
১
উগান্ডার এন্তেবে থেকে যখন কেনিয়ান এয়ারলাইন্সের ক্যারিয়ারটা ডানা মেলল, তখনো জানতাম না সামনে কতটা মন্ত্রমুগ্ধকর এক সফর অপেক্ষা করছে। নাইরোবিতে ট্রানজিটের সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে প্লেনটা যখন আবার উড়াল দিল, তখন গন্তব্য একটাই—ভারত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা এক ঝলমলে দ্বীপ। আকাশপথের সেই দীর্ঘ ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে গেল, যখন নীল জলরাশি পেরিয়ে জাঞ্জিবারের মাটিতে পা রাখলাম। এখানকার বাতাসেই যেন মিশে আছে লবঙ্গ আর দারুচিনির এক চেনা সুবাস। কিন্তু আমার গন্তব্য ছিল আরও গভীরে—এমন এক শহরে যেখানে ইতিহাস কোনো জরাজীর্ণ বইয়ের পাতায় বন্দি নয়, বরং প্রতিটা ইটের খাঁজে, প্রতিটা ধূলিকণায় আজও জীবন্ত। আফ্রিকান সুর, আরব ঐতিহ্য আর পারস্যের হাতছানি—যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর প্রাচীন কোনো এক প্রবাল পাথরের দালানের ছায়ায়।
বলছিলাম জাঞ্জিবারের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র স্টোন টাউন-এর কথা, যা স্থানীয় সোয়াহিলি ভাষায় পরিচিত 'মজি মকোংওয়ে' বা প্রাচীন শহর নামে। ২০০০ সালে ইউনেস্কো যাকে অনন্য এক বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২
বান্টু থেকে সোয়াহিলি সংস্কৃতির সুতোয় বোনা পথ।
স্টোন টাউনের আঁকাবাঁকা সরু গলিগুলো দিয়ে যখন হাঁটছিলাম, তখন চারপাশের প্রাচীন দালানকোঠা আর কারুকার্যময় দরজাগুলো আমাকে যেন সুদূর অতীতে নিয়ে গেল। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে মূল আফ্রিকান ভূখণ্ড থেকে বান্টুভাষী জনগোষ্ঠী এখানে এসে মাছ ধরা ও কৃষিকাজের মাধ্যমে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে ৮ম থেকে ১৫শ শতাব্দীর দিকে আরব ও পারস্য থেকে আসা বণিকদের পালের নৌকা এই উপকূলে নোঙর ফেলে। গলিমুখে স্থানীয় লোকজনের তামাক হাতে অলস আড্ডা আর গুঞ্জন দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ছিল সেই সোনালী দিনগুলোর কথা, যার হাত ধরে সোনা, হাতির দাঁত আর মসলার বাণিজ্যে স্টোন টাউন হয়ে উঠেছিল পূর্ব আফ্রিকার প্রধান বাণিজ্যিক হৃদপিণ্ড। স্থানীয় আফ্রিকান বান্টু আর আগন্তুক আরব-পারস্য সংস্কৃতির এই অনন্য মেলবন্ধনেই মূলত জন্ম নিয়েছিল এক অপূর্ব ভাষা ও সংস্কৃতি—সোয়াহিলি। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজ হয়তো সেসময়ের মানুষগুলো আর বেঁচে নেই, কিন্তু তাদের হাত ধরে যে সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সুগভীর ছাপ পড়েছিল, তার জীবন্ত চিহ্ন স্টোন টাউনের প্রতিটা কোণায় আজও স্পষ্ট খুঁজে পাওয়া যায়।
৩
জাঞ্জিবারি দরজা: কাঠের গায়ে আভিজাত্যের খোদাই।
স্টোন টাউনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর অনন্য স্থাপত্য, যার ভবনগুলো মূলত সমুদ্রের প্রবাল পাথর আর ম্যানগ্রোভ কাঠ দিয়ে তৈরি। তবে এই প্রাচীন শহরের অলিগলিতে হাঁটতে গিয়ে যা দেখে বারবার আমার চোখ আটকে যাচ্ছিল, তা হলো এখানকার বিশাল এবং অবিশ্বাস্য সুন্দর কাঠের দরজাগুলো, যা বিশ্বজুড়ে 'জাঞ্জিবারি ডোর' নামে পরিচিত। এই দরজাগুলো কেবল বাড়ির সাধারণ প্রবেশপথ নয়, বরং বাড়ির মালিকের তৎকালীন সামাজিক মর্যাদা, সমৃদ্ধি ও সংস্কৃতির এক একটি জীবন্ত দলিল। একটু গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলেই এই শিল্পকর্মগুলোর নকশায় দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক ধারা খুব স্পষ্ট সংস্কৃতির রূপ নিয়ে ধরা দেয়। এরমধ্যে আরব ঘরানার দরজাগুলোতে সাধারণত পবিত্র কোরআনের বাণী বা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা খোদাই করা থাকে। অন্যদিকে, ভারতীয় ঘরানার দরজাগুলোতে দেখা যায় সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বসানো চোখ ধাঁধানো পিতলের সূক্ষ্ম কাঁটা বা চমৎকার ফুল-লতাপাতার নান্দনিক কারুকাজ। শতাব্দীর প্রাচীন এই দরজাগুলো আজও দাঁড়িয়ে থেকে রাজকীয় আভিজাত্যের গল্প বলে যায়, যা প্রতিটি পথিককে মুগ্ধ না করে ছাড়ে না।
৪
রাজকীয় জৌলুস, দাসত্বের ক্ষত আর মার্কারির সুরের মূর্ছনা।
স্টোন টাউনের প্রাচীন পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে একে একে চোখ জুড়িয়ে গেল এর প্রধান ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলোতে, যার শুরুটা ওল্ড ফোর্ট বা ‘গমে কোংওয়ে’ দিয়ে। ১৭শ শতাব্দীর শেষের দিকে ওমানের আরবরা পর্তুগিজদের দুই শতাব্দীর শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই দুর্গটি তৈরি করেছিল, যেখানে আজ কোনো যুদ্ধের দামামা নেই, বরং স্থানটি রূপ নিয়েছে এক প্রাণবন্ত উন্মুক্ত থিয়েটার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। এরপরই দেখা মিলল ‘হাউস অব ওয়ান্ডার্স’-এর, যা ১৮৮৩ সালে সুলতান বারঘাশের হাত ধরে একসময় গোটা পূর্ব আফ্রিকার আধুনিকতার অনন্য প্রতীক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। যার ঠিক পাশেই রয়েছে সুলতানের প্রাসাদ। বর্তমানে প্যালেস মিউজিয়াম হিসেবে পরিচিত এই রাজকীয় ভবনটি আজও ওমানি রাজবংশের জাঁকজমকপূর্ণ লাইফস্টাইল এবং তাদের শাসনকালের নানা উত্থান-পতনের এক নির্বাক সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সুলতান সাইদ বিন সুলতান যখন ওমানের মাস্কাট থেকে রাজধানী জাঞ্জিবারে স্থানান্তরিত করেন, তখন একদিকে যেমন লবঙ্গ চাষের মাধ্যমে এটি "মসলা দ্বীপ" হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অন্ধকার অধ্যায়। রূপালী সৈকতের এই মায়াবী স্টোন টাউনই একসময় ছিল পূর্ব আফ্রিকার মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বর্বর দাস বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আজ যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন অ্যাংলিকান ক্যাথেড্রাল, ঠিক সেখানেই সুদীর্ঘকাল ধরে চলত পৃথিবীর অন্যতম জঘন্য ও অমানবিক দাস বাজার। এখানকার মাটির নিচের অন্ধকার বন্দিশালা আর শৃঙ্খলিত দাসদের মর্মস্পর্শী ভাস্কর্য সংবলিত স্মৃতিস্তম্ভটির সামনে দাঁড়ালে আজও বুকটা অজানা এক বেদনায় কেঁপে ওঠে, যা ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশদের চাপে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছিল।
ইতিহাসের এমন গম্ভীর ও বিষাদময় আবহ থেকে মনটাকে একটু হালকা করতে এরপর ঘুরে এলাম বিশ্ববিখ্যাত রক ব্যান্ড 'কুইন'-এর কিংবদন্তি লিড ভোকাল ফ্রেডি মার্কারির মিউজিয়াম থেকে। ১৯৪৬ সালে এই স্টোন টাউনের মাটিতেই ফারোখ বুলসারা নামে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্ব কাঁপানো এই রকস্টার, যার স্মৃতিধন্য আদি বাড়িটি এখন বিশ্বসংগীতপ্রেমীদের জন্য পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। মার্কারির সুরের মায়া কাটিয়ে এরপর সোজা চলে গেলাম স্টোন টাউনের সবচেয়ে জমজমাট ও ঐতিহ্যবাহী দারাজানি বাজারে, যেখানে পা রাখতেই এক অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য চারপাশ থেকে আমায় ঘিরে ধরল। বিক্রেতাদের চড়া সুরের হাঁকডাক, কাঙ্গাঁ কাপড়ের রঙিন সমাহার আর জাঞ্জিবারের খাঁটি লবঙ্গ ও নানা জাতের মসলার কড়া ঘ্রাণে পুরো বাজারটি গমগম করছে।
