
১
"So very little remains. The flooded house
and the broken pieces of the sun in the water.
We cannot remember any longer how we used to live,
only that we had a home that we lost..."
নোবেলজয়ী গ্রিক কবি জর্জিওস সেফেরিস-এর বিখ্যাত কবিতা "Mythistorema" (মিথিস্টোরেমা)-এর ২২ নম্বর কবিতার কয়েকটা লাইন। এখানে কবি সমুদ্রের ওপারে, তুরস্কে ফেলে আসা সোঁদা মাটির গন্ধ আর চিরতরে হারিয়ে যাওয়া চেনা স্বর্গের নস্টালজিয়া ফুটিয়ে তুলেছেন।
কবি তুরস্কের ইজমির থেকে বাস্তুচ্যুত হলেও সিল্লের গল্পটাও ছিল একইরকম। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বাস্তচ্যুতির গল্পটা আসলে কমবেশি একইরকম। ২০২৫ সালের জুন মাসে তুরস্কের কোনিয়া শহর ঘুরতে গিয়ে এক শান্ত সকালে পরিচিত হই সিল্লে (Sille) নগরীর সাথে। মধ্য আনাতোলিয়ার এই প্রাচীন জনপদে পা রাখতেই চারপাশের পাথুরে পাহাড় আর শত বছরের পুরনো বাড়িগুলোর নীরবতা যেন আমাকে এক শতাব্দীর পুরনো এক ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। সেখানে স্থানীয় প্রবীণ এবং আমার গাইডের সাথে কথা বলে জানতে পারি বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯২৩ সালের লজান চুক্তির অধীনে বাধ্যতামূলক জনসংখ্যা বিনিময়ের (Population Exchange) নির্মম শিকার হয়েছিল এই প্রাচীন শহরটি। অথচ শত শত বছর ধরে এখানে মুসলিম ও অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা একসাথে শান্তিতে বসবাস করে আসছিল। রাজনীতির এক কলমের খোঁচায় ধর্মকে ভিত্তি করে রাতারাতি এখানকার গ্রিকভাষী খ্রিস্টান পরিবারগুলোকে তাদের এই চেনা স্বর্গ ছেড়ে গ্রিসে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। একইভাবে গ্রিসের রোডস আইল্যান্ড (Rhodes) ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিমদেরও সবকিছু ফেলে চলে আসতে হয়েছিল তুরস্কের এই প্রান্তে।
সেসময়ে তুরস্কের সিল্লে ও গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝে প্রায় ১৫ লাখ খ্রিস্টান ও ৫ লাখ মুসলিমের এক বিশাল ও বাধ্যতামূলক জনসংখ্যা বিনিময় ঘটে। রাতারাতি চেনা ঘরবাড়ি ও পূর্বপুরুষের স্মৃতি ফেলে সম্পূর্ণ রিক্তহস্তে এক কাপড়ে তাদের পাড়ি দিতে হয় এক অজানা গন্তব্যে। এই স্থানান্তরের সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির সংকট; কারণ সিল্লে থেকে গ্রিসে যাওয়া অনেক মানুষ তুর্কিভাষী হওয়ায় গ্রিক সমাজে গিয়ে তীব্র একাকীত্ব ও পরিচয়হীনতায় ভোগেন। একইভাবে গ্রিস থেকে আসা মুসলিমরা তুর্কি সংস্কৃতির সাথে পরিচিত না থাকায় স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘ সময় ব্রাত্য হয়ে ছিলেন। চরম দারিদ্র্য, অবহেলা আর পরিচয় সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও এই শিকড়চ্যুত মানুষগুলো কেবল টিকে থাকার তীব্র আকুতিতে নতুন করে তাদের পথচলা শুরু করেন। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে তারা ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন এক নতুন মিশ্র সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার গল্প। তবে বাহ্যিক এই সচ্ছলতা ও নতুন প্রজন্মের প্রতিষ্ঠার আড়ালে প্রবীণদের মনে চিরকাল রয়ে যায় আদি ভিটের প্রতি এক গোপন রক্তক্ষরণ। শতাব্দীর ওপারে দাঁড়িয়ে আজও সিল্লে কিংবা রোডস আইল্যান্ডের এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভূখণ্ডের ভাগ হলেও মানুষের নস্টালজিয়া আর স্মৃতির কোনো ভাগ হয় না।
২
