বেঁচে থাকতে পেরেছিল। এই বেঁচে যাওয়া শক্ত-সমর্থ বন্দিদের এরপর স্টোন টাউনের মূল বাজারে তোলার জন্য অত্যন্ত সুকৌশলে প্রস্তুত করা হতো, যাতে নিলামের সময় ক্রেতাদের কাছে তাদের চড়া দামে বিক্রি করা যায়। তাদের গায়ের জমে থাকা ময়লা ও রক্ত ধুয়ে ফেলার জন্য সমুদ্রের নোনা জলে জোরপূর্বক স্নান করানো হতো এবং চাবুকের ক্ষতের দাগগুলো লুকাতে সারা শরীরে মাখানো হতো নারকেল তেল, যাতে চামড়া চকচকে ও পেশীবহুল দেখায়। আজ যে পেঙ্গা আইল্যান্ডের শান্ত, রূপালী সৈকত আর চারপাশের স্ফটিকচ্ছল নীল জলরাশি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের রোমাঞ্চ আর অবকাশ যাপনের এক স্বর্গীয় স্বর্গভূমি, তা আসলে একসময় ছিল লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের স্বাধীনতা হরণ, নির্মম কোয়ারেন্টাইন আর সাগরের বুকে জ্যান্ত সমাধি হওয়ার এক জল্লাদখানা।
১৯
স্টোন টাউনের স্লেভ মার্কেট: পূর্ব আফ্রিকার দাস ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু।
২০১১ সালের মে মাসে আমি যখন জাঞ্জিবারের ঐতিহাসিক স্টোন টাউনে পা রাখি, তখন চারপাশের প্রাচীন সোয়াহিলি স্থাপত্য আর সরু গলিপথগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল। ১৮ ও ১৯ শতকে ওমানি সুলতানদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষিত এই স্টোন টাউনই হয়ে উঠেছিল সমগ্র পূর্ব আফ্রিকার বৃহত্তম ও সবচেয়ে কুখ্যাত প্রকাশ্য দাস ব্যবসার মূল কেন্দ্র। আজ যেখানে পর্যটকদের মুখরিত কোলাহল, ঠিক সেই চত্বরেই একসময় আফ্রিকার গহীন জঙ্গল থেকে ধরে আনা লাখ লাখ স্বাধীন মানুষকে পশুর মতো লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। আমি যখন আধুনিক স্টোন টাউনের সেই শান্ত চত্বরে গিয়ে দাঁড়ালাম, আমার পায়ের নিচের মাটি যেন এক নিমেষে এক শতাব্দী আগের রক্ত, কান্না আর প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
ক। ভূগর্ভস্থ কুঠুরি (Slave Cells)।
আজ যেখানে স্টোন টাউনের ঐতিহাসিক অ্যাংলিকান ক্যাথেড্রাল (Anglican Cathedral) শান্ত ও পবিত্র পরিবেশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার নিচেই একসময় ছিল দাসদের আটকে রাখার আন্ডারগ্রাউন্ড কুঠুরি বা স্লেভ সেল। আমি যখন মাথা নিচু করে সেই স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার সেলের ভেতরে ঢুকলাম, তখন তীব্র এক দমবন্ধ করা অনুভূতি আমাকে গ্রাস করল। ছোট ছোট আন্ডারগ্রাউন্ড ঘরগুলোতে একসাথে ৫০ থেকে ৭৫ জন মানুষকে গলার শিকল দিয়ে একে অপরের সাথে বেঁধে রাখা হতো। সেখানে আলো-বাতাস চলাচলের কোনো জানালা ছিল না, ছিল না কোনো টয়লেটের ব্যবস্থা। সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা ছিল, সমুদ্রের জোয়ারের সময় নোনা পানি এই সেলের মেঝের ওপর চলে আসত। বন্দি মানুষেরা নিজেদের মলমূত্র, রক্ত আর নোনা পানির সেই নরককুণ্ডের মধ্যেই হাঁটু গেঁথে দিনের পর দিন বসে থাকত। স্টোন টাউনের মূল বাজারে বিক্রির জন্য তোলার আগেই বহু বন্দি এই দমবন্ধ করা কুঠুরির ভেতরেই মারা যেত।
খ। চাবুক মারার গাছ (The Whipping Tree)।