৫
ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম যুদ্ধ: ৩৮ মিনিটের সংঘাত।
১৮৯০ সালে জাঞ্জিবার ব্রিটিশ প্রটেক্টরেট বা সুরক্ষিত রাজ্যে পরিণত হওয়ার পর এই ঔপনিবেশিক আমলেই ঘটেছিল এক অদ্ভুত ঘটনা। ১৮৯৬ সালের ২৭ আগস্ট ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর সাথে জাঞ্জিবারের নতুন সুলতানের এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতটি ইতিহাসে "Anglo-Zanzibar War" নামে সুপরিচিত। আধুনিক সমরাস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে সুলতানের বাহিনী মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। তীব্র আক্রমণের মুখে এই যুদ্ধটি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৩৮ মিনিট, যা আজ অবধি পৃথিবীর ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম যুদ্ধ হিসেবে রেকর্ডের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।
৬
ফোরোধানি গার্ডেনসের স্বাদ এবং এক ক্ষণিকের মেলবন্ধন।
দিনের আলো যখন আস্তে আস্তে ভারত মহাসাগরের বুকে মিলিয়ে গেল, তখন আমার পা জোড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চলে এল সমুদ্রের কোল ঘেঁষে অবস্থিত ফোরোধানি গার্ডেনসে। সন্ধ্যার পর এই পার্কটি যেন রূপকথার মতো বদলে যায় এক জমজমাট স্ট্রিট ফুডের বাজারে! চারপাশে কয়লার আগুনের ধোঁয়া আর তাজা সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউর সুবাস। আমি হাত বাড়ালাম বিখ্যাত মুচমুচে 'জাঞ্জিবারি পিৎজা', স্থানীয় স্যুপ 'উরুজো' আর এক গ্লাস তাজা আখের রসের দিকে। আর ঠিক এখানেই পরিচয় হয়েছিল তাইওয়ানের সেই মেয়েটির সাথে। সে ডাক্তারি পড়ছিল, ইন্টার্নশিপ করতে এসেছিল মালাওয়িতে; আর সেখান থেকেই বন্ধুদের সাথে দলবেঁধে জাঞ্জিবার ঘুরতে আসা।
ফোরোধানির সেই আলো-আঁধারিতে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত অবধি আমাদের অবিরাম আড্ডা চলল, অথচ অদ্ভুত বিষয়—তার নামটাই জানা হয়নি! সে বলেছিল তার বাবার কথা, যিনি গার্মেন্টস ব্যবসার সূত্রে প্রায়ই ঢাকায় আসতেন। জীবনের কত বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি হলো আমাদের মাঝে, হয়তো অনেক বেশি কথা হয়েছিল বলেই কিছু খুব সাধারণ কথা শেষ পর্যন্ত অব্যক্তই থেকে গিয়েছিল। রাত বাড়লে পুরো সন্ধ্যাটা আড্ডায় আলোকিত করে রেখে ওদের ৫/৬ জনের গ্রুপটা চলে গেল এক নাইট ক্লাবে। আমাকেও সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল, কিন্তু পরদিন ভোরেই আমার এন্তেবের উদ্দেশ্যে ফিরে আসবার তাড়া ছিল। প্লেন মিস করবার ভয়ে আর পা বাড়াইনি, ফোরোধানির সেই সমুদ্রের পাড়েই ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। জীবনে এভাবেই অচেনা কোনো বাঁকে কেউ কেউ ধুমকেতুর মতো এসে মনের ভেতর গভীর এক চিহ্ন রেখে যায়, আর তারপর আবার সময়ের অনন্ত স্রোতে হারিয়ে যায়। কেন জানিনা, মনে পড়ল কবি রবার্ট ফ্রস্টের ‘Stopping by Woods on a Snowy Evening’ কবিতার শেষ লাইনগুলো:
The woods are lovely, dark and deep,
But I have promises to keep,
And miles to go before I sleep,
And miles to go before I sleep.
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৮ জুন ২০২৬