
১
২০১১ সালের কথা। আমি তখন কঙ্গোর বুনিয়াতে মিলিটারি অবজারভার হিসেবে কর্মরত। ২ মাসের টানা কর্মব্যস্ততার শেষে টিমসাইট থেকে ৬ দিনের সিটিও (CTO) মিলল। মনটা ছুটি চাইছিল, তাই ঠিক করলাম এবার জাঞ্জিবারের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেব। পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ার উপকূল ঘেঁষে অবস্থিত এই জাঞ্জিবার মূলত ভারত মহাসাগরের বুকে এক অসাধারণ সৌন্দর্যের দ্বীপপুঞ্জ। শতাব্দী প্রাচীন মশলার সুবাস, পাথুরে শহরের ইতিহাস আর অন্তহীন নীল জলরাশির এই দ্বীপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের টেনে এনেছে।
এন্টেবে থেকে নাইরোবি হয়ে যখন জাঞ্জিবারে পৌঁছলাম, তখন মাথার উপরে দুপুরের সূর্যটা গড়িয়ে বিকেল ছুঁইছুঁই। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এয়ারপোর্টের বাইরে এসে ফোরেক্স ব্যুরো থেকে লোকাল কারেন্সি সংগ্রহ করছিলাম। এমন সময় একমুখ অমায়িক হাসি নিয়ে একজন স্থানীয় তরুণ এসে সামনে দাঁড়াল। আফ্রিকানদের চোখের সাদা অংশে লুকিয়ে থাকা একরাশ স্বপ্ন আর মুক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁতের হাসি আমার সবসময়ই দারুণ লাগে। বব মার্লির মতো একমাথা ঝাঁকড়া চুলের সেই ছেলেটার নাম 'নাযা'। সে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আমার লোকাল গাইড হতে চাইল এবং চমৎকার একটি ট্যুর প্ল্যান আমার সামনে তুলে ধরল। তার সততা আর পরিকল্পনায় দ্বিমত করার কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে তাকে সাথে নিয়ে নিলাম।
২
জাঞ্জিবারের নর্থ কোস্টে বিখ্যাত কেন্দোয়া বিচে (Kendwa Beach) আমার রুম বুক করা ছিল। নাযা একটি গাড়ি ঠিক করল এবং আমরা সমুদ্রের পাড় বরাবর ছুটে চললাম উত্তর উপকূলের সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
রিসোর্টে আমার রুমটা ছিল এককথায় অসাধারণ। বুকিংয়ের সময়ই বলে রেখেছিলাম, রুম যেন সমুদ্রের যতটা সম্ভব কাছাকাছি হয়। ঘরের দরজা খুললেই যেন নোনা হাওয়া এসে গায়ে লাগে, আর কান পাতলেই যেন পাওয়া যায় তরঙ্গের অবিরাম গর্জন। প্রকৃতিকে এত কাছ থেকে ছোঁয়ার অনুভূতিই আলাদা। ২০০১ সালে সিয়েরা লিওন মিশনে থাকার সময় ক্যাম্পের হ্যামোকে শুয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের গর্জন শুনেছিলাম। এবার বিলাসবহুল রিসোর্টের আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে শুনতে চাই ভারত মহাসাগরের হুঙ্কার। আমার এই ইচ্ছের কথা শুনে রিসিপশনের আফ্রিকান মেয়েটি মৃদু হেসেছিল। নাযা আমাকে রুমে পৌঁছে দিয়ে রিসিপশন থেকেই বিদায় নিল; পরদিন সকালে স্পাইস গার্ডেন আর 'জোজানি ফরেস্ট'-এর বিলুপ্তপ্রায় লাল কোলোবাস মাংকি দর্শন দিয়ে আমাদের মূল ভ্রমণ শুরু হবে।
রুমে চেক-ইন করতেই ভ্রমণের ক্লান্তিতে শরীরটায় আলস্য ভর করল। ঘরের ছোট ফ্রিজ থেকে একটা চিলড বেভারেজ ক্যান হাতে নিয়ে এসে দাঁড়ালাম রুমের বারান্দায়। বাইরে তখন মায়াবী বাতাস, দুপুরের কড়া রোদটা নরম হয়ে চারপাশকে এক স্নিগ্ধ আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে। চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি। অগভীর অংশে সেই পানি আবার অদ্ভুত এক ফিরোজা রঙ ধারণ করেছে, যা ধবধবে সাদা বালুকাবেলায় এসে আছড়ে পড়ছে। প্রকৃতির এই প্রবল, উথাল-পাথাল সৌন্দর্যের দিকে বেশিক্ষণ চোখ রাখা যায় না; এক অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়। লর্ড বায়রনের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিটি যেন এই মায়াবী বিকালের রূপকেই মনে করিয়ে দেয়—
"She walks in beauty, like the night
Of cloudless climes and starry skies..."