এই স্লেভ মার্কেট চত্বরের আরেকটি শিউরে ওঠার মতো জায়গা ছিল দাসদের সহনশীলতা পরীক্ষার স্থান, যা ইতিহাসে ‘Whipping Tree’ বা চাবুক মারার গাছ নামে পরিচিত। আজ চার্চের মূল অল্টারের ঠিক নিচে যেখানে এই চাবুক মারার জায়গাটি ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই আমার গা শিউরে উঠেছিল। বাজারে বিক্রির ঠিক আগমুহূর্তে বন্দিদের এই গাছের সাথে শক্ত করে বাঁধা হতো এবং ক্রেতাদের সামনে তাদের পিঠে নির্মমভাবে চাবুক মারা হতো। এই নিষ্ঠুরতার উদ্দেশ্য ছিল দাসদের শক্তি পরীক্ষা করা। চাবুকের চরম আঘাতেও যে দাস কাঁদত না বা যন্ত্রণায় চিৎকার করত না, বাজারে তার দাম উঠত সবচেয়ে বেশি। কারণ ক্রেতারা মনে করত সে অত্যন্ত "শক্তিশালী, সহনশীল এবং বাধ্য"। আর যারা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠত, তাদের দুর্বল ও অকেজো ভেবে কম দামে বিক্রি করা হতো অথবা পরিত্যক্ত হিসেবে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো।
গ। বিক্রির প্রক্রিয়া ও কুখ্যাত টিপ্পু টিপ।
প্রতিদিন বিকেলে স্টোন টাউনের উন্মুক্ত চত্বরে বসত মানুষের প্রকাশ্য নিলাম। এই ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রক ছিল ওমানি আরব এবং কিছু স্থানীয় সোয়াহিলি ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত, প্রভাবশালী ও ধনকুবের ব্যবসায়ী ছিল টিপ্পু টিপ (Tippu Tip), যার আসল নাম হামাদ বিন মুহাম্মদ আল-মুজরিবী। সে আফ্রিকার গহীন অভ্যন্তর থেকে হাজার হাজার মানুষকে পশুর মতো শিকার করে এনে এই বাজারে তুলত। এই নিলামে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসত ওমান, পারস্য, ভারতের ব্যবসায়ী এবং ইউরোপীয় প্ল্যান্টেশন মালিকরা। পশুর হাটের মতো করে দাসদের দাঁত, পেশী, চোখ পরীক্ষা করা হতো এবং চলত প্রকাশ্য দামাদামি।
২০
গন্তব্য ও উদ্দেশ্য: যেখানে হারিয়ে যেত লাখো প্রাণ।
পশ্চিম আফ্রিকার দাসদের গন্তব্য যেমন ছিল আটলান্টিক মহাসাগর পার হয়ে আমেরিকা বা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, পূর্ব আফ্রিকার দাসদের গতিপথ ছিল তারচেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও ভিন্নধর্মী। স্টোন টাউনের উন্মুক্ত বাজার থেকে ওমানি আরব বণিক এবং বিদেশী ক্রেতাদের মাধ্যমে কিনে নেওয়া হতভাগ্য বন্দিদের মূলত তিনটি বড় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতো। এই বাজার থেকে চালিত দাস বাণিজ্য রুটের বিস্তার ছিল লবঙ্গ বাগান থেকে শুরু করে সুদূর পারস্য উপসাগর এবং ভারতবর্ষের রাজদরবার পর্যন্ত। এখান থেকে সমুদ্রপথে রওনা হওয়া ধো নৌকাগুলো চিরতরে কেড়ে নিত লাখ লাখ আফ্রিকান মানুষের নাম, পরিচয় ও তাদের জন্মভূমির স্বাধীনতা।
ক। জাঞ্জিবারের লবঙ্গ বাগান (Clove Plantations)।
১৯ শতকের শুরুতে ওমানি সুলতান সাঈদ বিন সুলতান তার রাজধানী ওমানে স্থানান্তর না করে জাঞ্জিবারে নিয়ে আসেন এবং দ্বীপজুড়ে বিশাল লবঙ্গ চাষের (Clove Plantations) সূচনা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই জাঞ্জিবার বিশ্বের বৃহত্তম লবঙ্গ উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক অঞ্চলে পরিণত হলে এই খামারগুলোতে হাড়ভাঙা খাটুনির জন্য প্রয়োজন হয় লাখো শ্রমিকের। স্টোন টাউনের বাজার থেকে নামমাত্র মূল্যে কেনা দাসদের এই বাগানগুলোতে চাবুকের মুখে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রমে বাধ্য করা হতো। ক্রান্তীয় অঞ্চলের তীব্র গরম, অপুষ্টি এবং ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এই সুগন্ধি লবঙ্গ বাগানগুলোর মাটিতেই প্রতি বছর অকালে বিলীন হয়ে যেত হাজার হাজার বন্দি মানুষের প্রাণ।
