
১
ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় পড়া ইতিহাস যখন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়, সেই রোমাঞ্চের কোনো তুলনা হয় না। হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি পড়ে আমার মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, ট্রয় নগরী বুঝি গ্রিসেরই কোনো এক প্রান্তে অবস্থিত। কিন্তু গত ২০২৫ সালের এক সকালে সেই ভুল ভাঙল এবং আমি পা রাখলাম এক নতুন বিস্ময়ে। আজ লিখছি ইস্তানবুল থেকে এজিয়ান ও মারমারা সাগরের কোল ঘেঁষে ইতিহাসের সেই ট্রয়, তুর্কিদের ভাষায় যা ‘ট্রুভা’—সেখানে যাওয়ার গল্প।
২
সকালের যাত্রা ও এসেবাতের হাতছানি।
ট্যুর অপারেটরের কোস্টারে করে যখন ইস্তানবুল থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো, তখন ভোরের আলো ফুটছে। আমাদের একপাশে মারমারা সাগর আর অন্যপাশে এজিয়ান সাগরের নীল জলরাশি। দুই সাগরের রূপ দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চললাম ঐতিহাসিক দার্দানেলিস প্রণালীর দিকে। ফেরি পার হয়ে আমরা যখন এসেবাত শহরে পৌঁছালাম, তখন চারপাশটা যেন ইতিহাসের গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এখানে এসে আমাদের ভ্রমণ দলটা এক দারুণ মোড়ের মুখোমুখি হলো। এসেবাত শহরটি মূলত দুটি ভিন্ন ইতিহাসের প্রবেশদ্বার। আমাদের দলের একটি গ্রুপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত গ্যালিপলির রুট ধরে চলে গেল। আর আমরা যারা ট্রয়ের পথ ধরলাম, তারা চানাক্কালের মূল শহরে যাওয়ার আগে এসেবাত শহরের উপকণ্ঠেই আমাদের লাঞ্চ পর্বটা সেরে নিলাম। যেখানে আমরা খেয়েছিলাম, তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বীরদের স্মরণে নির্মিত এক বিশাল যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। একপাশে আধুনিক ইতিহাসের ট্র্যাজেডি, আর চোখের সামনে দার্দানেলিসের ওপারে প্রাচীন ইতিহাস—এই দুইয়ের মাঝে বসে লাঞ্চ করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য ছিল।
৩
চানাক্কালে ও সেই জাদুকরী ট্রোজান হর্স।
লাঞ্চ শেষ করে ফেরি পার হয়ে আমরা পৌঁছালাম চানাক্কালে (Çanakkale) শহরের উপকণ্ঠে। সেখানে পা রাখতেই বুকটা ধক করে উঠল। দূর থেকেই চোখে পড়ল সেই বিশালাকার কাঠের ঘোড়া—'ট্রোজান হর্স'।
ওডিসিয়াসের সেই চতুর বুদ্ধি, ঘোড়ার পেটে লুকিয়ে থাকা গ্রীক সৈন্য আর এক রাতের গভীরে একটি আস্ত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার গল্পটা নিমেষেই চোখের সামনে ভেসে উঠল। ২০০৪ সালের হলিউডের বিখ্যাত 'Troy' সিনেমায় ব্র্যাড পিট ও এরিক বানাদের পেছনে যে আসল প্রপ ঘোড়াটি ব্যবহার করা হয়েছিল, এটি সেটিই! শুটিং শেষে ওয়ার্নার ব্রাদার্স এটি তুরস্ক সরকারকে উপহার দেয়, যা এখন চানাক্কালের সমুদ্রতীরে ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি যেন সাগরের বাতাস আর এই ঘোড়াটি দেখার রোমাঞ্চে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
৪
হিসারলিক ও ট্রুভার রহস্যময় ধ্বংসাবশেষ।
চানাক্কালে থেকে আমাদের কোস্টার ছুটে চলল মূল গন্তব্য—হিসারলিক পাহাড়ী অঞ্চলের দিকে। এই হিসারলিকই হলো সেই চারণভূমি, যার মাটির নিচে হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে ছিল আসল ট্রয়। ১৯৯৮ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে।