৩
ক্লান্ত শরীরটা বারান্দায় রাখা সান লাউঞ্জারে এলিয়ে দিয়ে মনের সুখে যেই না ওপরের দিকে তাকিয়েছি, অমনি চমকে উঠলাম! এ কী! মাথার ওপরে 'গরু মার্কা' ঢেউটিন! রিসোর্টের দেয়ালগুলো কোরাল পাথর আর সিমেন্টের গাঁথুনিতে তৈরি, আর তার ছাদটা স্থানীয় ঐতিহ্যে নারিকেল পাতা (Makuti thatch) দিয়ে ছাওয়া হলেও, ভেতরে সিলিংয়ের মূল কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশের ঢেউটিন। আফ্রিকার এক প্রত্যন্ত দ্বীপে এসে এভাবে আকস্মিকভাবে নিজের দেশের স্পর্শ পেয়ে মনটা এক নিমেষেই জুড়িয়ে গেল। দেশের জন্য এক অদ্ভুত গর্ব আর ভালো লাগা নিয়ে বেভারেজের ক্যানটা শেষ করে রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। তারপর সম্ভবত গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
কিন্তু আফ্রিকার রাত কি এত সহজে ঘুমাতে দেয়? না, পারলাম না। সন্ধ্যার আলো ফুরিয়ে রাত নামতেই চারদিকের বাতাসে ভেসে এল কয়লার আগুনে পোড়া ফিশ গ্রিলের মনকাড়া সুবাস। সেই সাথে যোগ হলো অ্যালকোহলের ঝাঁঝালো গন্ধ আর আফ্রিকান ড্রামের (Percussion) উন্মাতাল বিট। বালিশ দিয়ে কান চেপে ধরেও যখন নিজেকে এই প্রাণোচ্ছল পরিবেশ থেকে বিযুক্ত করতে পারলাম না, তখন ফ্রেশ হয়ে সেই উৎসবের দিকেই পা বাড়ালাম।
বিচে গিয়ে দেখি আলো-আঁধারির এক দারুণ মেলা। সেখানে নাযাকে দেখলাম ইটালিয়ান পর্যটকদের একটা দলের সাথে গল্প করছে। আমাকে দেখেই সে চওড়া হাসিতে এগিয়ে এল। জানাল, এই দলটার সাথেই আগামী দিনগুলোয় আমাকে ট্যুর করতে হবে। তবে আমার সময় স্বল্পতার কারণে সূচিটা কিছুটা কাটছাঁট করতে হয়েছে—কেন্দোয়া বিচে দুদিন কাটানোর পর আমার রওনা হতে হবে ঐতিহাসিক স্টোন টাউনের দিকে।
৪
ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে বিচের পার্টি তখন জমে ক্ষীর! ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের রেশ তখনো পুরো আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে। ডান্সের উডেন ফ্লোরে তখন শাকিরার সেই বিখ্যাত 'Waka Waka (This Time for Africa)' গানটির রিদম তরুণ-তরুণীদের রক্তে জোয়ার আনছে, উদ্দাম নাচে মেতে উঠেছে সবাই। শাকিরার পর পরই ডিজে একের পর এক ড্রপ করছিলেন জেনিফার লোপেজের 'On the Floor' কিংবা এমিনেমের চাবুকের মতো র্যাপ ট্র্যাকগুলো।
এভাবে চলতে চলতে রাতের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছাল, তখন এক সময় সেই হুল্লোড় ও হইচই ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসতে শুরু করল। ঘড়ির কাঁটা ইতিমধ্যে মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। আফ্রিকান এই দ্বীপের উত্তাপ যেন আস্তে আস্তে নিভে আসে। চারপাশ নিঝুম। শুধু সমুদ্রের বুক চিরে দূরে নোঙর করে থাকা দু-একটি ইয়ট থেকে মিটমিট করে আলো জ্বলছিল। আর মাথার ওপরে? মাথার ওপরে তখন মেঘমুক্ত কালো আকাশ জুড়ে কোটি কোটি তারার দেউটি। ভারত মহাসাগরের মৃদু গর্জন আর তারার আলোর চাদরে ঢাকা জাঞ্জিবারের সেই রাত আমার স্মৃতিতে চিরদিনের জন্য খোদাই হয়ে রইল। প্রকৃতির এই নিস্তব্ধ ও গভীর সান্নিধ্যে দাঁড়িয়ে কবি লর্ড বায়রনের 'Childe Harold's Pilgrimage'-এর চিরন্তন লাইনগুলোই মনে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল,
"There is a pleasure in the pathless woods,
There is a rapture on the lonely shore,
There is society, where none intrudes,
By the deep Sea, and music in its roar:
I love not Man the less, but Nature more..."
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৫ জুন ২০২৬