সিল্লের ঐতিহাসিক 'আয়া এলিনি চার্চ' (যা রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের মা হেলেনা ৩২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন) এই জনসংখ্যা বিনিময়ের পর দীর্ঘ সময় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। অথচ একসময় এটি ছিল সিল্লের খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু, যা তারা অশ্রুসজল চোখে চিরতরে পেছনে ফেলে গিয়েছিলেন। বর্তমানে তুরস্ক সরকার এটিকে সংস্কার করে যাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করেছে। যাদুঘরের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে স্থানীয়দের মুখে তাদের পূর্বপুরুষদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি, হাহাকার আর অশ্রুর গল্প শুনছিলাম। তখন আচমকাই আমার মনে হলো—স্থান, কাল, পাত্র কিংবা ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর সব প্রান্তে শিকড়চ্যুত মানুষের এবং তাদের পরিবারের গল্পগুলো আসলে প্রায় একইরকম। সিল্লে-র সেই বেদনা দূর প্রবাসে বসেও আমার বুকে এক তীব্র চেনা আঘাত হানল, কারণ এই একই বেদনাকাব্যের এক নীরব সাক্ষী আমার নিজের পরিবার।
আমার মন এক নিমেষে ফিরে গেল ১৯৪৭ সালের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোয়, যখন ব্রিটিশদের টানা এক কাল্পনিক রেখায় ভারতীয় উপমহাদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল। সেই নৃশংসতম পালাবদলে রাতারাতি লাখো পরিবারকে উদ্বাস্তু হতে হয়। আমার মাতামহ ছিলেন তেমনই একজন ভুক্তভোগী। বর্তমান ভারতের আসামে ছিল তাঁর সাজানো সংসার, ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা, অর্থ-সম্পদ আর কৃষিজমি। কিন্তু দেশভাগের সেই আকস্মিক দাঙ্গা আর চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে বলতে গেলে এক কাপড়ে, রিক্ত হস্তে সবকিছু ফেলে তাঁকে চলে আসতে হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে। নিজের চেনা উঠোন আর তিল তিল করে গড়ে তোলা পরিচয়কে চিরতরে পেছনে ফেলে আসার সেই যে মানসিক ক্ষত, তা তিনি সারাজীবনেও ভুলতে পারেননি। একই অনুভূতির ছোঁয়া পেয়েছি ২০০৩ সালে ট্রেনে কলকাতা থেকে দিল্লীর যাত্রাপথে। বাংলাদেশী, এই একটি পরিচয়েই যেন সেদিন পশ্চিমবঙ্গের কিছু মানুষের কাছে আমি আপন হয়েছিলাম। তারা আমাকে ফরিদপুর-শরীয়তপুর-খুলনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাদের পূর্ব-পুরুষের ভিটেমাটির কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। সেদিন তাদের প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে না পারলেও বুকের ভিতরের গভীর হাহাকার আমাকেও যেন ছুঁয়ে গিয়েছিল। কারণ পারিবারিকভাবেই এই অনুভূতির সাথে আমি পরিচিত। হিন্দু-মুসলমান ভেদে শিকড় উপড়ানোর যন্ত্রণাটা যে একইরকম! আর এই ট্র্যাজেডি কেবল আমার মাতামহের একার ছিল না; দুই বাংলার প্রতিটি কোণায় এমন হাজারো গল্প ছড়িয়ে আছে। দেশভাগের সময় পাঞ্জাব সীমান্তের মতো বাংলার সীমান্তেও রাতারাতি অনেক হিন্দু পরিবারকে যেমন বাংলাদেশের বরিশাল-খুলনা অঞ্চল থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি দিতে হয়েছিল, আবার ভারতের আসাম-জলপাইগুড়ি থেকে বহু মুসলমান পরিবারকেও তেমনি সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় এসে বসতি গড়তে হয়েছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রখ্যাত লেখক খুশবন্ত সিং-এর 'ট্রেন টু পাকিস্তান' উপন্যাসে পাঞ্জাব সীমান্তের যে নির্মমতার চিত্র আমরা পাই, দুই বাংলার লেখকদের গল্প-উপন্যাসেও সেই একই দুঃখগাথা কম-বেশি ফুটে উঠেছে। ঋত্বিক ঘটকের 'মেঘে ঢাকা তারা', 'কোমল গান্ধার' ও 'সুবর্ণরেখা' চলচ্চিত্রে উদ্বাস্তু জীবনের যে তীব্র হাহাকার ফুটে উঠেছে, তা চিরকাল মানবহৃদয়কে নাড়া দেবে। একইভাবে হাসান আজিজুল হকের গল্প, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'পূর্ব-পশ্চিম' কিংবা জ্যোতির্ময়ী দেবীর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে কাঁটাতারের ওপারের সোঁদা মাটির গন্ধ ও শিকড়চ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস। অশ্রু দিয়ে লেখা এই সাহিত্যগুলো আসলে একেকটি জীবন্ত দলিল, যা নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—মানচিত্রের কাটাকুটিতে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের আবেগ ও মানবিকতাই পরাজিত হয়।