খ। মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগর।
লবঙ্গ বাগানের পাশাপাশি পূর্ব আফ্রিকান দাসদের একটি বিরাট অংশকে জাহাজে বোঝাই করে ওমান, সৌদি আরব এবং ইরানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নিয়ে যাওয়া হতো। পারস্য উপসাগরের এই রুটে দাসদের প্রধানত ব্যবহার করা হতো গৃহস্থালির কঠিন কাজ, মরুভূমির রুক্ষ ক্যারাভান পরিচালনা এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মুক্তা শিকারে (Pearl Diving)। সমুদ্রের তলদেশ থেকে মুক্তা তোলার জন্য দাসদের পায়ে ভারী পাথর বেঁধে কোনো অক্সিজেন ছাড়াই গভীর পানিতে নামিয়ে দেওয়া হতো, যেখানে হাঙরের আক্রমণ ও ফুসফুস ফেটে বহু দাস মারা যেত। এ ছাড়া ওমানি সুলতান ও শেখরা তাঁদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে এই অনুগত দাসদের নিয়ে নিজস্ব ক্যাভলরি বা ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন।
গ। ভারতবর্ষ ও ‘সিদ্দি’ জনগোষ্ঠী।
পূর্ব আফ্রিকার এই দাস বাণিজ্যের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা গন্তব্য ছিল সুদূর ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত রাজদরবার। ভারতের গুজরাট, কর্ণাটক এবং বিশেষ করে হায়দ্রাবাদের নিজামের দরবারে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত দেহরক্ষী, অশ্বারোহী সৈন্য এবং প্রাসাদ প্রহরী হিসেবে এই কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের ব্যাপক চাহিদা ও চড়া মূল্য ছিল। তৎকালীন ভারতবর্ষে এরা 'হাবশি' নামে পরিচিত হলেও ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজকের ভারতের এই অঞ্চলে বসবাসকারী অনন্য 'সিদ্দি' (Siddi) জনগোষ্ঠী মূলত এই পূর্ব আফ্রিকান দাসদেরই সরাসরি উত্তরসূরি। নিজ ভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে এলেও এরা শত শত বছর ধরে নিজেদের পূর্বপুরুষদের আফ্রিকান লোকঐতিহ্য, ড্রামের তাল এবং ঐতিহ্যবাহী 'ধামাল' নৃত্য আজও টিকিয়ে রেখেছে।
২১
আটলান্টিক বনাম ভারত মহাসাগরীয় দাস ব্যবসা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
২০০১ সালে সিয়েরা লিওনের বান্স আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আমি যে দাস ব্যবসার রূপ দেখেছিলাম, ২০১১ সালে জাঞ্জিবারের স্টোন টাউনে এসে তার আরেকটি ভিন্ন রূপ দেখলাম। পশ্চিম ও পূর্ব আফ্রিকার এই দুই দাস বাণিজ্যের রুটের মধ্যে যেমন ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল, তেমনি ছিল তাদের কাজের ধরন, বাজার ব্যবস্থা এবং গন্তব্যের মৌলিক পার্থক্য। পশ্চিম আফ্রিকার দাস ব্যবসা (যা মূলত ট্রান্স-আটলান্টিক রুটে আবর্তিত হতো) ছিল সম্পূর্ণভাবে প্রাতিষ্ঠানিক এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদের খামার-ভিত্তিক কৃষির ওপর নির্ভরশীল, যার প্রধান