এখানে এসে গাইড যখন আমাদের পুরো সাইটটি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন, তখন বুঝতে পারলাম কেন একে প্রত্নতত্ত্বের এক গোলকধাঁধা বলা হয়। এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট শহর নেই, বরং একটির ওপর আরেকটি করে মোট ৯টি ভিন্ন যুগের শহর বা স্তরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে! খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ থেকে শুরু করে রোমান আমল পর্যন্ত, বারবার ধ্বংস হওয়া এবং নতুন করে গড়ে ওঠার এক মহাকাব্যিক দলিল এই হিসারলিক।
ক। প্রাচীন দেয়াল ও র্যাম্প।
আমরা যখন ট্রয়-৬ (Troy VI) এবং ট্রয়-৭ স্তরের সামনে দাঁড়ালাম, গাইড জানালেন—এটিই হোমারের বর্ণিত সেই ট্রয়, যা গ্রীকরা ১০ বছর ধরেও ভাঙতে পারেনি। সেই বিশাল ও নিখুঁত পাথুরে দেয়ালের নিচের অংশ এবং ঢালু পাথুরে পথ (Paved Ramp) আজও অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে।
খ। স্ক্যামান্ডার উপত্যকা।
দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে যখন নিচের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠের দিকে তাকালাম, তখন জানলাম—৩,০০০ বছর আগে এই মাঠটি ছিল আসলে সমুদ্রের অংশ! হোমার লিখেছিলেন গ্রীকদের জাহাজগুলো ট্রয়ের দেয়ালের কাছেই নোঙর করা ছিল। শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে স্ক্যামান্ডার (বর্তমান কারামেন্দিরেস) নদীর পলিমাটি জমে সমুদ্র আজ ৫ কিলোমিটার পিছিয়ে গেছে। এককালে যেখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, আজ তা শান্ত ফসলি জমি।
গ। ইতিহাসের ক্ষত।
ধ্বংসাবশেষের কিছু দেয়ালে এখনো কালো পোড়া দাগ দেখা যায়। ধারণা করা হয়, গ্রীকদের লাগানো সেই বিধ্বংসী আগুনেরই চিহ্ন বহন করছে এই পাথরগুলো। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক এখানেই হয়তো এককালে একিলিস আর হেক্টরের তলোয়ারের ঝনঝনানি উঠেছিল! হোমারের প্রতিটি লাইন যেন সেই ভাঙা দেয়ালগুলোর ভাঁজে ভাঁজে জীবন্ত হয়ে উঠছিল।
৫
কেউ যদি হোমারের মহাকাব্য নাও পড়ে থাকেন, তবুও ট্রুভার এই ধ্বংসাবশেষ এবং চানাক্কালের পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করবেই। তবে যাওয়ার আগে ট্রয় যুদ্ধের ইতিহাসটা একটু জেনে নিলে হিসারলিকের প্রতিটি পাথরের পেছনের গল্প মন দিয়ে অনুভব করতে পারা সম্ভব।
২০২৫ সালের সেই দিনটি আমার ভ্রমণ ডায়েরির অন্যতম সেরা একটি পাতা হয়ে থাকবে। বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা ট্রয় বা ট্রুভা আমার স্মৃতিতে চিরকাল অম্লান থাকবে। হিসারলিকের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে মনের গভীরে কেবল ২০০৪ সালের 'Troy' সিনেমার ওডিসিয়াসের (Sean Bean) সেই বিখ্যাত সংলাপটিই বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল:
"If they ever tell my story, let them say I walked with giants. Men rise and fall like the winter wheat, but these names will never die. Let them say I lived in the time of Hector, tamer of horses. Let them say I lived in the time of Achilles."
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১ জুলাই ২০২৬