৩
মানুষ যখন নিয়তির নির্মম পরিহাসে বাধ্য হয়ে নিজের চেনা উঠোন আর চেনা আকাশটা ছাড়ে, সে কি কেবলই কিছু স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে আসে? না; সে আসলে পেছনে ফেলে আসে তার আজন্মের আনন্দ, চোখের জল, প্রথম প্রেম আর আজীবনের সঞ্চিত স্মৃতির এক আস্ত চাদর। নতুন কোনো অজানা ভূখণ্ডে এসে এই শিকড়চ্যুত পরিবারগুলো হয়তো হাড়ভাঙা খাটুনি আর তীব্র জীবনযুদ্ধে একসময় মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেয়, তাদের হাত ধরেই ডালপালা মেলে নতুন প্রজন্মের এক নতুন গল্প। কিন্তু বাহ্যিক এই সচ্ছলতা আর টিকে থাকার দেদীপ্যমান লড়াইয়ের আড়ালে, মনের অবিনাশী গহীনে সারাজীবন এক গোপন রক্তক্ষরণ চলতে থাকে। আর সেই ক্ষরণ বুকে ধারণ করেই পরবর্তী প্রজন্ম গল্প, উপন্যাস আর কবিতার ছত্রে ছত্রে পরম মমতায় লিখে রাখে তাদের আদি শিকড়ের সেই বেদনাবিধুর দুঃখগাথা।
তুরস্কের পাথুরে সিল্লে নগরী থেকে শুরু করে গ্রিসের রোডস আইল্যান্ড, কিংবা আসামের গহীন চা বাগান থেকে বাংলার নদীবিধৌত পলিমাটি—সীমান্তের কাঁটাতার আর নিষ্ঠুর ভূ-রাজনীতি মানুষের ঘরবাড়ি হয়তো কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু মানুষের যৌথ নস্টালজিয়া আর স্মৃতির ব্যাকুলতাকে ভাগ করার সাধ্যি কার? পৃথিবীর ইতিহাসে বাধ্যতামূলক স্থানান্তরের এই চিরন্তন ক্রন্দনধ্বনি তাই সবখানে, সব ভাষায়, সব কাঁটাতারের ওপারে একই বিষাদময় সুতোয় বাঁধা। কোনিয়ার সেই বিষণ্ন বিকেলে মাথার ওপরের সূর্যটা যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছিল, তখন সিল্লে নগরীর মায়াবী নীরবতা ভেঙে আমাকেও ফেরার পথ ধরতে হলো। স্থানীয় একটা স্যুভেনির শপ থেকে স্মৃতির স্মারক হিসেবে টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনে যখন গাড়িতে উঠলাম, ততক্ষণে গোধূলির আলো গড়িয়ে রাতের অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। দূরের চেনা কোনিয়া শহরের আলোর ঝিকিমিকি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল, আর আমার মনের ভেতর তখনো অবিরাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল গাইডের মুখ থেকে শোনা এক বেদনাবিধুর ইতিহাস।
লজান চুক্তির পর গ্রিসে আসা লাখ লাখ তুর্কিভাষী গ্রিক শরণার্থী যখন এথেন্স বা থেসালোনিকির অন্ধকার বস্তিগুলোতে চরম দারিদ্র্য, অবহেলা আর একাকীত্বে ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন তাদের বুকফাঁটা আর্তনাদ আর জমে থাকা কান্না থেকে জন্ম নিয়েছিল নতুন ধারার সংগীত, যাকে বলা হয় 'রেবেতিকো' (Rebetiko)। এটি আসলে কেবল গান ছিল না, এটি ছিল "গ্রিসের ব্লুজ" বা হৃদয়ের ক্ষত থেকে নিংড়ে নেওয়া দুঃখের মহাকাব্য। এই গানগুলোর প্রতিটি সুরে জড়িয়ে থাকত স্মিরনা (বর্তমান তুরস্কের ইজমির) কিংবা আমার দেখা সিল্লের মাটি থেকে উপড়ে ফেলা মানুষের ফেলে আসা সোনালী জীবন, ভাষা হারানোর তীব্র সংকট এবং নিজের পূর্বপুরুষের দেশে এসেও এক ছাদহীন "পরবাসী" হয়ে বেঁচে থাকার অলিখিত যন্ত্রণা। আর এই দুঃখকে বুকে ধারণ করেই কোনো এক নিঝুম সন্ধ্যায় নিজের ভেতরের সবটুকু হাহাকার এক করে বাউজু্কি’র তারে ঝংকার তুলে আজও হয়তো কেউ উদাস কন্ঠে গেয়ে ওঠেন,
"I am a refugee, a stranger in my own blood's land,
They call me 'Tourkosporos' (Turkish seed), they don't understand.
I left my heart across the sea, where the soil was sweet,
Here I walk in rags, with stones beneath my feet."
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৪ জুন ২০২৬