ট্রানজিট কেন্দ্র ছিল বান্স ও পেপেল আইল্যান্ড এবং নিয়ন্ত্রক ছিল ব্রিটিশ, ফরাসি বা আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ বণিকরা। সেখানে মেন্দে উপজাতির মতো ধান চাষে দক্ষ বন্দিদের আমেরিকার মেরিল্যান্ড বা সাউথ ক্যারোলিনার রাইস প্ল্যান্টেশনে পাঠানো হতো এবং তাদের সম্পূর্ণ বংশগতভাবে দাস বানিয়ে রাখা হতো, যার ফলে আজ আমেরিকায় এক বিশাল আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ভারত মহাসাগরীয় রুটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পূর্ব আফ্রিকার দাস ব্যবসা ওমানি সুলতান ও সোয়াহিলি বণিকদের দ্বারা পরিচালিত হতো, যার প্রধান কেন্দ্র ছিল বাগামায়ো ও জাঞ্জিবারের স্টোন টাউন। এই রুটের পরিধি শুধু কৃষি খামারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর গন্তব্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতবর্ষ, যেখানে বন্দিদের লবঙ্গ বাগান ছাড়াও গৃহস্থালির কঠিন কাজ, ঝুঁকিপূর্ণ মুক্তা শিকার এবং রাজদরবারের সৈন্য ও দেহরক্ষী হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এর সাংস্কৃতিক পরিণতিও ছিল ভিন্ন—যার অন্যতম উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্যের মিশ্র সংস্কৃতি এবং আমাদের উপমহাদেশের গুজরাট বা হায়দ্রাবাদে আজও টিকে থাকা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অনন্য ‘সিদ্দি’ জনগোষ্ঠী। তবে অর্থনৈতিক কাঠামো ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দুই বিপরীতমুখী রুটের মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, মানবতার চরম অবমাননা আর পৈশাচিকতার দিক থেকে এই দুটি ব্যবস্থার রূপই ছিল সমান বীভৎস এবং ক্ষমার অযোগ্য।
বান্স আইল্যান্ডের আন্ডারগ্রাউন্ড কুঠুরির সেই নিরেট অন্ধকার আর স্টোন টাউনের জোয়ারের নোনা পানিতে ডুবে যাওয়া স্লেভ সেল—উভয় জায়গাতেই বন্দি মানুষের অবরুদ্ধ আর্তনাদ আর মুক্তির আকুলতা ছিল একই রকম তীব্র, গভীর ও হৃদয়বিদারক। আটলান্টিকের চাবুকের দাগ আর ভারত মহাসাগরের শিকলের ঘর্ষণ আসলে একই বৈশ্বিক ট্র্যাজেডির দুটি ভিন্ন পিঠ, যা লাখ লাখ মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ কোনোটির নির্মমতাকে কম বা বেশি করে না, বরং এটি প্রমাণ করে যে ভূখণ্ড বা মহাসাগরভেদে শোষকের গায়ের চামড়ার রঙ এবং ভাষা বদলে গেলেও, শোষিত মানুষের কান্নার জল আর শেষ দীর্ঘশ্বাসের ভাষা পৃথিবীর সবখানে একই থাকে। এই দীর্ঘ ট্রেইলের শেষ প্রান্তে এসে দুই মহাসাগরের এই তুলনামূলক রক্তাক্ত মানচিত্রটি আমার ভ্রমণ-অনুসন্ধানকে এক চূড়ান্ত ও দার্শনিক পূর্ণতা দান করেছে।
২২
ব্যক্তিগত অনুভূতি ও উপসংহার: দীর্ঘশ্বাসের শেষ সীমানায়।
২০১১ সালের মে মাসে স্টোন টাউনের সেই স্যাঁতসেঁতে স্লেভ সেলের ভেতরে যখন আমি একাকী দাঁড়িয়েছিলাম, চারপাশের নিরেট প্রাচীন দেয়ালগুলো যেন এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগের অবরুদ্ধ আর্তনাদ প্রতিধ্বনি করছিল। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনের কিং জিমি মার্কেট বা বান্স আইল্যান্ডের যে দগদগে ক্ষত আমি ২০০১ সালে দেখে এসেছিলাম, পূর্ব আফ্রিকার এই স্টোন টাউন যেন সেই একই বৈশ্বিক ট্র্যাজেডির আরেকটা ভিন্ন অথচ অন্ধকার পিঠ। আজকের স্টোন টাউনের যে চত্বরে দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটক নির্বিকার চিত্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ছবি তুলছে, ঠিক এই জায়গাতেই কোনো এক বিকেলে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো শত শত নগ্ন, চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত মানুষকে। তাদের অপরাধ ছিল শুধু একটাই—তারা আফ্রিকান, তাদের গায়ের রঙ কৃষ্ণবর্ণ। চার্চের অল্টারের নিচে যেখানে একসময় চাবুক মারার গাছটি ছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে উঠেছিল এবং মানুষের ওপর মানুষের এমন প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈধ নির্মমতা ভাবলে আজও আমার গা শিউরে ওঠে।
পশ্চিমা বিশ্বের ট্রান্স-আটলান্টিক দাস ব্যবসা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যত সিনেমা তৈরি হয়েছে, যত বই লেখা হয়েছে বা অ্যাকাডেমিক আলোচনা হয়েছে, ভারত মহাসাগরের এই রুট দিয়ে হওয়া পূর্ব আফ্রিকার দাস ব্যবসার এই নির্মম ইতিহাস যেন ততটাই আড়ালে রয়ে গেছে। জাঞ্জিবারের নীল সমুদ্রের অপার্থিব সৌন্দর্য, তার সাদা বালুকাবেলা আর লবঙ্গের সুবাসকে এক লহমায় ফিকে করে দেয় স্টোন টাউনের মাটির নিচের এই কান্নার ইতিহাস, যা আজো পর্যটকদের অগোচরে গুমরে মরে। ২০০১ সালে সিয়েরা লিওন থেকে শুরু হওয়া আমার এই দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি ঘটল ২০১১ সালের এই স্টোন টাউনে এসেই। বান্স আইল্যান্ড থেকে স্টোন টাউন—এই দীর্ঘ ট্রেইলে আমি কেবল ইতিহাসের পাতা ওল্টাইনি, বরং লাখ লাখ মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা, তাদের বুকের ভেতরের তীব্র হাহাকার আর শেষ দীর্ঘশ্বাসটুকুকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করার চেষ্টা করেছি। ভারত মহাসাগরের নোনা বাতাস আর স্টোন টাউনের পাথুরে দেয়ালগুলো যেন আজও সেই শিকল পরা মানুষদের অবিনশ্বর স্মারক হয়ে কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের বিবেককে দংশন করে।
‘স্লেভ ট্রেডের সুলুক সন্ধান’ শিরোনামে এই আর্টিকেলের এটাই শেষ পর্ব, যা দুই মহাসাগরের রক্তভেজা রুটগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে বিদায় নিচ্ছে। কঙ্গোর জঙ্গল থেকে হেঁটে আসা কঙ্কালসার মানুষটি কিংবা মেন্দে উপজাতির সেই ধান চাষী—সবার কান্নার ভাষা যে একই ছিল, তা এই এক দশকের দীর্ঘ ট্রেইলে আমি গভীরভাবে অনুধাবন করেছি। ইতিহাস হয়তো অনেক ক্ষতকে সময়ের প্রলেপে ঢেকে দেয়, কিন্তু স্টোন টাউনের এই চত্বর বা ফ্রিটাউনের ‘স্লেভ স্টেপস’ মানুষের তৈরি সেই পৈশাচিকতার দাগ কখনো মুছতে দেবে না। শৃঙ্খলিত সেই পূর্বপুরুষদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর তাঁদের দীর্ঘশ্বাসের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে আমি আমার এই এক দশকের অনুসন্ধান ও লেখার যাত্রায় এখানেই ইতি টানতে পারতাম, যদি না বর্তমান পৃথিবীর এক রূঢ় বাস্তবতা আমার সামনে এসে দাঁড়াত।
সময় বদলেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে মানব সভ্যতা আজ একবিংশ শতাব্দীর চরম শিখরে এসে পৌঁছেছে; কিন্তু প্রশ্ন জাগে—মানুষের দাসত্বপ্রবৃত্তির আদিম অভ্যাসটি কি আদেও বদলেছে? কাগজে-কলমে ও আন্তর্জাতিক আইনে আগের মতো সেই প্রকাশ্য স্লেভ ট্রেড বা মানুষের কেনাবেচা হয়তো আজ আর নেই, কিন্তু শোষণের রূপ বদলে তা ধারণ করেছে এক নতুন, আধুনিক ও ছদ্মবেশী অবয়ব। আজো প্রচুর খনিজ সম্পদে ভরপুর আফ্রিকার ভাগ্যবঞ্চিত শিশুরা পূর্ণবয়স্ক হবার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে; আমাদের হাতের স্মার্টফোন বা আধুনিক প্রযুক্তির কাঁচামাল জোগাতে কঙ্গোর মতো দেশের শিশুরা কোলতান, কোবাল্ট কিংবা গোল্ড মাইনিং এলাকায় অন্ধকার খনির গভীরে বিষাক্ত পরিবেশে মানবেতর শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। সুদূর মিয়ানমারের কোচিন রাজ্যে করপোরেট ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে স্থানীয় শ্রমিকদের জোরপূর্বক দাসখাতায় নাম লিখিয়ে কাজ করানো হচ্ছে রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়ালের (Rare Earth Materials) বিপজ্জনক খনিগুলোতে। ভারতের ওড়িশার অঙ্গুল, ঝারসুগুডা এলাকায় অ্যালুমিনিয়াম শিল্পবর্জ্যের ফ্লোরাইড ও রেড মাড সরাসরি উন্মুক্ত জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে খাবার পানিকে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত করে তুলছে। এই দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে স্থানীয় মানুষ ফ্লোরোসিস, চর্মরোগ এবং কিডনির নানা জটিলতায় ভুগছেন। নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের পাশাপাশি বিষাক্ত পরিবেশের কারণে সেখানে ঘরে ঘরে শ্বাসকষ্ট ও ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগব্যাধিতে ধুঁকে ধুঁকে মরছে হাজারো চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক, যাদের জীবনের নিরাপত্তা কোনো পুঁজিপতির খাতায় স্থান পায় না। এই নির্মমতার ছায়া থেকে মুক্ত নয় আমার নিজের চেনা মাতৃভূমিও—বাংলাদেশের উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা (Shipbreaking) শিল্প থেকে শুরু করে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ঢালাই কারখানা আর লেদ মেশিনের তৈলাক্ত চাকার নিচে হাজারো শিশুশ্রমিক প্রতিদিন তাদের শৈশবকে পিষে ফেলছে স্রেফ দু'মুঠো ভাতের তাগিদে।
বিশ্বব্যাপী কর্পোরেট পুঁজি আর আধুনিকায়নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই শিশুশ্রম এবং মানবেতর আধুনিক দাসত্ব কোনো অর্থেই অতীতের সেই অভিশপ্ত স্লেভ ট্রেডের চেয়ে কম নয়। স্টোন টাউনের লোহার শিকলগুলো আজ হয়তো অদৃশ্য হয়েছে, কিন্তু তা অদৃশ্য বেড়ি হয়ে চেপে বসেছে পৃথিবীর কোটি কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঘাড়ে; আর তাই এই ট্রেইল শেষ হলেও আমার ভেতরে থেকে যাওয়া সেই শিকলের সুর আর নোনা জলের স্মৃতি আজীবন অম্লান থাকবে, যা আমাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেবে—যতক্ষণ না পৃথিবীর শেষ প্রান্তের শোষিত মানুষটি মুক্তি পাচ্ছে, ততক্ষণ মানুষের তৈরি সভ্যতার এই জাঁকজমক এক প্রহসন মাত্র।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস,ঢাকা
১৬ জুন ২০২৬